আমার বিয়ের অনুষ্ঠানটা ছিল অন্যরকম

ছোটবেলা থেকেই বিয়ের কথা শুনলে ভয় পেতাম৷ শুধু যে নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের কথা ভেবে এমন হতো, তা নয়৷ আমার কোনো চাচা, খালা অথবা বড় ভাই বা বোনের বিয়ের ভিডিওতে পাত্রীর সার্বিক অবস্থা দেখেই খুব খারাপ লাগতো৷

ভিডিওতে আমি দেখেছি, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষেও অনেক আনুষ্ঠানিকতা থাকে, দেখেছি কনের প্রতি সবার দৃষ্টিভঙ্গিটা কেমন যেন বদলে যায়৷ নববধূর প্রতি অনেক রকমের প্রত্যাশার চাপও বাড়তে থাকে৷ এ সব বিষয় আতঙ্ক হয়ে যেন আমাকে তাড়া করতো৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

প্রায়ই একটা দুঃস্বপ্ন দেখতাম আমি৷ দেখতাম আমার মা-বাবা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনেরা জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে৷ সেই দুঃস্বপ্নের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটিতে দেখতাম, আমি আমার কথাগুলো কাউকে বোঝাতে পারছি না, কেউ শুনছে না আমার কথা, আর সেই কষ্টে আমি অঝোরে কেঁদে যাচ্ছি৷ আমি ভাবতাম, পরিবারের কথামতো বিয়ে করতে না চাইলে আমার সঙ্গেও হয়ত আর দশটা মেয়ের সঙ্গে যেমন করা হয়, সেরকম আচরণই করা হবে৷ আমি যেন শুনতাম, আমাকে কাঁদতে দেখেও সবাই হেসে হেসে বলছে, ‘‘বিয়ে হয়ে গেলে এ সব কথা ভেবে ও নিজেও হাসবে৷'' এ রকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যেত, দর দর করে ঘামতাম, ভয়ে আমার শরীর কাঁপতো৷

Heirat von Elita Karim (Sängerin und Journalistin aus Bangladesh)

মাত্র দুশ' মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলাম

আমার বিয়েটা হয়ে যাবার পর থেকে, অর্থাৎ এই বছর খানেক ধরে আমার সেই দুঃস্বপ্নটা দেখা বন্ধ৷ এর আগের কয়েকটা বছর আমাকে বহুবার অনুরোধ করে, নানাভাবে আবেগাপ্লুত করে, কোনো ছেলের সঙ্গে দেখা করা বা ফোনে কথা বলানোর চেষ্টা হয়েছে৷ আমাকে বিয়ে দেয়াই ওসবের মূল উদ্দেশ্য৷ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছিও আমি৷ কিন্তু মনে হয়, আমার কিছু ধ্যান-ধারণা এবং মতামত তাদের হতাশ করেছে এবং সে কারণে তারা আর আমার সঙ্গে দেখাই করতে চায়নি৷

Heirat von Elita Karim (Sängerin und Journalistin aus Bangladesh)

বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে ছোট্ট একটা রেস্তোরাঁয়

কিন্তু যখন আমি সঠিক ব্যক্তিটিকে খুঁজে পেলাম, এমন একজনকে যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি, যে আমার চেয়েও পাগল, যার সঙ্গে বাকি জীবন কাটানোর ব্যাপারে আমি একেবারে শঙ্কাহীন, তার সঙ্গে মিলে কেমন করে আমরা জীবনযাপন করবো, সংক্ষেপে তার একটা ছক এঁকে ফেললাম৷

বিয়ে হয় বেশ কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে৷ প্রচলিত নিয়মে প্রথমে বাগদান পর্ব এবং সেখানেই পাটিপত্রে বর-কনের স্বাক্ষর৷ তারপর একে একে আশীর্বাদ, গায়ে হলুদ, তারপর বিয়ের আসর৷ সেখানে দু’টি পর্ব – সাজ বিয়ে ও বাসি বিয়ে৷ সাজ বিয়েতে সাতবার প্রদক্ষিণ শেষে কনে আর বরকে বরণ করে নেয়া হয়৷ হয় মালাবদল৷ আর বাসি বিয়েতে দেবদেবীর অর্চনা শেষে কনের কপালে সিঁদুর দেয় বর৷ তারপর উভয় মিলে সাতবার অগ্নি দেবতাকে প্রদক্ষিণ করেন৷

‘পানচিনি’ অনুষ্ঠানে ঘটকের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনার পর ‘মোতাসা-রাই’ বা ‘পাকাকথা’ অনুষ্ঠানে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়৷ বিয়ে অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে দুই বাড়িতে আলাদাভাবে ‘হলদি’ বা ‘তেলাই’ অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর অবিবাহিত অবস্থায় নিজের বাড়িতে বর বা কনের শেষ খাওয়া হিসেবে দুই বাড়িতে ‘আইবুড় ভাত’ নামের অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর হয় মূল বিয়ের অনুষ্ঠান৷

এতক্ষণ রীতির কথা বলা হলো৷ কিন্তু সব মানুষের পক্ষে সব নিয়ম পালন করা সম্ভব হয় না৷ কারণ তাঁদের সেই সামর্থ্য থাকে না৷ আবার এর উলটোটাও ঘটে৷ যাঁদের অনেক সামর্থ্য আছে, তাঁরা রীতির বাইরেও জাঁকজমকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করে থাকেন৷

ভিডিওতে আমি দেখেছি, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষেও অনেক আনুষ্ঠানিকতা থাকে, দেখেছি কনের প্রতি সবার দৃষ্টিভঙ্গিটা কেমন যেন বদলে যায়৷ নববধূর প্রতি অনেক রকমের প্রত্যাশার চাপও বাড়তে থাকে৷ এ সব বিষয় আতঙ্ক হয়ে যেন আমাকে তাড়া করতো৷

প্রায়ই একটা দুঃস্বপ্ন দেখতাম আমি৷ দেখতাম আমার মা-বাবা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনেরা জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে৷ সেই দুঃস্বপ্নের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটিতে দেখতাম, আমি আমার কথাগুলো কাউকে বোঝাতে পারছি না, কেউ শুনছে না আমার কথা, আর সেই কষ্টে আমি অঝোরে কেঁদে যাচ্ছি৷ আমি ভাবতাম, পরিবারের কথামতো বিয়ে করতে না চাইলে আমার সঙ্গেও হয়ত আর দশটা মেয়ের সঙ্গে যেমন করা হয়, সেরকম আচরণই করা হবে৷ আমি যেন শুনতাম, আমাকে কাঁদতে দেখেও সবাই হেসে হেসে বলছে, ‘‘বিয়ে হয়ে গেলে এ সব কথা ভেবে ও নিজেও হাসবে৷'' এ রকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যেত, দর দর করে ঘামতাম, ভয়ে আমার শরীর কাঁপতো৷

Heirat von Elita Karim (Sängerin und Journalistin aus Bangladesh)

মাত্র দুশ' মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলাম

আমার বিয়েটা হয়ে যাবার পর থেকে, অর্থাৎ এই বছর খানেক ধরে আমার সেই দুঃস্বপ্নটা দেখা বন্ধ৷ এর আগের কয়েকটা বছর আমাকে বহুবার অনুরোধ করে, নানাভাবে আবেগাপ্লুত করে, কোনো ছেলের সঙ্গে দেখা করা বা ফোনে কথা বলানোর চেষ্টা হয়েছে৷ আমাকে বিয়ে দেয়াই ওসবের মূল উদ্দেশ্য৷ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছিও আমি৷ কিন্তু মনে হয়, আমার কিছু ধ্যান-ধারণা এবং মতামত তাদের হতাশ করেছে এবং সে কারণে তারা আর আমার সঙ্গে দেখাই করতে চায়নি৷

Heirat von Elita Karim (Sängerin und Journalistin aus Bangladesh)

বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে ছোট্ট একটা রেস্তোরাঁয়

কিন্তু যখন আমি সঠিক ব্যক্তিটিকে খুঁজে পেলাম, এমন একজনকে যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি, যে আমার চেয়েও পাগল, যার সঙ্গে বাকি জীবন কাটানোর ব্যাপারে আমি একেবারে শঙ্কাহীন, তার সঙ্গে মিলে কেমন করে আমরা জীবনযাপন করবো, সংক্ষেপে তার একটা ছক এঁকে ফেললাম৷

ঢাকার বেশির ভাগ পরিবারের বিয়েতে যেমনটি হয়ে থাকে, আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটা একেবারেই সেরকম তিন-চার দিন ধরে চলেনি৷ চাটগাইয়াদের মতো আমরা কয়েক হাজার মানুষকে দাওয়াত দিইনি৷ মাত্র দুশ' মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলাম৷ আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মর্যাদা অনুপাতে সংখ্যাটা সত্যিই বিস্ময়কর রকমের কম৷

মুসলিম বিয়ে

সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে পড়ানো হয়৷ দেনমোহর ধার্য করা হয় ছেলের আর্থিক সামর্থ্য ও অবস্থান অনুযায়ী৷ বিয়ের সময় একজন উকিল থাকেন৷ তিনি প্রথমে কনেকে জিজ্ঞাসা করেন, সে বিয়েতে রাজি আছে কিনা৷ কনে রাজি থাকলে বরকেও একই প্রশ্ন করা হয়৷ এরপর দোয়া কালাম করে সম্পন্ন করা হয় বিয়ে৷

হিন্দু বিয়ে

বিয়ে হয় বেশ কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে৷ প্রচলিত নিয়মে প্রথমে বাগদান পর্ব এবং সেখানেই পাটিপত্রে বর-কনের স্বাক্ষর৷ তারপর একে একে আশীর্বাদ, গায়ে হলুদ, তারপর বিয়ের আসর৷ সেখানে দু’টি পর্ব – সাজ বিয়ে ও বাসি বিয়ে৷ সাজ বিয়েতে সাতবার প্রদক্ষিণ শেষে কনে আর বরকে বরণ করে নেয়া হয়৷ হয় মালাবদল৷ আর বাসি বিয়েতে দেবদেবীর অর্চনা শেষে কনের কপালে সিঁদুর দেয় বর৷ তারপর উভয় মিলে সাতবার অগ্নি দেবতাকে প্রদক্ষিণ করেন৷

খ্রিষ্টান বিয়ে

বিয়ের তিন সপ্তাহ আগে পুরোহিতের কাছে বর-কনে নাম লেখান৷ এরপর ‘বান প্রকাশ’ অনুষ্ঠানে বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়৷ বিয়ের আগ পর্যন্ত অপশক্তির নজর থেকে রক্ষার জন্য দুজনকে ‘রোজারি মালা’ পরতে হয়৷ বিয়ের দিন ভোরে কনের বাড়ি গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসা হয়৷ এসময় বরপক্ষ থেকে দেয়া পয়সা ঘরের মধ্যে ছুড়ে দেন কনে৷ এর অর্থ, বাড়ি ছেড়ে গেলেও, বাড়ির লক্ষী ঘর থেকে চলে যাচ্ছে না৷ এরপর গির্জায় বর-কনে দু’জনের মধ্যে আংটিবদল করা হয়৷

বৌদ্ধ বিয়ে

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের পর সামাজিকভাবে সবাইকে জানিয়ে তারিখ ঠিক করে বৌদ্ধবিহারে পাত্র-পাত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে বুদ্ধের পূজা করা হয়৷ ত্রি-স্বরণ পঞ্চশীল পূজার মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুকের আশীর্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়৷ এরপর একজন গৃহী তাঁদের সামাজিক অনুশাসন প্রদান করে৷

ঢাকাইয়া বিয়ে

‘পানচিনি’ অনুষ্ঠানে ঘটকের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনার পর ‘মোতাসা-রাই’ বা ‘পাকাকথা’ অনুষ্ঠানে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়৷ বিয়ে অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে দুই বাড়িতে আলাদাভাবে ‘হলদি’ বা ‘তেলাই’ অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর অবিবাহিত অবস্থায় নিজের বাড়িতে বর বা কনের শেষ খাওয়া হিসেবে দুই বাড়িতে ‘আইবুড় ভাত’ নামের অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর হয় মূল বিয়ের অনুষ্ঠান৷

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিয়ে

চট্টগ্রামের বিয়ে সাধারণত বেশ আড়ম্বরপূর্ণ হয়৷ বিয়ের প্রাথমিক কার্যকলাপ অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সম্পন্ন হয়৷ তবে বিয়ের আগে আয়োজন করা হয় ‘বউ জোড়নি’ অনুষ্ঠান৷ বর ও কনের মধ্যে আলাপ করিয়ে দেয়াই এর মূল লক্ষ্য৷ চট্টগ্রামের আরেকটি বিচিত্র আয়োজন হচ্ছে ‘ঘরজামাই বিয়া’৷

রাজশাহী অঞ্চলের বিয়ে

এই অঞ্চলের বিয়েতে থাকে পিঠার জয়জয়কার৷ বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হওয়ার পর আঞ্চলিক গীতের তালে তালে বর-কনেকে নিজ নিজ বাড়িতে মিষ্টিমুখ করানো হয়৷ এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘থুবড়া’৷ সাধারণত ক্ষীর ও আন্ধাষা (তেলে ভাজা রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পিঠাবিশেষ) তৈরি করা হয়৷ এই মিষ্টি সাধারণত পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে তৈরি করে পাঠানো হয় বর-কনের বাড়িতে৷

শেষ কথা

এতক্ষণ রীতির কথা বলা হলো৷ কিন্তু সব মানুষের পক্ষে সব নিয়ম পালন করা সম্ভব হয় না৷ কারণ তাঁদের সেই সামর্থ্য থাকে না৷ আবার এর উলটোটাও ঘটে৷ যাঁদের অনেক সামর্থ্য আছে, তাঁরা রীতির বাইরেও জাঁকজমকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করে থাকেন৷

আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে ছোট্ট একটা রেস্তোরাঁয়৷ রেস্তোরাঁর বাইরে অনেকটা জায়গা৷ জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর৷ সুন্দর একটা লেক আছে সেখানে৷ লেকের ওপরেই একটা মিনি ব্রিজ৷ ছবি তোলার জন্য জায়গাটা এক কথায় অসাধারণ৷ আমার বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যরা খুব আনন্দ করে ছবি তুলেছে সেখানে৷

লেকের পারে পাথর বিছানো৷ সেখানেই আমাদের ‘নিকাহ', অর্থাৎ কাবিননামায় স্বাক্ষর এবং আংটিবদল হয়েছে৷ বন্ধু-স্বজনরা আমাদের জন্য দারুণ একটা অনুষ্ঠান করেছিল৷ কৌতুক, হাসির নাটক, গান এবং জমজমাট নাচ ছিল সেখানে৷ সবার ভবিষ্যৎ বলার জন্য একটা টিয়ে পাখিও রাখা হয়েছিল৷ নিজের ভবিষ্যৎ জানার জন্য সেই টিয়ের সামনে ভিড় করেছিল সবাই৷ পুরান ঢাকার লেবুর শরবত আর লাচ্ছিরও ব্যবস্থা ছিল৷ বিউটি বোর্ডিং থেকে আসা দু'জন বিরতিহীনভাবে অতিথিদের পছন্দের এই পানীয়ের চাহিদা মিটিয়েছে৷

Heirat von Elita Karim (Sängerin und Journalistin aus Bangladesh)

জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর

আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রথাগত বিয়ের তুলনায় আমার বিয়েটা অনেকটাই অন্যরকম ছিল৷ কারণ প্রথমত, আমার পার্টনার আর আমি আগেই ঠিক করেছিলাম, বিয়ের অনুষ্ঠানের সবকিছু হবে আমাদের ইচ্ছামতো, আমরাই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করবো, আমরাই হবো আয়োজক৷ আমরা আমাদের পরিবারের মুরুব্বিদের আগেই বলেছিলাম, স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া, সাজসজ্জা, অতিথিদের দাওয়াত দেয়া পর্যন্ত সবকিছুর দায়িত্বই যেন তাঁরা আমাদের দু'জনের ওপর ছেড়ে দেন৷

দ্বিতীয়ত, কনেকে বর যে দেনমোহর দেয়, সেটাও আমরা দু'জনই ঠিক করেছি৷ সাধারণত দেনমোহরের জন্য আলাদা একটা দিন, আলাদা আনুষ্ঠানিকতাই থাকে৷ দুই পরিবারের মুরুব্বিরা একসঙ্গে বসেন, তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়, তর্কাতর্কি হয়, তারপর ঠিক হয় বর দেনমোহর হিসেবে কত টাকা দেবে৷ অথচ এটা কিন্তু বর এবং কনেরই আলোচনা করে ঠিক করার কথা৷ এ বিষয়টি নিয়ে মুরুব্বিদের না ভাবার অনুরোধ জানিয়ে আমরাও তা-ই করেছি৷

জার্মানি

প্রথমে কোর্টে ছোট্ট একটি আয়োজনের মাধ্যমে বিয়েটা সেরে ফেলেন বর-কনেরা৷ পরে অন্য এক সময়ে গির্জায় হয় বিয়ের অনুষ্ঠান৷ গির্জার অনুষ্ঠানের আগের রাতে কনের বাড়ির সামনে সেরামিকের বিভিন্ন জিনিস ভাঙেন বর-কনের পরিবারের সদস্যরা৷ এরপর সেটা পরিষ্কার করেন শুধু বর আর কনে৷ এর মাধ্যমে নবদম্পতিকে দলবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে দীক্ষা দেয়া হয়৷

টিউনিশিয়া

কনের এই পোশাকটির নাম ‘কিসওয়া’৷ হীরা আর মুক্তা দিয়ে সাজানো বিয়ের এই পোশাকটি ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই সেটা একদিনের জন্য ধার করে৷ শুধু এক রাতের জন্য ভাড়া হিসেবে দিতে হয় ২৫ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত!

দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিয়ের ক্ষেত্রে এখনও প্রচলিত নিয়মগুলো পালন করা হলেও তরুণরা ইদানীং পশ্চিমা ধাঁচের দিকে ঝুঁকছে৷ সে অনুযায়ী তরুণীরা সাদা গাউন আর তরুণরা কালো জ্যাকেট পরে বিয়ে করছেন৷

ইথিওপিয়া

বরের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য কনের পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়৷ আর বিয়ের দিন বর তিন চারজন সঙ্গীকে নিয়ে গান গাইতে গাইতে কনের বাড়ি যান৷

ভারত

এটি কলকাতার একটি গণবিয়ের অনুষ্ঠানের দৃশ্য৷ বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা এভাবে গরিব মানুষদের জন্য বিয়ের আয়োজন করে থাকে৷ কেননা ভারতে নিয়ম মেনে বিয়ে করাটা ব্যয়বহুল – যা অনেকের পক্ষেই জোগাড় করা সম্ভব হয়না৷

ইরান

ছবিটি ইরানের হলেও এটি আসলে সেখানকার সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ‘তুর্কমেন’-দের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান৷ সংখ্যালঘু হওয়ায় তুর্কমেনদের ভাষা ও সংস্কৃতি খোদ ইরানিদের কাছে ততটা পরিচিত নয়৷ তিন-চারদিন ধরে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়৷

আমাদের দেশে বিয়ের আসরে কনেরা সাধারণত এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে৷ সবাই চায়, কনে গা-ভর্তি গয়না আর চড়া মেকআপ নিয়ে বসে থাকবে আর বন্ধু-বান্ধব বা ভাই-বোনেরা কাছে এলেই হেসে তাদের দিকে তাকাবে৷ শুনে মনে হতে পারে আমি খুব প্রাচীন কালের কথা বলছি, কিন্তু এমনটি আসলে এখনো হরহামেশাই ঘটে৷ এমনিতে এমন সাজে নতুন বৌকে সত্যিই খুব সুন্দর লাগে৷ যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে পারে, বরকে পাশে নিয়ে ছবি তুলতে পারে, তারা আসলেই খুব ধৈর্যশীল৷ কিন্তু আমি আর আমার পার্টনার ঠিক করেছিলাম, ওভাবে বসে না থেকে বিয়েতে আমরা নিজেরাই মজা করবো৷

বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা মঞ্চ বা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় বসিনি৷ সারাক্ষণ এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছি৷ ঘুরে ঘুরে দেখেছি অতিথিদের কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা৷ একটা সময় বন্ধুদের সঙ্গে নেচেছিও আমরা৷ কখনো খাবারের কোনো ‘আইটেম' আসতে দেরি হচ্ছে দেখলে রান্নাঘরে গিয়ে তাগিদ দিয়ে এসেছি৷ সব মিলিয়ে আমার বিয়ের অনুষ্ঠানটা ছিল একটা পার্টির মতো, যার মাধ্যমে আমর খুব কাছের মানুষেরা একত্র হয়ে আনন্দ করার সুযোগ পেয়েছে৷

Heirat von Elita Karim (Sängerin und Journalistin aus Bangladesh)

বিয়ের অনুষ্ঠানটা জীবনের অন্যতম বড় ঘটনা

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিয়ের অনুষ্ঠানটা জীবনের অন্যতম বড় ঘটনা৷ বিয়েটা অনেকটা পরিচয় বদলের মাধ্যম৷ অন্য একটি পরিবারের অংশ হওয়া, আপোস, ত্যাগ স্বীকার – এসবও বিয়ের পরিণাম৷ বিশেষ করে কনের বেলায় তো নাকি বিয়ের পর জীবনটাই বদলে যায়, সবাই আশা করে, সব পরিবর্তনকে সে খোলা মনে, দু'হাত বাড়িয়ে বরণ করে নেবে৷

তবে আমরা, মানে আমি আমার আমার পার্টনার মনে করি, পরিবর্তনকে বরণ করা উচিত আবার কখনো কখনো আমাদের একজনেরই তা প্রত্যাখ্যানও করা উচিত৷ কোনো কিছুর সঙ্গে সাবলীল হতে পারাটা খুব জরুরি৷ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একজন মানুষের অন্যজনের সঙ্গে সাবলীল হওয়া৷ সেই অবস্থাতেই শুধু আপোস বা ত্যাগ স্বীকার স্বতঃস্ফূর্ত হয়, ভালোবাসাও তখন স্থায়ীত্ব পায়৷

এলিটা করিম, বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী, সাংবাদিক ও অভিনেত্রী৷

এলিটা করিমের লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? জানান নীচের ঘরে৷