জবরদস্তির পতিতাবৃত্তি থেকে জীবনের আনন্দে

ঘর ছেড়ে আঁধারের পথে

মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে প্রতি বছর নেপালের অন্তত দশ হাজার মেয়ে ঘর ছাড়ে৷

যেখানে নরক

পরিবারে অভাব৷ তাই ভালো চাকরির আশ্বাসে মানবপাচারকারীদের বিশ্বাস করে ঘর ছাড়ে মেয়েরা৷ কিন্তু আশা অনুযায়ী চাকরি জোটে না৷ বেশির ভাগ মেয়েকেই ভারতে নিয়ে জোর করে নামানো হয় পতিতাবৃত্তিতে৷ অত্যাচার, নির্যাতন তো আছেই, ধীরে ধীরে এইডসসহ অনেক জটিল রোগ বাসা সচ্ছল জীবনের ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়া মেয়েদের শরীরে৷

তাঁদের পাশে ‘মাইতি নেপাল’

অনেক বছর ধরেই দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে নেপালেের মেয়েদের যৌনকর্মী হতে বাধ্য করছে মানবপাচারকারীরা৷ একবার যৌনকর্মী হলে আর নিস্তার নেই – এমন যাঁরা ভাবতেন, অত্যাচার-নির্যাতন সইতে সইতে যাঁরা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেককেই ২২ বছর ধরে স্বপ্ন দেখাচ্ছে মাইতি নেপাল৷ ১৯৯৩ সালে এই সংগঠনটি গড়েছিলেন অনুরাধা কৈরালা৷ সেই থেকে বাধ্য হয়ে যৌনকর্মীর জীবন মেনে নেয়া মেয়েদের জীবনের পথে ফেরাচ্ছে মাইতি নেপাল৷

মঞ্চে জীবনের অভিনয়

যৌনপল্লি থেকে নিয়ে এসে মেয়েদের জীবনে আনন্দও এনে দেয় মাইতি নেপাল৷ সে আনন্দ ধরে রাখার উপায়ও শেখায়৷ মঞ্চনাটক করে মেয়েরা৷ সেই নাটকেও থাকে মানবপাচারকারী এবং তাদের দুরভিসন্ধির কথা৷ সেই নাটকে অভিনয় করেন যৌনপল্লিফেরত মেয়েরা৷ এভাবে অন্য মেয়েদের যৌনপল্লি থেকে দূরে থাকার উপায়ও জানায় যৌনকর্মীর জীবনকে পেছনে ফেলে আসা মেয়েরা৷

নজরদারি

আর কোনো মেয়ে যাতে মানবপাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে দেশ না ছাড়ে সেদিকে সবসময় নজর রাখে মাইতি নেপাল৷ বিশেষ করে ভারত সংলগ্ন সীমান্তে গিয়ে বাসগুলোর ওপর কড়া নজর রাখেন সংস্থার কর্মীরা৷ কোনো মেয়ে এবং তার সঙ্গের কোনো পুরুষকে দেখে সন্দেহ হলেই তাঁরা পুলিশ ডাকেন৷

নয় বছরের সেই মেয়েটি

গীতা নামের এই নারীকে মানবপাচারকারী যখন যৌনপল্লিতে নিয়ে যায়, তখন তাঁর বয়স মাত্র নয়৷ সেখান থেকে যখন ফিরলেন তখন এইচআইভি-র সংক্রমণে তাঁর শরীর কাহিল, বেঁচে থাকার আশাও প্রায় শেষ৷ একে তো যৌনকর্মী তার ওপর এইচআইভি-র রোগী –তাই অনেক সমাজসেবকও তখন গীতার কাছেই ঘেঁষতেন না৷ তখনই তাঁর পাশে দাঁড়ায় মাইতি নেপাল৷

নতুন ঠিকানা

নেপালের সীমান্ত এলাকায় ১১টি গৃহ নির্মাণ করেছে মাইতি নেপাল৷ যৌনপল্লি থেকে ফেরা মেয়েদের জন্য ঘর৷ মেয়েদের ভোকেশনাল ট্রেনিং বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও দেয়া হয় সেখানে৷

দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে...

কাঠমান্ডুর মাইতি নেপাল সেন্টারের উঠোনে প্রতিদিন বসে নাচের আসর৷ মেয়েরা যাতে অতীত ভুলে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সুন্দর আগামীর পথ রচনা করতে পারে সেজন্যই নাচ শেখানো হয় তাদের৷ এ পর্যন্ত ১২ হাজার শিশু ও নারী মাইতি নেপালের সহায়তায় যৌনপল্লি ছেড়েছে৷ সীমান্ত থেকে বাঁধা পেয়ে অল্পের জন্য যৌনকর্মী হওয়া থেকে বেঁচেছে প্রায় ৩০ হাজার জন৷

জার্মানিতে মাইতি নেপালের মেয়েরা

মাইতি নেপাল-এর কয়েকজন এখন জার্মানিতে৷ কোলন শহরের এলি হয়েস রেয়ালশুলে-তে সেদিন নেপালি নাচই নাচলেন৷

যেন প্রজাপতি...

কোলনে মাইতি নেপালের মেয়েরা যেন প্রজাপতির মতো উড়ছিলেন৷ তাঁদের জীবনও তো প্রজাপতির মতোই৷ শৈশব থেকে জীবনের একটা সময় পর্যন্ত শুঁয়োপোকার মতো তাঁদেরও অনেক কষ্ট সইতে হয়েছে৷ কষ্টের সময় কেটে যাওয়ার পর এখন প্রজাপতির মতোই যেন ডানা মেলে উড়ছে৷

ইউরোপ সফর

নভেম্বর পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠান করবে মাইতি নেপালের মেয়েরা৷ এ সময়ে জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে হবে তাঁদের অনুষ্ঠান৷

প্রতি বছর নেপালের কয়েক হাজার মেয়েকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেছে নিতে হয় যৌনকর্মীর জীবন৷ শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ – সবই সইতে হয় তাঁদের৷ চাকরির আশায় ঘর ছেড়ে অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়া এমন মেয়েদেরই জীবনের আনন্দে ফেরায় ‘মাইতি নেপাল’৷