সাক্ষাৎকার

‘গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ হলে মিডিয়ার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়’

‘‘একটা রাষ্ট্রে যখন গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ হয়, তখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়৷ বাধাগ্রস্ত হয় সাংবাদিকদের লেখার স্বাধীনতা৷ গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে সবকিছু সংকুচিত হবে৷ বারবার ব্যাহত হবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা৷’’

বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে সর্বত্র

ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা যদি গত তিন দশকের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সংবাদপত্রের মালিকানার ধরন পাল্টে গেছে৷ দু-একটি ছাড়া অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে বা ব্যবসায়ীরাই সেগুলো পরিচালনা করছেন৷''

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বা গণমাধ্যমে আমরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন খুব একটা দেখি না৷ এর কারণ কী? 

নূর খান: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা রির্পোটিংয়ের জন্য যে বিষয়টি জরুরি বলে আমি মনে করি, সেটা হলো নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা৷ এটা অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না৷ তাই সময়টা এখানে একটা বড় ফ্যাক্টর৷ দ্বিতীয় হলো দক্ষতা এবং তৃতীয় কারণ হলো একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার জন্য যে ধরনের প্রযুক্তিগত সাপোর্ট দরকার সেটা না পাওয়া৷ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য একটা ঘটনার পেছনে লেগে থাকার ব্যাপারে যেভাবে সময় দেয়া দরকার এবং অর্থনৈতিক সাপোর্ট থাকা দরকার, সে জায়গায় আমাদের দুর্বলতা রয়ে গেছে৷ এ সমস্ত কারণে আমাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দুর্বলতা রয়েছে

অডিও শুনুন 08:37

‘‘আমাদের দেশে সর্বক্ষেত্রেই এক ধরনের ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ' রয়েছে’’

একটা কথা তো ঠিক যে, দু-একটি মিডিয়া হাউজ ছাড়া অধিকাংশই বর্তমানে ব্যবসায়ীদের দখলে? ফলে তাঁরা পুঁজি রক্ষায় বা পুঁজি বাড়াতে মিডিয়াকে কখনও কখনও ব্যবহার করছেন৷ এই পরিস্থিতিতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা কি আদৌ সম্ভব?

গত তিন দশকের দিকে তাকালে, আমরা দেখবো যে সংবাদপত্রের মালিকানার ধরন পাল্টে গেছে৷ দু-একটি ছাড়া অধিকাংশ মিডিয়া হাউজই এখন ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে বা ব্যবসায়ীরাই সেগুলো পরিচালনা করেছেন৷ ফলে তাঁরাই রিপোর্টিংয়ের ধরন বা বিষয়গুলো স্থির করছেন৷ আর এটা তাঁরা করছেন নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে মাথায় রেখেই৷ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটি একটি বাধা বৈকি!

এই পরিস্থিতি বদলানোর উপায় কী?

এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে একজন সংবাদকর্মীকে তাঁর সংবাদ সংগ্রহের জন্য স্বাধীনতা দিতে হবে৷ সেক্ষেত্রে সময় কোনো বিবেচ্য বিষয় না৷ কারণ সময় বেধে দিলে অনেকক্ষেত্রেই কাজটা ব্যর্থতায় রূপ নেয় বা রিপোর্ট দুর্বল হয়৷ তাই একজন সাংবাদিককে যদি সময় বেধে দেওয়া না হয় এবং তাঁকে নিয়ন্ত্রণ না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়াও হয়, তাহলে উন্নয়ন সম্ভব৷

আমরা মমতাজ ভাইয়ের পর এই ধরনের সাংবাদিকতায় একটা বড় ‘গ্যাপ' লক্ষ করেছি৷ যদিও দু-একজন সাংবাদিক আছেন, যাঁরা এখনও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে থাকেন৷ তবে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়সারা গোছের হয়ে যায়৷ এক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে – আপনি কোন বিষয়ের ওপর অনুসন্ধান করছেন৷ অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে সরকারের যদি বিব্রত হওয়ার কোনো কারণ থাকে বা সরকারের স্বার্থ যদি বিঘ্নিত হয় অথবা ক্ষমতাসীন মানুষদের স্বার্থ যদি বিঘ্নিত হয় বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে প্রতিপদে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধা আসে৷

এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধেরও ব্যাপার থেকে যায়৷ সেক্ষেত্রে প্রকাশ্যে না হলেও নানাভাবে আইনকে ব্যবহার করার একটা চেষ্টা হয়৷ যেমন ধরুন দুর্নীতির বিষয়ে কেউ যদি অনুসন্ধান করতে চান বা শেকড়ে যেতে চান, তাহলে দেখা যায় আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকার ফলে ক্ষমতাধররাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি করে থাকেন৷ তা তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হন বা আমলাদের ক্ষমতাধর ব্যক্তি হন, স্বাভাবিকভাবেই তিনি আইনকে নিজের মতো করে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন৷ ফলত অনেকক্ষেত্রেই, বিশেষ করে মফঃস্বলের উন্নয়ন নিয়ে কোউ যদি দুর্নীতির রিপোর্ট করতে চান, তাহলে ঐ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ আনা হয়, যার কোনো ভিত্তি নেই৷ এমনকি তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়৷

সব দেশেই দেখা যায় যে, এ সব ক্ষেত্রে সরকার একটা চাপ তৈরি করে৷ কিন্তু সেই চাপকে সামলে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন সাংবাদিকরা৷ এখানে আমরা সেই চাপকে সামলে কেন ভালো রিপোর্ট করতে পারছি না?

প্রথমত আমরা যেটা খেয়াল করছি, সেটা হলো অধিকাংশ মিডিয়া হাউজই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে৷ তাঁদের ব্যবসায়ও কিন্তু সরকারের এক ধরনের চাপ দেয়ার সুযোগ রয়েছে৷ এতে করে বহুক্ষেত্রেই দায়সারা গোছের রিপোর্ট হয়৷ আবার অনেক সময় দেখা যায়, একটা শুরু করার পর আর শেষ হচ্ছে না বা শেষ হলেও শুরু আর শেষের কোনো মিল নেই৷ অথবা সেই রিপোর্টটা ওখানেই থেমে যায়৷ এর একটা বড় কারণ হলো, আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যম অনেকক্ষেত্রেই সরকারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়৷ কারণ ব্যবসায়ীরা তো সরকারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত৷ তাই সরকারের ভয়েই ব্যবসায়ীরা তাঁদের মিডিয়াতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে দেন না৷

আমাদের দেশে মিডিয়ার উপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ আছে না মিডিয়াগুলো স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে?

আমাদের দেশে সর্বক্ষেত্রেই এক ধরনের ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ' রয়েছে৷ কারণ গোটা রাষ্ট্রেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ভয়ের সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবক্ষয় বিরাজ করছে৷ আর এ তিনটি কারণে সমস্ত ক্ষেত্রেই এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে৷ একটা জিনিস আমরা খেয়াল করেছি যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুবই পরোক্ষভাবে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে কিছু মহল৷

এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য কী করা দরকার?

একটা রাষ্ট্রে যখন গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ হয়ে যায় তখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়৷ একই সঙ্গে সংবাদকর্মীদের লেখার স্বাধীনতাও প্রকারন্তরে বাধাগ্রস্ত হয়৷ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে সবকিছুই এভাবে সংকুচিত হয়ে আসবে৷ ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাও ব্যাহত হবে বারবার৷

সাংবাদিকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টে যাচ্ছে৷ আমি মনে করি, প্রত্যেকের নিজের একটা রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে৷ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের কাজটি করে মহান পেশার মর্যদা রক্ষা করা উচিত সাংবাদিকদের৷ 

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو