ইউরোপে শরণার্থী পাঠানোয় এনজিও জড়িত!

ইটালির কাতানিয়া শহরের মুখ্য সরকারি কৌঁসুলি পুনরায় অভিযোগ করেছেন যে, লিবিয়া থেকে অভিবাসীদের ইউরোপে আনতে এনজিওগুলো মানব পাচারকারীদের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে৷

কাতানিয়া বন্দর নগরের চিফ প্রসিকিউটর কার্মেলো জুকারো রবিবার ‘লা স্তাম্পা' দৈনিককে বলেছেন, এনজিওগুলো যে অভিবাসীদের ইটালিতে আনার জন্য সরাসরি মানব পাচারকারীদের সঙ্গে কাজ করছে, তাঁর কাছে এমন সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে৷

কী ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ, সে বিষয়ে জুকারো বিশদ কিছু বলেননি এবং কোনো দায়রা তদন্ত হবে কিনা, সে বিষয়েও তিনি নীরব থেকেছেন৷ তাঁর বক্তব্য হলো, ‘‘এই তথ্য বাস্তবিক বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হবে কিনা অথবা কিভাবে, তা আমরা জানি না৷ কিন্তু আমরা যা বলছি, সে ব্যপারে আমরা নিশ্চিত, লিবিয়া থেকে কিছু এনজিওর কাছে টেলিফোন কল এসেছে৷''

প্রসঙ্গত, গত মাসেও জুকারো অনুরূপ মন্তব্য করেছিলেন৷ মানবিক সাহায্য গোষ্ঠীগুলি ইতিপূর্বেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে যে, তারা না থাকলে আরো অনেক উদ্বাস্তু প্রাণ হারাত৷

জার্মানির ওপর বহুমুখী চাপ

শরণার্থীদের নিয়ে জার্মানিতে উদ্বেগ বাড়ছে৷ বেশ কিছুদিন ধরেই আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলছেন, শরণার্থী সংকট ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংকট হতে চলেছে৷ আশঙ্কা সত্যি হওয়ার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে৷ এ বছর আট লাখেরও বেশি শরণার্থী জার্মানিতে আসবে বলে জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশঙ্কা৷ শরণার্থীবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধছে৷ তার ওপর নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে উঠেছে হাঙ্গেরি থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জার্মানির দিকে ঠেলে দেয়ার হিড়িক৷

জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় ট্রেনবোঝাই শরণার্থী

সোমবার শরণার্থীতে ভরা ট্রেন ঢুকেছে জার্মানির হামবুর্গ ও অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে৷ ট্রেনগুলো এসেছে হাঙ্গেরি থেকে৷ যাত্রীদের বেশিরভাগই সিরিয়ার নাগরিক৷ তবে তাদের কাছে কোনো পাসপোর্ট, ভিসা বা বৈধ কাগজপত্র নেই৷

শরণার্থীদের চাপে বুদাপেস্ট রেল স্টেশন বন্ধ

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে৷ মঙ্গলবার কয়েক হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী ভিয়েনা এবং মিউনিখ যাওয়ার জন্য স্টেশনে হাজির হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয় রেল কর্তৃপক্ষ৷ ভিয়েনার পুলিশ জানায়, বুদাপেস্টের কেলেটি স্টেশনে ৩ হাজার ৬৫০ অভিবাসনপ্রত্যাশী প্লাটফর্মে অপেক্ষারত ভিয়েনা-মিউনিখগামী ট্রেনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করে৷ পরে সবাইকে স্টেশন থেকে বের করে দেয়া হয়৷

হাঙ্গেরিকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস

এই মুহূর্তে হাঙ্গেরি খবরে এলেও, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এতদিন মূলত গ্রিস এবং ইটালি হয়েই ইউরোপের সমৃদ্ধ দেশগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করতো৷ এ বছর অন্তত ৩ লাখ অভিবাসনপ্রত্যাশী ঢুকেছে ইটালি ও গ্রিসে৷ এ কারণে দুটি দেশই ইইউর আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে৷ ইইউর অভিবাসন বিষয়ক দূত জানিয়েছেন, হাঙ্গেরিকেও এ সহায়তা দেয়া হবে৷

শরণার্থীদের বিক্ষোভ

গত সপ্তাহেই ৭১ জন শরণার্থীর গলিত লাশ পাওয়া গিয়েছিল হাঙ্গেরি সীমান্তবর্তী ভিয়েনার এক রাস্তায়৷ মর্মন্তুদ সেই ঘটনার পর শরণার্থীদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দেয়৷ সোমবার ২০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে ভিয়েনায়৷ বিক্ষুব্ধ শরণার্থীদের দাবি, ইউরোপে প্রবেশের বৈধ রুট খুলে দিতে হবে, কেননা, ‘মানবতাই সবচেয়ে বড়’৷ ওপরের ছবিতে ভিয়েনা রেল স্টেশনে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দেখা যাচ্ছে৷

শরণার্থী নিতে রাজি তবে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকায় আপত্তি পোল্যান্ডের

মধ্যপ্রাচ্যের কোনো শরণার্থী নিতে রাজি নয় পোলিশ সরকার৷ সরকারের যুক্তি- ইউক্রেন সংকটের কারণে সেখান থেকে যাঁরা আসছে তাদের গ্রহণ করছে পোল্যান্ড, তাই আর শরণার্থী নেয়া সম্ভব নয়৷ পোল্যান্ড এতদিন সব মিলিয়ে মাত্র ২ হাজার ২০০ শরণার্থী নিতে রাজি ছিল৷ তবে ইইউ অঞ্চলে শরণার্থী সংকট বেড়ে যাওয়ায় পোল্যান্ড আরো বেশি শরণার্থী গ্রহণ করার চিন্তা করছে৷ ছবিতে পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া এক চেচেন পরিবার৷

সাইকেল চালিয়ে....!

সিরিয়া থেকে অনেকে নাকি সাইকেলেই পাড়ি দিচ্ছেন দীর্ঘ পথ৷ রাশিয়ায় প্রবেশ করেছেন অনেকে৷ কেউ কেউ ঢুকে পড়েছেন নরওয়েতে৷ নরওয়ের কিরকেনস শহরের পুলিশ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, এ পর্যন্ত দেড়শ-র মতো সিরীয় সে দেশে ঢুকেছে৷ ইউরোপের দেশ হলেও নরওয়ে বা রাশিয়া ইইউ-র সদস্য নয়৷ তবে নরওয়ে সেঙেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত৷ তাই সেখান থেকে ইইউভুক্ত যে কোনো দেশে অনায়াসে ঢুকে পড়া যায়৷

দায়িত্ব কার?

এনজিও এবং বেসরকারি মালিকানার জলযানের পাশাপাশি ইটালির উপকূলরক্ষী বাহিনীও ভূমধ্যসাগর থেকে নিমজ্জমান অভিবাসীদের উদ্ধার করার কাজে সংশ্লিষ্ট থেকেছে৷ অবশ্য জুকারো বলেছেন যে, যেসব এনজিও ইটালির উপকূলরক্ষীবাহিনীর সঙ্গে কাজ করে, তাদের সকলেরই যে মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যোগসাজস আছে, এমন নয়৷

জুকারো বলেছেন, ‘‘সন্দেহভাজন এনজিওগুলির ক্ষেত্রে আমাদের বুঝতে হবে, তারা কী করছে৷ ভালো এনজিওগুলির ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যাবে, ভূমধ্যসাগরে কোথায় এবং কিভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব এনজিওদের উপর ছেড়ে দেওয়াটা ইউরোপীয় সরকারবর্গের পক্ষে ঠিক এবং স্বাভাবিক কিনা৷''

২০১৭ সালে অভিবাসীদের লিবিয়া থেকে ডিঙি বা বোটে চড়ে  সাগর পার হয়ে ইটালি আসার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে৷ এ যাবৎ প্রায় ৩৬,০০০ অভিবাসীকে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্বার করা হয়েছে, যা কিনা ২০১৬ সালের অনুরূপ সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি৷ শুধুমাত্র ২০১৭ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত ১,০০০ অভিবাসী সাগরপাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংগঠন আইওএম৷ এভাবে চললে বছর শেষ হওয়ার আগে আড়াই লাখ অভিবাসী ইটালির উপকূলে পৌঁছতে পারে বলে জুকারোর ধারণা৷

প্রাণে বাঁচা

২০শে এপ্রিল, ২০১৫: একটি ছোট পালের নৌকা গ্রিসের রোডোস দ্বীপের কাছে চড়ায় আটকালে সীমান্তরক্ষী আর স্থানীয় মানুষেরা বেশ কিছু উদ্বাস্তুকে উদ্ধার করেন৷ তা সত্ত্বেও এই দুর্ঘটনায় তিনজন উদ্বাস্তু জলে ডুবে মারা যান৷

সীমান্তরক্ষীদের ডিঙিতে

১৩ই এপ্রিল, ২০১৫: উদ্বাস্তুরা কোস্ট গার্ডের ইনফ্ল্যাটেবল বোটে চড়ে সিসিলি-র একটি বন্দরে পৌঁছচ্ছে৷ সীমান্তরক্ষীরা লিবিয়ার উপকূলে একটি ডোবা নৌকা দেখতে পেয়ে ১৪৪ জন উদ্বাস্তুকে উদ্ধার করেন – এবং যুগপৎ ন’টি মৃতদেহকে সাগরের জলে ভাসতে দেখেন৷ আবহাওয়া ভালো থাকায় এপ্রিলের শুরু থেকে উদ্বাস্তুরা আরো বেশি সংখ্যায় আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইউরোপে আসার চেষ্টা করছে৷

বাহন

১২ই এপ্রিল, ২০১৫: ওপিয়েলক অফশোর ক্যারিয়ার কোম্পানির ‘জাগুয়ার’ নামধারী মালবাহী জাহাজের অতি কাছে ডুবে যায় একটি উদ্বাস্তু বোট৷ এই কোম্পানির জাহাজগুলি গত ডিসেম্বর মাস যাবৎ দেড় হাজারের বেশি উদ্বাস্তুকে সমুদ্রবক্ষ থেকে উদ্ধার করেছে৷

হাঁটাপথে

২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫: পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা উদ্বাস্তুরা ম্যাসিডোনিয়া সীমান্তের দিকে হেঁটে চলেছেন৷ আশা, এইভাবে ‘খিড়কির দরজা’ দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ – যদিও সে প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়৷

ব্রিটেন যাওয়ার শেষ পন্থা

১৭ই ডিসেম্বর, ২০১৪: ফ্রান্সের ক্যালে বন্দর-শহরের কাছের হাইওয়েতে ব্রিটেনগামী লরিতে ওঠার সুযোগের অপেক্ষায় উদ্বাস্তুরা৷ সে আমলে ক্যালে-র পাঁচ-পাঁচটি বেআইনি ক্যাম্পে প্লাস্টিকের ঝুপড়িতে বাস করছিল তিন থেকে পাঁচ হাজার উদ্বাস্তু, শুধুমাত্র ইংল্যান্ড যাবার আশায়৷

‘সেভ আওয়ার সোলস’

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪: ভূমধ্যসাগরে সাইপ্রাসের কাছে একটি শরণার্থী নৌকা বিপদ সঙ্কেত পাঠানোর পর সাগরে ভাসতে থাকে – ৩০০ উদ্বাস্তু নিয়ে৷

যারা কোনো বাধা মানে না

১৭ই মে, ২০১৪: আফ্রিকান উদ্বাস্তুরা মরক্কোর উপকূলে স্পেনের এক্সক্লেভ মেলিলা-র চারপাশের উঁচু তারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করছে৷ প্রায় ৫০০ মানুষ সীমান্ত পার হবার চেষ্টা করে, তাদের মধ্যে জনা ত্রিশেক সফলও হয়, কিন্তু পরে তাদের আবার মরক্কোয় ফেরৎ পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷

পপুলিজমের পালে হাওয়া

ইটালির প্রধানমন্ত্রী পাওলো কিছু এনজিওর অপরাধী করা সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন৷ এনজিওগুলো ‘‘জীবন বাঁচায় ও তাদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ'', বলেছেন পাওলো৷ কিন্তু ২০১৮ সালের গ্রীষ্মের আগেই ইটালিতে সাধারণ নির্বাচন৷ উদ্বাস্তুদের চাপে ইটালিতে এনজিওগুলোর প্রতি জনসহানুভূতি কমতির দিকে৷ ওদিকে বিভিন্ন পপুলিস্ট দল ও তাদের নেতারা এনজিওদের নিন্দায় মুখর৷

ফাইভ-স্টার মুভমেন্ট দল এনজিও-দের কাজকে অভিবাসীদের জন্য ‘‘ট্যাক্সি সার্ভিস'' বলে অভিহিত করেছে৷ সাম্প্রতিক জরিপে এই দল ক্ষমতাসীন মধ্যম-বামপন্থি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ে এগিয়ে৷ এছাড়া পপুলিস্ট পন্থি নর্দার্ন লিগ ও ফর্ৎসা ইতালিয়া দল দু'টিও এনজিগুলোর বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ তুলেছে৷

এসি/এসিবি (এপি, রয়টার্স)