কিঞ্চিৎ ভালোলাগা, অনেক খারাপলাগা

ট্রাফিক আইন না মানা যেন এক সংস্কৃতি হয়ে গেছে বাংলাদেশে৷ সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন হোক আর ব্যক্তিগত হোক৷ সমাজের প্রভাবশালীরা যেমন এগুলোর অপব্যবহার করেন, তেমনি করেন নিজেদের প্রভাবশালী ভাবতে শুরু করা শিক্ষার্থীরা৷

কিঞ্চিৎ৷ একটা বাসের নাম কখনো এত মিষ্টি হতে পারে? অন্তত আমার জানা ছিল না৷ বাসার সামনে যে বটগাছটি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল কতকাল, তার কচি কচি সবুজ পাতাগুলোর ছায়া পড়ত বাসটির লাল-সাদা গায়ে৷ সকাল আটটার একটু আগে বাসা থেকে বের হয়েই দূরে বাসটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মন ভালো হয়ে যেত৷ ঘণ্টা আধেক বা তার একটু বেশি সময়েই পৌঁছে যেতাম প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে৷ কিন্তু কতবার মনে হয়েছে, নিশ্চিন্ত এই ভ্রমণ যেন শেষ হয় না কখনো৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোর নাম এমনই মিষ্টি হয়৷ তরঙ্গ, হেমন্ত, ফাল্গুনী, আনন্দ, উল্লাস, ঈশাখা, মৈত্রী৷ যেন প্রকৃতি, ইতিহাস আর আবেগের মিশেল৷ বিকেল হলেই ফেরার তাড়া৷ অনেক ভিড়৷ সবাই ফিরছে৷ কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ দরজায় ঝুলে৷ এ যেন সত্যিই এক জীবন তরঙ্গ৷ মৈত্রীর উল্লাস৷ সেসব দিনের কথা মনে হলে এখনো কম্পিউটারের স্ক্রিন ঝাপসা হয়৷ কিবোর্ডে আঙুল কেঁপে কেঁপে ওঠে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

উলটো পথে চলাচল

ঢাকা শহরে নানা ট্রাফিক অব্যবস্থপনার মধ্যে উলটো পথে চলা অন্যতম৷ বাইকার, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভিআইপি – অনেকেই নিজের তাড়াতাড়ি যাওয়া নিশ্চিত করতে উলটো পথে গাড়ি ছোটান৷ তাতে আরো বেশি বিড়ম্বনায় পড়েন রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বেপরোয়া ড্রাইভিং

এমনিতে হয়ত যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেক গাড়িকে৷ তবে রাস্তা ফাঁকা পেলে যেন দেরি সয় না অনেক চালকের৷ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে দেন তাঁরা৷ এর ফলে অনেক সময়ই প্রাণ যায় মানুষের৷ প্রিয়জন হারানোর আহাজারিতে ভারী হয় আকাশ বাতাস৷ কেবল ঢাকার রাস্তাতেই প্রতি বছর কয়েক শত মানুষের প্রাণ যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যত্রতত্র পার্কিং

ঢাকা মহানগরের সড়কগুলো আর যাই হোক, বিপুল পরিমাণ মানুষ আর যান বাহনের চাপ সামলানোর মতো নয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত৷ সরু সেই সব রাস্তার অবস্থা আরো করুণ হয়ে যায়, যখন যত্রতত্র পার্কিংয়ে এই রাস্তা আরো সরু হয়ে যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

অননুমোদিত ড্রাইভিং

গত মে মাসে এক স্কুলছাত্র এই গাড়িটি নিয়ে বের হয়ে পড়ে রাস্তায়৷ অননুমোদিত এই ড্রাইভিংয়ে আহত হয় আরেক শিশু৷ অবৈধ ড্রাইভিংয়ে কেবল শিশু নয়, বড়রা জড়িয়ে পড়েন৷ লাইসেন্স ছাড়াই অনেকে নেমে পড়েন রাস্তায়৷ লাইসেন্স থাকলেও মাদক গ্রহণের পর, শারিরীক বা মানসিকভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায়ও গাড়ি চালানো আইনে নিষেধ৷ সড়কে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, রেসে অংশ নেয়াও নিষিদ্ধ৷ বীমার বাধ্যবাধকতাও অনেকে মানেন না৷

সমাজ-সংস্কৃতি

উলটো পথে চললে চাকা ফুটো

উলটো পথে গাড়ির চলাচল বন্ধ করতে একটি যন্ত্র বসিয়েছিল ট্রাফিক পুলিশ৷ কথা ছিল গাড়ি উলটো পথে চললে তাতে চাকা ফুটো হয়ে যাবে৷ কিছুদিন পর এই যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যায়৷ ঢাকা শহরের গাড়িকে স্বয়ংক্রিয় সংকেত বাতির উপর নির্ভরশীল করে দিতে সর্বশেষ ২০১৫ সালে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়৷ কিন্তু পুলিশের অসহযোগিতায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে৷ এই শহরে ট্রাফিক আইন ভাঙা মামলাও হয় গতানুগতিকভাবে, হাতে লিখে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যত্রতত্র পথচারীদের চলাচল

ঢাকার রাস্তায় আরেক যন্ত্রণা সৃষ্টি করে খোদ পথচারীরাই৷ নির্ধারিত জায়গার পরিবর্তে যেখানে সেখানে রাস্তা পার হয়ে যান তাঁরা৷ রাজধানীতে পথচারীদের আইন না মানার প্রবণতাও এখানকার দুর্ঘটনার একটা কারণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

আইন প্রয়োগে ফাঁকি

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে নানা আইন থাকলেও, সেটা প্রয়োগে ফাঁকি রয়েছে৷ প্রায়ই খোদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক সদস্যকেই আইন ভাঙতে দেখা যায়৷ লেগুনা নামের এই ‘আনফিট’ গাড়ি ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য

রাজধানী ঢাকায় যে সব গাড়ি চলে তার অধিকাংশই ব্যক্তিগত৷ এ সব গাড়িকে যত্রযত্র যানজট সৃষ্টির জন্যও দায়ী করা হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গণপরিবহনে নৈরাজ্য

ঢাকার সমস্যা গণপরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য৷ মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব তো রয়েছেই৷ যে গাড়িগুলো রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল৷ যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলা যেন নগরীর নিত্যদিনের চিত্র৷

তখনো জ্যাম ছিল ঢাকায়৷ কিন্তু খুব কি তাড়া ছিল আমাদের? খুব অল্প সময়েই সব বদলে গেল কীভাবে? উলটো পথ ধরা এখন কেন নিয়মিত হয়ে গেছে? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী এই ক'দিন আগেই কর্মরত এক পুলিশ সার্জেন্টকে মারধর করেছে৷ তাঁর দোষ ছিল, তিনি উলটো পথে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ঠেকাতে চেয়েছিলেন৷ এমন ‘অপরাধ' ছাত্ররা মেনে নেবে কেন? পুলিশ সার্জেন্ট তাঁর অপরাধের উচিত শাস্তিই পেয়েছেন৷

ধানমন্ডির সেই ঘটনাটি এখনো গায়ে কাঁটা দেয়৷ কয়েক বছর আগে উলটো দিক থেকে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের সামনে একটি প্রাইভেট কার ‘অন্যায়ভাবে' এসে পড়ে৷ গাড়ির যাত্রী বয়স্ক এক ভদ্রলোক ও তাঁর ছেলে, যিনি কিনা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র৷ একটু কথা কাটাকাটিতেই ছেলেটিকে বেধড়ক পেটালো ছাত্ররা৷ ছেলেটি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র বলে পরিচয় দিয়েও নিস্তার পাননি৷ তাঁর বয়স্ক বাবাকেও ছাড়েনি ছাত্ররা৷

উলটো পথে গাড়ি চলা বা নিয়ম ভাঙা একরকম সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে৷ সবাই চলেন, সবাই ভাঙ্গেন যখনই ‘সুযোগ' পান৷ এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন আছে, তেমনি আছে পেশাগত জায়গাগুলোতেও৷ বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আগে এই সংস্কৃতি বদলানো খুব দরকার৷ ফিলিপাইন্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার৷ এই দেশটির উদাহরণ দিচ্ছি, কারণ, অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা বাংলাদেশ থেকে খুব একটা এগিয়ে নেই৷ বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়েই আছে৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

ম্যানিলার যানজট ঢাকার কাছাকাছিই৷ যাই হোক, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সড়ক দিয়ে হাটতে হবে আর কোন সড়ক দিয়ে গাড়ি চলবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়৷ এমনকি ক্যান্টিনে প্রত্যেক টেবিলে টেবিলে লেখা আছে ক্লেগো (CLAYGO), অর্থাৎ ‘ক্লিন অ্যাস ইউ গো'৷ সবাই সেটি মানছেও৷ খাবার খেয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সব ফেলছে৷ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, এ ধরনের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে স্কুলগুলোতেও৷ তাই সেখানে নিয়ম মানতেই শিখছে সবাই৷ নিয়ম ভাঙতে নয়৷ বাংলাদেশে ছাত্রদের দোষ ঢাকছি না৷ কিন্তু দায় এড়াতে পারবেন না কেউই৷ নিয়ম মানার শিক্ষা দিতে হবে ছাত্রছাত্রীদের৷ সেইসঙ্গে ঘটনাকে একেবারেই ছাড় দেয়া যাবে না৷ আর তা শুরু করতে হবে শিশুকাল থেকে৷

যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এতগুলো বছর কাটান, তাঁদের সবাই তাদের বিদ্যাপীঠটিকে ভালোবাসেন৷ কিন্তু এই ভালোবাসার সঙ্গে অনেক খারাপলাগা যুক্ত হয়, যখন এমন সব হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখতে হয়৷ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, অনুজদের এমন আচরণ দেখতে হয়, তখন মাথা উঁচু করে বিদ্যাপীঠটির নাম বলতে বাধে৷

আপনার কি লেখককে কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷