ব্লগ

জাহাজ ভাঙা শিল্প: সমস্যা প্রকট, সমাধান অসম্ভব নয়

ঢাল-তলোয়ার সবই আছে, তারপরও নিধিরাম সর্দার৷ সবসময় নয়, কখনো কখনো৷ বলছি, বাংলাদেশ সরকারের কথা৷ তবে মূল পসঙ্গ জাহাজ ভাঙা শিল্প৷

বাংলাদেশের একটি ডক-ইয়ার্ড

শাসকদের অসীম ক্ষমতা৷ ন্যায়ের চেয়ে অন্যায় কাজ করায় পারদর্শী৷ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, জনমানুষের ভয়ংকর ক্ষতি বা বিপদ থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাদের সীমাহীন দুর্বলতা৷ এ সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকেন, তারা বোঝাতে চান ‘ক্ষমতা নেই' ইচ্ছে ছিল৷ ফলে কাজটি আমরা করতে পারছি না৷

এমন অনেক ক্ষত বা ঘটনা নিয়ে কথা বলা যায়৷ তবে সবগুলো নিয়ে নয়৷ আজকের বিষয় বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প৷ এই শিল্পের সামগ্রিক বিষয় খুব বেশি মানুষ জানেন না৷ এর একটি বড় অর্থনৈতিক দিক আছে৷ আছে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি কুফল৷ এসবের পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্কে অধিকাংশ সময়, সরকার দর্শক৷ তার যা করা দরকার করে না৷ এই করব, সেই করব, করতে চেয়েছিলাম, বিরোধিতার কারণে করা গেল না, ইত্যাদি কথা বলা হয় সরকারের পক্ষ থেকে৷ করা হয় না কিছু৷ আর দশটি সেক্টরের মতো জাহাজ ভাঙা শিল্পও চলছে সরকারি অভিভাবকত্বহীনভাবে৷ পরিবেশ আর জনমানুষের নিরাপত্তার প্রেক্ষিতে বলা হয় জাহাজ ভাঙা শিল্প চলতে দেয়া উচিত নয়৷ আবার অর্থনৈতিক বিবেচনায় যুক্তি দেয়া হয়, জাহাজ ভাঙা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে, দিতে হবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা৷

এই পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্ককে সামনে রেখে সংক্ষিপ্ত আলোচনা

১৷ জাহাজ ভাঙার ইতিহাসটা কম-বেশি অনেকে জানেন৷ বিস্তারিত বলছি না৷ সেই ১৯৬০ সালে গ্রিক জাহাজ এমভি আলপাইন জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলে অকেজো হয়ে আটকে পড়েছিল৷ পাঁচ বছর জাহাজটি আটকে ছিল৷ তারপর সেটিকে টেনে এনে ভাঙা শুরু হয়৷ শুরু থেকেই লাভজনক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিতি পায়৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে৷ জাহাজ ভাঙা ব্যবসা শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে৷ শতাধিক ইয়ার্ড, দুই লক্ষের অধিক মানুষ এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন৷ এক কথায় কালক্রমে জাহাজ ভাঙা শিল্প বিশালত্ব লাভ করেছে৷ জাহাজ ভাঙা শিল্পের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের অনেক বড় বড় রড ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে৷ দেশের অর্থনীতিতে আরও বহুবিধ অবদান এই জাহাজ ভাঙা শিল্পের৷ তা সত্ত্বেও সমালোচনা, জাহাজ ভাঙা শিল্প বন্ধ করে দিতে হবে৷

২৷ জাহাজ ভাঙা শিল্পের সমালোচনার কারণগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক:

ক. জাহাজ ভাঙার পদ্ধতিগত দিকটিতে বাংলাদেশ এখনও প্রায় সেই প্রস্তর যুগে রয়ে গেছে৷ ব্যবসা থেকে শিল্পে রূপান্তর ঘটলেও কারিগরি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হয়নি বা এত কম হয়েছে যে, তা দৃশ্যমান নয়৷

খ. বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্প বিকশিত হয়েছে মূলত খুব সহজে শ্রমিক পাওয়া যাওয়ার কারণে৷ শ্রমিকদের  কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বা জীবনঝুঁকির বিষয়টি কোনো বিবেচনায় নেওয়া হয় না৷ দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকদের শারীরিক ক্ষতির দিকটিও সামান্যতম কোনো বিবেচনায় থাকে না৷

গ. যেসব শ্রমিক জাহাজ ভাঙেন, তাদের অধিকাংশই কোনো-না-কোনোভাবে তাৎক্ষণিক শারীরিক ক্ষতির শিকার হন৷ অনেকে হাত-পায়ের আঙুল হারান৷ শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ক্ষতের শিকার হন৷ চোখ-কানের সমস্যা হয়৷ দীর্ঘমেয়াদে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন৷

ঘ. সমুদ্রের পানি এবং আশপাশের উপকূলের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে৷ শ্রমিকরা তো বটেই, স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এর ভুক্তভোগী৷ জটিল রোগে তারাও আক্রান্ত হয়ে পড়েন বা পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে জীবনযাপন করেন৷

ঙ. জাহাজ ভাঙা শিল্পের মালিকরা প্রায় কোনো নীতি অনুসরণ করে ব্যবসা করেন না৷ পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো বিষাক্ত জাহাজও বাংলাদেশের মালিকরা কিনে আনেন৷ কখনো কখনো তারা এমন জাহাজ নিয়ে আসেন যা পৃথিবীর কোনো দেশ নিতে চায় না বা নেয় না৷ কিনে না, বিনা পয়সায়ও নেয় না৷ বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের মালিকরা সেই সব জাহাজ বিনা পয়সায় নিয়ে আসেন৷ বিষাক্ত জাহাজ অনেক কম মূল্যে কিনে আনেন৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে, পারমাণবিক বর্জ্য বহন করা জাহাজও বাংলাদেশে আনা হয়েছে৷

৩৷ ভারতসহ পৃথিবীর আরও কিছু দেশে জাহাজ ভাঙা হয়৷ অভিযোগ সেইসব দেশেও আছে৷ সেসব দেশের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ বা সমালোচনার বিষয়গুলো কিছুটা হলেও গুরুত্ব দেন৷ সরকারও কিছু ক্ষেত্রে তাদের নিয়ম-নীতি মানতে, শ্রমিকের স্বার্থ দেখতে বাধ্য করেন৷

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের মালিকরা নিজেদের সব নিয়মনীতির ঊর্ধ্বে ভাবেন৷ শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা বা স্বার্থ দেখার দিকটি তারা বিবেচনাতেই আনেন না৷ সরকার ‘এই করব, সেই করব' কখনো কখনো বলে, শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায় না৷ পরিবেশ ক্ষতির দিকটিতে নজর দেয় না৷ সরকার মালিক পক্ষের ভাষায় কথা বলে৷ নীতি করে বা আইনের প্রয়োগে সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে না৷

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

ফলে শ্রমিকের জীবনযাপন, নিরাপত্তা ঝুঁকি, পরিবেশ বিপর্যয় ইস্যুতে আন্দোলন হয় – জাহাজ ভাঙা শিল্প বন্ধ করে দিতে হবে৷

৪৷ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জাহাজ ভাঙা শিল্প বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না৷ আবার যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতেও দেয়া উচিত নয়৷ জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকাটিতে মালিকরা আলাদা রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন৷ ইচ্ছে করলেই সেখানে যাওয়া যায় না, শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলা যায় না৷ এই অবস্থায় সরকারের কিছু করণীয় আছে৷ শিল্পটি টিকিয়ে রাখার জন্যে করণীয় আছে মালিকদেরও৷

ক. জাহাজ ভাঙা কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তার দিকটি সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে৷ হেলমেট দিতে হবে৷ হাতুড়ি বাটালের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে৷ শ্রমিকদের কিছুটা ট্রেনিং দিলেই তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠবেন৷

খ. কত পুরনো জাহাজ দেশে আনা যাবে, তা শুধু কাগুজে নীতি করলে হবে না৷ নিয়মিত মনিটরের আওতায় আনতে হবে৷ কোন ধরনের বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ সম্পৃক্ত জাহাজ দেশে আনা যাবে না, তা নিয়মের মধ্যে এনে বাস্তবায়ন করতে হবে৷

গ. কোন  জাহাজে বিষাক্ত পদার্থ কোন মাত্রায় আছে, তার পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে৷ রাসায়নিক পরীক্ষা সম্পন্ন না করে শ্রমিকদের দিয়ে জাহাজ ভাঙানো যাবে না৷ এ সব ক্ষেত্রে নিয়ম অনুসরণ না করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে৷

ঘ. শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে মালিকদের বাধ্য করতে হবে৷ শ্রমিকের অঙ্গহানি বা জীবনহানি হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে৷ খুব গুরুত্ব দিতে হবে সকল শ্রমিক-কর্মচারীর ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থার দিকে৷ বিশেষ করে জীবন-ঝুঁকি বা অঙ্গহানির আশঙ্কা আছে সেসব ক্ষেত্রে, তাদের ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা থাকতেই হবে৷

ঙ. মজুরি বৃদ্ধি করলে, ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা করলে, নিরাপত্তা বা জীবনের মানের উন্নয়নের জন্যে অর্থ ব্যয় করলে, জাহাজ ভাঙা শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে৷ এই অসত্য কথা বলা, বাংলাদেশের শিল্প মালিকদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য৷ পোশাক শিল্প, চামড়া শিল্পসহ সব মালিকের চরিত্র একই রকম৷ সরকার যদি কঠোর হয়, গরিব শ্রমিকদের পক্ষে অবস্থান নেয়, মালিকদের লাভের পরিমাণ সামান্য কমবে৷ শ্রমিকরা লাভবান হবে, অঙ্গহানি বা মৃত্যু কমবে৷ শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশেরও উন্নয়ন হবে৷

৫৷ শ্রমিকদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়, পৃথিবীতে বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প নিয়ে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে৷ এর থেকে বের হয়ে আসার জন্যে দেশের সরকারের উদ্যোগ তো দরকার বটেই, মালিকদেরও মানসিকতা পরিবর্তন হওয়া বাঞ্ছনীয়৷ এক্ষেত্রে দায়িত্ব আছে উন্নত দেশগুলোরও৷ যারা তাদের সবচেয়ে পুরনো বিষাক্ত জাহাজ বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে৷ এ সব জাহাজ বাংলাদেশে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত তাদেরও নিতে হবে৷

সম্মিলিত উদ্যোগে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের, আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ আছে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو