চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, নিন্দার ঝড়

সারাদেশে বগুড়া ধর্ষণকাণ্ড নিয়ে যখন তোলপাড় চলছে, তখন ঢাকায় সাড়ে তিন বছর বয়সি শিশু তানহা ধর্ষণের ঘটনায় বিক্ষোভের ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে৷ ঐ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে সোমবার এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷

দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে ঘরে ডেকে নিয়ে শিশু তানহাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে গ্রেপ্তারকৃত শিপন৷ এরপর লাশটি তানহাদের বাড়ির শৌচাগারে ফেলে যায়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছে অনেকেই৷ তারা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দাবি করেছেন৷ আইয়াজ মাবুদ নিজের মেয়ের বয়সি তানহার ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কিত বোধ করছেন৷ ফেসবুক পাতায় তিনি লিখেছেন, ‘‘তানহা আমার মেয়ের চেয়ে কয়েক মাসের বড়৷ তানহা জানতো না – সে শুধু শিশু নয়, সে একটি মেয়ে৷ আর এই পৃথিবীর বিশাল একটি অংশ এখনো মেয়েদের মানুষ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি৷ এখনো মেয়ে একটি ভোগ্যবস্তু, সেজন্য বয়স কোন বিবেচ্য নয়৷ পুরুষত্ব চরিতার্থ করার জন্য ‘ঘাতক' শিপনের মতো প্রয়োজনে তিন বছরের মেয়েটির যৌনাঙ্গে চিড়ে-ফেড়ে-কেটে পৌরুষত্বের রাজদণ্ডটি ঢুকিয়ে দেয়া হবে৷ সে জানতো না – তাকে চিৎকার করতেও দেবে না – সেজন্য গলা টিপে মেরে ফেলা হবে৷ তানহা আমার মেয়ের মতো, মেয়ের মতো বলছি কেন – আমার মেয়েই তো৷ এদেশে আমি কি আমার মেয়ের হত্যার বিচার পাব? এ দেশে আমার বাকি মেয়েদের নিরাপত্তা আছে তো? সবার সম্মিলিত প্রতিরোধে আসুন আপনার-আমার মেয়ের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি৷ যেখানে ‘তানহারা' প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াবে৷’’

দীপু মাহমুদ অঙ্গীকার করেছেন তানহা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আর গল্প উপন্যাস লিখবেন না৷ তিনি ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘‘নষ্টদের দখলে চলে গেছে এই দেশ৷ সেই নষ্টদের আমরা দেবতাজ্ঞানে পূজা করি৷ এই নষ্ট জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার চাইতে ভাগাড়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে মরে পড়ে থাকা ভালো৷''

এই ঘটনাটি নিয়ে জোরালো কোনো প্রতিবাদ বিক্ষোভ না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন মো. সম্রাট খান৷ তিনি লিখছেন, ‘‘কোথায় আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা? কোথায় নারী সংগঠনগুলো-সমাজপতিরা? কোথায় সুশীলসমাজ? কেউ তো প্রতিবাদ করলো না৷ এই হলো আমাদের সোনার বাংলা৷’’

নাজমুল বাদশাহ বগুড়ার ছাত্রী ধর্ষণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘‘বগুড়ার ছাত্রী ধর্ষণ ঘটনার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে শিশু তানহা ধর্ষণ ও হত্যার মতো নিষ্ঠুর, অমানবিক ঘটনা৷ জাতি হিসেবে আমরা বড়ই আবেগী, বড়ই উৎসাহী৷'' তিনি প্রশ্ন তুলেছেন,‘‘ জানেন কি, কী ঘটেছিল চার বছরের নিষ্পাপ শিশু তানহার সঙ্গে?’’

মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল শিশু ধর্ষণের একটি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘কেবল গত জুলাই মাসে ৩২টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে৷ সর্বশেষ তিন বছরের শিশু তানহা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলো গত পরশু৷’’ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘‘কেন চুপ করে আছেন? আর কত? ধর্ষকদের কঠোর হস্তে দমন করুন৷’’

আনসার উদ্দীন তাঁর লেখায় বাংলাদেশের সমাজের অবক্ষয়ের কথা লিখেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘দিন দিন এই সমাজ ধ্বংস আর নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে৷ গত ২/৩ দিন আগেও হিংস্র নরপশু কর্তৃক বগুড়া জেলায় একটি গরীব কিশোরী ছাত্রীকে অমানুষিক যৌন নির্যাতন করার পর ধর্ষিতার মাকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে মাথা ন্যাড়া করে দেয় পাষণ্ড ধর্ষক তুফান৷ এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীতে শিশু তানহার উপর হিংস্র যৌন নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে লাশ বাথরুমে ফেলে রাখা হয়৷ এ সবের শেষ কোথায় বলতে পারেন কেউ?’’

এদিকে, বগুড়ায় ‘ধর্ষণের শিকার’ ঐ কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া ঘটনায় গ্রেপ্তার কাউন্সিলর রুমকি ও নরসুন্দরসহ সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত৷

বগুড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকিকে চারদিনের এবং তুফানের স্ত্রী আশা, শ্বশুর জামিলূর রহমান রুনু, শাশুড়ী রুমি খাতুন, গাড়িচালক জিতু, নরসুন্দর জীবন রবিদাস ও যুবক মুন্নাকে দুই দিন করে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত৷

বগুড়ার এক কিশোরীকে ভালো কলেজে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে ১৭ জুলাই ও পরে কয়েকবার ধর্ষণ করেন শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান৷ এ কাজে তাকে সহায়তা করেন তার কয়েকজন সহযোগী৷

বিষয়টি জানতে পেরে তুফানের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকিসহ ‘একদল সন্ত্রাসী’ শুক্রবার দুপুরে ঐ কিশোরী এবং তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়৷ পরে তাদের মারধর করে নাপিত দিয়ে মা ও মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেন৷ এ ঘটনার পর রোববার তুফানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়৷

সংকলন: অমৃতা পারভেজ

সম্পাদনা: দেবারতি গুহ

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে...

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই ছবিঘরটি দেখুন..

সাত মাসে ৬১ গণধর্ষণ

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন ২৬৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’ এর হিসেবে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ৬১টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে৷ সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই তথ্য জানায় ফোরামটি৷ একই সময়ে ধর্ষণ, উত্ত্যক্তসহ যৌন সহিংসতার শিকার হয় ৩৪৭টি শিশু৷ এর মধ্যে চারটি ছেলেশিশুও রয়েছে৷

বয়স ১৫ হওয়ার আগেই বিয়ে

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে ২৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় তাদের বয়স ১৫ পার হওয়ার আগে৷ আর ৬৫ শতাংশের বিয়ে হয় বয়স ১৮ পার হওয়ার আগে৷

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪৫ লাখেরও বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত৷ এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখেরও বেশি শিশুর বাস খোদ ঢাকা শহরে৷ বাংলাদেশ সরকার ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করলেও আদতে তা মানা হচ্ছে না৷ সরকারিভাবে নেই কোনো নজরদারির ব্যবস্থা৷

কিশোর অপরাধী

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিবছর কমপক্ষে দুই হাজার শিশুকে নানা অপরাধে আটক করা হয়৷ শিশু অধিকার ফোরামের হিসেবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৭৬ জন শিশুকে অস্ত্র ও মাদক বহনসহ নানা অভিযোগে আটক করা হয়৷

মাত্র তিনটি

আইন অনুযায়ী শিশু-কিশোর অপরাধীদের বিচার করা হয় কিশোর আদালতে৷ এরপর বিচার শেষে শাস্তি ভোগের জন্য তাদের শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর কথা৷ কিন্তু বাংলাদেশে এমন কেন্দ্র আছে মাত্র তিনটি৷ গাজীপুরে দু’টি এবং যশোরে একটি৷ এর মধ্যে গাজীপুরের একটি মেয়েদের জন্য৷ সব মিলিয়ে এই তিনটির ধারণ ক্ষমতা ৬০০৷ অর্থাৎ আটক শিশুদের বড় একটি অংশের জায়গা উন্নয়ন কেন্দ্রে হয় না৷ ফলে তাদের কারাগারে থাকতে হয়৷