আলাপ

‘আমরা খেয়াল করি বা না করি, এরাই জলবায়ু উদ্বাস্তু'

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনবহুল শহর ঢাকা৷ এ শহরে প্রতিদিন দুই হাজার নতুন মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে আসেন, অধিকাংশই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে৷ মূলত নদী ভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা লবণ পানির শিকার এই ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুরা'৷

Bangladesch Klimaflüchtlinge Slum Dhaka

বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে৷ ২০৮০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে পানির উচ্চতা ২ ফুট বাড়বে বলে আশঙ্কা৷ আর তাই যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশের ৪০ ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে৷ অথচ এই ৪০ ভাগ এলাকায় কমপক্ষে ৫ কোটি মানুষ বাস করেন৷ নগর গবেষক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এর ফলে ফসলি জমি নষ্ট হবে, কৃষক-জেলে নিজেদের পেশা হারাবে৷ হারাবে তাদের আশ্রয় বা আবাসও৷ আর তারপর কাজের খোঁজে আশ্রয়ের খোঁজে মহানগরীতে ভিড় করবে এরা৷ বিশেষ করে ঢাকা শহরই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য৷ এরাই যে জলবায়ু উদ্বাস্তু৷''

ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার-এর হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন৷ নগর গবেষকদের মতে, প্রতি বছর ঢাকার জনসংখ্যা চার থেকে পাঁচভাগ হারে বাড়ছে৷ আর এই স্থানান্তরের হার ভবিষ্যতে আরো বাড়বে৷

ড. নজরুল ইসলামের কথায়, ‘‘ঢাকা ছাড়াও এই জলবায়ু উদ্বাস্তুরা গাজীপুর ও তার আশেপাশের এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন৷ এরা প্রধানত বস্তিতে থাকছেন, যেখানে ন্যুনতম নাগরিক সুবিধা নেই৷ আর এভাবে ঢাকা শহরে ভিড় করার ফলে এরা ঢাকার নগর জীবনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছেন৷''

বলা বাহুল্য, ঢাকার বস্তি এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে স্থানান্তরিত বলে জানিয়েছে অভিবাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমও৷

অন্যদিকে পরিবেশবিদ ইকবাল হাবিব ডয়চে ভেলেক বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার হচ্ছে নারী৷ কারণ সংসার বা ঘর-গৃহস্থালি তাঁকেই করতে হয়৷ তারপর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক৷ সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে৷ কৃষক চাষাবাদ উপযোগী কৃষি জমি হারিয়ে উদ্বাস্তে পরিণত হচ্ছে৷ আর তখনই তাঁরা আশ্রয় হারিয়ে এই নগরীতে আসছেন৷ এভাবে গ্রাম থেকে শহরে আসা পুরুষরা প্রধাণত রিক্সা চালান আর নারীদের বস্তিতে সন্তান-সংসার সামলিয়ে বাড়ি বাড়ি গৃহকর্মীর কাজ করে উপার্জন করতে হয়৷ জীবন হয়ে ওঠে ঝড়া পতার মতো৷''

ভিডিও দেখুন 02:46

গাইবান্ধায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের চিত্র

লবণপানি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে ধীরে ধীরে গ্রাস করায় সেখানকার মানুষ শুধু কাজ হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে না৷ তাঁরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও পড়ছেন, বিশেষ করে নারীদের এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি৷ বাংলাদেশের দক্ষিণের খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, বাগেরহাটের মংলা ও শরণখোলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার প্রায় দুই লাখ নারী ও কিশোরী প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন৷ একই অবস্থা ঢাকার বস্তিগুলোতেও৷

ইকবাল হাবিব বলেন, ‘‘ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় উপকূলীয় এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুতরা এসে আশ্রয় নেয়ায় নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে৷ এদের মধ্যে নিম্নাঞ্চল এবং জলাশয় ভরাট করে আবাসন এবং বস্তি তৈরির প্রবণতা লক্ষ্যণীয়৷ ফলে ঢাকার প্রাণপ্রবাহ এবং পানির বাহ্যিক উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে ঢাকা শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে৷ এছাড়া ঢাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় শহরে এখন নানা ধরণের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে৷''

২০১১ সালের এক গবেষণায় জানানো হয়, ২০৭০ সালের মধ্যে বন্যায় উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ ২০ জনবহুল শহরের তালিকায় ঢাকা তৃতীয়৷ প্রথম স্থানে কলকাতা ও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মুম্বই৷ ৩২৫ বর্গ কিলোমিটারের এই শহরটিতে বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি, ফলে ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন, ময়লা ব্যবস্থাপনা আর যোগাযোগ কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রব ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ বিপর্যয়ে আমাদের ভূমিকা সামান্য হলেও এর বড় শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছি আমরা৷ আর এটা নিয়ে বিশ্বে রাজনীতি আছে৷ ফলে কার্বণ নিঃসরণ কমিয়ে আনার ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না৷''

তিনি বলেন, ‘‘সারা বিশ্বকে মিলেই এই বিপর্যয় রোধে উদ্যোগ নিতে হবে৷ বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের হয়ত উপকূলের চার থেকে পাঁচ কোটি মানুষকে সরিয়ে আনতে হবে৷ এদের জন্য বিকল্প পেশা, আবাসস্থল ইত্যাদির লক্ষ্যে এখন থেকেই মহাপরিকল্পনা নিতে হবে৷''

অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রবের কথায়, ‘‘এরইমধ্যে দেখা গেছে যে, ঢাকায় জলবায়ু পবির্তনের শিকার হয়ে যাঁরা আছেন তাঁরা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না৷ এগে আগে প্রধানত কৃষক ছিলেন৷ কিন্তু এখন এরা বলতে গেলে পেশায় উদ্বাস্তু৷ তাই এদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই৷''

ড. নজরুল ইসলাম বলেন, গত জন গণনায় দেখা গেছে যে, গ্রামের লোক বাড়ছে না৷ বাড়ছে শহরের মানুষ৷ এর কারণ, মানুষ এখন পরিস্থিতির চাপে অতিমাত্রায় শহরমুখী৷ ২০৪০ সাল নাগাদ শতকার ৫০ ভাগ মানুষই নাকি শহরে বসবাস করব৷ কিন্তু ঢাকাসহ দেশের শহরগুলো এই জনসংখ্যার চাপ নিতে যে কোনোভাবেই প্রস্তুত নয়৷ তাই তাঁর কথায়, ‘‘বাস্তবতা না পাল্টালে এ শতাব্দীর শেষে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে৷''

বন্ধুরা, বাস্তবতা না পাল্টালে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? জানান নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو