গাছেরা যদি ভূমিকম্প থামায়

বনজঙ্গলের গাছপালা কি ভূমিকম্পের তীব্রতা কমানোর ক্ষমতা রাখে? ফরাসি বিজ্ঞানীরা মাঠে ও জঙ্গলে কম্পনের তরঙ্গ নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে সেই প্রশ্নেরই উত্তর পাবার চেষ্টা করছেন৷

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের মিমিজঁ গ্রামের কাছে একটি পাইন গাছের বন৷ বিজ্ঞানীরা এখানে সাইসমিক ওয়েভ বা ভূকম্পনঘটিত তরঙ্গের ওপর গাছেদের প্রভাব নিয়ে একটি বড় মাপের পরীক্ষা চালাচ্ছেন৷

বিজ্ঞানীরা এসেছেন ফ্রান্সের অপর প্রান্তে গ্রেনোব্লে শহরের ‘আইএস-ত্যার' ভূবিজ্ঞান ল্যাবরেটরি থেকে৷ প্রতিষ্ঠানটির পদার্থবিদরা একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছেন৷ ভূকম্পনের অনুকরণে একটি এক্সপেরিমেন্টে তারা একটি ধাতব পাতে কম্পন সৃষ্টি করেন: প্লেটটিতে লম্বা লম্বা ধাতব রড লাগানো ছিল৷ মাটিও রুপ্যাঁ আর ফিলিপ রু দেখেন যে, রডগুলো যেখানে মেটাল প্লেটটিতে জোড়া লেগেছে, সেখানে কম্পনের মাত্রা অনেক কম৷

দুই বিজ্ঞানী মুক্ত প্রকৃতিতে তাদের এক্সপেরিমেন্টের পুনরাবৃত্তি করার সিদ্ধান্ত নেন – রডের বদলে গাছ দিয়ে; গাছের নীচে মাটি বা জমিটা হবে যেন ঐ ধাতব প্লেট৷ গাছেরা কি মাটিতে ভূকম্পনের বিস্তার রোধ করতে পারে?

ভিডিও দেখুন 05:28
এখন লাইভ
05:28 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 05.09.2017

ভূমিকম্পের তীব্রতা কমাবে গাছপালা?

প্রস্তুতি

প্রথমে বিজ্ঞানীরা একটি পরিখা খুঁড়ে মাটির ধরন ও পদার্থবিদ্যাগত গুণাগুণ সম্পর্কে আরো বেশি জানবার চেষ্টা করেন, কেননা প্রথমেই প্রশ্ন ছিল: মাটি নিজেই ভূকম্পনের তীব্রতা অংশত শুষে নেয় কিনা৷ বিজ্ঞানী ফিলিপ রু বললেন, ‘‘সেটাই হলো আসল চ্যালেঞ্জ৷ আমাদের ফিল্ড এক্সপেরিমেন্ট দেখাবে যে, আমরা যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছি, তা কোনো বিশেষ পদার্থের ওপর নির্ভর করে না৷ বাহ্যিক পার্থক্য সত্ত্বেও, তরঙ্গের বিস্তার সংক্রান্ত পদার্থবিদ্যাগত ঘটনা কি একই থাকে?''

বিজ্ঞানীরা প্রথমে রাডার দিয়ে জমিটা সার্ভে করে নেন, যাতে পরে আঁকাজোকা করার সময় ফ্যাক্টর হিসেবে জমির উঁচুনীচু বৈশিষ্ট্য পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে৷ রাডার তরঙ্গ দু'মিটার পর্যন্ত মাটিতে ঢুকে যায়৷

বিজ্ঞানীরা মাটিতে প্রায় ১,০০০ সাইসমিক সেন্সর বসিয়েছেন – তাদের অর্ধেক জঙ্গলে আর বাকি অর্ধেক কাছের একটা খোলা মাঠে৷ তারা গাছেও সেন্সর লাগিয়েছেন, ফিলিপ জুজঁ যার দায়িত্বে ছিলেন – তিনি একজন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ৷ জুজঁ সাধারণত বাড়িঘরে সেন্সর লাগিয়ে থাকেন, সাইসমিক ওয়েভ বা ভূকম্পনের তরঙ্গে বাড়িঘরের কি প্রতিক্রিয়া হয়, তা দেখবার জন্য৷

আরটুডিটু

সব ক'টি সেন্সর বসাতে ও পরীক্ষা করতে প্রায় তিন দিন সময় লেগে গেছে৷ এবার চাই সাইসমিক ওয়েভ৷ ভূকম্পনের তরঙ্গের নকল করবে একটি বহনযোগ্য ভাইব্রেশান জেনারেটর৷ তার ৭০ কিলোগ্রাম ওজনের সিলিন্ডারটি সুইচ টিপলে ওঠানামা করে, যার ফলে ভাইব্রেশান বা কম্পন সৃষ্টি হয়৷ বিজ্ঞানীরা বস্তুটির নাম দিয়েছেন আরটুডিটু৷ ভাইব্রেশান জেনারেটরের পক্ষে সত্যিই একটা ভূমিকম্প সৃষ্টি করা সম্ভব নয় – তবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য এই মাত্রার কম্পনই যথেষ্ট৷

আরটুডিটু চালু করার পর সেন্সরগুলি তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করে৷ দেখা যায়, খোলা মাঠে কম্পনের বিস্তারের নকশাটি স্বাভাবিক ও একটানা হলেও – জঙ্গলে তা অনেক কম! তাহলে কি এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে আশাজনক ফল পাওয়া গিয়েছে? ফিলিপ রু বললেন, ‘‘আমরা এখনো সব তথ্য বিশ্লেষণ করিনি৷ কিন্তু আমরা যে ফলাফল দেখার আশা করছিলাম, তার কিছুটা আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি৷ প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বনজঙ্গল সত্যিই রেজোনেটর হিসেবে কাজ করে ও কম্পনের মাত্রা কমিয়ে দেয় – এমনকি পুরোপুরি রোধ করে দিতে পারে৷''

মুশকিল আসান?

এই গবেষণার ফলে হয়ত ভূকম্পন রোধের নতুন পন্থার উদ্ভব হতে পারে... এমনকি ভূমিকম্পের সময় মানুষের জীবন বাঁচাতেও সাহায্য করতে পারে৷ ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ফিলিপ জুজঁ জানালেন, ‘‘ভূকম্পনে শহর এলাকার বাড়িগুলো ঠিক গাছের মতোই আন্দোলিত হয়৷ অনেক বাড়ি থাকার ফলে তারা সাইসমিক ওয়েভগুলোর তীব্রতা প্রশমন করতে পারে৷ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পরিকল্পনা হল, আমরা এখানে অরণ্যে যা পর্যবেক্ষণ করছি, তা নগর পর্যায়ে ব্যবহার করা যায় কিনা... এমন সব বাড়ি বা বাড়ির সমষ্টির কথা ভাবা যায় কিনা, যা শহরকে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে৷''

শুনতে তো ভালোই লাগে – তবু এ দূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন৷ মিমজঁ-র পাইন ফরেস্ট থেকে আগামীর সেই ভূমিকম্প প্রতিরোধী নগরসভ্যতা এখনও অনেক দূর৷

ইংগো ক্নফ/এসি

নিয়মিত অনুশীলন

জাপানে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, তা শেখানো হয়৷ এরপর প্রতি মাসে শেখানো এই বিষয়গুলো নিয়ে অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয়৷ ছাদ থেকে শক্ত কিছু পড়ে যেন মাথার তেমন ক্ষতি না হয় সেজন্য অনেক শিক্ষার্থীকে এরকম (ছবিতে দেখা যাচ্ছে) টুপি দেয়া হয়৷ এছাড়া কয়েক তলা বিশিষ্ট স্কুলগুলোতে ঢালু পথের ব্যবস্থা রাখা হয় যেন ভূমিকম্পের সময় শিক্ষার্থীরা সেগুলো দিয়ে দ্রুত নীচে নেমে আসতে পারে৷

প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ

বড় ধরনের কোনো কম্পন আঘাত হানতে যাচ্ছে কিনা – সে সম্পর্কে আগেভাগেই তথ্য জানার চেষ্টা করে জাপান৷ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে ভূমিকম্পের অন্তত কয়েক সেকেন্ড (সর্বোচ্চ ৫০ সেকেন্ড) আগেই সে সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যায় দেশটি৷ সঙ্গে সঙ্গেই সেটি নাগরিকদের জানিয়ে দেয় তারা৷ ভাবছেন মাত্র কয়েক সেকেন্ড! কিন্তু ঐ মুহূর্তে এই কয়েক সেকেন্ডই ক্ষতির মাত্রা অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে৷

নিউক্লিয়ার বাংকার

সুইজারল্যান্ডে ১৯৬৩ সালের পর থেকে আবাসিক ভবন নির্মাণের সময় আবশ্যকীয় শর্ত হিসেবে ঐ ভবনে একটি নিউক্লিয়ার বাংকার তৈরির নিয়ম চালু আছে৷ বাড়ি থেকে ৭০০ মিটার দূরে ১২ মিলিয়ন টন শক্তিসম্পন্ন বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলেও যেন ঐ বাংকার টিকে থাকতে পারে সেরকম ক্ষমতাসম্পন্ন বাংকার তৈরি করতে হয় সুইসদের৷

আয়োডিনের মজুদ

বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের কর্তৃপক্ষ তাদের সংগ্রহে আয়োডিন রাখছেন৷ হঠাৎ করে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে সেই সময় এই আয়োডিন কাজে লাগবে৷

দুর্যোগ থেকে শিক্ষা

২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির আঘাতে প্রায় আড়াই লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়৷ এমন বড় ক্ষতি যেন আর না হয় সেজন্য অত্র অঞ্চলে এ ধরনের (ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে) সতর্কবাণী প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ ফলে পরবর্তীতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেছে৷

স্মার্টফোনে বার্তা

সতর্কবার্তা পাঠাতে আজকাল স্মার্টফোন অ্যাপ ও ক্ষুদে বার্তার সহায়তা নেয়া হচ্ছে৷ ভারত, ফিলিপাইন্স সহ অনেক দেশের দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বাস করা বাসিন্দাদের এই প্রক্রিয়ায় সতর্ক করা হয়ে থাকে৷

বাড়িতে খাবার আর ওষুধ রাখা

বেসামরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গ হিসেবে জার্মান সরকার পরিকল্পনা করছে যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা সন্ত্রাসী আক্রমণ ঘটলে, প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি সামলে ওঠার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের বাড়িতে কিছু কিছু করে রসদ রাখতে হবে৷ যেমন দশদিনের মতো খাবার, পাঁচদিনের মতো পানীয় জল রাখতে হবে৷ এছাড়া ওষুধ ও কিছু নগদ টাকা রাখারও পরামর্শ দেয়া হবে৷ তবে এ সব এখনও আলোচনার পর্যায়ে আছে৷

প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভূমিকম্প মোকাবেলার জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে৷ এরইমধ্যে ৮৪টি প্রাথমিক এবং ৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মহড়া সম্পন্ন করেছে৷ এ সংক্রান্ত একটি ‘গাইডলাইন’ চূড়ান্ত করতেও কাজ করছে সরকার৷ প্রায় ৬৬ হাজার প্রাথমিক এবং ৩২ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের মহড়া পরিচালিত হবে৷