সংবাদভাষ্য

জৈব চাষ কেন বাড়ানো উচিত?

কোনো ধরনের কৃত্রিম সার, রাসায়নিক ইত্যাদি ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলকেই অরগ্যানিক বলা হয়৷  জৈব সার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়৷ উৎপাদিত ফসল হয় স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ৷

default

২০১০ সালে কক্সবাজারের মারমেইড ইকো রিসোর্টে গিয়ে খাবার খেয়ে বড়ই তৃপ্তি পেয়েছিলাম৷ যেহেতু ইকো রিসোর্ট, তাই সেখানে খাবারগুলো ছিল একেবারেই অরগ্যানিক৷ তাজা তাজা ফল, ফলের রস সবই তাদের বাগানের বা আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে কেনা, যেখানে কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি৷ এ সব খাবার খেয়ে তৃপ্তি যেমন পেয়েছিলাম, তেমনটা কক্সবাজারের আর কোথাও পাইনি৷ সেই ভালো লাগার রেশ রয়ে গেছে এখনো৷ সেখানকার ফল বা মাছ খেয়ে যে কেউ টের পাবে ঢাকার ফল বা মাছ থেকে এর স্বাদ কতটা ভিন্ন, অর্থাৎ এগুলো একেবারেই নির্ভেজাল, ফরমালিন মুক্ত৷


কেন খাবেন অরগ্যানিক খাবার?

আমাদের দেশে ফরমালিনযুক্ত খাবারের আধিক্য থাকায় গত কয়েক বছর ধরে অরগ্যানিক খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে৷ ২০১৪ সালে নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রমাণ করেন অরগ্যানিক খাবারের উপকারিতা৷ ব্রিটিশ জার্নাল অফ নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত তাঁদের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাধারণ সারমিশ্রিত ফসলের চেয়ে অরগ্যানিক ফসলে কীটনাশকের পরিমাণ এক চতুর্থাংশের চেয়েও কম থাকে৷ বিষাক্ত ধাতব উপাদানও কম থাকে৷ তাই এতে ক্যানসার প্রতিরোধী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অনেক বেশি মাত্রায় পাওয়া যায়৷

প্রতিদিন পাঁচটি করে ফল খেতে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা৷ আর এ পাঁচ ফলের মধ্যে যদি অরগ্যানিক খাবার থারে তাহলে তা কিছু বাড়তি স্বাস্থ্যগত সুবিধা যোগ করে, যা আরও দু'টি অতিরিক্ত ফল খাওয়ার মতো৷ গবেষকদলের প্রধান যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির গবেষক প্রফেসর কার্লো লেইফার্ট জানান, পরিসংখ্যানগতভাবে কিছু অর্থবহুল পার্থক্য দেখা গেছে সাধারণ ও অরগ্যানিক খাবারের মধ্যে৷ বিশেষ করে অ্যান্ট-অক্সিডেন্টের হার শতকরা ১৯ থেকে ৬৯ ভাগ পর্যন্ত বেশি থাকে অরগ্যানিক খাবারে৷ এ গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচালিত ৩৪৩টি সমীক্ষার ফলাফল সংগ্রহ করা হয়৷ এরপর বিভিন্ন ফল ও সবজির ক্ষেত্রে তা পর্যালোচনা করা হয়৷ তবে এ গবেষণার ফলাফল কিছু বিজ্ঞানী সমালোচনাও করেছেন৷ তাঁরা বলছেন, বিভিন্ন পরিবেশ ও ভূমিতে এ গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে না করেই ফলাফল তুলনা করা হচ্ছে৷

Landwirtschaft in Asien

রাসায়নিক সার ও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করলে প্রতিবছরই মাটির উর্বরতা হ্রাস পেতে থাকে


রাসায়নিক চাষের ফসলে রোগব্যাধি:
বাজার থেকে আমরা যেসব খাবার-দাবার ও সবজি কিনে খাই, তার প্রায় সবগুলোর মধ্যেই বিভিন্ন কৃত্রিম সার, রাসায়নিক মিশ্রিত থাকে৷ এর ক্ষতিকারক প্রভাব আমাদের সবার উপর পড়ছে৷ কৃত্রিম সার, রাসায়নিক দ্রব্য, ফরমালিন ইত্যাদির যথেচ্ছ ব্যবহারে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, লিভারের ক্ষতি সাধনসহ নানাবিধ রোগব্যাধির প্রকোপ মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে৷ বিশেষভাবে শিশুদের ওপর এর প্রভাব বেশ প্রবল৷ শিশুদের খাবার-দাবারের সাথে তাদের বিভিন্ন আচরণগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে৷ তাই অরগ্যানিক (কৃত্রিম সার ও রাসায়নিক মুক্ত) খাবার ও শাক-সবজি আমাদের নিজেদের জন্য তো দরকারই, শিশুদের জন্য এর প্রয়োজন আরও বেশি৷

বিজ্ঞানীদের মতে অরগ্যানিক ফুড অনেক বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ৷ গবেষণায় দেখা গেছে, যে জৈব খাদ্য বা অরগ্যানিক ফুড শরীরের চর্বি কমায় এবং পেশীর গঠনে সহায়তা করে৷

জৈব চাষে ফলন কেমন?

জৈব সার দিয়ে চাষ করলে প্রথম এক থেকে দু'বছর ফলন কিছুটা কম হবে এতে সন্দেহ নেই৷ তবে চার থেকে পাঁচ বছর পর রাসায়নিক সার দিয়ে চাষ করা জমির তুলনায় ফলন বেশি হবে৷ যে জমিতে সর্বশেষ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে চাষাবাদ করা হয়েছে সেই জমি ন্যূনতম তিনবছর পতিত অবস্থায় ফেলে রাখলে বা পুনরায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ ছাড়া চাষ করলেই অরগ্যানিক খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব৷ চাষাবাদে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত রাসায়নিক সারের অবশিষ্টাংশ তিন বছরে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে৷

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি হচ্ছে কৃষি৷ এ দেশের ৯০ শতাংশ কৃষকের কাছে মধ্য আশির দশকের আগ পর্যন্ত অরগ্যানিক কৃষি ছিল বেশ জনপ্রিয় তারপর নানা প্রলোভনে কৃষকরা বাধ্য হয়ে রাসায়নিক কৃষিতে ঝুঁকে পড়েছে নব্বইয়ের দশকে৷ বর্তমান বিশ্বে অরগ্যানিক কৃষিতে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে বটে, তবে বাংলাদেশে এর মাত্রা খুবই কম৷ ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ অরগ্যানিক এগ্রিকালচার মুভমেন্ট কৃষকদের জৈব উপায়ে ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে৷

খরচ কম, জর্মির উর্বরতা বৃদ্ধি:
জৈবসার প্রয়োগ ও জৈব কীটনাশক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল এবং সবজির উৎপাদন খরচ শতকরা ২৫-৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব৷ জৈবসার ব্যবহার করলে ফসলের উৎপাদন খরচ রাসায়নিক সারের চেয়ে শতকরা ৫০-৬০ শতাংশ কম হয়৷ অরগ্যানিক খাবার ও শাক-সবজি হয়ত সামান্য ব্যয়বহুল৷ কারণ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এতে হরমোন, কৃত্রিম সার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় না৷ সেই সাথে পোকামাকড় দমনের জন্য রাসায়নিক বিষ না দেয়ায় এবং পচন রোধের জন্য ফরমালিন না দেয়ার ফলে সংরক্ষণ ব্যয় বেশি৷

অমৃতা পারভেজ

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

রাসায়নিক সারের পরিবর্তে উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন প্রযুক্তিতে উৎপাদিত জৈব সার সবজি ও ধান গাছে প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, পটাশ ও ফসফেট সারের জোগান দেয়৷ আধা-কম্পোস্ট গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, ধানের কুঁড়া, মাছ-মুরগির পাখনা ও পরিপাকতন্ত্র তথা পরিত্যক্ত অংশ একসাথে করে জৈব কম্পোস্ট সার তৈরি করা হয়৷ জৈবসার প্রয়োগ করলে আর অতিরিক্ত ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয়না৷ এছাড়া মাটির উর্বরতা ও স্বাস্থ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়৷ উৎপাদিত ফসল হয় স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ৷

অপরদিকে রাসায়নিক কীটনাশক ছাড়া পর্যায়ক্রমিক শস্য চাষ এবং মেহগনি, পীতরাজ, গাছ আলু ও নিমের নির্যাস ব্যবহার করে সবজি ও অন্যান্য ফসলের রোগবালাই দমন করা সম্ভব হয়েছে৷ জৈব পদ্ধতিতে জমিতে দীর্ঘ মূল ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের মূল বিশিষ্ট সবজির সমন্বয় ঘটিয়ে মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে৷ কম খরচে শস্যে এ ধরনের জৈব কীটনাশক ব্যবহার করে একদিকে যেমন কৃষকদের অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব, তেমনি জনস্বাস্থ্যও রক্ষা করা সম্ভব৷ অথচ রাসায়নিক সার ও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করলে প্রতিবছরই মাটির উর্বরতা হ্রাস পেতে থাকে৷ বারি, ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত নানা জৈব পদ্ধতির মাধ্যমে পোকামাকড় ও রোগ জীবাণু প্রতিরোধী ফসল উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা অর্জিত হয়েছে৷

দূরদর্শী পদক্ষেপের মাধ্যমে রাসায়নিক কৃষি বর্জন করে প্রাণ-বৈচিত্র্য নির্ভর জৈব কৃষির মাধ্যমে খাদ্যে সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব৷

অরগ্যানিক খাদ্য বা জৈব চাষ সম্পর্কে আপনাদের মতামত জানান আমাদের, লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو