জলাবদ্ধতা: সাধারণের স্বপ্নভঙ্গ

নগরের মানুষগুলোর অবস্থা যেন দিবাস্বপ্ন দেখা সেই পুরোহিতের মতো৷ ফিবছর বর্ষায় পানিবন্দি হয়ে বড় কষ্টে ভোগে৷ আর স্বপ্ন দেখে পরের বছর সব ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন আর পূরণ হয় না৷

বহুকাল আগের কথা৷ এক পুরোহিত প্রতিদিন গাছতলায় বসে ধ্যান করেন আর মনে মনে একদিন মস্ত ধনী হবার স্বপ্ন দেখেন৷ একদিন ভিক্ষে করে এক বাটি দুধ পেলেন৷ তারপর দিবাস্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন যে, কাল সকালে এই দুধ থেকে ঘি তুলবেন৷ তারপর সেই ঘি বাজারে বিক্রি করে একটা মুরগি কিনবেন৷ মুরগি ডিম পাড়বে৷ সেই ডিমগুলো থেকে ছানা হবে৷ সেই ছানাগুলো বড় হয়ে আরো অনেক ডিম দেবে৷ তার একটা পোল্ট্রিফার্ম হবে৷ পোল্ট্রিফার্ম থেকে অনেক টাকা আসবে৷ তা দিয়ে গরু কিনে দুধের খামার করবেন৷ এরপর দুধ বিক্রি করে দামি অলংকার কিনবেন৷ সেই অলংকার রাজার কাছে বিক্রি করে আরো ধনী হবেন৷ পরে সুন্দরী এক পাত্রী দেখে বিয়ে করে সংসারী হবেন৷ তার একটা ছেলে হবে৷ ছেলে দুষ্টুমি করবে৷ তাকে লাঠি দিয়ে শাসন করবেন৷ স্বপ্ন দেখতে দেখতে পুরোহিত তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে সত্যি একটা আঘাত করলেন৷ আর বাটি থেকে দুধ গড়িয়ে মাটিতে পড়ে গেল৷ হলো পুরোহিতের স্বপ্নভঙ্গ৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ডিজিটাল বিশ্ব

অপরিকল্পিত নগরায়ন

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মহানগরীতে এখন প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস করছেন৷ এই শহরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে৷ ফলে শহরের বেশিরভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা

ঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই এখনো ময়লা ফেলা হয় খোলা জায়গায়৷ এসব ময়লা আবর্জনা, বিশেষ করে কঠিন বর্জ্যের একটা অংশ সরাসরি ড্রেনে গিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়৷ ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় রাস্তাঘাটে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

বর্ষায় খোড়াখুড়ি

ঢাকা শহরের সড়কগুলোতে খোড়াখুড়ির মহোৎসব শুরু হয় বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে থেকে৷ পুরো বর্ষা মৌসুম ধরেই চলে এসব খোড়াখুড়ি৷ সামান্য বৃষ্টিতেই তাই জলাব্ধতার সৃষ্টি হয় শহরে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

নদী ভরাট

ঢাকা শহরের চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতালক্ষ্যা প্রভৃতি নদীগুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা৷ আর তাই বিশাল জনসংখ্যার এ শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

খাল দখল

ঢাকা নগরীর ৬৫টি খাল এক সময়ে এ মহানগরীর পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা রাখত৷ কিন্তু রাজধানীর এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়াও কঠিন৷ বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে৷ অনেকগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে৷ যে দু’য়েকটি টিকে আছে সেগুলোও দখলে জর্জরিত৷

ডিজিটাল বিশ্ব

জলাশয় ভরাট

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে আবাসান ব্যবস্থা গড়ে তোলায় বড় এই শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়েছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

বুড়িগঙ্গা দূষণ আর দখল

ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী দখল আর দূষণে জর্জরিত৷ দখলে এ নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্থ হয়েছে আর দূষণে নদীর তলদেশে নানান বর্জ্য্ জমে এর গভীরতা কমিয়েছে৷ ফলে পানির প্রবাহ বাড়লেই তা উপচে পড়ে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট

রাজধানীর জলাবদ্ধতা রোধে ঢাকা ওয়াসা বিভিন্ন সময়ে যেসব বক্স কালভার্ট নির্মাণ করেছে, তার বেশিরভাগই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত৷ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তৈরি এসব বক্স কালভার্ট প্রয়োজনের তুলনায় সরু হওয়ায় বৃষ্টির পানি অপসারণে তেমন কাজে আসে না৷ অনেক ক্ষেত্রে এসব কালভার্টে অপচনশীল কঠিন বর্জ্য আটকে গিয়ে পানি নির্গমন পথও বন্ধ হয়ে যায়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

সমন্বয়হীন সংস্কার কাজ

ঢাকা শহরে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে কোনো সমন্বয় না থাকায় সারা বছরই সড়ক খোড়াখুড়ি চলতেই থাকে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়াসা স্যুয়ারেজ নির্মাণের জন্য একটি সড়ক খোড়া হলো, সে কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খোড়াখুড়ি শুরু করল গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগ৷ ফলে সারা বছর সড়কগুলোতে এ ধরনের কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

পলিথিনের অবাধ ব্যবহার

ঢাকা শহরে চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার৷ পলিথিন ব্যবহার না করার আইন থাকলেও তার সামান্যটুকুও মানা হয় না৷ ফলে দুই কোটি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার অধিকাংশজুড়েই থাকে পলিথিন৷ এসব পলিথিন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

ড্রেনের ময়লা ড্রেনে

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন থেকে ময়লা তুলে সেগুলো দিনের পর দিন ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়৷ ফলে বৃষ্টি হলেই সে ময়লার পুনরায় ঠিকানা হয় ড্রেন৷ সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা৷

ডিজিটাল বিশ্ব

নতুন আতঙ্ক ফ্লাইওভার নির্মাণ

ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ফ্লাই ওভার নির্মাণ কাজের দীর্ঘসূত্রিতা৷ ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের ফলে এ এলাকার রাস্তাঘাটের দিনের পর দিন যে ক্ষতি হয়েছে, তার কখনোই সংস্কার না করায় সামান্য বৃষ্টি হলেই বিশাল এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা৷

রাজারবাগ, শান্তিনগর, আরামবাগ, মালিবাগ, মগবাজার, কাকরাইল, ফকিরাপুল, আজিমপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, রামপুরা, নাজিম উদ্দীন রোড, হাজারীবাগ, গ্রিন রোড, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মীরহাজিরবাগ, আগারগাঁও – নামগুলো শুনলেই বোঝা যায় কিসের কথা বলা হচ্ছে৷ রাজধানীর এছাড়া আরো এলাকা আছে, যেখানে খানিক বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়৷ কোথাও কোথাও পানি ঢুকে পড়ে ঘরবাড়িতে৷ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কিছু এলাকার অবস্থা আরো খারাপ৷

এ বছরও জলাবদ্ধতায় কষ্ট পাচ্ছে মানুষ৷ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গেল ১৩ই জুন ২৪ ঘণ্টায় দেশের আটটি জায়গায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় বান্দরবানে, ৩৩২ মিলিমিটার৷ চট্টগ্রাম ও ঢাকায় যথাক্রমে ২২২ ও ১১৯ মিলিমিটার৷ ২০০৪ সালের পর এতটা জলাবদ্ধতা আর দেখেনি রাজধানীর মানুষ৷ গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘন্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ঢাকা নগরীর প্রায় দুই তৃতীয়াংশ৷ প্রতিবছর জলাবদ্ধতার সময় এসব বিষয় নিয়ে এত কথা হয় যে, কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দিতে পারবে এর কারণ কী, এর থেকে বাঁচতে হলে কী করতে হবে৷ কিন্তু সমাধান আর হয় না৷ বরং বছর বছর মানুষ বাড়ে৷ নগরী হয়ে ওঠে আরো অপরিকল্পিত৷ তৈরি হয় নতুন নতুন অবকাঠামো৷ সঙ্গে সরু হতে থাকে জমে থাকা পানি বেরুবার পথ৷ এ যেন এক ঘূর্ণায়মান চড়কি, ঘুরছে তো ঘুরছেই৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

অপরিকল্পিত নগরায়নের সঙ্গে জলাশয় দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ড তৈরিসহ ছোট বড় অনেক কারণ জড়িত এই জলাবদ্ধতার জন্য৷ অপরিকল্পিত নগরায়ন যা হয়ে গেছে, তা হয়তো বদলানো সম্ভব নয়৷ কিন্তু তাই বলে কি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সম্ভব নয়? কিংবা নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কি উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব নয়? একটি সমস্যার কথা প্রায়ই শোনা যায়৷ তা হলো, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউকসহ ১৪টি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব৷ একই জায়গায় একেক সংস্থার একেক কাজের জন্য বারবার খোঁড়াখুঁড়ি, যা বেশিরভাগ বর্ষার সময়েই হয়ে থাকে, তা কি বন্ধ করা সম্ভব নয়? একটি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কতগুলো সংস্থার হাতে থাকে? ঢাকার চারদিকে যে চক্রাকার নদীপথের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল, তা এগুচ্ছে না কেন? বিশেষজ্ঞরা এত বছর ধরে বলে আসছেন, একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে সবকিছু থাকলে কাজগুলো পরিকল্পিতভাবে করা যেত৷ তা এত বছরেও কেন করা যাচ্ছে না?

চট্টগ্রামকে এখনো কিছুটা গোছানো সম্ভব, অন্তত ঢাকার মতো অবস্থা হয়নি এখনো৷ কিন্তু তা কি আদৌ করা হচ্ছে? গেল ২২ বছরে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে৷ কিন্তু হিসেব বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতি বছরই শত কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে জলাবদ্ধতার কারণে৷ এর অর্থ লোকসানের তুলনায় তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি সমস্যা মোকাবেলায়৷ একদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে, সে আশা কেউ করছে না৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমস্যাগুলোর সমাধানে ঠিক পথে কি এগুচ্ছি আমরা? নাকি সেই পুরোহিতের মতো স্বপ্নভঙ্গ হতেই থাকবে?