বাংলাদেশ

ইভ টিজিংয়ের শেষ কোথায়?

বাংলাদেশে ইভ টিজিং যেন এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে৷ ইভ টিজারারা হয়ে উঠছে বেপরোয়া৷ তাদের শিকার হয়ে মেয়েরা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে৷ হত্যারও শিকার হচ্ছে তারা৷ প্রতিরোধে আইনও আছে, তারপরও থামছে না ইভ টিজিং৷

Indien Protest Vergewaltigung (Indranil Mukherjee/AFP/Getty Images)

গত ৩০ জুন বিকেলে মহাখালী যাওয়ার জন্য যাত্রাবাড়ি বাস টার্মিনালে অপেক্ষা করছিলেন এক তরুণী৷ সেই সময় স্থানীয় বখাটে ফাহিম ইসলাম রাব্বি তরুণীকে উত্যক্ত করতে থাকে৷ তরুণী এড়িয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে রাব্বি মোটরসাইকেল দিয়ে গতিরোধ করে৷ এমনকি তুলে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করে৷ কিন্তু তরুণীর কপাল ভালো যে, কাছেই ছিল র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত৷ বিষয়টি তাঁদের নজরে এলে তাঁরা তরুণীকে যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করে বখাটে রাব্বিকে আটক করে৷ এই ঘটনায় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রের রাব্বিকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন৷

র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত কাছে ছিল বলে তরুণী রক্ষা পেয়েছেন৷ অপরাধী আটক হয়েছে, সাজা পেয়েছে৷  নয়ত ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে ‘লোক লজ্জার' ভয়ে তাঁকে হয় কোথাও পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে হতো, নইলে হয়ত জীবন থেকেই বিদায় নিতে হতো৷ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান তেমন আশঙ্কাই জাগায়৷

জুন মাসে মহিলা পরিষদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য ও খবরের ভিত্তিতে এক প্রতিবেদনে জানায়, গত আড়াই বছরে ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে ৪০ জন আত্মহত্যা করেছেন৷ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি জুন পর্যন্ত ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটেছে ৭৫৪টি৷

চলতি বছরের পাঁচ মাসে ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটে ১০৮টি এবং সাত তরুণী আত্মহত্যা করেন৷ কেবল মে মাসেই ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটে ২১টি৷ এ সময়ে ইভ টিজিংয়ের শিকারদের মধ্যে দু'জন আত্মহত্যা করেন৷

অডিও শুনুন 08:43

‘বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ’

মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাস পুরকায়স্থ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই হিসাব পত্রিকায় প্রকাশিত  প্রতিবেদন থেকে দেয়া হয়েছে৷ তবে অনেক খবরই পত্রিকায় আসে না৷ আমরা মনে করি, প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ৷''

ইভ টিজাররা অনেক ক্ষেত্রেই বেপরোয়া৷ তারা ইভ টিজিং করেই ক্ষান্ত হয় না৷ কেউ প্রতবাদ করলে তার ওপরও হামলা করে৷

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রী ইভ টিজিংয়ের শিকার হলে এর প্রতিবাদ করেন তাঁর সহপাঠি রনি ও রাহুল৷ তাঁরা প্রতিবাদ করায় ছাত্র লীগের কর্মী রাহাত ও মিরাজসহ কয়েকজন রনি ও রাহুলকে বেদম মারপিট করে৷ এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ইভ টিজারদের বিরুদ্ধে নালিশ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি৷

গত ১২ মে যশোর সদর উপজেলার মোমিননগরের নওদাগাঁয় ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার হয় রেজাউল ইসলাম রিজু নামে এক মাদ্রাসা ছাত্র৷ টাঙ্গাইল সদর উপজেলার রসুলপুরে ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় একজন স্কুলছাত্রীসহ পাঁচজনকে পিটিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা৷ আর ২০১৬ সালের অক্টোবরে মিরপুরে স্কুল ছাত্রী দুই যমজ বোন ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় তাদের পিটিয়ে আহত করে ইভ টিজার লুৎফর বাবু ও তার সহযোগিরা৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে বাবুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ পরে আরো একজনকে আটক করা হয়৷

নিজের দুই মেয়ে মার খেলেও ইভ টিজারদের প্রতিরোধ করায় তখন গর্বিত হয়েছিলেন তাদের বাবা আহসান হাবিব৷ কিন্তু এ পর্যায়ে এসে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আমার গর্বের জায়গা আর নাই৷ মামলায় মামুলি একটা চার্জশিট হয়েছে৷ দুই আসামি এরই মধ্যে জামিনে ছাড়া পেয়েছে৷ আমার আইনজীবী জানিয়েছেন, যেভাবে চার্জশিট দেয়া হয়েছে তাতে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যাবে৷ তাদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না৷''

তিনি বলেন, ‘‘ইভ টিজিং প্রতিরোধে আইন আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন৷ আর প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা৷ এটা হচ্ছে না বলেই ইভ টিজিং কমছে না৷ বখাটেরা দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে৷ এই দেশে কিছুই হয় না৷ আমি হতাশ৷''

অডিও শুনুন 01:50

‘ইভ টিজিং প্রতিরোধে আইন কঠোর হওয়া প্রয়োজন’

ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা অনেক৷ আবার ইভ টিজারদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে৷ ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে ২০১৬ সালের আগস্টে ইভ টিজার ওবায়দুলের হাতে প্রাণ দিতে হয়৷ ওবায়দুল আটক হয়েছে৷ তার বিচারও শুরু হয়েছে, কিন্তু ইভ টিজারদের দৌরাত্ম কমছে না৷

মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাস পুরকায়স্থ বলেন, ‘‘আমাদের ইভ টিজিং শব্দটিতে আপত্তি আছে৷ এই শব্দটি অপরাধকে হালকা করে দেয়৷ এটা আসলে যৌনসন্ত্রাস৷ আড়াই বছরে এর শিকার হয়ে ৪০ নারীর আত্মহত্যাও আমাদের টনক নাড়ায় না৷ এটাকে আমরা আত্মহত্যা বলছি কেন? এটা তো হত্যাণ্ড৷ দুর্বৃত্তরা মেয়ে বা নারীকে এমনভাবে যৌন হয়রানি বা নির্যাতন করে যে, ওই নারীর কাছে জীবনের চেয়ে মরণই শ্রেয় হয়ে যায়৷''

তিনি বলেন, ‘‘যৌন হয়রানির জন্য আলাদা কোনো আইন নাই৷ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায়ই এ ব্যাপারে মামলা হয়৷ তবে সুপ্রিম কোর্ট ২০০৯ সালে যৌন নিপীড়নবিরোধী একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দেয়৷ তাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি-বেসরকারি অফিসে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল, অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে৷ আমরা চাই, এটা আইনে পরিণত করা হোক৷''

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্তে সারাদেশে, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে, মার্কেট, শপিংমল, বাস, রেল ও লঞ্চ স্টেশনে ভ্রাম্যমাণ আদালত জোরদার করা হয় ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে৷ র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সরওয়ার আলম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট অনেক কার্যকর৷ কারণ সাধারণভাবে মামলা করে প্রতিকার পেতে অনেক সময় লাগে৷ আর মোবাইল কোর্ট তাৎক্ষণিক সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি দেয়৷ তা না হলে ইভ টিজিংয়ের শিকার নারীর সাধারণভাবে বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো আরো হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷''

এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটই ৩০ জুন যাত্রাবাড়ীতে ইভ টিজার ফাহিম ইসলাম রাবিকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন৷ তিনি বলেন, ‘‘ভ্রাম্যমাণ আদালত না থাকলে ওই দিন ওই তরুণীর আরো বিপদ হতে পারতো৷ কারণ, সে ঢাকার বাইরে থাকে৷ তার সঙ্গে তার আত্মীয়-স্বজন কেউ ছিল না৷ সে কোথায় মামলা করত? কে তাকে সহায়তা করত? সাক্ষী কোথায় পেত?''

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরো জানান, ‘‘গত ছর ঢাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত আট জনকে শাস্তি দিয়েছে৷ আর এ বছর পর্যন্ত দিয়েছে তিনজনকে৷''

অডিও শুনুন 05:26

‘ইভ টিজংয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের জেল’

সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শপিং সেন্টারের মতো জনবহুল জায়গায় নারীরা ইভ টিজিংয়ের শিকার হন৷ যাঁরা শিকার হন, তাঁদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে৷ আর যারা এই অপরাধ করে, তাদের বয়স মোটামুটি ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে৷ তবে রাখী দাস পুরকায়স্থ বলেন, ‘‘শিশুরাও যৌন নিপীড়ন বা হয়রানি থেকে রেহাই পান না৷ আর কর্মস্থলেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে৷''

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সরওয়ার আলম বলেন, ‘‘দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় ইভ টিজংয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের জেল৷ ইভ টিজিং বলতে অশ্লীল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা বাক্য-শব্দকে বোঝানো হয়৷ আর সেটা যদি নারীর শরীরে স্পর্শের পর্যায়ে যায়, তাহলে দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারায় বিচার হয়৷ তার সর্বোচ্চ শান্তি ২ বছরের জেল৷ পরবর্তী অপরাধের ধাপগুলোর জন্য আইনেই বলা আছে শাস্তির কথা৷''

কিন্তু আইনের চেয়ে বড় বিষয় হলো মূল্যবোধ৷ মো. সরওয়ার আলম বলেন, ‘‘আমরা আটকের পর ইভ টিজারদের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তারা নারীর প্রতি যে সম্মান দেখাতে হয়, সেই শিক্ষা পরিবার থেকে পায়নি৷ আর কেউ কেউ সঙ্গীদের কারণে খারাপ পথে গেছে৷''

রাখী দাস পুরকায়স্থ মনে করেন, ‘‘নারীর প্রতি সম্মানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ৷ এই মূল্যবোধ সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়াতে না পারলে শুধু আইন দিয়ে ইভ টিজিং ঠেকানো যাবে না৷ গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন৷''

মো. সরওয়ার আলম স্পষ্ট করেই বলেছেন, অনেকে যে ইভ টিজিংয়ের জন্য নারীদের পোশাককে দায়ী করেন, তা একেবারেই অযৌক্তিক৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘কেউ কেউ বলতে চান, ইভ টিজিংয়ের সঙ্গে পোশাকের একটা সম্পর্ক আছে৷ কিন্তু বাস্তবে তা নয়৷ ইভ টিজাররা পোশাক বিবেচনা করে না৷ তারা যাকে সামনে পায়, তাকেই উত্যক্ত করে৷ তাদের কাছে তথাকথিত শালীন পোশাকের মেয়েরাও রেহাই পায় না৷ এটা আসলে মূল্যবোধ এবং শিক্ষার ব্যাপার, দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার৷''

এ বিষয়ে আপনার কোনো মন্তব্য থাকলে লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو