জার্মানিতে গড়ে প্রতিদিন ১০টি শরণার্থী-বিরোধী হামলা: তথ্য

জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে দেশটিতে শরণার্থী ও তাদের জন্য নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রের উপর প্রায় সাড়ে তিন হাজার হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি এ রকম হামলা হয়েছে৷

সংসদীয় এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এসব হামলায় ৪৩ জন শিশুসহ ৫৬০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন৷ সরকার এসব হামলার ‘কঠোর সমালোচনা' করছে বলে ঐ চিঠিতে লেখা আছে৷ বার্তা সংস্থা এএফপি চিঠিটি দেখেছে বলে জানিয়েছে৷ ‘‘যারা প্রাণ বাঁচাতে তাদের দেশ থেকে পালিয়ে নিরাপত্তার জন্য জার্মানিতে এসেছে তাদের নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার অধিকার আছে'', চিঠিতে লিখেছে মন্ত্রণালয়৷

পুলিশের বরাত দিয়ে মন্ত্রণালয় জানায়, ২০১৬ সালে ২,৫৪৫ জন শরণার্থীর উপর এবং আশ্রয়কেন্দ্রের উপর ৯৮৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ এর মধ্যে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া ঘটনাও রয়েছে৷ ২০১৫ সালে আশ্রয়কেন্দ্রের উপর এক হাজারেরও বেশি হামলা হয়েছিল৷ তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ১৯৯৷

সমাজ

যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যতা থেকে পালানো

২০১৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘ইসলামিট স্টেট’-এর বিস্তার ঘটার পর সিরীয়দের দেশত্যাগের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়৷ একইসময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নিগার এবং কসভোর অনেক মানুষ ইউরোপমুখী হন৷

সমাজ

সীমান্তের ওপারে আশ্রয় খোঁজা

সিরীয় শরণার্থীদের অধিকাংশই ২০১১ সাল থেকে সে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন তুরস্ক, লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন৷ কিন্তু ২০১৫ সাল নাগাদ সেসব দেশের শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা সন্তানদের শিক্ষা দিতে না পারায় এবং কাজ না পাওয়ায় এক পর্যায়ে আরো দূরে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

সমাজ

পায়ে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি

২০১৫ সালে ১৫ লাখের মতো শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে পায়ে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে চলে আসেন৷ সেসময় ইউরোপের শেঙেন চুক্তি, যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশের মধ্যে ভিসা ছাড়াই চলাচাল সম্ভব, নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ কেননা শরণার্থীরা গ্রিস থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলোর দিকে আগাতে থাকেন৷

সমাজ

সমুদ্র পাড়ির উন্মত্ত চেষ্টা

সেসময় হাজার হাজার শরণার্থী ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করেন৷ লিবিয়া থেকে ইটালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত আটশ’ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

সমাজ

সীমান্তে চাপ

ইউরোপের বহির্সীমান্তে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কয়েকটি রাষ্ট্র চাপে পড়ে যায়৷ হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক পর্যায়ে সীমান্তে বেড়া দিয়ে দেয়৷ শুধু তাই নয়, সেসময় শরণার্থী আইন কঠোর করা হয় এবং শেঙেনভুক্ত কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে৷

সমাজ

বন্ধ দরজা খুলে দেয়া

জার্মান চ্যান্সেল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর ‘ওপেন-ডোর’ শরণার্থী নীতির কারণে বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অনেক শরণার্থীই ইউরোপে আসতে উৎসাহ পেয়েছেন৷ এক পর্যায়ে অবশ্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে জার্মানিও৷

সমাজ

তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি

২০১৬ সালের শুরুতে ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যে একটি চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির আওতায় গ্রিসে আসা শরণার্থীদের আবারো তুরস্কে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করে৷ নভেম্বর মাসে অবশ্য তুরস্কের ইইউ-তে প্রবেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণার পর, সেই চুক্তি আবারো নড়বড়ে হয়ে গেছে৷

সমাজ

পরিস্থিতি বদলের কোনো লক্ষণ নেই

ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকলেও সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলার কোনো সঠিক পন্থা এখনো খুঁজে পাননি৷ কোটা করে শরণার্থীদের ইইউ-ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সহিংসতার ইতি ঘটার কোনো লক্ষণও নেই৷ ওদিকে, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে৷

মন্ত্রণালয় বলছে, পুলিশের পরিসংখ্যানে না থাকলেও শরণার্থীদের সহায়তা করে এমন বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের উপর ২১৭টি হামলা হয়েছে৷

২০১৫ সালে জার্মানিতে প্রায় ৮ লক্ষ ৯০ হাজার শরণার্থী প্রবেশ করে৷ সেই সময় জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের শরণার্থী নীতির কঠোর সমালোচনা করায় ডানপন্থি পপুলিস্ট দল‘অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড' বা এএফডির সমর্থক সংখ্যা বেশ বেড়ে যায়৷

চরম বামপন্থি দল ডি লিংকের রাজনীতিবিদ উলা ইয়েল্পকে জার্মান এক পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারের শরণার্থীদের উপর এমন হামলার জন্য চরম ডানপন্থিরা দায়ী বলে মন্তব্য করেন৷ তিনি সরকারকে এ সব হামলা প্রতিরোধে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

চলতি মাসে শরণার্থীদের থাকার জন্য প্রস্তুত করতে থাকা একটি হলে আগুন ধরানোর দায়ে একজন নব্য-নাৎসিকে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে৷

গত ফেব্রুয়ারিতে বাউটৎসেন এলাকায় যখন একটি আশ্রয় শিবির আগুনে পুড়ছিল তখন কয়েক ডজন ব্যক্তিকে উচ্ছ্বসিত হতে দেখা গেছে৷

জেডএইচ/ডিজি (এএফপি, ডিপিএ)

২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি

জার্মানির অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক কেন্দ্রীয় সংস্থা বিএএমএফ এর সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিল মাসে মোট ৫৯,৬৮০টি আবেদন পড়েছে৷ মার্চ মাসে সংখ্যাটি ছিল ৫৮,৩১৫, অর্থাৎ ১,৩৬৫টি কম৷

শীর্ষে সিরিয়া

সবচেয়ে বেশি আবেদন করেছেন সিরিয়ার নাগরিকরা৷ ২৫,৭৯১ জন৷ অবশ্য মার্চ মাসে সংখ্যাটি ছিল সাড়ে সাত শতাংশ বেশি৷ ২৭,৮৭৮ জন৷

প্রথম চার মাসেও শীর্ষে সিরিয়া

২০১৬ সালের প্রথম চার মাসে এক লক্ষ ১৬ হাজার ৮২৬ জন সিরীয় নাগরিক জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন৷ আর সব দেশ মিলিয়ে আবেদনের সংখ্যা দুই লক্ষ ৪৬ হাজার ৩৯৩ জন৷

ইরাকিদের সংখ্যা বেড়েছে

মোট হিসেবে সিরিয়ার পরেই আছে ইরাক৷ তবে সিরিয়ার ক্ষেত্রে আবেদনের সংখ্যা এপ্রিলের চেয়ে মার্চে বেশি হলেও ইরাকের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো৷ অর্থাৎ মার্চের চেয়ে এপ্রিলেই বেশি ইরাকি আবেদন করেছেন৷ ৯,৫০৫ জন৷ মার্চে ছিল ৮,৯৮২ জন৷

তৃতীয় স্থানে আফগানিস্থান

সিরিয়া ও ইরাকের পর তালিকায় তিন নম্বরে আছে আফগানিস্তান৷ এপ্রিলে ৮,৪৫৮ জন আফগান রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন৷ মার্চ মাসের চেয়ে সংখ্যাটি ১১.৮ শতাংশ বেশি৷

জাতীয়তা জানা নেই

জাতীয়তা ‘অস্পষ্ট’ এমন আবেদনের সংখ্যা এপ্রিলে ছিল ১,২৯৯ জন৷ সংখ্যাটি মার্চ মাসে ছিল আরও বেশি৷ ১,৮৬৯ জন৷

পাঁচ নম্বরে ইরান

১,৯৮১ আবেদন নিয়ে তালিকায় ইরানের নাম আছে পাঁচ নম্বরে৷ ছয়-এ আছে আলবেনিয়া (১,১৮৮ জন)৷ পাকিস্তানি আবেদনের সংখ্যা ১,০৩৮; আর ইরিত্রিয়ার ১,১৫২৷