জার্মানিতে কর ফাঁকি চলে কোটির অঙ্কে...

...কিন্তু সেটা ঘটে মূলত জার্মানি বাইরে, অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ কালো টাকা জার্মানি থেকে পাচার হয়ে বিদেশে জমা পড়ে৷ জার্মানির অভ্যন্তরে আবার বিদেশ থেকে আসা কালো টাকা সাদা করা হয়৷

জার্মান অর্থমন্ত্রীরা – ক্ষেত্রবিশেষে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের এক চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী – বারংবার সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে মাল্টার মতো ছোট দেশের অপ্রীতিভাজন হয়েছেন, সেদেশে জমা করা জার্মান কালো টাকার খতিয়ান দাবি করে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

জার্মান রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমে একটি বহুলপ্রচলিত শব্দ হলো ‘স্টয়ারওয়াজে', অর্থাৎ কর ফাঁকি দেওয়ার মরুদ্যান৷ এর অর্থ হলো এমন সব দেশ, যেখানে জার্মান নাগরিকরা জার্মান সরকারকে ফাঁকি দিয়ে এবং কর প্রদান না করে টাকা জমা করতে পারেন৷

এর বিরুদ্ধে জার্মান সরকারের হাতে বিগত কয়েক বছরে দু'টি অস্ত্র উঠে এসেছে: প্রথমত, সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জার্মান জামানতকারীদের সম্পর্কে চোরাই সিডি, যা জার্মান সরকার (কেন্দ্রীয় অথবা আঞ্চলিক) অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা দশ লাখ ইউরো বা তার বেশি মূল্য দিয়ে কেনেন – কিন্তু কেন?

সমাজ

এক হাজার কোটি ডলার

শুধুমাত্র ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে এই পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’ (জিএফআই)৷ বাংলাদেশি মুদ্রায় সেটি প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার সমান৷

সমাজ

তিনটি পদ্মা সেতু

সবশেষ হিসেব অনুযায়ী, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা৷ অর্থাৎ শুধু ২০১৪ সালে যে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে তা দিয়ে প্রায় তিনটি পদ্মা সেতু বানানো যেত৷

সমাজ

প্রতিবছর বাড়ছে

জিএফআই-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের পরিমাণ প্রায় প্রতিবছরই বাড়ছে৷ ২০০৪ সালে প্রায় ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার পাচার হয়েছিল৷

সমাজ

গড়

জিএফআই-এর কাছে ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের হিসেব আছে৷ এতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতিবছর ৫৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে৷

সমাজ

শিক্ষা বাজেটের তিন গুণ

গতবছরের জুনে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ’ বা সিপিডি জানায়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা শিক্ষা বাজেটের ৩ দশমিক ৬ গুণ এবং স্বাস্থ্য বাজেটের ৮ দশমিক ২ গুণ৷ জিএফআই-এর হিসেবে ২০১৩ সালে পাচার হয়েছে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার৷

সমাজ

জাতিসংঘের তথ্য

ইউএনডিপির এক প্রতিবেদন বলেছে, ১৯৭০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রতিবছর গড়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে৷ সব মিলিয়ে এই ৪০ বছরে যে অর্থ পাচার হয়েছে তার পরিমাণ ২০১০ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপির (১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি) ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বলে জানায় জাতিসংঘের এই সংস্থা৷

সমাজ

অর্থপাচারের পন্থা

সারা বিশ্বেই আমদানি-রপ্তানির লেনদেনে ইচ্ছে করে ভুল মূল্য উপস্থাপনের মাধ্যমে (ট্রেড মিস প্রাইসিং) অর্থপাচার হয়ে থাকে৷ বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কৌশল অবলম্বন করা হয়৷

সমাজ

পাচার রোধে ব্যবস্থা

বাংলাদেশ সরকারের তিনটি সংস্থা অর্থ পাচার রোধে কাজ করছে৷ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত ‘বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন৷

চোরাই সিডি-তে যাদের নাম থাকতে পারে, এমন জার্মান নাগরিকরা বিপদ দেখে নিজেরাই নিজেদের নাম দায়ের করেন করফাঁকিদাতা হিসেবে, যেন মাছ এসে নিজেই জালে ধরা দিচ্ছে! এভাবে ‘স্বঘোষণার' সুবিধা হলো এই যে, কর বিভাগ মাছটাকে ন্যাজা-মুড়োয় পুঁচিয়ে না কেটে, অপেক্ষাকৃত কম সাজা দেন৷

তাও সে সাজা জরিমানা এবং কারাদণ্ড, দুই-ই হতে পারে, বায়ার্ন মিউনিখ ফুটবল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট উলি হ্যোনেস সুইজারল্যান্ডের শেয়ারবাজারে কোটি-কোটি ইউরোর ফাটকা খেলে – এবং কর না দিয়ে – যে সাজা পেয়েছিলেন৷ হ্যোনেস-এর কারাদণ্ড জার্মান কর বিভাগের উদ্দেশ্য ছিল না; উদ্দেশ্য ছিল, বকেয়া কর সুদে-আসলে আদায় করে নেওয়া ও হবু করফাঁকিদাতাদের সাবধান করে দেওয়া৷

ওদিকে চোরাই সিডি কিনে নর্থ রাইন-ওয়েস্ট ফালিয়া রাজ্যের অর্থমন্ত্রী নর্বার্ট ভাল্টার-বোরিয়ান্স যেন ভীমরুলের চাকে ঢিল মেরেছেন: স্বদেশে যেমন শাঁসালো বিত্তশালীরা, তেমনই সুইজারল্যান্ডের মতো ব্যাংকিং-এর স্বর্গের হর্তাকর্তারা বেআইনি সিডি কেনার দরুণ ভাল্টার-বোরিয়ান্সের উপর খড়গহস্ত৷ এবার আবার তিনি মাল্টাকে কর ফাঁকি দেওয়ার অফশোর কোম্পানিগুলোর স্বর্গরাজ্য বলে আরো অপাত্র হয়েছেন৷

DW Bengali Redaktion

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

ওদিকে জার্মানিতে সম্প্রতি এক সুইশ ‘গুপ্তচর' ধরা পড়েছে, যে নাকি এখানকার কর তদন্তকারীদের উপর আড়ি পাতার তাল করছিল – বিশেষ করে যে সব তদন্তকারীরা চোরাই সুইশ সিডি কিনে থাকেন৷ মনে রাখা দরকার, নর্থ রাইন-ওয়েস্ট ফালিয়া, বাডেন ভ্যুর্টেমব্যার্গ, নিম্ন স্যাক্সনি এবং রাইনল্যান্ড প্যালেটিনেটের মতো রাজ্য সুইজারল্যান্ড ও লিখটেনস্টাইনের মতো দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চোরাই সিডি কিনছে – তাও ২০০৬ সাল যাবৎ৷ চোরাই সিডির জন্য জার্মান কর্তৃপক্ষ ২০১০ সাল যাবৎ ব্যয় করেছেন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ইউরো৷ অপরদিকে এর ফলে বাড়তি কর আদায় হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি ইউরো৷ কাজেই অর্থদপ্তরের কাছে চোরাই সিডি কেনা একটা লাভের ব্যবসা বৈকি!

বিশ্ব | 10.01.2011

সর্বশেষ খবর, ঐ নর্থ রাইন-ওয়েস্ট ফালিয়া রাজ্যের কর কর্তৃপক্ষ আপাতত ডজন-ডজন দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘কাম-এক্স বাণিজ্য' থেকে প্রায় ১,০০০ কোটি ইউরো কর ফাঁকি দেওয়ার কেলেঙ্কারির তদন্ত করছেন৷

ওদিকে জার্মানিতে নাকি ব্যাংকিং থেকে শুরু করে বাড়িঘর কেনাবেচা, নতুন-পুরনো গাড়ির ব্যবসা অথবা শিল্পকলার মতো সেক্টরে বছরে ১০,০০০ কোটি ইউরোর বেশি কালো টাকা সাদা করা হয়৷ এ টাকার অধিকাংশই আসে জার্মানির বাইরে থেকে৷

সাধে কি বলে, মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার...

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷