জলবায়ু পরিবর্তন এবং ট্রাম্পের পশ্চাৎপসরণ

শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট ‘জি-৭'-এর পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রীদের এক বৈঠকে উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে জলবায়ু বিষয়ক প্যারিস চুক্তিকে ‘অপরিবর্তনীয়' বলে চিহ্নিত করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রতিবেদনের অংশবিশেষে স্বাক্ষর করেনি৷

ইটালির বোলোনা শহরে গত সপ্তাহান্তের (১০-১১ জুন) এক বৈঠকের পর যে চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের এই আপত্তি ফুটনোট আকারে সন্নিবেশিত হয়েছে৷ এতে করে রিপোর্টে জলবায়ু এবং বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংক বিষয়ে যে অংশগুলো আছে, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোর সঙ্গে আর থাকলো না৷ অন্য ছয়টি দেশ সুস্পষ্টভাবেই এই অঙ্গীকারে সম্মতি দিয়েছে এবং বলেছে যে, তারা মনে করে, প্যারিস চুক্তি নিয়ে আবার আলোচনার কোনো সুযোগ নেই৷ যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মোটেই বিস্ময়কর নয় এই কারণে যে, এই মাসের গোড়াতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন৷ ফলে প্যারিস চুক্তির আওতায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের যে প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছিল, সেটা মানার আর কোনো রকম দায়-দায়িত্ব তার নেই৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

প্যারিস চুক্তির সারাংশ হচ্ছে এই যে, স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এই শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা বা বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্প বিপ্লবের আগের তাপমাত্রার চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলশিয়াস, সম্ভব হলে এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলশিয়াস, বৃদ্ধির মধ্যে সীমিত রাখার জন্যে ‘চেষ্টা' করবে৷ অর্থাৎ কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয় এমন ধরণের কার্যক্রমকে তারা হ্রাস করবে এবং এই লক্ষে অন্যান্য পদক্ষেপ তারা নেবে, যাতে করে এখন যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে তার হার কমিয়ে আনা যায়৷ চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, সব দেশ তাঁদের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করবে৷ প্রকৃতপক্ষে, প্যারিসে ২০১৫ সালে শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবার আগেই ১৮০টি দেশ তাঁদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছিল, যা চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে৷ এসব হচ্ছে ২০২০ বা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা৷ যেমন, যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল যে, ২০০৫ সালকে ভিত্তি বছরে ধরে ২০২৫ সাল নাগাদ ২৬ থেকে ২৮ শতাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস ইমিশন হ্রাস করবে৷ এই মর্মে দেশের ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরে কিছু বাধ্যতামূলক মান এবং নিয়মকানুন আরোপ করা হয়েছিল৷ এর একটি হচ্ছে ‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান', যার আওতায় জ্বালানি খাতে ২০৩০ সাল নাগাদ মোট ত্রিশ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের কথা ছিল এবং এখনকার তুলনায় ত্রিশ শতাংশ বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল৷ ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইতিমধ্যেই এই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে৷

পরিবেশ

বিমানযাত্রা কঠিন হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিমানে ঝাঁকুনি বেড়ে যাবে, ফলে বিমানযাত্রায় শারীরিক ও মানসিক চাপ আরো বাড়বে৷ বিশেষ করে যাত্রীবাহী বিমানগুলো যে পথে চলাচল করে, সেই পথ আগের চেয়ে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে বলে এক গবেষণায় জানা গেছে৷

পরিবেশ

জাহাজের পথে আইসবার্গ

সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করবে ভাসমান আইসবার্গ৷ গত এপ্রিলে চারশ’ আইসবার্গ নর্থ আটলান্টিকে জাহাজ চলাচলের জলসীমায় প্রবেশ করে৷ ফলে অনেক জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় নিয়েছে, ঘুরে যাওয়ার কারণে তেল খরচও গেছে বেড়ে৷

পরিবেশ

বজ্রপাত আরো ঘনঘন হবে

বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বজ্রপাত আরো ঘনঘন হবে৷ যদিও এতে দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে৷ তবে বজ্রপাতের ফলে নাইট্রোজেন অক্সাইড উৎপন্ন হয় যা বিশ্বের বায়ুমণ্ডলির জন্য উপকারী৷

পরিবেশ

আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত বাড়বে

ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিগুলো ভবিষ্যতে সক্রিয় হতে শুরু করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনটা ঘটার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা৷

পরিবেশ

আপনার রাগ বাড়বে

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের মুডও পরিবর্তন করে দেবে৷ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে অস্থিরতাও বাড়বে৷ এমনকি সহিংস আচরণ করার প্রবণতাও দেখা দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন৷

পরিবেশ

প্রাণীর আকার ছোট হবে

এই পরিবর্তনটি অবশ্য চোখে পড়তে সময় লাগবে৷ তবে কয়েক কোটি বছর আগে দৈত্যাকারের প্রাণিগুলো ছোট হয়ে গিয়েছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও৷ ভবিষ্যতেও তেমনটা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে৷

প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারেরতাৎপর্য এবং তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটা বিষয় মনে রাখতে হবে৷ প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে পৃথিবীর গ্রিন হাউস গ্যাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস৷ চীন প্রথম৷ যুক্তরাষ্ট্রের মোট ভাগ হচ্ছে পনেরো থেকে সতেরো শতাংশ, কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশের বাস– এটা মাথায় রেখে মাথাপিছু হিসেব করলে দেখা যায় যে, যে কোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিন হাউস নিঃসরণের জন্যে অনেক বেশি দায়ী৷ দ্বিতীয়ত, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে তার দায়িত্ব পালনে অতীতে খুব আগ্রহী ছিল না৷ ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে এই বিষয়ে যে প্রটোকল স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তাতে এই ধরণের লক্ষ্যমাত্রাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল৷ কিন্ত ধনী দেশগুলোর চাপে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের চাপে, এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি৷ প্যারিসের চুক্তি আলোচনার সময়ও এই প্রশ্ন ওঠে৷ যে কারণে, প্যারিস চুক্তিতে যে লক্ষ্যমাত্রার কথা বলে হয়েছে, তা সম্পূর্ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত৷ অর্থাৎ এই লক্ষ্য পূরণ না করলে ঐ দেশকে কোনোরকম দণ্ড বা ফল বইতে হবে না৷

এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং ধনী দেশগুলোকে দেয়া অন্যান্য সুবিধার প্রতিবাদে নিকারাগুয়া এখনো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি৷ তৃতীয়ত, এই চুক্তির ভাষা এবং ব্যবস্থাদি এমনভাবে লেখা হয়েছে, যা আসলে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে ছিল৷ একে যে ‘ট্রিটি' না বলে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট' বলা হয়েছে, সেটাও কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যেই৷ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট যে কোনো ধরণের অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করতে পারেন এবং তা বাস্তবায়নে নির্বাহী ব্যবস্থা নিতে পারেন; কিন্ত প্রেসিডেন্ট যে কোনো ধরণের ট্রিটি স্বাক্ষর করলে তা কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে অনুমোদিত হতে হবে, অন্যথায় তার কোনো আইনি ভিত্তি থাকবে না৷

রাজনীতি | 01.06.2017

এইসব দুর্বলতা স্বত্বেও প্যারিসের এই চুক্তি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্যে মনে করা দরকার যে, লক্ষ্যমাত্রা হিসবে যখন তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের কথা বলা হয়েছিল, সেই সময়ে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছে এমন দেশগুলো চাপ দিয়েছিল যেন লক্ষ্যমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস করা হয়৷ অ্যালায়েন্স অব স্মল স্টেটস (এয়োসিস), যার সদস্য ৪৪টি ছোট দেশ, যেমন বেলিজ, মালদ্বীপ, জ্যামাইকা, সিঙ্গাপুর, কেপ ভার্ডে, পাপুয়া নিউগিনি, তারা বারবার এই দাবি জানিয়েছিল৷ তাদের এই দাবির সঙ্গে ক্লাইমেট ভালনারেবেল ফোরাম (সিভিএফ)-এর সদস্যরা তাদের চিরাচরিত জি-৭৭ গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে এসে এয়োসিসের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল৷

 বাংলাদেশ সিভিএফের সদস্য৷ আপসরফা হিসেবে দেড় ডিগ্রিকে চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নেয়ার পেছনে সেই প্রচেষ্টা স্মরনীয়৷

পরিবেশ

বারাক ওবামার বিবৃতি

কঠিন পরিস্থিতিতেও আশাবাদী হিসেবে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পরিচিত৷ ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি বর্জন করার পর তিনি অ্যামেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের উদ্দেশ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পথে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেন৷

পরিবেশ

ক্লাইমেট মেয়রস গ্রুপ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৬৮টি শহরের মেয়র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলার অঙ্গীকার করেছেন৷ লস অ্যাঞ্জেলেস, বস্টন, নিউ ইয়র্ক, হিউস্টন ও শিকাগোর মতো বড় শহরের নগরপাল পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি

পরিবেশ

‘ট্রাম্প পিটসবার্গের প্রতিনিধি নন’

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে নিজেকে পিটসবার্গের প্রতিনিধি বললেও শহরের মেয়র তা নস্যাৎ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলার উদ্যোগ চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার করেন৷ ইস্পাত শিল্পের পতনের পর শহরকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত করতে তিনি বদ্ধপরিকর৷

পরিবেশ

শিকাগোর সাফল্যের কাহিনি

বারাক ওবামার শহর শিকাগোর মেয়র ব়্যাম ইমানুয়েল মনে করিয়ে দেন, কার্বন নির্গমন কমিয়ে কীভাবে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়, তাঁর শহর তার দৃষ্টান্ত৷ প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী তিনি এই সফল কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন৷

পরিবেশ

মার্কিন জলবায়ু জোট

ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটন রাজ্যের গভর্নররা মিলে ‘ইউএস ক্লাইমেট অ্যালায়েন্স’ নামের এক জোট গড়ে তুলেছেন৷ তাঁরা শুধু প্যারিস চুক্তি কার্যকর করবেন না, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জোরালো পদক্ষেপের ঘোষণা করেছেন৷

পরিবেশ

ক্যালিফোর্নিয়া আদর্শ দৃষ্টান্ত

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর জেরি ব্রাউন বলেন, ‘‘ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভুল পথ বেছে নিয়েছেন৷’’ এমন ‘বিপথগামী’ ও ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর রাজ্য তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত৷

এখানে এসে আমরা দুটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারি৷ প্রথমত, যদি অতীতে যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আলোচনায় এবং এই মর্মে তার দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট ইতিবাচক না হয়ে থাকে, তবে প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করলে উদ্বেগের কারণ কী? দ্বিতীয়ত, প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশ প্রত্যক্ষভাবে কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হবে?

অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা মোটেই ভালো না হলেও, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছিল৷ এগুলোর মধ্যে ক্লিন পাওয়ার প্ল্যানের কথা আমি উল্লেখ করেছি৷ এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ওবামা বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবেলার জন্যে জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে তিন বিলিয়ন ডলার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; তিনি ক্ষমতা ছাড়ার আগে পর্যন্ত মোট এক বিলিয়ন ডলার দিতে সক্ষম হন৷ প্যারিস যুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারের সময় সারা পৃথিবীর ১৯৫টি দেশ তাতে সই করেছিল, তবে তা অনুসমর্থন (রেটিফাই) করেছিল ১৪৭টি দেশ – অর্থাৎ এই দেশগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে যে, তাঁরা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবে৷ এতে করে মোট নিঃসৃত গ্যাসের উৎপাদকদের ৮০ শতাংশের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল৷ এখন ১৫ শতাংশ তা থেকে বাদ যাওয়ায় এর পরিমাণ দাঁড়ালো ৬৫ শতাংশ৷ চুক্তিটি বেঁচে থাকার জন্যে এটা যথেষ্ট হলেও তা যে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমিত রাখার জন্যে যথেষ্ট নয়, তা সহজেই বোধগম্য৷

এমনিতেই বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও এখনকার হারে চললে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না৷ এখন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে তা হয়ে উঠবে দুঃসাধ্য৷ কোনো কোনো গবেষক অনুমান করেছেন যে, যুক্ত্ররাষ্ট্র না থাকার ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকতে পারে, তা হলে সারা পৃথিবীর জন্যেই তা ভয়াবহ৷

 ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশের জন্যে, ক্ষতির প্রশ্নটি ঠিক আগামীকালেরই বিষয় নয়৷ স্বল্পমেয়াদে হচ্ছে জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন তহবিলে অর্থের ঘাটতি পড়ার প্রশ্ন৷ ইতিমধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সেগুলো অব্যাহত রাখার জন্যে হুমকি হতে পারে৷ আর দীর্ঘমেয়াদে হচ্ছে এই যে, এর ক্ষতির ধাক্কাটা ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকেই বইতে হবে৷ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব গত এক দশকের বেশি সময় ধরেই সুস্পষ্ট৷

 দেশে ক্লাইমেট রেফ্যুজি বা পরিবেশগত কারণে শরণার্থী তৈরি না হলেও অভ্যন্তরীণ বাস্তচ্যুতির ঘটনা ঘটছে৷ আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধির ঘটনাও সহজেই লক্ষনীয়৷ বৈশ্বিকভাবে এই সব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, অন্য দেশগুলোকেও দায়িত্ব পালনে অনুৎসাহী করতে পারে৷ সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপরে তাতে করে চাপ বাড়বে৷

Ali Riaz

আলী রীয়াজ, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক

প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার ঘোষণা দেবার পর কিছু ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে৷ চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত সুস্পষ্টভাবেই তাঁদের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে৷ ‘জি-৭'-এর বাকি ছয়টি দেশের অঙ্গীকারের বিষয়টি আলোচনার গোড়াতেই উল্লেখ করেছি৷ এতে করে ক্ষতির সবটাই পুষিয়ে নেয়া যাবে– তা মনে করার কারণ নেই৷ এখন পর্যন্ত পরিস্থিতিকে ‘মন্দের ভালো' বলেই ভাবতে হবে৷ তবে এই অঙ্গীকারের পরীক্ষা হবে এই বছরের নভেম্বরে যখন ১৯৫টি দেশের নেতারা জার্মানির বন শহরে মিলিত হবেন৷ কেননা, প্রতিশ্রুতি পালিত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের এবং সেগুলো যাচাইয়ের নিয়ম-কানুন তৈরি করা হবে৷ প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, এই বৈঠকের একটি অন্যতম কমিটি, যার দায়িত্ব হছে স্বচ্ছতা নিরুপন করা, তার যুগ্ম-সভাপতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র৷ যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, সে এই চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, নিয়মানুযায়ী চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হবার তিন বছর সম্পূর্ণ হবার আগে কোনো দেশ চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের লিখিত নোটিশ দিতে পারেনা৷ সেই হিসেবে ২০১৯ সালের নভেম্বরের আগে এই চুক্তি থেকে বেরুবার নোটিশ যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারবে না৷ তার এক বছর পরে কোনো দেশ চুক্তি ত্যাগ করতে পারবে৷ কার্যত যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরুতে পারবে, ২০২০ সালের ৪ নভেম্বর, অর্থাৎ আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরের দিন৷ আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এইসব কমিটিতে যুক্ত থাকে কিনা এবং থাকলে কী ভূমিকা পালন করে সেটা দেখার বিষয়৷

কিন্ত প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে  ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক নীতিমালা, বিশেষত পররাষ্ট্র নীতি থেকে আলাদা করে দেখবার সুযোগ নেই৷ জানুয়ারি মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রশাসন কোন ধরণের পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করবে সে বিষয়ে অস্পষ্টতা মোটেই কাটেনি৷ কিন্ত তারা যে ‘একলা চলো'র পথেই এগুচ্ছে সেটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়৷ ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, ন্যাটোর সঙ্গে টানাপোড়েন সৃষ্টি, ইউরোপের প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থাহীনতা তৈরি কূটনীতির প্রতি অনাস্থা ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে অনিচ্ছার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত৷ এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী – ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের নেতৃত্বে সুন্নি দেশগুলোর সামরিক জোট গঠনের ব্যাপারে ও কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের অবরোধ আরোপের প্রতি খোলামেলা সমর্থন দিয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে৷ এগুলো এই ইঙ্গিতই দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসন আলাপ-আলোচনা ও কূটনীতির চেয়ে বলপ্রয়োগের ব্যাপারেই অধিকতর উৎসাহী৷ এগুলো দায়িত্বহীন আচরণেরই প্রমাণ৷ অস্থিতিশীল বিশ্বের জন্যে এগুলো কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷


বিজ্ঞান

অপারেশন আইসব্রিজ

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ক্রিয়োস্ফিয়ার কর্মসূচির অন্তর্গত ‘অপারেশন আইসব্রিজ’-এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে আকাশ থেকে মেরু অঞ্চলের উপর নজর রাখা হচ্ছে৷ ১৯৬৬ সালের লকহিড পি-৩ বিমান থেকে রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যেমে ঐ অঞ্চলের বরফের পুরুত্ব ও স্থান পরিবর্তনের হিসাব রাখছে নাসা৷

বিজ্ঞান

প্রস্তুতি চলছে

অপারেশন আইসব্রিজের মেয়াদ ছয় বছর৷ এর আওতায় মার্চ থেকে মে-তে গ্রিনল্যান্ডে এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বরে অ্যান্টার্কটিকায় আট ঘণ্টা করে কয়েকটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে৷ এর মাধ্যমে বরফের পাত ও খণ্ডের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা হচ্ছে৷

বিজ্ঞান

বিমানে আছে উচ্চ প্রযুক্তি

উপর থেকে কুয়াশার ভেতর দিয়ে ক্যানাডার এলেসমেয়ার দ্বীপের গ্লেসিয়ার দেখতে পাচ্ছেন৷ অপারেশন আইসব্রিজে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষ ‘আইস-পেনিট্রেটিং রাডার’ ব্যবহার করা হচ্ছে৷ বিমান নীচু দিয়ে উড়ে গেলে রাডারটি ভালো কাজ করে৷

বিজ্ঞান

প্রভাব এখনই দেখা যাচ্ছে

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখনই দেখতে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা৷ উপরের ছবিতেও সেটি বোঝা যাচ্ছে৷

বিজ্ঞান

বিকল্প ব্যবস্থা

অপারেশন আইসব্রিজ আসলে নাসার একটি বিকল্প ব্যবস্থা৷ কারণ ২০০৩ সালে একই কাজের জন্য ‘আইসস্যাট’ নামে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ চালু করেছিল তারা৷ কিন্তু ২০০৯ সালে সেটি হঠাৎ করে তথ্য সংগ্রহের কাজ বন্ধ করে দেয়৷ ফলে ‘আইসস্যাট-দুই’ নামে আরেকটি উপগ্রহ তৈরির কাজ শুরু করেছে নাসা, যেটি আগামী বছর চালু হওয়ার কথা৷ ২০০৯ থেকে ২০১৮ – এই নয় বছরের তথ্যও যেন সংগ্রহে থাকে সেজন্য অপারেশন আইসব্রিজ শুরু করা হয়েছে৷

বিজ্ঞান

সীমাবদ্ধতা

আইসস্যাট-এর মাধ্যমে সারা বছর ধরে অনেক বিস্তৃত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল৷ কিন্তু অপারেশন আইসব্রিজের সাহায্যে শুধু মেরু অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে এবং সেটিও মাত্র কয়েক মাসের জন্য৷

বিজ্ঞান

‘আইসস্যাট-দুই’ নিয়ে অনিশ্চয়তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাসার আর্থ সায়েন্স প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দেয়ায় আগামী বছর এই কৃত্রিম উপগ্রহের কাজ শুরুর বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়েছে৷