বাংলাদেশ

অর্থ পাচারের ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা৷ এই অর্থ বাংলাদেশের দু'টি বাজেটের সমান৷ স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই৷

default

গত ২ মে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে  ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে৷ বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা৷ বলা হয়েছে, আমদানি-রপ্তানিতে আন্ডার ভয়েস এবং ওভার ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধাণত এই অর্থ পাচার করা হয়৷

এবারের প্রতিবেদনে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা৷

জিএফআই-এর প্রতিবেদন মতে, ২০০৪ সালে পাচার হয় ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০১১ সালে পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার৷ ২০১২ সালে পাচার হয়েছে ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার৷ ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার পাচার হয়েছে৷

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সব তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণমূলক কিছু কাজ করেছে৷ তারা দেখিয়েছে ২০১৩ সালে পাচার হওয়া অর্থ দেশের শিক্ষা বাজেটের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ গুণ বেশি, আর স্বাস্থ্য বাজেটের তুলনায় বেশি ৮ দশমিক ২ গুণ৷ পাচার হওয়া ওই অর্থের ২৫ শতাংশ হারে যদি কর পাওয়া যেত, তাহলে স্বাস্থ্য বাজেট তিন গুণ এবং শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ করা সম্ভব হতো৷ সিপিডি আরও দেখিয়েছে, ওই সময়ে পাচার হওয়া অর্থ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে ৫ শতাংশ এবং একই সময়ে বাংলাদেশের পাওয়া মোট বৈদেশিক সাহায্যের ৩৪০ শতাংশের সমান৷

বাংলাদেশের পাঠক প্রিয় দৈনিক প্রথম আলোর বিজনেস এডিটর শওকত হোসেন মাসুম গত বছর অর্থ পাচারের ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেন৷ সেই প্রতিবেদনে তিনি সিপিডি-র তথ্য সূত্র উল্লেখ করে বলেন, ‘‘মোট পাচার হওয়া অর্থের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে৷ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমদানি করা পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে অর্থ বাইরে পাচার করা হয়৷ সিপিডি এ বিষয়ে গবেষণা করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু উদাহরণ দিয়েছে৷ যেমন, ২০১৪ সালের মার্চে সাড়ে ৫৪ শতাংশ আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা একটি রেকর্ড৷ এ সময়ে কেবল পুঁজি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ৭৩ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি৷ আবার এ সময়ে ফ্রান্স থেকে কেবল ক্রেন (পণ্য ওঠানো-নামানোর যন্ত্র) আনা হয়েছে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের৷ পুঁজি যন্ত্রপাতি হিসেবে এর শুল্ক মাত্র ২ শতাংশ৷ ২০১৫ সালেও পুঁজি যন্ত্রপাতির দাম বেশি দেখানো হয়েছে৷''

অডিও শুনুন 04:42

‘আমাদের বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হয়’

সিপিডির দেওয়া আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যত চাল বিদেশ থেকে আনা হয়েছে, তার আমদানি মূল্য ছিল টনপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ডলার৷ অথচ এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের গড় মূল্য ছিল টনপ্রতি  প্রায় ৫০০ ডলার৷

২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার বা ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা পাচার হয়েছে৷ ওই বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা চলতি অর্থ বছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার সমান৷ চলতি বাজেটে  সরকারের ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা৷

২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা৷ এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দু'টি বাজেট করা সম্ভব৷ বাংলাদেশের চলতি বছরের বাজেট ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার৷

শওকত হোসেন মাসুম বলেন, ‘‘আমদানি-রপ্তানি ছাড়াও হুন্ডির মাধমেও টাকা পাচার হয়৷ বিনিয়োগ বা মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের আড়ালেও বাংলাদেশ থেকে টাকা অবৈধভাবে পাচার হয়৷ তবে এই পাচারের ব্যাপারে বাংলাদেশে তেমন কোনো গবেষণা নেই৷ আমাদের বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হয়৷ এজন্য বাংলাদেশের তিনটি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারে৷ বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং দুদক৷ কিন্তু তাদের তেমন কোনো কাজ দেখা যায় না৷''

এদিকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ বাড়ছে প্রতি বছর৷ সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড, ২০১৫ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ বেড়ে ৫৫ কোটি সুইস ফ্রাঁ ছাড়িয়ে গেছে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪ হাজার ৪শ' ৮ কোটি টাকার বেশি৷ এর আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ৬০ লাখ সুইস ফ্রাঁ৷ এক বছরে ১০ তাংশ বেড়েছে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের হিসেব থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে৷ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে৷ বিশ্লেষকদের কথা বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকের এই টাকা পাচার হওয়া টাকা৷

অডিও শুনুন 05:59

‘অবৈধ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে জমা রাখা হয়’

গত বছরের মে মাসে দ্বিতীয় দফায় পানামা পেপারস-এ বাংলাদেশের অন্তত ৫০ ব্যক্তি ও ৫টি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে যারা অফশোর কোম্পানি স্থাপন করেছেন দেশের বাইরে৷ কর ফাঁকি দিয়ে দেশের বাইরে অর্থ পাচার করা হয় এইসব অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে৷

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) -এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বৈধ পথে ৩ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দেশের বাইরে নেয়ার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসা, শিক্ষাসহ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য এক শ্রেণির নাগরিক অবৈধভাবে অর্থ পাচার করেন৷ আবার কেউ বৈধভাবে আয় করছেন, কিন্তু দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চান৷ সুযোগ না থাকায় তারা পাচার করেন৷ আরেক শ্রেণি আছে, যারা দেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আয় করেন৷ তারা সেই অর্থ নিরাপদ রাখতে দেশের বাইরে পাচার করেন বা বিনিয়োগ করেন৷ প্রথম দুই শ্রেণির জন্য সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারে৷  আইনের আওতায় সুযোগ দেয়া যায় কিনা ভাবতে পারে৷ কিন্তু তৃতীয় পক্ষ দেশের জন্য ক্ষতিকর৷ তাদের আয় অবৈধ এবং তারা পাচার করে দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘এই অবৈধ আয়ধারী অর্থ পাচারকারীদের আমরা চিনি, কিন্তু নাম বলি না৷ আমার জানা মতে, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে এখন বড় একটি বিনিয়োগ হচ্ছে অবৈধ অর্থ পাচারের মাধ্যামে৷ যারা এটা করছেন, তাদের একটি টেলিভিশন চ্যানেলও আছে৷''

ড. নাজনীন আরো বলেন, ‘‘অবৈধ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে জমা রাখা হয়৷ আর ওইসব ব্যাংক ক্লায়েন্টের তথ্য গোপন রাখে৷ কেউ বাড়ি কেনেন, কেউবা বিনিয়োগও করেন৷''

শওকত হোসেন মাসুম বলেন, ‘‘সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে অর্থ পাচার বেড়ে যায়৷ আর এই অর্থ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কারা পাচার করেন তা বোঝা যায়৷ অর্থমন্ত্রী গত বাজেট বক্তৃতায় অর্থ পাচারের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কোনো পক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না৷''

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ব্যাপক অবৈধ আয়ের সুযোগ আছে৷ অবৈধ আয়ের সুযোগ বন্ধ না করে অর্থ পাচার বন্ধ করা কঠিন৷ অর্থ পাচার বেআইনি৷ মানি লন্ডারিং আইনে তা ধরে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে৷ আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের তথ্য জানতে সরকারি পর্যায়ে চুক্তি করতে হবে৷ আর তা না করা গেলে বাংলাদেশ বিপূল পরিমান অর্থ হারাবে৷ ট্যাক্স হারাবে৷ বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو