জার্মানিতেও নকল ওষুধের বাজার রমরমা

জার্মানিতে নকল ওষুধ আসে আকাশপথে, লাইপসিগ কি ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দরে৷ সেখানে একবার কাস্টমস পার হতে পারলেই অনলাইন বিক্রির মাধ্যমে শুধু মুনাফা আর মুনাফা৷ এই জাল ওষুধ আসে প্রধানত এশিয়া থেকে৷

প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে, জার্মানির হেল্থ কেয়ার বা জনস্বাস্থ্য প্রণালী সুবিশাল ও সুসংগঠিত৷ এ দেশে ওষুধের অনুমোদন থেকে শুরু করে ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশন, ডিস্পেনসারি থেকে ওষুধ বিক্রি ও স্বাস্থ্যবীমা থেকে তার দাম চোকানো পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ চোখে পড়ার মতো ফাঁক বা ফোকর নেই৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বড় বেশি ডাক্তারের কাছে যাওয়া, ডাক্তারদের বড় বেশি ওষুধ ‘প্রেস্ক্রাইব' করা, ওষুধ কোম্পানিগুলির জার্মানিতে ওষুধের জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি দাম নেওয়া, এ সব সমস্যা আছে বটে, কিন্তু তা বলে ভেজাল বা জাল ওষুধ এ দেশে সরকার বা জনগণের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে এখনও অনেক বাকি৷ তাহলে জার্মানিতে জাল ওষুধের প্রসঙ্গ উঠছে কেন?

শুধু উঠছে নয়, প্রতিবছর আরো বড় আকার ধারণ করছে৷ মজার কথা, এই সব মেকি ‘পিল' সঠিক ফার্মেসিতে যে দামে পাওয়া যায়, তার চেয়ে অনেক চড়া দামে বিক্রি হয় অনলাইন শপে৷ শুধু এশিয়ায় বসা পিল উৎপাদনকারীরাই জানেন, ঐ সব বড়ি বা বটিকায় কী আছে, কী তাদের উপাদান৷ ওদিকে খরিদ্দাররা অজ্ঞাতই থাকতে চান৷ ২০১৫ সালে জার্মান কাস্টমস প্রায় ৪০ লাখ মেকি পিল বাজেয়াপ্ত করে, যা কিনা ২০১৪ সালের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি৷

সমাজ

বাংলাদেশে ৭৬ শিশুর মৃত্যু

নব্বইয়ের দশকে ‘ফ্ল্যামোডল’ নামক এক প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ৭৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়৷ ঐ ঘটনায় অ্যাডফ্লেম কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় হয় ২০১৪ সালে৷ এতে তিনজনকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়৷ পরের বছর বিসিআই ফার্মা নামে আরেক কোম্পানির পরিচালকসহ (ছবি) ছয় জনকে একই অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়৷ ফ্ল্যামোডল সিরাপে ডাইইথাইলিন গ্লাইকল পাওয়া গিয়েছিল, যা শিল্প কারখানায় রাসায়নিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়৷

সমাজ

২৮ শিশুর মৃত্যু, কিন্তু সবাই খালাস

রিড ফার্মা নামে এক ওষুধ প্রস্তুতকারীর তৈরি ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে সারা দেশে ২৮ শিশু মারা যাওয়ার অভিযোগ এনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ২০০৯ সালে আদালতে মামলা করেছিল৷ কিন্তু তদন্তে গাফিলতির কথা বলে ২০১৬ সালের নভেম্বরে ঐ কোম্পানির মালিকসহ পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত৷ ২০০৯ সালে তোলা উপরের ছবিতে শারমীনকে দেখা যাচ্ছে৷ সেও ভেজাল ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল৷ পরে সুস্থ হয়৷

সমাজ

ম্যালেরিয়ার ওষুধ নকল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ২০১০ সালে বিশ্বের ৬ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় মারা যান৷ এ সব মৃত্যুর জন্য নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী বলে মনে করা হয়৷ ২০১০ সালে ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ম্যালেরিয়ার ওষুধ নকল ছিল বলে জানানো হয়৷ ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ পরীক্ষা করে এ সব তথ্য পান গবেষকরা৷

সমাজ

যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু

২০০৭-২০০৮ সালে চীন থেকে যাওয়া নকল হেপারিনের (যে ওষুধ রক্ত জমাট প্রতিহত করে) কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল৷

সমাজ

নাইজেরিয়ায় শিশুর মৃত্যু

২০০৯ সালে ‘মাই পিকিন’ নামে একটি ভেজাল সিরাপ সেবনের কারণে ৮৪ জন শিশুর প্রাণ গিয়েছিল৷ সিরাপের মধ্যে ডাইইথাইলিন গ্লাইকল পাওয়া গিয়েছিল৷

সমাজ

হৃদরোগের ওষুধে ভেজাল

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে সরকারি ‘পাঞ্জাব ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিওলজি’ থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হৃদেরাগের ওষুধ খেয়ে ২০১২ সালে একশ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়৷ পরে পরীক্ষা করে ওষুধে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গিয়েছিল৷ ছবিতে পাকিস্তানের একটি সরকারি হাসপাতালের সামনে রোগীদের দেখা যাচ্ছে৷

সমাজ

পানামায় কাশির সিরাপে বিষ

২০০৬ সালে দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা না জেনে কাশির ওষুধে ডাইইথাইলিন গ্লাইকল মিশিয়েছিলেন৷ সেই ওষুধ খেয়ে ৩৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে সেই সময় দাবি করা হয়েছিল৷ কয়েকটি চীনা কোম্পানি গ্লিসারিনের নামে এই বিষ পানামায় রপ্তানি করেছিল৷ ছবিতে পানামার এক শিশুকে দেখা যাচ্ছে৷

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১,০০০ ইউরো মূল্যের এক কিলোগ্রাম কাঁচা কোকেইন থেকে যদি কালোবাজারে ৪৫,০০০ ইউরো মুনাফা করা যায়, তাহলে এক কিলোগ্রাম ‘সিলডেনাফিল' থেকে মুনাফা হয় ৯০,০০০ ইউরো – কেননা সিলডেনাফিল হলো ভায়াগ্রার সক্রিয় উপাদান৷

ভায়াগ্রার মতোই কালোবাজারে ভালো বিক্রি হয় পেশি বানানোর জন্য অ্যানাবোলিক স্টেরয়েড, মাথায় চুল গজানোর ওষুধ বা ওজন কমানোর নানা ওষুধ৷ জাল ওষুধের সিংহভাগ নাকি আসে চীন, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে, ‘ভেল্ট.ডিই' ওয়েবসাইটের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে৷

ফ্রাংকফুর্ট অথবা লাইপসিগ বিমানবন্দরে জাল ওষুধের দশটা পার্সেল এসে পৌঁছালে, তার মধ্যে পাঁচটা ধরা পড়ে – কিন্তু যেগুলো ধরা পড়ে না, সেগুলি থেকে এতই মুনাফা হয় যে, দুই মহাদেশের অপরাধীদের ধরপড়তা পুষিয়ে যায়৷

এছাড়া জাল ওষুধে থাকেই বা কী? ব্যথা কমানোর ওষুধে থাকে হয়ত কাঠকয়লা, খিদে কমানোর ওষুধে আর্সেনিক থাকলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, আর পুরুষত্ব বাড়ানোর টনিকে থাকে হয়ত শুধু পানি৷

কাজেই জার্মানিতে জাল ওষুধের ব্যবসাটা মাদক পাচারের মতোই সাধারণ অপরাধবৃত্তির একটা অঙ্গ বলে গণ্য করা চলে ও গণ্য করা হয়ে থাকে৷ সেক্ষেত্রে আফ্রিকা মহাদেশে প্রতিবছর সাত লাখ মানুষ প্রাণ হারান ম্যালেরিয়া বা যক্ষার জাল ওষুধ খেয়ে৷

আয়রন ট্যাবলেট যন্ত্রণাদায়ক

আয়রন ট্যাবলেট খালি পেটে খেলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়৷ কিন্তু এতে আবার পাকস্থলীতে সমস্যা দেখা দেয় বা পেটব্যথা হয় বা খারাপ লাগে অনেকেরই৷ তাই ‘‘খালি পেটে আয়রন ট্যাবলেট না খেয়ে সকালের নাস্তার সাথে সেবন করুন৷’’ এই পরামর্শ জার্মানির লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্যের কম্পাউন্ডার, মানে ফার্মেসি কর্মী৷

রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়

এমন অনেক নতুন রোগী আছেন, যাঁদের ‘ব্লাড সুগার’ বা ডায়াবেটিস কমানোর ওষুধ খাওয়ার পর রাতে ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয়৷ আসলে অনেক ওষুধের মধ্যেই মূত্রবর্ধক প্রভাব থাকে৷ যাঁদের এ সমস্যা হয়, তাঁদের জন্য পরামর্শ – রাতের ওষুধটি একটু আগেই খেয়ে নিন৷ তবে সব রোগী সমান নন৷ তাই রোগী আর অন্য আরো কোনো ওষুধ খান কিনা, সেটাও জানা দরকার৷

ট্যাবলেট সেবনের পর ডায়রিয়া

ওষুধ খাওয়ার পর ডায়রিয়া বা পেট খারাপ হয় অনেকের৷ ওষুধের মধ্যএ থাকা ‘ল্যাকটোজ’-এর কারণেই সাধারণত এমনটা হয়৷ অর্থাৎ তাঁদের ল্যাকটোজের অ্যালার্জি রয়েছে৷ এক্ষেত্রে ডাক্তার বা ফার্মেসি কর্মীদের সাথে আলোচনা করে ট্যাবলেটের বদলে ক্যাপসুল বা তরল ওষুধ দেয়া যেতে পারে৷ অবশ্য অ্যান্টিবায়োটিক সেবনেও এরকম হতে পারে৷ এ অবস্থা তিন দিনের বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন৷

ওষুধ সেবনে চোখ জ্বালা

কিছু ওষুধ সেবনে চোখ জ্বালা করে, চোখটা শুকিয়ে যায় বা পানি গড়ায়৷ বিশেষ করে যাঁরা ‘কন্ট্যাক্ট লেন্স’ ব্যবহার করেন৷ যে কোনো ফার্মেসিই চোখের জন্য ড্রপ পাওয়া যায়, এক্ষেত্রে সেগুলোর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে৷

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভয় নেই

ওষুধ খাওয়ার ফলে যাঁদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তাঁরা ভয় না পেয়ে বরং তাড়াতাড়ি ডাক্তারের সাথে সরাসরি কথা বলুন৷ এছাড়া ফার্মেসি কর্মীদের সাথেও কথা বলতে পারেন৷ ডাক্তারের তুলনায় তাঁদের সময় কিছুটা বেশি থাকায় তাঁরা রোগীকে এ ব্যপারে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবেন৷ এর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করলেও অনেক সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম হতে পারে৷

খোলাখুলি কথা বলুন

অনেকেই ওষুদের প্যাকেট থেকে ওষুধ সেবন বা ব্যবহারের নিয়মাবলীতে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পড়েই ভয়ে পেয়ে যান৷ তবে সবারই যে একই রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে, সেরকম কোনো কথা নেই৷ কারণ প্রতিটি মানুষই আলাদা! তাই ভয় না পেয়ে এ বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলুন৷ মনে রাখতে হবে সুস্থ হতেই মানুষ ওষুধ খায়, অসুখে আক্রান্ত হতে নয়৷

ওষুধ ককটেল

‘ওষুধ ককটেল’, অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ একসাথে খেলে এর প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হতে পারে৷ তাই নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার আগে রোগীর ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন৷ শুধু তাই নয়, ডাক্তারকে এ কথাও জানানো জরুরি যে রোগী অন্য কোনো ওষুধ সেবন করেন কিনা৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

এসি/ডিজি