কুয়াশা থেকে পানি

ভিডিও দেখুন 05:21
এখন লাইভ
05:21 মিনিট
28.02.2017

কুয়াশা ধরে যেভাবে পানি তৈরি হচ্ছে

মরক্কোর একটি এনজিও ও জার্মান ওয়াটার ফাউন্ডেশন মিলে সাহারা মরুভূমির প্রান্তে বুৎমেজগিদা পাহাড়ের ঢালে জাল দিয়ে কুয়াশা ধরে তা থেকে পানি তৈরি করেছেন!

রাস্তাটা সরু আর এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোও সহজ নয়৷ কিন্তু দার সি হমাদ এনজিও-র জামিলা বারগাশ বুৎমেজগিদা পাহাড়ে ওঠার পথ চেনেন৷ ১,২০০ মিটার উচ্চতায় দার সি হমাদ এনজিও একটি বিশেষ প্রকল্প শুরু করেছে৷

বিজ্ঞান পরিবেশ | 17.08.2010

লক্ষ্য হলো: পানীয় জল সংগ্রহ করা৷ তাই এ-ধরনের জাল টাঙানো হয়েছে৷ এই জালে কুয়াশা ধরা পড়ে; জাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি চুঁইয়ে নীচে গিয়ে জমা হয়৷ আজ রোদ ঝকঝক করছে৷ কিন্তু প্রায়ই পুরো এলাকাটা কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে৷

এনজিও দার সি হমাদ-এর জামিলা বারগাশ বললেন, ‘‘কুয়াশা আসে এদিক থেকে৷ দেখা যায়, কীভাবে তা ক্রমেই আরো ওপরে উঠছে৷ অথচ কোথায় পা ফেলছি, তা দেখা যায় না...৷’’

সমাজ

প্রত্যন্ত এলাকা

মরক্কোতে সাহারা মরুভূমির কাছে অবস্থিত ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০০ মানুষের বাস৷ গ্রামগুলো এতই প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত যে, সেখানকার বাসিন্দাদের পানির জন্য অনেক দূরে যেতে হয়৷ প্রতিদিন এই কাজে গড়ে অন্তত তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়৷ সাধারণত নারীরাই এই কাজটি করে থাকেন৷ তবে একটি প্রকল্প তাঁদের কষ্ট লাঘবের স্বপ্ন দেখাচ্ছে৷

সমাজ

সমাধান কুয়াশা

এলাকাটি বছরের প্রায় ছ’মাস ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে৷ সেই কুয়াশাকে কাজে লাগিয়েই গ্রামবাসীদের জন্য পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷

সমাজ

কুয়াশা ধরতে জাল

পাহাড়ের উঁচুতে স্থাপিত বিশেষ জালে কুয়াশা আটকে পানি হয়ে ঝরবে৷ পানি ধরার জন্য থাকবে বড় বড় পাত্র৷ এরপর পাইপের মাধ্যমে তা পাহাড়ের নীচে অবস্থিত গ্রামগুলোতে সরবরাহ করা হবে৷ ঘন কুয়াশার সময় এক বর্গমিটার জাল থেকে দিনে প্রায় ২২ লিটার পানি পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা৷ ভিডিও দেখতে ‘+’ চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

জার্মান সহায়তা

যে প্রযুক্তিতে কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহ করা হবে তার নাম ‘ক্লাউডফিশার’৷ জার্মানির ভাসাস্টিফটুং ফাউন্ডেশনের প্রকৌশলী পেটার ট্রাউটভাইন এটি উদ্ভাবন করেছেন৷ মরক্কোর বেসরকারি সংস্থা ‘দার সি হামদ’ ঐ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ইতিমধ্যে প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কাজ শেষ করেছে৷ ফলে কিছু গ্রামের বাসিন্দারা এখনই তাদের ঘরে পানি পাচ্ছেন৷ কয়েকদিনের মধ্যে সবার জন্য পানির ব্যবস্থা করতে আরও জাল স্থাপনের কাজ শুরু হবে৷

সমাজ

শিক্ষিত হচ্ছেন নারী

যে গ্রামগুলোতে ইতিমধ্যে পানি পাওয়া যাচ্ছে সেখানকার নারীদের প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় বেঁচে যাওয়ায় এখন তাঁরা লেখাপড়া শেখা থেকে শুরু করে অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে জড়িত হতে পারছেন৷ প্রকল্পের আওতায় তাঁদের শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে৷

সমাজ

কাজের স্বীকৃতি

প্রকল্পটিকে সম্প্রতি জাতিসংঘের ক্লাইমেট চেঞ্জ পুরস্কার দেয়া হয়েছে৷ কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহের এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প বলে ধারণা করা হয়৷ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফসিসির মুখপাত্র নিক নাটাল বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এ ধরনের অভিনব পরিকল্পনা সত্যিই এক দারুণ ব্যাপার৷’’

দক্ষিণ-পশ্চিম মরক্কোর এই এলাকাটি সাহারা মরুভূমির প্রান্তে৷ এখানে কখনো-সখনো বৃষ্টি হয়, তাও অত্যন্ত কম৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রায়ই খরা হয়৷ পানি আনার জন্য মানুষজনকে কখনো-সখনো দু’তিন ঘণ্টা হাঁটতে হয়৷ এখানকার মানুষ চাষবাস করে বাঁচেন৷ কৃষি আর পশুপালন, দু'টি কাজের জন্যেই লাগে পানি৷ কুয়াশা ধরার প্রকল্প পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে৷

কুয়াশা ধরার জাল

তিন বছর আগে দার সি হমাদ এনজিও জার্মান ওয়াটার ফাউন্ডেশন বা পানি নিধির সঙ্গে ‘ফগ নেট প্রোজেক্ট’, অর্থাৎ কুয়াশা ধরার জাল প্রকল্প শুরু করে৷ ইনডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনার পেটার ট্রাউটভাইন সেজন্য নানা ধরনের ফাইবার পরীক্ষা করেছেন৷ জাল বাতাসে ছিঁড়ে গেলে চলবে না, তা-তে পর্যাপ্ত পানি ধরা চাই, এছাড়া জালগুলো টাঙানো সহজ হওয়া চাই৷

জার্মান ওয়াটার ফাউন্ডেশন-এর পেটার ট্রাউটভাইন বললেন, ‘‘একটা রাবারের এক্সপ্যান্ডার নিয়ে, সেটাকে তলায় এখানে আটকে, একটু টেনে ওপরে লাগিয়ে খানিকটা অ্যাডজাস্ট করে নিতে হয়৷ এবার পুরো কাঠামোটাই শক্ত৷ পরিষ্কার দেখা যায়, জালটা বাতাসে কীভাবে নড়তে-চড়তে পারবে৷’’

নতুন কুয়াশা ধরার জালগুলো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ভালোই কাজ করেছে৷ আগামী বছর বুৎমেজগিদা পাহাড়ের চারপাশে ৩১টি ফগ নেটের একটি বড় গ্রিড বসানো হবে৷ 

জামিলা বারগাশ ও তাঁর এনজিও-র প্রকল্পটি মারাকেশের জলবায়ু সম্মেলনে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে৷ বারগাশ বললেন, ‘‘আমি পরিবেশকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখতে ভালোবাসি, শুধু আবর্জনা কিংবা আবর্জনা ফেলার জায়গা বা আমাদের নিজেদের প্রগতির জন্য সম্পদ আহরণের স্থান হিসেবে নয়৷ সেই প্রগতি নিজেই আজ সংকটে, যা আমরা প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তনের ধরন থেকে দেখতে পাই৷’’

সমাজ

মহাপরিকল্পনা

মরক্কো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১৫ হাজার সরকারি মসজিদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে৷ কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে৷ এই পরিকল্পনার আওতায় মসজিদগুলোতে জ্বালানি-সাশ্রয়ী বাতি, সৌরচালিত ওয়াটার হিটার ও সৌরপ্যানেল বসানো হবে৷

সমাজ

উদ্দেশ্য

একটি উদ্দেশ্য অবশ্যই পরিবেশ রক্ষা৷ সঙ্গে আছে খরচ কমানো এবং নাগরিকদেরও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করে তোলা৷ কারণ কোনো নাগরিক যখন দেখবেন এই জ্বালানি ব্যবহার লাভজনক, তখন তিনিও তা শুরু করবেন৷

সমাজ

খরচ কমেছে ৮০ শতাংশ

এটি আস-সুন্না মসজিদ৷ রাজধানী রাবাতে অবস্থিত৷ ইতিমধ্যে সেখানে সোলার প্রযুক্তি বসানো হয়েছে৷ ফলে জ্বালানি খরচ কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ৷ ঐ মসজিদে সৌরপ্রযুক্তি বসাতে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ডলার৷ তবে এর ফলে জ্বালানি বাবদ খরচ প্রতি বছর কমবে ৭ হাজার ডলার করে৷

সমাজ

পাওয়ার গ্রিডে সরবরাহ

সৌরপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আস-সুন্না মসজিদে যে জ্বালানি উৎপাদিত হবে তার বাড়তি অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে৷

সমাজ

২০৩০ সালের মধ্যে...

ঐ সময়ের মধ্যে মরক্কোতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে তার অর্ধেক নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি৷ এই লক্ষ্য পূরণে সৌরশক্তিসহ অন্যান্য উৎস খুঁজে বের করতে অনেকদিন ধরে কাজ করছে মরক্কো৷

সমাজ

চাকরির সুযোগ

লক্ষ্য পূরণে প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ হাজার নাগরিককে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে গড়ে তুলছে দেশটি৷ এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি তৈরি ও স্থাপনের মতো বিষয়গুলো কোর্স কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে৷

প্রকল্পে পাহাড় থেকে গ্রামের বাড়িগুলো অবধি জলের পাইপ বসানোর ব্যবস্থা হয়েছে, যা সুসানে পরিবারের কাজে লাগছে৷ এক বছর হলো কল খুললেই জল পড়ে৷

কুয়াশার ‘ফসল’

অথচ পরের দিনই আবার....কুয়াশা! শুধু গাছপালাতেই নয়....পানির ফোঁটা পাহাড়ের ওপর ফ্রেমে বাঁধা জালগুলোতেও লেগে থাকে৷ প্রতি বর্গমিটার জাল থেকে ২২ লিটার পানি৷ খুব খারাপ ‘ফসল’ নয়৷ নতুন গ্রিড থেকে কুয়াশার দিনে গ্রামের মানুষরা ৩৭,০০০ লিটার পানি পাবেন৷

মোহামেদ হামুয়ালির কাছে তার অর্থ: এখনও অনেকদিন কাজ পাওয়া যাবে৷ তিনি প্রথম পরীক্ষামূলক জালগুলো বসানোতেও সাহায্য করেছিলেন৷ কুয়াশার যে একটা ভালো দিক আছে, গ্রামবাসীদের সেটা বোঝাতে গোড়ায় তাঁকে বেগ পেতে হয়েছিল৷ সকলেরই সন্দেহ ছিল৷ মোহামেদ হামুয়ালি বললেন, ‘‘গোড়ায় আমি ভেবেছি, ও-তে কাজ হবে না৷ ভেবেছি, কুয়াশা থেকে পানি তৈরি করা কি সত্যিই সম্ভব? জন্মে কোনোদিন শুনিনি, কল্পনা পর্যন্ত করতে পারিনি৷’’

মোহামেদ জলকষ্টেই বড় হয়েছেন৷ অথচ তাঁর ভাইবোনেদের জন্যে কল থেকে জল পড়াটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে৷ কুয়াশাও আসবে আবার – তবে এবার হয়ত বুৎমেজগিদা পাহাড়ের অধিবাসীরা কুয়াশা দেখে শুধু ভয় পাবেন না, কিছুটা আনন্দও পাবেন৷

মাবেল গুন্ডলাখ/এসি