আর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারছেন না নওয়াজ

পানামা পেপার্স সংক্রান্ত একটি দুর্নীতি মামলায় এই রায় দিয়েছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট৷ গণতন্ত্র আন্দোলনকারীদের মতে এই রায় রাজনৈতিক অভিসন্ধি প্রসূত ও পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ধারার পক্ষে হানিকর৷

শুক্রবার রাজধানী ইসলামাবাদে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত রায়টি ঘোষণা করা হয়৷ সুপ্রিম কোর্ট ভবনের চারপাশে প্রায় ৩,০০০ নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল৷ অধিকাংশ রাজনৈতিক ভাষ্যকার যেমন প্রত্যাশা করেছিলেন, বিচারকরা পানামা পেপার্স মামলায় নওয়াজ শরিফকে দোষী সাব্যস্ত করেন৷ গতবছর থেকে এই মামলা শরিফের মাথার উপর ঝুলছিল৷

বিশ্ব | 13.05.2013

পাঁচজন বিচারকের প্যানেল বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী শরিফ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলির উত্তরোত্তর তদন্তের জন্য বিষয়টি ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো বা জাতীয় জবাবদিহিতা কার্যালয়ে দাখিল করা হবে৷ বিচারকদের প্যানেল সর্বসম্মতিক্রমে শরিফকে ‘ডিসকোয়ালিফাই' করার সিদ্ধান্ত নেন৷

Pakistan Oberster Gerichtshof in Islamabad

‘পানামাগেট'

২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে তথাকথিত পানামা পেপার্সের সূত্রে প্রকাশ পায় যে, শরিফের সন্তানদের মধ্যে তিনজনের এমন কিছু অফশোর কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, যাদের লন্ডনে স্থাবর সম্পত্তি আছে৷ শরিফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন৷

অতঃপর শরিফের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যে পিটিশন দাখিল করা হয়, তার ফলশ্রুতি স্বরূপ সর্বোচ্চ আদালত গত এপ্রিল মাসের রায়ে শরিফকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডিসকোয়ালিফাই, অর্থাৎ অযোগ্য ঘোষণা করতে অস্বীকার করলেও, একটি জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশান টিম (জেআইটি) বা যৌথ তদন্ত গোষ্ঠী গঠনের নির্দেশ দেন৷ উদ্দেশ্য: এই জেআইটি শরিফ সংক্রান্ত অভিযোগগুলির তদন্ত চালিয়ে যাবে৷

Panama Papers Mossack Fonseca

এ বছরের ১০ই জুলাই তারিখে সুপ্রিম কোর্টকে প্রদত্ত রিপোর্টে জেআইটি বলে যে, শরিফ পরিবারের সম্পত্তি বৃদ্ধির জন্য তাঁর দুই পুত্র, হুসেইন ও হাসান নওয়াজকে প্রক্সি বা প্রতিহস্ত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে৷

জেআইটি আরো বলে যে, শরিফ পরিবার তাদের ‘‘আয়ের জ্ঞাত ও বিদিত উৎস'' সংক্রান্ত আবশ্যক নথিপত্র জমা দিতে পারেনি – অর্থাৎ শরিফ পরিবার তাদের সম্পত্তির সঙ্গে তাদের আয়ের সামঞ্জস্য দেখাতে পারেনি৷ পরিশেষে ছয় সদস্য বিশিষ্ট জেআইটি বিষয়টি জাতীয় জবাবদিহিতা কার্যালয়ে পাঠানোর সুপারিশ করে৷

শুক্রবারের রায়ের অর্থ এই যে, শরিফ সংসদে তাঁর আসন বজায় রাখতে পারবেন না৷ সম্ভবত তিনি তাঁর মুসলিম লিগ দলের অপর কোনো প্রার্থীকে আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচন অবধি প্রধানমন্ত্রী পদে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মনোনীত করবেন – যদি তাঁর পক্ষে মধ্যকালীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য চাপ প্রতিহত করা সম্ভব হয়, বিরোধী নেতা ইমরান খান, যিনি পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের প্রধান, তিনি ইতিমধ্যেই যেমন দাবি করছেন৷

Pakistan Gegner von Premierminister Nawaz Sharif in Islamabad

সুপ্রিম কোর্টের সামনে নওয়াজ শরিফ বিরোধীরা শ্লোগান দিচ্ছেন

শরিফ স্বয়ং বিপুল ভোটে ২০১৩ সালের নির্বাচন জেতার পর ক্ষমতায় আসেন৷ তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনোবারেই তার কর্মকাল পূর্ণ করতে পারেননি৷ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় কর্মকাল অসমাপ্ত থেকে যায়, কেননাজেনারেল পারভেজ মুশাররফ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন৷ এবারেও শরিফকে পাকিস্তানের শক্তিশালী মিলিটারি এস্ট্যাবলিশমেন্টের রোষের বলি হতে হচ্ছে, বলে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা: সামরিক হর্তাকর্তারা নাকি বিরোধী দলগুলিকে সমর্থন করছেন৷ শরিফ যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিসাধন ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করছেন, সেটাই নাকি তাঁকে অপ্রিয়পাত্র করে তুলেছে৷

‘পানামা পেপার্স’ আসলে কী?

পানামা পেপার্স হচ্ছে এগারো দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ডকুমেন্ট এবং দুই দশমিক ছয় টেরাবাইট তথ্য যা ই-মেল, আর্থিক বিবরণী, পাসপোর্ট এবং কর্পোরেট নথি আকারে আছে৷ আইন বিষয়ক সংস্থা মোসাক ফনসেকার কাছে এ সব তথ্য ছিল৷ রবিবার প্রকাশিত এই তথ্যে অনেক কাগুজে প্রতিষ্ঠানের খদ্দেরদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেছে, যারা ১৯৭৭ থেকে ২০১৬ অবধি নিজেদের আয়ের সঠিক তথ্য গোপন করেছেন৷

মোসাক ফনসেকা কী?

দ্য ইকোনোমিস্ট পত্রিকা ২০১২ সালে মোসাক ফনসেকাকে ‘অফসোর ফাইনান্সের’ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, যারা নিজেদের সম্পর্কে কোনো তথ্যই প্রকাশ করতো না৷ শেল কোম্পানিদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান পানামাভিত্তিক এই আইন বিষয়ক সংস্থাটি৷ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের মতো ‘ট্যাক্স হেভেন’ বলে পরিচিত প্রায় সব জায়গাতেই তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজ আছে৷

আইসিআইজে কে?

ওয়াশিংটনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম আইসিআইজে ফাঁস হওয়া দলিলদস্তাবেজ পরীক্ষা করে দেখেছে৷ বিশ্বের ৬৫টি দেশের ১৯০ জনের মতো সাংবাদিক এই কনসোর্টিয়ামের সদস্য, যা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে৷

জড়িত কারা?

ট্যাক্স ফাঁকি দিতে মোসাক ফনসেকার সহায়তা নেয়াদের মধ্যে বিশ্বের অনেক নামি-দামি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, তারকা এবং ক্রীড়াবিদরা রয়েছেন৷ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিনের ঘনিষ্ঠদের অর্থের হদিশ পাওয়া গেছে ‘ফাঁস’ হওয়া তালিকায়৷ রয়েছে ভারতের অমিতাভ বচ্চন এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির নামও৷

‘শেল কোম্পানি’ কী?

‘শেল কোম্পানি’ আইনগতভাবে বৈধ এমন এক ধরনের প্রতিষ্ঠান যাদের নিজস্ব কোনো ব্যবসা নেই৷ তারা শুধু অন্যকে নানান নামে অর্থ খাটানোর সুযোগ করে দেয়৷ এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে কার অর্থ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে তা যাতে কোনোভাবে বের করা না যায়৷

‘অফশোর ট্যাক্স হেভেন’ ব্যবহার কি অবৈধ?

যেসব দেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ খুব কম এবং আয়ের উপর কর প্রদানের পরিমান দফারফার মাধ্যমে অনেক কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে, সেসব দেশকে ‘অফশোর ট্যাক্স হেভেন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ সেসব দেশে অর্থ লগ্নি অপরাধ নয়, কিন্তু লগ্নিকারী ব্যক্তিটি যে দেশের সেদেশের কর কর্তৃপক্ষের কাছে সেটা অবৈধ হতে পারে, যদি তিনি সেই বিনিয়োগের কথা না জানিয়ে থাকেন৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে এটা অবৈধ৷

শামিল শামস/এসি