জঙ্গিবাদ কি ইসলামসম্মত?

ইরাক-সিরিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর খেলাফতের দিন শেষ হয়ে আসছে৷ অথচ ঠিক সেই সময় আত্মঘাতী বোমা হামলা ঘটা দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম৷ প্রশ্ন হচ্ছে, জঙ্গিবাদ কি ইসলাম সমর্থন করে?

আইএস সংগঠনটি যার হাতে প্রথম গড়ে উঠেছিল, তার নাম আবু মুসাব আল-জারকাভি৷ নব্বইয়ের দশকে তার হাতে গড়া ‘আল তাওহিদ ওয়াল জিহাদ' নামের সংগঠনটি থেকে পরবর্তিতে আইএস বা আইসিস-এর জন্ম৷ জারকাভির জন্ম জর্ডানে৷ তরুণ বয়সে মাদক বিক্রি, যৌন নির্যাতন, ছিনতাই, মারামারি ইত্যাদি নানা অপরাধে তার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টা মামলা ছিল৷ জিহাদি হওয়ার আগে সে ছিচকে অপরাধী ছিল, আর জিহাদি হওয়ার পরে হয় উঠলো ইন্টারনেট যুগের প্রথম সেলিব্রেটি মুজাহিদ৷ নিজেদের নৃশংস ও বর্বর কর্মকাণ্ডের ছবি বা ভিডিও প্রচার করার যে কৌশল আইএস গ্রহণ করে, তার শুরুটাও জারকাভিরই হাতে৷ ২০০৫ সালে জর্ডানের আম্মানের ভয়াবহ বোমা হামলাসহ ইরাকে সংগঠিত বহু আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছিল তার নির্দেশে৷ ২০০৬ সালে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হয় জারকাভি৷ কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এখন বাংলাদেশেও আত্মঘাতী বোমা হামলা চলছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ইসলাম ও আত্মঘাতী বোমা হামলার মধ্যে সম্পর্ক যদিও মিডিয়া, বিশেষ করে পাশ্চাত্য মিডিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ইস্যু, কিন্তু আত্মহত্যাকে সবসময়ই মুসলিম পন্ডিতরা নিরুৎসাহিত করেছেন৷ এমন হাদিসও আছে যাতে দেখা যায় যে, আহত ও মরণাপন্ন যোদ্ধার জন্যও আত্মহত্যার অনুমতি নেই৷ হাদিসের উল্লেখ করছি এ বিষয়ে ক্লাসিকাল মুসলিম পন্ডিতদের অবস্থান বোঝানোর জন্য, আত্মঘাতী বোমা হামলা ইসলামসম্মত অথবা ইসলামসম্মত নয় – সে বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার জন্য নয়৷ কী ইসলাম সম্মত আর কী নয়, তা সাধারণত একটা সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতা-সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত হয়, নির্ধারিত হয় ইসলামের নামে রাজনৈতিক বৈধতা দাবিকারী ব্যক্তি বা সংগঠনের স্বার্থ, সুবিধা ও দাবি অনুযায়ী৷ আত্মহত্যার প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া যাক৷  ইসলামি আইনের ইতিহাসে দেখা যায় যে মুসলিম পন্ডিতরা নারী, শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সর্বোপরি নিরস্ত্র জনগণকে হত্যা করা যুদ্ধের সময়ও ‘জায়েজ' বলে মনে করতেন না৷ নিহতের লাশ বিকৃত না করার কঠোর বিধান ছিল৷ অথচ হোলি আর্টিজান বেকারিতে নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে লাশের বিকৃত ছবি অনলাইনে প্রচার করাও আইএস-এর সদস্যদের কাছে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ৷ জিহাদি মা বোমা বিস্ফরণ ঘটিয়ে নিজেও নিহত হচ্ছেন, সন্তানকেও হত্যা করছেন৷ জিহাদিদের দুনিয়ায় আত্মহত্যা থেকে শুরু করে নিজের সন্তান হত্যাও ইসলামসম্মত হয়ে যাচ্ছে৷

সমাজ

প্রথম আত্মঘাতী হামলা

১৮৮১ সালের ১৩ মার্চ এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন রুশ সম্রাট দ্বিতীয় আলেকজান্ডার৷ তাঁকে বহনকারী ঘোড়ার গাড়ির সামনে বোমা হামলা চালিয়েছিল ২৫ বছরের তরুণ ইগনাটি গ্রিনেভিৎস্কি৷ তিনি ‘দ্য পিপলস উইল’ নামে বামপন্থি একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন৷

সমাজ

ফিলিস্তিনের প্রথম নারী আত্মঘাতী হামলাকারী

ওয়াফা ইদ্রিস নামে ২৮ বছরের এক নারী ২০০২ সালের ২৭ জানুয়ারি জেরুসালেমে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে এক বয়স্ক ইসরায়েলিকে হত্যা করেন৷ আহত হয়েছিলেন প্রায় ১০০ জন৷ ইদ্রিসের পিঠে ঝোলানো ব্যাগে ১০ কেজি ওজনের বোমা ছিল৷ ছবিতে তাঁকে গ্রাজুয়েশন পোশাক পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে৷ ‘আল-আকসা মার্টায়ার্স ব্রিগ্রেড’ হামলার দায় স্বীকার করেছিল৷ পরবর্তীতে নারী আত্মঘাতী হামলাকারীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল তারা৷

সমাজ

সবচেয়ে প্রাণঘাতী আত্মঘাতী হামলা

২০০১ সালে আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলাকারীরা বিমান ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলা চালিয়েছিল৷ এতে প্রায় তিন হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছিলেন৷

সমাজ

বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা

১৯৮৩ সালের অক্টোবরে লেবাননে গৃহযুদ্ধ চলার সময় শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত ৩০০-র বেশি মার্কিন ও ফরাসি সামরিক বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল৷ দু’টি ট্রাক নিয়ে হামলাকারীরা ব্যারাকে ঢুকে পড়েছিল৷ প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ১ দশমিক ৪ টন বিস্ফোরক ছিল৷ ৯/১১ হামলার আগে ওটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা৷

সমাজ

শরীরের ভেতর বোমা স্থাপন

২০০৯ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নাইফকে (ছবি) হত্যার উদ্দেশ্যে নিজের শরীরের ভেতর বোমা স্থাপন করিয়েছিলেন ২৩ বছরের সৌদি তরুণ আল-আসিরি৷ পরে মোবাইল ফোনের সাহায্যে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটনা হলেও তাতে শুধু আসিরিই মারা যান৷ প্রিন্স নাইফ সামান্য আহত হয়েছিলেন৷ উল্লেখ্য, শরীরের ভেতরে বোমা স্থাপন করলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সেটি সহজে ধরা পড়ে না৷

সমাজ

রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড

১৯৯১ সালের ২১ মে ভারতের তামিলনাড়ুতে আত্মঘাতী এক বোমা হামলায় নিহত হন দেশটির সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী৷ তাঁকে হত্যা করেন শ্রীলঙ্কার তৎকালীন জঙ্গি সংগঠন ‘লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম’ বা এলটিটিই-র এক নারী সদস্য৷ ছবিটি হামলার কয়েক সেকেন্ড আগের মুহূর্তে তোলা৷ শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে সে দেশে শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠিয়েছিল ভারত৷

সমাজ

বাংলাদেশে প্রথম আত্মঘাতী হামলা

বাংলাদেশে নব্য জেএমবি-র সদস্যদের মধ্যে সম্প্রতি আত্মঘাতী প্রবণতা বেশি দেখা গেলেও, আগেও এর নজির ছিল৷ ২০০৫ সালের ২৯শে নভেম্বর গাজীপুরে বাংলাদেশের প্রথম আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে৷ ঐ হামলায় আত্মঘাতী হামলাকারী জেএমবি-র সদস্য আসাদসহ আটজন নিহত হয়েছিলেন৷ উপরের ছবিটি সম্প্রতি সিলেটে এক অভিযানের সময় তোলা৷

গুলশান হামলার পর থেকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের একটা শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ জঙ্গিবাদীরা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের অনুসারী না বলে তাদের ধর্মচ্যুত করার একটা প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে, যাচ্ছেও৷ কিন্তু ব্লগার, লেখক, প্রকাশকদেরকে যখন ইসলামের সমালোচনার দায়ে হত্যা করা শুরু হয়েছিল, তখন তার বিরুদ্ধে এই শক্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় অবস্থানটা দেখা যায়নি৷ তা থাকলে আজকে বাংলাদেশ এই অবস্থায় পৌঁছাতো কিনা সেই প্রশ্ন তোলা যেত৷

২০১৪ সালে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শফি একবার ঘোষণা দিলেন যে, নাস্তিকদের হত্যা করা ‘ওয়াজিব' হয়ে গেছে৷ কিন্তু ২০১৫ সালে যখন প্রায় প্রতি মাসেই একজন করে ব্লগারকে খুন করা হচ্ছিল এবং ব্লগার বিরোধী হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনটি বারবার আলোচনায় উঠে আসছিল, তখন হেফাজতে ইসলাম একবার ‘এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ইসলামসম্মত নয়' বলে বিবৃতি প্রকাশ করে৷ সেই বিবৃতিতেই আবার এমন হুঁশিয়ারি ছিল যে, রাষ্ট্র নাস্তিকদের বিচার করে না বলেই এমন হত্যাকাণ্ড ঘটছে৷ অভিজিৎ রায় নিহত হওয়ার পর যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে একটা শব্দ উচ্চারণ করেননি, সেখানে তিনি গুলশান হামলা পরবর্তি সময়ে এ ধরমের হামলা যে ইসলামসম্মত নয়, সেই বিষয়ে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন৷ দিনশেষে কোনটা ইসলামি আর কোনটা নয়, তা আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি আর রাজনীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়, পরিবর্তিত হয়৷ সমাজ বা রাষ্ট্র ইসলামের নামে কী গ্রহণ করতে পারবে, কী বর্জন করতে বাধ্য হবে আর কোন বিষয়ে সম্মতিসূচক নিরবতা অবলম্বন করবে বা বিহ্বল অবস্থান গ্রহণ করবে, তাও নানান দেশীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিদ্যমান ক্ষমতা-সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত হয়৷

কী ইসলাম সম্মত আর কী নয়, তার সাথে ক্ষমতার সম্পর্কের কারণেই বিখ্যাত নৃতাত্ত্বিক তালাল আসাদ ইসলামকে ‘ডিসকার্সিভ ট্র্যাডিশন' হিসাবে বোঝার কথা বলেন৷ ‘ট্র্যাডিশন' মানে ঐতিহ্য৷ সকল ঐতিহ্যেরই ইতিহাস থাকে৷ ইসলামি ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত সবকিছুর ইতিহাসই সাধারণত ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগের সাথে যুক্ত করার প্রচলন আছে৷ কিন্তু ঐতিহ্যের কোনো কোনো অংশ ঐতিহ্য না থেকে একেবারেই ইতিহাসে পরিণত হতে পারে৷ যেমন তুরস্কে ওসমানি খেলাফতের বিলুপ্তির পরে খেলাফত বিষয়টাই ইসলামি ঐতিহ্য থেকে বাদ পরে ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল৷ ঐতিহাসিকভাবে ওসমানি খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলের মুসলমানদের কাছে খেলাফতের বিলুপ্তি ইসলামের অস্তিত্ব সংকট হিসাবে মনে হয়নি৷ এর পেছনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তি মধ্যপ্রাচ্যের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ও রাজনীতি ভূমিকা রেখেছে৷ ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস ইতিহাস থেকে বের করে এনে খেলাফতকে যে আবার ইসলামি ঐতিহ্যের অংশ বলে দাবি তুললো এবং ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলে তা প্রতিষ্ঠাও করতে পারলো, তা সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই৷ ইরাকে ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কিংবা পরবর্তিতে সিরিয়ায় ‘রেজিম' পরিবর্তনে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া হয়ত খেলাফতের নামে আইএস-এর বর্বর রাজত্বের আবির্ভাব ঘটতো না৷ মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো ‘মেইনস্ট্রিম ইসলামিস্টদের' হঠকারী, ফ্যাসিস্ট ও প্যারাডক্সিকাল রাজনীতিও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে৷

রাজনীতি

আইএস কোথা থেকে এসেছে?

ইসলামিক স্টেট (আইএস) সুন্নী ইসলামিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী আল-কায়েদার একটি উপদল, যেটি আইএসআইএল, আইসিস এবং দায়েশ নামেও পরিচিত৷ ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণের পর এটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে৷ এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন আবু বকর আল-বাগদাদি৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটির লক্ষ্য হচ্ছে ইরাক, সিরিয়া এবং অন্যান্যা অঞ্চল নিয়ে একটি ইসলামিক স্টেট বা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা৷

রাজনীতি

আইএস কোথায় কাজ করে?

বিশ্বের ১৮টি দেশে আইএস সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়৷ ইরাক এবং সিরিয়ার কিছু অংশ এই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি সিরিয়ার রাকা শহরকে রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে৷ তবে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন অবধি নিজেদের দখলে থেকে এক চতুর্থাংশ এলাকা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে৷

রাজনীতি

কারা তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে?

আইএস-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে৷ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের সমন্বয়ে তৈরি মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি ‘কোয়ালিশন’ আইএস অধ্যুষিত এলাকায় বিমান হামলা চালাচ্ছে৷ এই কোয়ালিশনে কয়েকটি আরব দেশও রয়েছে৷ অন্যদিকে সিরিয়া সরকারের পক্ষে সেদেশে বিমান হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া৷ তবে ভূমিতে তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে কুর্দিশ পেশমার্গার মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো৷

রাজনীতি

আইএস-এর অর্থের উৎস কী?

জঙ্গি গোষ্ঠীটির অর্থ আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে তেল এবং গ্যাস৷ এটি এখনো সিরিয়ার তেল উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশ দখলে রেখেছে৷ আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠীর এই মূল্যবান সম্পদ৷ এছাড়া কর, মুক্তিপন এবং লুট করা পুরাকীর্তি বিক্রি করেও অর্থ আয় করে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি৷

রাজনীতি

আইএস কোথায় কোথায় জঙ্গি হামলা চালিয়েছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য জঙ্গি হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস৷ চলত বছর সবচেয়ে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলাটি চালানো হয়েছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে, যেখানে দু’শোর বেশি মানুষ নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে৷ আইএস-এর নেতারা জঙ্গি গোষ্ঠীটির আদর্শে বিশ্বাসীদের এককভাবে বিভিন্নস্থানে আঘাত হানতে উৎসাহ প্রদান করে৷

রাজনীতি

অন্যান্য আর কী কৌশল ব্যবহার করে আইএস?

নিজেদের ক্ষমতার পরিধি বাড়াতে অনেক কৌশল ব্যবহার করে আইএস৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটি ‘কালচারাল ক্লিনজিংয়ের’ নামে সিরিয়া এবং ইরাকের অনেক ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম লুট ও ধ্বংস করেছে৷ এছাড়া সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কয়েকহাজার মেয়েকে ক্রীতদাসী বানিয়েছে৷ গোষ্ঠীটি নিজেদের ‘প্রোপোগান্ডা’ এবং নিয়োগের কাজে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে৷

রাজনীতি

শরণার্থী হয়েছেন কতজন?

সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে সেদেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ প্রতিবেশী লেবানন, জর্ডান এবং তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছেন৷ অনেক সিরীয় ইউরোপেও পাড়ি জমিয়েছেন৷ এছাড়া প্রায় ৩০ লাখ ইরাকে ইরাকের মধ্যেই অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বলে খবর৷

বাংলাদেশেও বর্তমানে যে ইসলামের নামে খুন, বোমা হামলা ইত্যাদি হচ্ছে – তার পেছনে নানান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ আছে৷ যে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা বর্তমানে বাংলাদেশে কায়েম হয়েছে এবং প্রকৃত বিরোধী দলের উপস্থিতিতে যে রাজনৈতিক ‘ভেকুয়াম' তৈরি হয়েছে, জঙ্গিবাদীদের মতো অরাজনৈতিক র‍্যাডিকালদের জন্যে উর্বর ভূমি তো বটেই৷ বিরোধী পক্ষ হিসাবে কট্টর ইসলামপন্থি ও জঙ্গিবাদীদের হাজির করা ‘ওয়ার অন টেরর'-এর রাজনীতি দুনিয়ার বহু ডানপন্থি ও স্বৈরশাসকদেরই পছন্দের৷

‘ওয়ার অন টেরর' নিয়ে রাজনীতি জর্জ বুশ করেছেন, আসাদও করেছেন৷ এই রাজনীতি তাঁদের কারো দেশের জন্যেই ভালো ফল বয়ে আনেনি৷ শেখ হাসিনা সরকারের ‘ওয়ার অন টেরর' কেন্দ্রিক রাজনীতিও আমাদের জন্যে দুশ্চিন্তার কারণ৷ এছাড়া জাতীয় রাজনীতির বাইরে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতগুলোও বিবেচনার বিষয়৷ বাংলাদেশ সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যুক্ত হয়ে জঙ্গি হামলার ঝুকি আরো বাড়িয়ে তুলেছে৷ এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই৷ তবে বলে রাখা ভালো যে তা অত্যন্ত জটিল৷

সৌদি আরব এবং ইসলামিক স্টেট – এই দুইই সালাফি আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান৷ যে আল-কায়েদা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আইএস-এর জন্ম, সেই আল-কায়েদার জন্ম হয়েছে সৌদি আরবেরই প্রত্যক্ষ্য সহযোগিতায়৷ সৌদি আরবপন্থি সালাফি পন্ডিতদের সাথে আল-কায়েদাপন্থি সালাফি পন্ডিতদের প্রধান মতপার্থক্যের বিষয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি৷ আল-কায়েদার মতে, মার্কিন সেনাবাহিনীর এই উপস্থিতি অনৈসলামিক, সৌদি আরবের মতে নয়৷ অর্থাৎ এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে যে, কী ইসলামি আর কী নয়, তা দিনশেষে রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত হচ্ছে৷ বাংলাদেশে বর্তমানে ইসলাম মূলত আদালত প্রাঙ্গন থেকে মুর্তি অপসারণ কিংবা পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিরোধিতায় পরিণত হয়েছে৷ পাশাপাশি পরিণত হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষার উপায়ে, এবং অনেকক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামো টিকিয়ে রাখার মতাদর্শে৷ শান্তির পক্ষে ইসলামকে হাজির করতে দেখা যায় যখন ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা বক্তব্য দেন শুধু তখনই৷ এই হাজিরাটাও সর্বক্ষেত্রে সমান গুরুত্বের সাথে করা হয় না, যেমন ইতিমধ্যে ব্লগার হত্যাকাণ্ড বিষয়টির উল্লেখ করেছি৷

সর্বোপরি আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, আমাদের সময়কার ইসলামের রাজনীতি শুধু ইসলামি নয়, প্রবলভাবেই আধুনিকও বটে৷ আধুনিক ইসলামিস্টরা ‘কালচারাল লিবারালিজম' (যেমন নারী স্বাধীনতা, ধর্ম ত্যাগের স্বাধীনতা) গ্রহণ করতে না চাইলেও, ‘ইকোনোমিক লিবারালিজম' (ইসলামি ব্যাংক) গ্রহণ করে বসে আছে এবং ইকোনোমিক লিবারালিজম যে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার মতো কালচারাল লিবারালিজম ছাড়াও দিব্বি টিকে থাকতে পারে তা ভুলে গেলে চলবে না৷ তাই শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরতন্ত্র আর জঙ্গিবাদ যে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷

জঙ্গিবাদ কি ইসলামিক না অনৈসিলামিক? যাঁরা এতক্ষণ এই লেখাটি মনযোগ দিয়ে পড়েছেন, তাঁদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এই প্রশ্নের উত্তরও রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়৷ বাংলাদেশে যদি কখনও আইএস বা আল-কায়েদার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, শুধুমাত্র তাহলেই জঙ্গিবাদ ইসলামসম্মত হবে, নতুবা নয়৷

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Parvez Alam

পারভেজ আলম, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট

পাঠক হয়ত আমার সাথে একমত হবেন যে বাংলাদেশে কখনোই আইএস-এর মতো খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে না৷ কিন্তু বাংলাদেশ যে সিরিয়া বা ইরাকের মতো জঙ্গিবাদ কবলিত যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়ে যাবে না, সেই নিশ্চয়তা বোধহয় এখন আর দেওয়ার উপায় নেই৷ যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের আবির্ভাব ঘটেছে, তা না বুঝলে জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করা সম্ভব না৷ জঙ্গিবাদের বিরোধিতা করতে গেলে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কাঠামোর সমালোচক হিসাবেও আবির্ভাব করতে হবে৷ জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলতে গেলে তাই গণতন্ত্রহীনতা নিয়েও কথা বলতে হবে৷ জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলতে গেলে র‍্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়েও কথা বলতে হবে৷ গণতন্ত্রের পক্ষে বা মানবাধিকারের পক্ষে যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের শক্ত নৈতিক অবস্থান না থাকে, তবে অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক জঙ্গিবাদকে পরাজিত করা যাবে না৷ জঙ্গিবাদ নির্মূলের ক্ষেত্রে সরকারি ‘ন্যারেটিভকে' বিনা প্রশ্নে মেনে নেোয়া যেমন ভয়ানক ভুল হবে, তেমনই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উপস্থিতিকে সরকারি ‘কন্সপেরেসি' হিসাবে প্রচার করাও আত্মঘাতী হবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷