জলাবদ্ধতার কারণে দূষিত হচ্ছে ওয়াসার পানি?

ঢাকায় বৃষ্টি নামলেই এখন অনিবার্যভাবে জলাবদ্ধতা৷ আর এই জলাবদ্ধতার কারণে বাড়ির ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিতে ঢুকে পড়ছে দূষিত এবং ময়লা পানি, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যে আরেক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে৷

বনশ্রী এলাকায় সপরিবারে বসবাস করেন নাহিদা আক্তার৷ ওয়াসার পানিই তাঁর একমাত্র ভরসা৷ খাবার পনি তো বটেই, রান্না-বান্না থেকে বাসন-কোসন ধোয়া সবই হয় ওয়াসার পানি দিয়ে৷ কিন্তু বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি পানি নিয়ে সংকটে আছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘‘বৃষ্টিতে পানি জমলেই ওয়াসার পানিতে ময়লা আসে৷ আসে বিভিন্নরকম পোকাও৷ পানি আর খাবার উপযুক্ত থাকে না৷ এমনকি পানি থেকে উৎকট গন্ধও আসে৷''

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

অডিও শুনুন 00:19
এখন লাইভ
00:19 মিনিট
বিশ্ব | 27.07.2017

‘বৃষ্টির পানি জমলেই ওয়াসার পানিতে ময়লা ও পোকা আসে’

তাঁর কথায়, ‘‘জলাবদ্ধতার কারণে বাসার নীচতলা পানিতে ডুবে যায়৷ এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিও যায় ডুবে৷ আমার মনে হয়, তখনই পানিতে আবর্জনা ঢুকে পড়ে৷''

একই অভিজ্ঞতা মিরপুরের জেসমিন লিপির৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যখন জলাবদ্ধতা হয় তখন ওয়াসার পানির রং হয়ে যায় কালো৷ পানির মধ্যে নানা ধরনের ময়লা দেখা যায়৷ দেখা যায় অনেক ধরনের পোকা৷ এছাড়া দুর্গন্ধ তো আছেই৷''

তিনিও জানান, ‘‘বৃষ্টিতে পানি জমলে বাসার ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকিও ডুবে যায়৷ তখন ময়লা পানিতে ট্যাংকি ভরে যায়৷'' তিনি বলেন, ‘‘আমরা খাবার পানি তখন বাইরে থেকে কিনে খাই৷ কিন্তু রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছাসহ গৃহস্থালীর কাজের জন্য এত পানি তো আর বাইরে থেকে চড়া দামে কেনা যায় না৷ তাই বাধ্য হয়েই ময়লা পানি ছেকে ফুটিয়ে ব্যবহার করি৷''

অডিও শুনুন 00:36
এখন লাইভ
00:36 মিনিট
বিশ্ব | 27.07.2017

‘ময়লা পানিতে ট্যাংকি ভরে যায়’

ঢাকার প্রায় সব একারই একই চিত্র, বিশেষ করে যেসব এলকার বাড়িতে জলবদ্ধতায় পানি ঢোকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকি রাস্তার লেভেলের চেয়ে নীচুতে৷''

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার মিরপুর রামপুরা, বনশ্রী মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, ওয়ারী, গোলাপবাগ, গোপীবাগ, গেন্ডারিয়া মানিকনগর, মতিঝিল ফকিরাপুল, শাজাহানপুর, মতিঝিল সোনালী ব্যাংক স্টাফ কোয়াটার, বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ কোয়াটার, গোড়ান, সবুজবাগ, মুগদা, বাসাবো কমলাপুরসহ পশ্চিম কারওয়ান বাজারের গার্ডেন রোড, পুরান ঢাকার শশী মোহন বসাক লেন, বনগ্রাম, মৈশুন্ডি, সুত্রাপুর, ধোলাইখাল, অভয়দাস লেন, স্বামীবাগ প্রভৃতি এলাকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা পাওয়া যাচ্ছে৷

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বির হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন ওয়াসার পাইপগুলো আধুনিক এবং কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত৷ পাইপের মধ্য দিয়ে উচ্চচাপে পানি যায়৷ ফলে বাইরে থেকে লিক করে পানি ঢোকার সম্ভাবনা খুবই কম৷ কোথাও পনির চাপ কম হলে তা কম্পিউটারে ডিটেকটেড হয়৷ আমার মনে হয় পানির ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার পানিতে ডুবে ময়লা পানি প্রবেশ করে৷

সমাজ-সংস্কৃতি | 25.07.2017
অডিও শুনুন 05:48
এখন লাইভ
05:48 মিনিট
বিশ্ব | 27.07.2017

‘অবৈজ্ঞানিকভাবে সংস্কার করায় রাস্তা উঁচু হয়ে গেছে বাড়ি-ঘরের ত...

ঢাকার শহরের বিশেষ করে পুরনো ঢাকার বাড়ি-ঘরের পানির রিজার্ভার জলাবদ্ধতা হলেই পানির নীচে চলে যায়৷ এর ফলে ময়লা পানি ঢোকে৷ ঢাকার সড়কগুলো অবৈজ্ঞানিকভাবে সংস্কার করায় রাস্তা উঁচু হয়ে গেছে বাড়ি-ঘরের তুলনায়৷ ফলে বৃষ্টি নামলেই পানিবাড়িতে ঢুকে যায়৷

ওয়াসা শতকরা ১৩ ভাগ পানি নদী থেকে সংগ্রহ করে, বাকিটা ভূগর্ভস্থ পানি৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা থেকে যে প্রক্রিয়ায় পানি সংগ্রহ করা হয় তাতে পানি বিশুদ্ধ হয় না৷ এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে অনেক সময় ওয়াসা অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার করে, যার কারণে পানি দুর্গন্ধ হয়৷

ঢাকার দেড় কোটি মানুষের জন্য প্রতিদিন ২৩০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে৷ ওদিকে ওয়াসার উৎপাদন ক্ষমতা ২১০ কোটি লিটারের মতো৷ রাজধানীর বাসিন্দারা প্রধানত ওয়াসার পানির ওপরই নির্ভরশীল৷ কিন্তু যে পানি তারা পান, তাও সব সময় ব্যবহার উপযোগী থাকে না৷

অডিও শুনুন 00:59
এখন লাইভ
00:59 মিনিট
বিশ্ব | 27.07.2017

'আমাদের পাইপ ওয়াটার টাইট, লিকেজ থাকলে আমরা তা জানতে পারি"

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী কামরুল হাসান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াসা ডিস্ট্রিক্ট মিটার্ড এরিয়া(ডিএমএ) প্রজেক্ট চালু করেছে৷ তবে এই প্রজেক্টের আওয়তায় সব গ্রাহককে এখনো আনা যায়নি৷ যেসব এলাকা ডিএমএ-র আওতায় এসেছে, সেসব এলকায় পানির মিটারগুলো ওয়াটার টাইট৷ পানিতে ডুবে গেলেও সাধারণভাবে পাইপে বাইরের পানি ঢোকার কথা না৷ তবে পানির রিজার্ভারে সমস্যা থাকলে আলাদা কথা৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘কোনো এলাকার পাইপে লিকেজ থাকলেও আলাদা কথা৷ কিন্তু আমাদের পাইপ ওয়াটার টাইট, লিকেজ থাকলে আমরা তা জানতে পারি৷''

মোবাশ্বির হোসেনের কথায়, ‘‘এই ময়লা পানি পান করে ডায়ারিয়া, আমাশয়সহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে৷ হয় নানা ধরনের চর্মরোগও৷ তাই বিকল্প হিসেবে আমাদের রেইন ওয়াটার হারভেস্টে যাওয়া উচিত৷''

আপনার বাড়িতেও কি একই সমস্যা হয়? মন্তব্য করুন নীচের ঘরে৷ 

ডিজিটাল বিশ্ব

অপরিকল্পিত নগরায়ন

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মহানগরীতে এখন প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস করছেন৷ এই শহরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে৷ ফলে শহরের বেশিরভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা

ঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই এখনো ময়লা ফেলা হয় খোলা জায়গায়৷ এসব ময়লা আবর্জনা, বিশেষ করে কঠিন বর্জ্যের একটা অংশ সরাসরি ড্রেনে গিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়৷ ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় রাস্তাঘাটে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

বর্ষায় খোড়াখুড়ি

ঢাকা শহরের সড়কগুলোতে খোড়াখুড়ির মহোৎসব শুরু হয় বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে থেকে৷ পুরো বর্ষা মৌসুম ধরেই চলে এসব খোড়াখুড়ি৷ সামান্য বৃষ্টিতেই তাই জলাব্ধতার সৃষ্টি হয় শহরে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

নদী ভরাট

ঢাকা শহরের চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতালক্ষ্যা প্রভৃতি নদীগুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা৷ আর তাই বিশাল জনসংখ্যার এ শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

খাল দখল

ঢাকা নগরীর ৬৫টি খাল এক সময়ে এ মহানগরীর পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা রাখত৷ কিন্তু রাজধানীর এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়াও কঠিন৷ বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে৷ অনেকগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে৷ যে দু’য়েকটি টিকে আছে সেগুলোও দখলে জর্জরিত৷

ডিজিটাল বিশ্ব

জলাশয় ভরাট

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে আবাসান ব্যবস্থা গড়ে তোলায় বড় এই শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়েছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

বুড়িগঙ্গা দূষণ আর দখল

ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী দখল আর দূষণে জর্জরিত৷ দখলে এ নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্থ হয়েছে আর দূষণে নদীর তলদেশে নানান বর্জ্য্ জমে এর গভীরতা কমিয়েছে৷ ফলে পানির প্রবাহ বাড়লেই তা উপচে পড়ে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট

রাজধানীর জলাবদ্ধতা রোধে ঢাকা ওয়াসা বিভিন্ন সময়ে যেসব বক্স কালভার্ট নির্মাণ করেছে, তার বেশিরভাগই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত৷ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তৈরি এসব বক্স কালভার্ট প্রয়োজনের তুলনায় সরু হওয়ায় বৃষ্টির পানি অপসারণে তেমন কাজে আসে না৷ অনেক ক্ষেত্রে এসব কালভার্টে অপচনশীল কঠিন বর্জ্য আটকে গিয়ে পানি নির্গমন পথও বন্ধ হয়ে যায়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

সমন্বয়হীন সংস্কার কাজ

ঢাকা শহরে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে কোনো সমন্বয় না থাকায় সারা বছরই সড়ক খোড়াখুড়ি চলতেই থাকে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়াসা স্যুয়ারেজ নির্মাণের জন্য একটি সড়ক খোড়া হলো, সে কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খোড়াখুড়ি শুরু করল গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগ৷ ফলে সারা বছর সড়কগুলোতে এ ধরনের কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

পলিথিনের অবাধ ব্যবহার

ঢাকা শহরে চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার৷ পলিথিন ব্যবহার না করার আইন থাকলেও তার সামান্যটুকুও মানা হয় না৷ ফলে দুই কোটি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার অধিকাংশজুড়েই থাকে পলিথিন৷ এসব পলিথিন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

ড্রেনের ময়লা ড্রেনে

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন থেকে ময়লা তুলে সেগুলো দিনের পর দিন ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়৷ ফলে বৃষ্টি হলেই সে ময়লার পুনরায় ঠিকানা হয় ড্রেন৷ সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা৷

ডিজিটাল বিশ্ব

নতুন আতঙ্ক ফ্লাইওভার নির্মাণ

ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ফ্লাই ওভার নির্মাণ কাজের দীর্ঘসূত্রিতা৷ ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের ফলে এ এলাকার রাস্তাঘাটের দিনের পর দিন যে ক্ষতি হয়েছে, তার কখনোই সংস্কার না করায় সামান্য বৃষ্টি হলেই বিশাল এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা৷