এবার নদী দখলমুক্ত করার দিকে নজর দিন

আবেদনটি কার কাছে করব তাই ভাবছি৷ নদীগুলো দেখভালের জন্য সরকারি যে কর্তৃপক্ষ আছে তাদের কাছে, নাকি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে?

আমাদের দেশটাই যেন কেমন৷ এখানে, যদি আপনি সত্যিই চান যে, কোনো কাজ হোক, তাহলে যেভাবেই হোক বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে৷ তাহলে আপনি সাফল্য আশা করতে পারেন৷ নদী দখলমুক্ত করার মতো যে কাজ, তা ঠিকঠাকমতো করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আছে কিনা, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে৷ না, তাদের পর্যাপ্ত উপকরণ, যন্ত্রপাতি নেই, সেটা বলছি না৷ বলছি প্রভাবশালী দখলদারদের কাছ থেকে নদী ফিরিয়ে আনার মতো ক্ষমতা থাকার কথা৷ এই ধাপ পেরোনোর একমাত্র উপায় বোধ হয় প্রধানমন্ত্রী৷ তিনি যদি একবার বলে দেন, ‘‘কোনো কথা শুনতে চাই না৷ আগামী কয়েকমাসের মধ্যে আমি সব নদী দখলমুক্ত দেখতে চাই'' তাহলেই হয়ত কাজ হয়ে যাবে৷ অন্তত এটা আমার আশা৷ আর নদীগুলোকে কেন তাদের আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়া উচিত সেটা প্রধানমন্ত্রী ভালোই জানেন৷ কারণ, একসময় জার্মানিতে থাকাকালীন তিনি কার্লসরুয়ে নামে যে শহরে থাকতেন, তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাইন নদী তিনি হয়ত দেখেছেন৷ সেই নদী দিয়ে বড় বড় কার্গো জাহাজের যাওয়া-আসা দেখে নিশ্চয় তাঁর সেইসময়কার ছোট্ট ছেলেমেয়ে জয় আর পুতুল অবাক হয়েছে, আনন্দ পেয়েছে৷ তিনি নিজেও হয়ত রাইনের পার ধরে সকাল-বিকাল হেঁটেছেন আর মুগ্ধ হয়েছেন৷ এছাড়া বিভিন্ন উন্নত দেশ সফরে গিয়েও প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই সেসব দেশের নদীগুলোর সংস্পর্শে এসেছেন৷ তিনি দেখেছেন সেসব দেশে কীভাবে নদীগুলো দেখেশুনে রাখা হয়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সমাজ-সংস্কৃতি

দূষণকালো বুড়িগঙ্গা

ভয়াবহ দূষণে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি কুচকুচে কালো৷ ঢাকার প্রাণ বলা হয় এই বুড়িগঙ্গাকে৷ কিন্তু দূষণে জর্জরিত নদীটি দিনে দিনে যেন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বর্জ্যের নদী

ঢাকার বাবুবাজার এলাকা দিয়ে সরাসরি বর্জ্য মিশ্রিত পানি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়৷ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার এরকম বেশ কিছু জায়গা থেকে সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হয় বর্জ্য৷ বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের এটি একটি অন্যতম কারণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

রাসায়নিকের ব্যাগ থেকে...

বুড়িগঙ্গার পানিতে রাসায়নিক বহন করার ব্যাগ পরিস্কার করছেন শ্রমিকরা৷ পুরনো ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে নিয়মিত রাসায়নিক বহনের ব্যাগ, কন্টেইনার পরিস্কার করার কারণে এ নদীর পানি দূষিত হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নদীতে রাসায়নিক

পুরনো ঢাকার ইসলামবাগ, শোয়ারিঘাট, কামরাঙ্গিরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরজুড়ে চলে প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ৷ বিভিন্ন রাসায়নিব দ্রব্য মিশ্রিত এসব প্লাস্টিকের সামগ্রী পরিস্কারের কাজটি সরাসরি করা হয় বুড়িগঙ্গার পানিতে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফল ব্যবসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া!

বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের আরেকটি কারণ ফলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক জাতীয় মোড়ক, ফোম ইত্যাদি৷ পুরনো ঢাকার বাদামতলী এলাকায় ঢাকার সবচেয়ে বড় ফলের পাইকারী বাজার থেকে এসব অপচনশীল দ্রব্যাদি সরাসরি ফেলা হয় বুড়িগঙ্গায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নদীর আরেক শত্রু ডকইয়ার্ড

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ডকইয়ার্ড৷ এসব ডকইয়ার্ডের কারণেও দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা৷ ডকইয়ার্ডের জাহাজের তেল আর পোড়া মবিল এ দূষণে ভূমিকা রাখে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পলি ঢাকে পলিথিন

পলিথিনের ব্যাগও বুড়িগঙ্গা দূষণের অন্যতম কারণ৷ বাংলাদেশে পলিথিন ব্যবহারে কিছুটা বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে সে আইন কোথাও মানা হয় না৷ ফলে ঢাকা শহরের সর্বত্র অবাধে পলিথিন ব্যবহার করা হয় এবং বিভিন্ন ড্রেন হয়ে ব্যবহৃত সব পলিথিন চলে আসে বুড়িগঙ্গায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নদী যেন ডাস্টবিন

বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী অনেক এলাকার মানুষই সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলেন৷ এসব ময়লা-আবর্জনা বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশে যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নৌ চলাচলও ব্যাহত যখন

বর্ষা মৌসুমে ভাটি থেকে প্রচুর কচুরিপনা এসে বুড়িগঙ্গার পানি ঢেকে ফেলে৷ এ সময়ে এ নদীতে নৌকা ও জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

তীরে ইটভাটা

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে বিভিন্ন এলাকায় আছে বেশ কিছু ইটভাটা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

তুরাগ দখল

এ ছবি ঢাকার আমিনবাজারের কাছের তুরাগ নদের৷ দখলে জর্জরিত এ নদের দুই পাড়৷ দখলকারীরা মূলত প্রভাবশালী বালু আর পাথর ব্যবসায়ী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গোসল যখন দূষণের কারণ

ঢাকার মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় তুরাগ নদে গবাদি পশু আর মানুষের গোসল চলছে একই সঙ্গে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শীতলক্ষ্যায় শিল্পের অভিশাপ

নারায়ণগঞ্জের শীতালক্ষ্যা নদীও ভয়াবাহ দূষণের শিকার৷ এ নদীর পানি শীত মৌসুমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে৷ এ নদী দূষণের অন্যতম কারণ এর দুই তীরের অসংখ্য শিল্প কারখানা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শীতলক্ষ্যার দুরবস্থা

নরসিংদীর পলাশ এলাকায় একটি শিল্প কারাখানা থেকে রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য শীতালক্ষায় ফেলা হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মৃতপ্রায় চাক্তাই

চট্টগ্রামের চাক্তাই এখন প্রায় মৃত৷ অথচ এক সময় এই চাক্তাই খাল ছিল চট্টগ্রামের প্রাণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

দূষণের কবলে সুরমা

সিলেট শহরের পাশে কীন ব্রিজের নিচে দূষণে জর্জরিত সুরমা নদী৷ সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে এ নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে মারাত্মক দূষিত এ নদীর পানিও এখন ব্যবহারের অনুপযোগী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গবাদি পশুর মৃতদেহও নদীতে

খুলনা ভৈরব নদীতে ভাসমান মৃত পশুর মাংস খাচ্ছে কাক৷ বাংলাদেশে মৃত গবাদি পশুর বেশিরভাগই সরাসরি ফেলা হয় নদীতে৷ মৃত গবাদি পশু পচে নদীগুলো দূষিত করে৷

এসব অভিজ্ঞতা থেকেই হয়ত প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেন৷ নদীগুলো দখলমুক্ত করা যার অন্যতম কাজ৷ সংস্থাটির ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম, তাদের কাছে কোন নদীর পাড়ে কতগুলো অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে, তার হিসেব আছে৷ খুবই আশার কথা যে, তারা অন্তত জানেন নদীগুলোর কী অবস্থা৷ কিন্তু এখন প্রয়োজন এই স্থাপনাগুলোর স্থায়ী অপসারণ, অস্থায়ী নয়৷ এই কথা বলার কারণ, মাঝেমধ্যে আমরা অবৈধ স্থাপনা অপসারণের খবর পাই৷ কিন্তু পরে এ-ও জানা যায় যে, ক'দিন পরই আবার সেগুলো আগের জায়গায় ফিরে গেছে৷ অর্থাৎ স্থায়ীভাবে নদীগুলো দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না৷ এর জন্য প্রভাবশালী দখলদার ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়ী৷ প্রভাবশালীদের তালিকায় আছেন ধনী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ৷ মাঝেমধ্যে সেই তালিকায় পুলিশসহ সরকারেরই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হয়৷

একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দেয়া যাক৷ এপ্রিলের ১৩ তারিখ শীতলক্ষ্যার তীরে খানপুর বরফকল এলাকায় ‘চৌরঙ্গী ফ্যান্টাসি পার্ক' উদ্বোধন করেন সরকারের নৌমন্ত্রী ও নদী রক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান শাজাহান খান৷ বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) বলছে, ঐ এলাকায় নদীর সীমানা প্রাচীরের কাছ থেকে ৩৩৭ নম্বর পিলারের পর প্রায় দুই একর জমি ভরাট করে পার্কটি নির্মাণ করা হয়েছে৷ অর্থাৎ নদী দখল করে গড়ে তোলা পার্ক উদ্বোধন করেছেন নদী রক্ষা কমিটির প্রধান!

লেখার (নাকি মামার বাড়ির আবদার?) এই অংশে এসে ২০০৯ সালে প্রকাশিত একটি খবরের দিকে চোখ পড়ল৷ ঐ বছরের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দখলবাজদের হাত থেকে নদী রক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন৷

খবরটি পড়ে নিজেকে বোকা মনে হচ্ছে৷ কারণ, লেখার শুরুতে আমি আশা প্রকাশ করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্দেশ দিলে কাজ হতে পারে৷ এখন দেখছি সেটি আমার ভুল ধারণা৷

DW Bengali Mohammad Zahidul Haque

জাহিদুল হক, ডয়চে ভেলে

তবে আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী সেই সময় নির্দেশ দিলেও পরবর্তীতে হয়ত আর এ সংক্রান্ত খবর নেয়ার সময় পাননি৷ কিংবা এ-ও হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী পরে ভেবে দেখলেন যে, নদী দখলমুক্ত করার চেয়ে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি করলে মানুষ তথা ভোটারদের চোখে পড়বে বেশি৷ ফলে সেই দিকেই মনোযোগ দেয়া শুরু করেন৷

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সবসময় যে শুধু ভোট পাওয়ার জন্যই কাজ করতে হবে, তা তো নয়৷ নিজের মনে প্রশান্তি এনে দেয় এমন কাজও তো মানুষ করে৷ নদী দখলমুক্ত করার কাজটি তেমনই একটি কাজ ধরে নিয়ে আপনি এই দিকটায় নজর দেবেন, সেই আশা করছি৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷