ইইউ-এর কৃষিনীতির ভালোও আছে, মন্দও আছে

প্রসঙ্গটা এলেই ‘ক্যাপ’ বা কমন এগ্রিকালচারাল পলিসির কথা উঠে পড়ে৷ ১৯৬২ সালের এই নীতি অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিপুল পরিমাণ কৃষি ভরতুকি বিলি করে থাকে৷ ক্যাপের ভালোমন্দ নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি৷
অরুণ শঙ্কর চৌধুরী
অরুণ শঙ্কর চৌধুরী

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ক্যাপ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষিনীতি৷ ইইউ-এর বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ আজও যায় কৃষি ভরতুকিতে – তাও অনেক কমার পরে, কেননা ১৯৮৪ সালে ইইউ-এর বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ যেত কৃষি ভরতুকিতে৷

কিসের ভরতুকি? ফসল বা ফল ফলানোর ভরতুকি; পশুপালনের ভরতুকি; কৃষিজাত পণ্য রপ্তানির ভরতুকি৷ আবার কম কীটনাশক ব্যবহারের ভরতুকি; আলে গাছ না লাগানোর ভরতুকি; জমি ফেলে রাখার ভরতুকি; পুকুর না বোজানোর, গাছ বা ঝোপঝাড় বাঁচিয়ে রাখার ভরতুকি; বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ভরতুকি৷

ইউরোপের জনসংখ্যার মাত্র তিন শতাংশ কৃষিজীবী; খাদ্যশিল্পের সঙ্গে মিলে এই কৃষি সেক্টর ইইউ-এর জিডিপি-র মোট ছয় শতাংশ উৎপাদন করে৷ অথচ তারা ইইউ-এর বাজেটের ৩০ শতাংশ বা তার বেশি পেয়ে থাকে৷ মোট জনসংখ্যার এই অকিঞ্চিৎকর অংশটিকে বছরে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ইউরো ভরতুকি দিয়ে থাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন৷

ক্যারিয়ার পরিবর্তন

ভালো চাকরি বলতে যেসব পেশাকে বোঝায়, তেমন চাকরি খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ে কেনিয়ার অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন কৃষিকাজ ও পশুপালনের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন৷ এই যেমন ছবির বাম দিকের তরুণটির নাম ফ্রান্সিস কিমানি৷ ৩০ বছরের এই তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে পড়াশোনা শেষ করে কোনো চাকরি না পেয়ে এখন একটি খামার পরিচালনা করছেন৷ খামারে একশোর বেশি গরু ও প্রায় ২০০ ভেড়া ও ছাগল রয়েছে৷

কৃষক হয়ে বেশি আয়

খামার থেকে কিমানির আয় প্রতিমাসে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা৷ চাকরি করলে বেতন হিসেবে এই পরিমাণ অর্থ পাওয়া সম্ভব ছিল না৷

নারীরাও এগিয়ে আসছেন

৩০ বছরের মেরি গিতাউ পড়াশোনা শেষে চাকরি পাচ্ছিলেন না৷ শেষে তিনিও কৃষিকাজ শুরু করে দেন৷ ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, টমেটো চাষের পাশাপাশি গিতাউ মুরগি, শুকর ও খরগোশ লালন-পালন করেন৷

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

অ্যাকুয়াপোনিক্স ব্যবস্থার মাধ্যমে একসঙ্গে স্ট্রবেরি ও মাছ চাষ করছেন দানিয়েল কিমানি৷ তিনি মনে করেন, চাষের ক্ষেত্রে নতুন এই ব্যবস্থা আরও জনপ্রিয় হবে৷ কেননা এর ফলে পানি ও জায়গার অভাব দূর করা সম্ভব৷ অ্যাকুয়াপোনিক্স ব্যবস্থায় একটি ট্যাংকের পানিতে মাছ চাষের পাশাপাশি পানির ওপরে কোনো কিছু জন্মানো যায়৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার

কৃষিকাজে শিক্ষিত তরুণরা আশায় পণ্য বিক্রি ও বাজারজাতকরণে এসেছে নতুনত্ব৷ ‘মুকুলিমা ইয়ং’ নামের ওয়েবসাইটে তরুণ কৃষকরা তাদের পণ্যের ছবি দেন৷ ক্রেতারাও সেখান থেকেই পণ্য কেনেন৷ এক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের দামও কম পড়ে৷

‘‘কেউ কি পাখি বিক্রি করছেন?

এমন সব প্রশ্নের দেখা মেলে ‘মুকুলিমা ইয়ং’ সাইটে৷ ৩৫ বছর বয়সি জোসেফ মাচারিয়া মাত্র এক বছর আগে সাইটটি শুরু করেছিলেন৷ এখন তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা ২৫ হাজারেরও বেশি৷

‘আমরা সবাই কৃষক হতে পারি’

দানিয়েল কিমানির মতে, ‘‘আমরা সবাই আইনজীবী হতে পারবো না৷ তবে আমরা সবাই কৃষক হতে পারি৷’’ এই কথার মাধ্যমে কিমানি তাঁর আশার কথা শুনিয়েছেন৷ তিনি মনে করেন, কেনিয়াতে আরও বেশি সংখ্যক তরুণ কৃষিকাজের দিকে ঝুঁকবে৷ বর্তমানে কেনিয়ার প্রতি চারজনের মাত্র একজন কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট৷

কৃষিকাজ এখন একটা ব্যবসা

‘মুকুলিমা ইয়ং’ সাইটের প্রতিষ্ঠাতা জোসেফ মাচারিয়া বলেন, ‘‘কৃষিখাত এখন শুধু পরিবারের চাহিদা মেটানোর একটা উপায় নয়, এটা একটা ব্যবসা৷’’ তাঁর মতে, তরুণরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সহজেই কৃষি সংক্রান্ত তথ্য পেতে পারে৷

ক্যাপের ভালো দিক

আবার এও সত্য যে, ক্যাপ ইউরোপকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছে৷ কৃষিজীবীদের আয়ের নিরাপত্তা না থাকলে ইউরোপবাসীরা এত কম দামে এই পরিমাণ খাবারদাবার কিনতে পারতেন না৷ ৭৫০ ধরণের স্থানীয়, প্রথাগত খাদ্যদ্রব্য আর প্রায় দু'হাজার বিভিন্ন ধরনের সুরা ও মদ্যকে এভাবে সুরক্ষিত করে রাখা যেত না৷ মার্কিন ফুড ইন্ডাস্ট্রি ইউরোপের বাজার ভাসিয়ে দিতো৷

বিশ্ব | 12.12.2014

ইউরোপের ৯০ শতাংশই তো গ্রামাঞ্চল, যেখানে তার ৬০ শতাংশ অধিবাসীর বাস৷ অথচ ইউরোপে কৃষিজীবীদের সংখ্যা প্রতিবছর দুই শতাংশ কমে যাচ্ছে৷ চাষি ছাড়া গ্রাম বাঁচে না, গ্রামীণ সংস্কৃতি বাঁচে না – সে কথা ইউরোপেও সত্য৷ তাই শুধু ইউরোপের খাদ্যসংস্কৃতিই নয়, গোটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য গ্রামাঞ্চলকে বাঁচিয়ে রাখা, ছোট খামারগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা, কৃষিজীবীদের বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন – ক্যাপ বা সাধারণ কৃষিনীতি যা করছে৷

সত্যিই কি তাই? ক্যাপের ভরতুকির ৮০ শতাংশ যায় ২০ শতাংশ বড় খামারগুলির কাছে৷ তাদের মধ্যে যেমন ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ পড়েন – যিনি বছরে পাঁচ লাখ ইউরো কৃষি ভরতুকি পান – তেমনই ক্যাম্পিনা কিংবা নেসলে-র মতো ফুড ইন্ডাস্ট্রির জায়েন্টরাও পড়ে৷

বাদবাকি

জার্মানি ইউরোপ | 29.10.2013

অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নে চাষবাসের হালখাতা করতে গেলে কী বাদ দিতে হবে আর কী বাকি থাকবে – তাই হলো প্রশ্ন৷ ইউরোপীয় কৃষির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অতি-উৎপাদন, যেহেতু এই উৎপাদন ডিম্যান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই-এর উপর নির্ভর নয়৷ এর ফলে ইউরোপীয় কৃষি ফুলে-ফেঁপে যে অতিকায় আকার ধারণ করেছে, তা-তে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলি ইউরোপে খাদ্য রপ্তানি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

প্রশ্ন উঠবে কীটনাশক, আগাছানাশক, পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভূত ব্যবহার নিয়ে৷ প্রশ্ন উঠবে রাসায়নিক সার ও তরল জৈব সারের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে৷ প্রশ্ন উঠবে মাত্রাধিক পশুপালন, ও তার ফলে পানি ও পরিবেশের দূষণ নিয়ে৷ প্রশ্ন উঠবে খাদ্যের অপরিসীম অপচয় নিয়ে৷ ফাস্ট ফুড, শিশুদের মেদবহুলতা৷ খাদ্যে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ও রাসায়নিক উপাদান যোগ৷ অরগ্যানিক ফুডের ভালোমন্দ, সেখানেও ভেজাল চলছে কিনা!

সব মিলিয়ে ইউরোপীয় কৃষ্টির জীবনমরণ যে কোনো না কোনো ভাবে এই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, সে উপলব্ধি আজও আছে বলেই সম্ভবত ইউরোপ বেঁচে রয়েছে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে৷ তাই ক্যাপ বানচাল করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না – অন্তত আপাতত নয়৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

ক্যাপ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষিনীতি৷ ইইউ-এর বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ আজও যায় কৃষি ভরতুকিতে – তাও অনেক কমার পরে, কেননা ১৯৮৪ সালে ইইউ-এর বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ যেত কৃষি ভরতুকিতে৷