জঙ্গি তৎপরতা রোধে ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলোর যা করা উচিত

বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলাগুলোর পর একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে৷ ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলো জঙ্গি তৎপরতা কমাতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে? আর বাড়াতেই বা কেমন ভূমিকা রাখছে?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

জঙ্গি তৎপরতায় এখন এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে৷ উচ্চবিত্তের সন্তানরাও খুব অল্প সময়ে জঙ্গিতে রুপ নিচ্ছে এবং ধর্মের নামে মানুষ খুন করতে গিয়ে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে কার্পণ্য করছে না৷ যে ছেলে একবছর আগে এক বলিউড নায়িকার দেখা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল, সেই কিনা বছরখানেকের মধ্যে এক রেস্তোরাঁয় ঢুকে দিব্যি একের পর এক বিদেশিকে জবাই করেছে৷ এমনকি সেই ভয়ংকর বর্বর কাজ করার আগে হাসিমুখে ছবি তুলে পাঠিয়ে গেছে তাদের কাছে, যারা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি গোষ্ঠী বলে পরিচিত৷

বাংলাদেশে যে শুধু এমন হচ্ছে তা নয়, জার্মানিতে সম্প্রতি এক শরণার্থী, যে কিনা কয়েকমাস আগেও বেশ উদারতার পরিচয় দিয়েছে, জার্মানদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে, সে এক ট্রেনে পাঁচজনকে কুপিয়ে আহত করেছে৷ আর সেটা করার আগে এক ভিডিওতে বশ্যতা স্বীকার করে গেছে তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট’-এর' প্রতি৷ এ সব কারণে তাই প্রশ্ন উঠছে, কী এমন ‘মহৌষধ' জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দিচ্ছে যে রাতারাতি তরুণ ছেলেমেয়েরা জঙ্গি হয়ে উঠছে?

ইন্টারনেটে তথ্য

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা প্রতিদিনই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কিছু না কিছু তথ্য যোগ করেন৷ স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনগুলোও ব্যবহারকারীদের ধারণার চেয়ে বেশি তথ্য নিয়ে থাকে৷

মেটাডাটা

গুপ্তচর বিভাগ বেশি আগ্রহী ‘মেটাডাটা’ সম্পর্কে৷ নেট ব্যবহারকারী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ওয়েবভিত্তিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় মেটাডাটা৷

মেটাডাটার তথ্য

কে কাকে ই-মেল করছেন, সেই ব্যক্তির পরিচয়, সময় সম্পর্কে তথ্য থাকে মেটাডাটায় যা গুপ্তচর বিভাগ পেতে চায়৷ প্রেরক, ঠিকানা, তারিখ থেকে শুরু করে যে সার্ভার ব্যবহার করে ই-মেলটি করা হয়েছে, সেই তথ্যও এভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব৷

ডার্কনেটের ব্যবহার

ডার্কনেটের মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করা সম্ভব৷ প্রযুক্তিগত কারণে এখনো সরকার বা নিরাপত্তা কর্মীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডার্কনেট ব্যবহারকারীদের সনাক্ত করতে পারেন না৷

ফ্রিনেট

সবচেয়ে আলোচিত ডার্কনেটের নাম ফ্রিনেট৷ তাদের ওয়েবসাইটে গেলে বিনামূল্যে একটি সফটওয়্যার ডাউনলোড করা যায়৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য

ফেসবুক এবং টুইটারে একজন ব্যবহারকারী শুধু নিজের সম্পর্কে সাধারণ তথ্যই জানান না, তাঁরা তাঁদের পছন্দ, অপছন্দ, এমনকি বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও জানান৷ ব্লগে সমাজ সচেতনতা, মানবাধিকার, সরকার বিরোধী লেখাও লেখা হয়৷

বাংলাদেশে ডার্কনেট

বাংলাদেশে ডার্কনেটের ব্যবহার আগে না হয়ে থাকলেও খুব শিগগিরই যে সেটা শুরু হয়ে যাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণ-তরুণীদের মগজ ধোলাইয়ে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করছে বিভিন্ন ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম৷ আর এই কাজটা জঙ্গিদের নিয়োগদাতারা করছে খুবই সুনিপুণভাবে৷ তাদের সেই কাজের কিছু নমুনা পাওয়া যায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ফেসবুক কর্মকাণ্ড ঘাটলে৷ ফেসবুকের একটি পাতার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় বোমা তৈরির কৌশলসহ, কাকে, কেন, কিভাবে হত্যা করা উচিত কিংবা কেন তথাকথিত ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠায়' নিজের জীবন উৎসর্গ করে জিহাদ করা উচিত সেই জ্ঞান দেয়া হয় প্রকাশ্যে৷ অনলাইনে নিয়মিত বয়ানেরও ব্যবস্থা করা হয় পাতাটি থেকে, যেখানে তাদের সঙ্গে লাইভ আড্ডায় অংশ নিতে পারে যে কেউ৷ ফেসবুক যদিও তাদের অপতৎপরতা রোধে সক্রিয়, কিন্তু দেখা যাচ্ছে জঙ্গিদের গতি ফেসবুকের গতির চেয়ে অনেক বেশি৷ জঙ্গিদের একটি পাতা বন্ধ হলে আরেকটি চালু হয়ে যাচ্ছে৷ নতুন পাতা বন্ধ করতে ফেসবুক কয়েকদিন সময় নিচ্ছে৷ আর সেই সময়ের মধ্যে জঙ্গিদের তৎপরতা অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে৷ আবার, ফেসবুক পাতা বন্ধ হলেও ওয়ার্ডপ্রেসে তাদের ওয়েবসাইট ঠিকই সক্রিয় থাকছে৷ ফলে তরুণদের জঙ্গি বানানোর প্রক্রিয়া ঠিক থামছে না৷

ফেসবুকসহ বিভিন্ন ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জঙ্গিরা যেন কোনো ফায়দা নিতে না পারে সেটা নিয়ে জার্মানিও তৎপর৷ গত সপ্তাহে জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টোমাস ডেমেজিয়ের বিভিন্ন ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মকে জঙ্গি তৎপরতা রোধে ‘দায়িত্ব' নেয়ার কথা বলেছেন৷ তিনি বলেছেন, ‘‘আমি মনে করি না যে বিদ্বেষমূলক মেইল, বোমা তৈরির নিয়মাবলীসহ এরকম কন্টেন্ট ওয়েব থেকে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে চাওয়াটা বড় কোনো প্রত্যাশা৷'' ফেসবুক, টুইটারসহ ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলো যদিও বাংলাদেশের তুলনায় জার্মানিতে আপত্তিকর কন্টেন্ট সরিয়ে নিতে যথেষ্ট তৎপর, কিন্তু জার্মান সরকারের কাছে তা যৌক্তিক কারণেই যথেষ্ট মনে হচ্ছে না৷

DW Bengali Arafatul Islam

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

এক্ষেত্রে একটি কারিগরি জটিলতা রয়েছে৷ ফেসবুক, টুইটারসহ ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলো সচরাচর কোনো কন্টেন্ট নিয়ে এর ব্যবহারকারীরা আপত্তি জানানোর পর সেটি রিভিউ করে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজে থেকে তারা তেমন একটা মডারেশন করে না বলেই জানাচ্ছে গণমাধ্যম৷ আর এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার৷ এই কাজ দ্রুত করার মতো লোকবলও তাদের নেই, যা এক সমস্যা মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ বিষয়টি কি-ওয়ার্ড নির্ভর করে স্বয়ংক্রিয় করাটাও ভালো উপায় নয় কেননা তখন দেখা যাবে, জঙ্গিরা যেসব কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করছে সেগুলোর কোনোটি কোনো সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিবেদন করলে সেটাও ইন্টারনেটে ব্লক হয়ে যাবে৷ জঙ্গি তৎপরতা রোধে এলগোরিদমভিত্তিক মডারেশনের সফল কোনো পদ্ধতি এখনো পাওয়া যায়নি৷ ফলে বিষয়টি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় না করে অনেকটা ম্যানুয়ালিও করতে হবে৷

ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলো জঙ্গিরা যাতে অপতৎপরতামূলক কাজে ব্যবহার করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে তাই সেসব প্লাটফর্মের মডারেশন নীতি এবং মডারেটরের সংখ্যা আরো অনেক বেশি বাড়াতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷ শুধু ব্যবহারকারীর রিপোর্টের ভিত্তিতে নয়, প্লাটফর্মগুলোর নিজেদেরও উদ্যোগী হতে হবে আপত্তিকর কন্টেন্ট সরাতে৷ সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে সেটা যত দ্রুত করা যায় ততই মঙ্গল৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

জঙ্গি তৎপরতায় এখন এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে৷ উচ্চবিত্তের সন্তানরাও খুব অল্প সময়ে জঙ্গিতে রুপ নিচ্ছে এবং ধর্মের নামে মানুষ খুন করতে গিয়ে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে কার্পণ্য করছে না৷ যে ছেলে একবছর আগে এক বলিউড নায়িকার দেখা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল, সেই কিনা বছরখানেকের মধ্যে এক রেস্তোরাঁয় ঢুকে দিব্যি একের পর এক বিদেশিকে জবাই করেছে৷ এমনকি সেই ভয়ংকর বর্বর কাজ করার আগে হাসিমুখে ছবি তুলে পাঠিয়ে গেছে তাদের কাছে, যারা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি গোষ্ঠী বলে পরিচিত৷