ইভ টিজিংয়ের শিকার মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়

বাংলাদেশে ইভ টিজিং নতুন নয়৷ স্কুল-কলেজের মেয়েরা এর শিকার আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে৷ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জিল্লুর রহমান খান রতনের কথায়, এর ফলে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি হয়ে চলেছে৷

ডয়চে ভেলে: মেয়েরা কেন ইভ টিজিং-এর শিকার হন? এতে তারা কী ধরনের মাসসিক সমস্যায় পড়েন?

ডা. জিল্লুর রহমান খান রতন: ইভ টিজিং হলো বিভিন্ন ধরনের উত্যক্ত করা৷ এটা মৌখিক এমনকি শারীরিকও হতে পারে৷ শারীরিক লাঞ্ছনা পর্যন্ত হতে পারে৷ এর কারণে অ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনাও ঘটতে পারে৷ হত্যা পর্যন্ত সংগঠিত হতে দেখি আমরা৷ শারীরিকের পাশাপাশি মানষিক নির্যাতন হতে আমরা দেখে থাকি৷ সেক্সসুয়াল ভায়োলেন্সও আমরা হতে দেখে থাকি৷ এখানে মানসিক নির্যাতনের দু'টো দিক আছে৷ একটা তৎক্ষণিক এবং একটা দীর্ঘমেয়াদি মেয়াটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে৷ স্কুল-কলেজগামী তরুণীরা এই ঘটনায় বেশি আক্রান্ত হন৷ অনেক মেয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়ে থাকেন৷ মানসিক নির্যাতনের শিকার মেয়েরা সবসময় একটা আতঙ্কে থাকেন৷ তার স্বাভাবিক কাজকর্ম-চলাফেরা এতে বিঘ্নিত হয়৷ এক পর্যায়ে মেয়েটা নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়৷ তার ঘুমের অসুবিধা-খাওয়ার অরুচি হয়৷ এক সময় সে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে যায়৷

বাংলাদেশের ফরিদা

ফরিদার স্বামী ছিলেন ড্রাগ এবং জুয়ায় আসক্ত৷ ঋণের দায়ে একসময় বাড়িটাও বিক্রি করে দেয় নেশাগ্রস্ত লোকটি৷ রেগেমেগে ফরিদা বলেছিলেন, এমন স্বামীর সঙ্গে আর ঘর করবেন না৷ সেই রাতেই হলো সর্বনাশ৷ ঘুমন্ত ফরিদার ওপর অ্যাসিড ঢেলে দরজা বন্ধ করে দিল পাষণ্ড স্বামী৷ যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন ফরিদা৷ প্রতিবেশীরা এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে তাঁকে৷

মায়ের স্নেহে, বোনের আদরে...

অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়ার সময় ফরিদা ছিলেন ২৪ বছরের তরুণী৷ ১৭টি অস্ত্রোপচারের পর এখন কিছুটা সুস্থ৷ তবে সারা গায়ে রয়েছে দগদগে ঘায়ের চিহ্ন৷ পুড়ে যাওয়া জায়গাগুলোর ত্বক মসৃণ রাখতে প্রতিদিন মালিশ করে দেন মা৷ নিজের কোনো বাড়ি নেই বলে মায়ের সাথেই বোনের বাড়িতে থাকেন ফরিদা৷

উগান্ডার ফ্লাভিয়া

ফ্লাভিয়ার ওপর এক আগন্তুক অ্যাসিড ছুড়ে মেরেছিল ৫ বছর আগে৷ আজও ফ্লাভিয়া জানেন না, কে, কেন তাঁর ওপর হামলা চালালো৷ বিকৃত চেহারা নিয়ে অনেকদিন ঘরেই ছিলেন৷ বাইরে যেতেন না৷ এক সময় ফ্লাভিয়ার মনে হলো, ‘‘এভাবে ঘরের কোণে পড়ে থাকার মানে হয় না৷ জীবন এগিয়ে চলে৷ আমাকেও বেরোতে হবে৷’’

আনন্দময় নতুন জীবন

এখন প্রতি সপ্তাহে একবার সালসা নাচতে যায় ফ্লাভিয়া৷ আগের সেই রূপ নেই, তাতে কী, বন্ধুদের কাছে তো রূপের চেয়ে গুণের কদর বেশি! ফ্লাভিয়া খুব ভালো নাচ জানেন৷ তাই একবার শুরু করলে বিশ্রামের সুযোগই পান না৷ এভাবে পরিবার আর বন্ধুদের সহায়তায় আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন ফ্লাভিয়া৷

ভারতের নীহারি

নীহারির বয়স তখন ১৯৷ একরাতে আত্মহত্যা করার জন্য আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের শরীরে৷ স্বামীর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি মনে হয়েছিল তখন৷

নতুন রূপ

যে ঘরটিতে বসে নীহারি তাঁর চুল ঠিক করছেন এটা ছিল বাবা-মায়ের শোবার ঘর৷ এখানেই নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন৷ দেয়াশলাইয়ের বাক্সে একটা কাঠিই ছিল৷ তা দিয়েই আগুন জ্বালিয়েছিলেন শরীরে৷ তবে এখন আর দুর্বল মনের মেয়েটি নেই নীহারি৷ নিজেকে সামলে নিয়ে একটা সংস্থা গড়েছেন৷ সংস্থাটির নাম, ‘পোড়া মেয়েদের রূপ’৷

পাকিস্তানের নুসরাত

দু-দুবার অ্যাসিড ছোড়া হয়েছে নুসরাতের ওপর৷ প্রথমে স্বামী আর তারপর দেবর৷ ভাগ্যগুণে বেঁচে আছেন নুসরাত৷ ভালোই আছেন এখন৷

আশার আলো

দু-দুবার অ্যাসিড হামলার শিকার হওয়ায় মাথার অনেকটা চুলও হারিয়েছেন নুসরাত৷ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে মাথার ক্ষতস্থান পুরোপুরি সারিয়ে চুল এবং আগের হেয়ারস্টাইল ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি৷

বন্ধুদের মাঝে...

নিজের ভাবনা, যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে কিংবা গল্প করতে প্রায়ই অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ)-এ যান নুসরাত৷ সেখানে এমন অনেকেই আসেন যাঁদের জীবনও অ্যাসিডে ঝলসে যেতে বসেছিল৷ এখন সকলেই জানেন, তাঁরা আর একা নন৷

কোন বয়সের ছেলেরা ইভ টিজিং করে? তাদের মানসিকতা কেমন?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বয়সে যারা তরুণ, বিশেষ করে ১৫ বছর থেকে ২৯ বছর পর্যন্ত বয়সি তরুণরাই এই কাজ বেশি করে৷ বিশেষ করে যুবক যারা, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ তাদের বিরুদ্ধেই এই ধরনের অভিযোগ বেশি৷ যেসব ছেলের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ বেশি, তাদের অনেকেই বেকার৷ তারা অনেক সময় সন্ত্রাসী বা মাস্তান হয়৷ তারা খুব খারাপ পরিবেশে অনেক সময় বড় হয়৷ কেউ তো বাড়িতে বাবার হাতে মাকে নির্যাতন হতে দেখেছেন৷ বস্তিতে বড় হওয়া তরুণদের মধ্যেও এই ধরনের প্রবণতা বেশি৷ মধ্যবয়সিদের মধ্যেও কেউ কেউ এই ধরনের কাজ করে থাকে৷ বইমেলা বা বাসের ভেতরে আমরা দেখি বিভিন্ন বয়সি পুরুষ এই ধরনের কাজ করছে৷

কোন বয়সের মেয়েরা বেশি ইভ টিজিং-এর শিকার হন? কোন জায়গাগুলোতে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে?

স্কুলে যারা যাচ্ছে, অর্থাৎ বয়সে কিশোরী – তারাই বেশি ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়৷ এমনকি কাস ফাইভের একটা মেয়েও ইভ টিজিং-এর শিকার হচ্ছে৷ হাইস্কুলের মেয়েরা তো আহরহ এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে৷ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরাও ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়৷ এর মানে এই নয় যে, মধ্যবয়সি নারীরা ইভ টিজিং-এর শিকার হচ্ছেন না৷ তাঁরাও হচ্ছেন৷ তবে কিশোরী বা তরুণীদের তুলনায় কম৷ স্কুল বা কলেজের সামনে বা পাবলিক প্লেসেও এটা হতে পারে৷ অনেক সময় কাউকে ফলো করে নির্জন জায়গায়ও হতে পারে৷

বিশ্ব | 29.10.2010
অডিও শুনুন 12:16
এখন লাইভ
12:16 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 05.07.2017

ডা. জিল্লুর রহমান খান রতন

কর্মস্থলে কি নারীরা ইভ টিজিং-এর শিকার হন?

কর্মস্থলে অন্যভাবে হয়৷ এটাতে আমরা মানসিক হয়রানি বলি৷ তাকে ভয় দেখানো বা পদোন্নতি হবে না এমনভাবে বস ভয় দেখান বা সহকর্মীরা নানা ধরনের কথা বলে তাঁকে বিরক্ত করতে পারেন৷ তাঁকে ব্লাকমেইল করতে পারে৷ অনেক সময় প্রলোভনও দেখানো হয় মেয়েদের৷ কর্মক্ষেত্রে হরহামেশাই এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে৷ অনেক সময় ছোট ভুলের কারণে অনেক বেশি মানসিক পীড়ন তাঁকে দেয়া হয়৷

কর্মস্থলে ইভ টিজিং-এর কারণে মেয়েদের কর্মস্পৃহা কমে যায় কি?

সব সময় যদি কেউ মানসিক চাপে থাকে, তাহলে এক সময় সে আর চাপ নিতে পারে না৷ তখন তার কর্মস্পৃহা কমে যায়৷ মনোসংযোগে ঘাটতি দেখা দেয়৷ এক পর্যায়ে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে৷ সে হতাশ হয়ে পড়ে এবং তার প্রডাক্টিভিটি কমে যায়৷ এতে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷

ইভ টিজিং-এর ভয়ে অনেকে বাইরে বের  হন না, তাদের মানসিক অবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

কেউ যদি এই ভয়ে ঘরের বাইরে বের না হয় তাহলে সে নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে৷ এখন কিন্তু এটা অনেক নিয়ন্ত্রণে৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর৷ সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে৷

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইভ টিজিং-এর ঘটনা কি ঘটে? ঘটে থাকলে সেটা কেমন?

বর্তমানে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার কারণে মোবাইল ফোনে সবাই সেটা ব্যবহার করেন৷ এতে হুমকি দেয়া বা থ্রেট দেয়ার মতো ঘটনা ঘটে৷ এখানেও নারীর ইভ টিজিং-এর শিকার হওয়ার সুযোগ আছে৷

ইভ টিজিং-এর কারণে আত্মহত্যা করে থাকেন অনেক মেয়ে৷ তারা কি ধরনের মানসিক সমস্যায় ভোগেন?

কোনো মেয়ে যদি ইভ টিজিং-এর শিকার হয়, তখন তার আশ্রয়স্থল হলো তার পরিবার৷  এক্ষেত্রে কোনো মেয়ে এই ঘটনা পরিবারের কাছে বলতে গেলে অনেক সময় পরিবার বলে যে, অন্য কারো সঙ্গে এটা হয় না, তোমার সঙ্গে কেন এমনটা হলো? তখন মেয়েটি ভেঙে পড়ে৷ সে তখন আত্মহত্যার দিকে চলে যেতে পারে৷ এই ধরনের মেয়েদের মধ্যে মানসিক রোগ বেশি দেখা দেয়৷ তারা বিষনণ্ণতায় ভোগে৷ কোনো মেয়ে এই পরিস্থিতিতে পড়লে পরিবারকেই তাকে সহযোগিতা দিতে হবে৷ প্রয়োজনে মানসিক চিকিৎকের কাছে নিয়ে যেতে হবে৷

ইভ টিজিং-এর কারণে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগীর হার বেড়েছে না কমেছে?

এখন থেকে ৮-১০ বছর আগে ইভ টিজিং-এর হার যা ছিল তার চেয়ে অনেক কমেছে এখন৷ এখন এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি হয়েছে৷ মিডিয়াও এক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা পরিবারও এখন অনেক বেশি সচেতন৷ তবে এখনও এই ধরনের রোগী আসছে৷

আপনি কি ডা. জিল্লুর রহমান খান রতনের সঙ্গে একমত? জানান আমাদের মন্তব্যের ঘরে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়