আফ্রিকার মুসলিম তরুণরা জিহাদি হচ্ছে কেন?

অনেক তরুণ আফ্রিকান চরমপন্থি গোষ্ঠীতে যোগ দিয়ে দারিদ্র্য ও হতাশা থেকে মুক্তি পাবার স্বপ্ন দেখছে এবং এ প্রবণতা বাড়ছে বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে৷

আফ্রিকার মুসলিম তরুণরা বোকো হারামের মতো জিহাদি সংগঠনগুলির সঙ্গে জড়ায় কেন? খাদিজা হাওয়াজা গাম্বো বহু বছর ধরে এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছেন৷

‘‘বহু নাইজেরীয় তরুণ এতই হতাশ যে, তারা প্রাণপণে পালানোর কোনো পন্থা খুঁজছে,’’ নাইজেরিয়ার মানবাধিকার আন্দোলনকারী গাম্বো ডয়চে ভেলের একটি সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন৷ তাঁর মতে, ‘‘তাদের অধিকাংশই সেই পথ না খুঁজে পেয়ে আরো ক্রুদ্ধ, আরো হতাশ, সমাজের প্রতি আরো আগ্রাসী হয়ে পড়ে৷’’ এই মানসিক অবস্থা থেকে সহজেই উগ্রপন্থি হওয়া যায়৷ গাম্বো নিজে মুসলিম৷ তিনি এসেছেন মধ্য নাইজেরিয়ার জস শহর থেকে, যেখানে ইসলামি সন্ত্রাসী সংগঠন বোকো হারাম গত বছর একাধিক আক্রমণ চালায়

এ পর্যন্ত ১৭,০০০-এর বেশি নাইজেরীয় জিহাদি সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন৷ প্রধানত উত্তর নাইজেরিয়া থেকে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন৷ বোকো হারামের নামে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোররা বারংবার আত্মঘাতী সন্ত্রাসী আক্রমণ চালিয়েছে৷

 Townhall-Debate

নাইজেরিয়ার মানবাধিকার আন্দোলনকারী গাম্বো

ধর্মীয় প্রেরণা থেকে নয়: জাতিসংঘ

উগ্রপন্থি ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সমস্যা শুধু নাইজেরিয়ার নয়, উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বোকো হারামের গতিবিধির পাশাপাশি আল-শাবাব জঙ্গি গোষ্ঠীও বহু বছর ধরে সোমালিয়ায় ক্ষমতা দখলের যুদ্ধ চালিয়ে আসছে৷ মালিতে আল-কায়েদার একটি শাখা ছাড়া অপরাপর গোষ্ঠী সক্রিয়৷ জাতিসংঘের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আফ্রিকায় প্রায় ৩৩,০০০ মানুষ চরমপন্থি সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন৷

রাজনীতি | 12.12.2016

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আফ্রিকার তরুণ মুসলিমরা ধর্মপরায়ণতার চেয়ে দারিদ্র্য ও সুযোগের অভাবের  কারণেই জঙ্গিবাদের দিকে বেশি ঝুঁকছে৷ ‘জার্নি টু এক্সট্রিমিজম ইন আফ্রিকা’ শীর্ষক রিপোর্টটির জন্য জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি-র তরফ থেকে দু'বছর ধরে আফ্রিকার বিভিন্ন উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর প্রায় ৫০০ জন সাবেক সদস্যের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়৷

খাদিজা হাওয়াজা গাম্বো মনে করেন ১২৮ পাতার রিপোর্টের সিদ্ধান্তসমূহ সঠিক৷ যাঁরা বাস্তবিক ইসলাম বোঝেন, তাঁদের কাছে বোকো হারাম গোত্রীয় গোষ্ঠীগুলির ইসলামের ব্যাখ্যা গভীরভাবে অনৈসলামিক৷

বোকো হারাম

ইসলামিক স্টেট বা আইএস নয়, বিশ্বের ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে নাইজেরিয়ার বোকো হারাম৷ ২০১৫ সালে আবু বকর শেকাউ-এর নেতৃত্বে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি ৬ হাজার ৬৪৪ জন মানুষকে হত্যা করেছে৷ তাদের হামলায় আহত হয়েছে ১,৭৪২ জন৷ বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক৷ এছাড়া হাজারো কিশোরীকে অপহরণ করেছে বোকো হারাম৷

ইসলামিক স্টেট

যদিও বোকো হারাম আইএস-এর তুলনায় বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, কিন্তু আতঙ্ক সৃষ্টির দিক থেকে সবচেয়ে উপরে আছে আইএস৷ বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলা হচ্ছে আইএসকে৷ ২০১৫ সালে তাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে ৬ হাজার ৭৩ জন মানুষ এবং আহত হয় ৫ হাজার ৭৯৯ জন৷ ১০৭১টি হামলা চালিয়েছে তারা বিশ্ব জুড়ে৷ আবু বকর আল-বাগদাদির নেতৃত্বে সংগঠনটি সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক ও ইউরোপ জুড়ে এখনো হামলা চালিয়ে যাচ্ছে৷

তালেবান

১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলার সময় এই জঙ্গি সংগঠনটির আবির্ভাব৷ বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ জঙ্গি সংগঠন বলা হয় এদের৷ ২০১৫ সালে তালেবানের হাতে প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ৪৭৭ জন এবং আহত হয়েছে ৩ হাজার ৩১০ জন৷ গত বছর বিশ্ব জুড়ে ৮৯১ টি হামলা চালিয়েছে তারা৷ হিবাতুল্লাহ আকন্দজাদা এখন তালেবানের নেতৃত্বে রয়েছেন৷

ফুলানি জঙ্গি গোষ্ঠী

বিশ্বব্যাপী এদের তেমন পরিচিতি নেই৷ এরা নাইজেরিয়ার ফুলা সম্প্রদায়ের মানুষ৷ এদের লক্ষ্য ফুলানির ভূমি মালিকদের হত্যা করা৷ ২০১৫ সালে ১৫০ টি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে ফুলানি, তাদের হামলায় মারা গেছে ১ হাজার ২২৯ জন৷

আল-শাবাব

বোকো হারামকে যদি আইএস-এর সাথে তুলনা করা হয়, তবে আল শাবাবকে তুলনা করা যায় আল-কায়েদার সঙ্গে৷ পূর্ব আফ্রিকায় এদের আধিপত্য অনেক বেশি৷ সোমালিয়াকে ইসলামিক রাষ্ট্র বানানোই তাদের মূল লক্ষ্য৷ গত বছর জঙ্গি গোষ্ঠীটি ৪৯৬টি হামলা চালিয়েছে, হত্যা করেছে ১ হাজার ২১ জন মানুষকে, আহত হয়েছে ৮৫০ জন৷

গাম্বো বলেন, ‘‘কোনো ব্যক্তি ইসলাম সম্বন্ধে যত কম জানে, ততই সে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়৷ যারা ইসলাম সম্পর্কে কিছু জানে না, তারা ঐসব গোষ্ঠী যা বলে, তা-ই বিশ্বাস করে৷’’ ইউএনডিপি-র সমীক্ষা গাম্বোর ধারণাকেই প্রতীত করছে৷ জরিপের ৫০০ সাবেক ইসলামি জঙ্গির ৫৭ শতাংশ ইসলামধর্মের আকরগ্রন্থ বা তার বয়ান সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না৷ জাতিসংঘের জরিপ অনুযায়ী, ছয় বছর বা তার বেশি সময় ধরে ইসলাম শিক্ষা জঙ্গি হওয়ার সম্ভাবনাকে ৩২ শতাংশ কমিয়ে দেয়৷

ধর্ম নয়, হতাশা

চরমপন্থি সংগঠনগুলির কর্মীরা ধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়, বরং তারা হতাশাগ্রস্থ তরুণ৷ তারা নিজেকে অবহেলিত ও পরিত্যক্ত বলে মনে করছে বলে প্রতিবেদনের রচয়িতারা মনে করেন৷ বিশেষ করে আফ্রিকার দরিদ্রতম প্রত্যন্ত এলাকার তরুণ ও কিশোররা চরমপন্থিদের বাগাড়ম্বরে মোহিত হয়, যার একটি নিদর্শন হলো আল-শাবাব৷ জঙ্গি সংগঠনটি ২০০৬ সাল থেকে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের জন্য যোদ্ধা সংগ্রহ করে আসছে৷ আল-শাবাবের লক্ষ্য হলো, হর্ন অফ আফ্রিকায় ইসলামি শাসন চালু করে বিশ্বব্যাপী জিহাদে অংশগ্রহণ করা৷

‘‘তরুণদের কর্ম ও অর্থের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়; তারা ভাবে, এই সব গোষ্ঠীতে যোগদান করলে তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটবে ও তারা তাদের পরিবারবর্গকে সাহায্য করতে পারবে,’’ বলেন মোম্বাসাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হাকি আফ্রিকা’-র সালমা হিমিদ৷ তাঁরও ধারণা, ধর্মীয় বা আদর্শগত কারণের চেয়ে অর্থনৈতিক কারণেই যুব জনতা জিহাদি গোষ্ঠীগুলিতে বেশি যোগদান করে৷ তিনি আরো মনে করেন, আফ্রিকার সরকারবর্গকে এ বিষয়ে সচেতন করা উচিত৷

আন্তোনিও কাসকেইস/এসি