আলাপ

এমডিজি থেকে এসডিজি: সমস্যা নীতিতে

এমডিজির প্রধান লক্ষ্য ছিল সামগ্রিক উন্নয়ন৷ এর কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট থাকলেও, অনেকগুলো ক্ষেত্র ছিল বায়বীয়৷ ফলে যখন এমডিজির লক্ষ্য পূরণের ইতিবাচক হিসাব সামনে আনা হয়, তখন অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মেলে না৷ তৈরি হয় নতুন প্রশ্নও৷

বাংলাদেশের শিশুশ্রমিক

এমন অবস্থায় দীর্ঘ ১৫ বছর পর, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রণীত এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা শেষ হয়৷ জাতিসংঘের নতুন উদ্যোগ এসডিজি৷ লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন উন্নয়ন৷ এসডিজির উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এমডিজিরই পরিবর্ধিত রূপ৷ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় দারিদ্র বিমোচন, ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো, বৈষম্য দূরীকরণ – এমন ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে৷ প্রশ্ন হলো, এ রকম এমডিজি থেকে এসডিজি ঘরানার পরিকল্পনা নির্ধারণ করে আসলে কতটা উন্নয়ন করা যায়? এতে মানুষের ভাগ্যেরই বা ঠিক কতটা পরিবর্তন হয়?

১. এ সব লক্ষ্য নির্ধারণ, ভালো ভালো শব্দে তার বিবরণ শুনতে ভালো লাগে৷ কিন্তু বাস্তবে এতে খুব একটা কাজ হয় না৷ দারিদ্র বিমোচন থেকে শুরু করে যা কিছুই বলা হোক না কেন, সব কিছুর মূলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা বা সমাজে সুশাসনের উপস্থিতি না থাকলে, কোনো লক্ষ্যই অর্জন সম্ভব নয়৷

২. সুশাসন না থাকলে ধনী আরও ধনী হয়, গরিব হয় আরও গরিব৷ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট করে বললে, গরিবের অর্থ ধনীরা লুটপাট করে নিয়ে যায়৷ রাষ্ট্র গরিবের স্বার্থ দেখে না, লুটপাটকারী ধনীদের পক্ষেই দাঁড়ায়৷

৩. যদি একটি দেশে গণতন্ত্র না থাকে, জনগণেরও অধিকার থাকে না৷ বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে৷ জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে৷ তৃণমূল পর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে৷ সরকারি মেকানিজমের জোর-জুলুমে নির্বাচনি প্রক্রিয়া বলতে কিছু থাকছে না৷ যে দেশের সরকারের ভোটের জন্যে জনগণের কাছে যেতে হয় না, সে দেশের সরকার জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন নিয়ে ভাবে না৷ সরকার যদি জনগণকে নিয়ে না ভাবে, তবে এসডিজির ১৭টি কেন, প্রায় কোনো লক্ষ্যই সুষ্ঠু-সঠিকভাবে অর্জিত হবে না৷

৪. এ ধরনের সরকার ক্ষমতায় থাকলে জনগণের অর্থ-সম্পদ, স্বার্থ কোনো কিছুই রক্ষিত হয় না৷ দেশের আর্থিকভাবে অস্থিরতা, নৈরাজ্য বিরাজ করে৷ তৈরি হয় দেশে অসুস্থ, অস্থির এক পরিবেশ৷ রিজার্ভের পরিমাণ হয়ত বাড়ে, কিন্তু ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি হয়, রিজার্ভ থেকে ডলার চুরি হয়৷ অথচ বিনিয়োগ বা শিল্পায়ন হয় না৷ আর বিনিয়োগ না হলে, বেকারত্ব কমানো যায় না৷ দারিদ্র বিমোচন, বৈষম্য কমানো যায় না, সমতা, অধিকার প্রতিষ্ঠিত করাও যায় না৷

৫. জাতিসংঘের উদ্যোগে উন্নত দেশগুলোর অর্থে গরিব বা অনুন্নত দেশের উন্নয়ন করা হবে৷ এমডিজি বা এসডিজির মূল লক্ষ্য এটাই৷ কিন্তু বাস্তবে উন্নত দেশগুলোর নীতি কী? তাদের নীতির কারণে গরিব মানুষের ভাগ্যের ঠিক কতটা পরিবর্তন হচ্ছে? জাতিসংঘ উন্নত দেশের নীতির ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না৷ যেমন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক জনগণ৷ অথচ জনগণ দিন দিন সেই অধিকার হারাচ্ছে৷ জনগণের সম্পদ দেশের সরকারের সঙ্গে যোগসাজোস করে দখল করে নিচ্ছে উন্নত দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো৷ শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীব্যাপী এমন নীতির বাস্তবায়ন হচ্ছে৷ যেমন জাপান কিছু সহায়তা বাংলাদেশকে দেয়, অল্প সুদে ঋণও দেয়৷ কিন্তু নানা শর্তে কাফকো-র কাছে প্রায় বিনামূল্যে গ্যাস বিক্রি করতে বাধ্য করে বাংলাদেশকে৷ গ্যাসের মতো দামি সম্পদ আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম ৬ ডলার, কাফকো-র কাছে সরকার বিক্রি করেছে ০.৭৯ ডলারে৷ বছরের পর বছর এভাবেই চলেছে৷ কিছু সাহায্য, কিছু ঋণ দিয়ে, এভাবে গ্যাস নিয়ে নিলে বাংলাদেশের দারিদ্র কীভাবে দূর হবে?

ব্লগার গোলাম মোর্তোজার ছবি

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

৬. দারিদ্র দূরীকরণ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা অ্যামেরিকা-ইউরোপের নীতির কারণে ধনী দেশের মানুষও উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে৷ ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া বিষয়ে যে নীতি, তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ সব হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে৷ এক সময় যাদের সব ছিল, তারা সব হারিয়ে এখন ইউরোপের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে৷ সাগরে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার নারী-শিশু-যুবক -বৃদ্ধ৷

৭. বলা হয়, পৃথিবীতে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি৷ তাদের দৈনিক আয় ১.২৫ ডলারের সমান বা কম৷ সামগ্রিকভাবে জাতিসংঘ বা উন্নত দেশগুলো যদি বিশ্বে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তার নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে৷ বাংলাদেশ, আফ্রিকা বা অন্য অনুন্নত দেশগুলোর বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে৷ নিজেদের স্বার্থে অগণতান্ত্রিক সরকার টিকিয়ে রাখার নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে৷ গরিব দেশের সম্পদ শোষণের মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে৷ অনুন্নত দেশে শিল্পায়ন বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু কৌশলি আচরণ বা কথা নয়, বাস্তবে ভূমিকা রাখতে হবে৷ তাহলেই হয়ত এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা অর্জিত হবে বাংলাদেশে৷

বন্ধু, আপনি কি গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে একমত? জানান মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو