ব্লগ

টাকা পাচারের এপিঠ-ওপিঠ

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে নিয়মিত টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে – এটি এখন আর নতুন কোনো খবর নয়৷ বরং কোথায় ও কত টাকা পাচার হচ্ছে, কীভাবেই বা তা হচ্ছে, সেটা জানতে পারা অধিক গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু এসব তথ্য সঠিকভাবে জানা বেশ কঠিন৷

default

সর্বশেষ চলতি মে মাসে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) তাদের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন বা ৭৫৮ কোটি ডলার পাচার হয় বলে তথ্য মেলে৷ এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর দেশে আবারও হৈচৈ পড়েছে৷

জিএফআই গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে টাকা পাচারের তথ্য-পরিসংখ্যান উপস্থাপন করছে৷ তবে এবারের প্রতিবেদনে টাকা পাচারের অংক সরাসরি উল্লেখ না করে এটিকে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে প্রকাশ করেছে তাদের হিসেব পদ্ধতি সংশোধন করার জন্য৷ তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ১২ থেকে ১৭ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, যার বেশিরভাগই আবার হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মিথ্যা ঘোষণা ও পণ্য চালান বিকৃতির (ট্রেড মিসইনভয়েসিং) মাধ্যমে৷ আর বাকিটা লেনদেনের ভারসাম্য হিসাবের ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে, যা মূলত সম্পন্ন হয় আর্থিক বাজার থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার মাধ্যমে৷

জিএফআই-এর প্রতিবেদনে ২০০৫-২০১৪ সময়কালে বা ১০ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের মোট অর্থমূল্য দেখানো হয়েছে ৪৪৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন বা ৪৪ হাজার ৬১৫ কোটি ডলার৷ এর ১৭ শতাংশ হয় ৭৫ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৫৮৪ কোটি ডলার৷ এটি ১০ বছরে৷ তার মানে, প্রতি বছর গড়ে ৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন বা ৭৫৮ কোটি ডলার বা ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা কিনা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের কর-বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ, মোট ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রায় সমান অথবা মোট বাজেটের প্রায় ১৮ শতাংশ৷ তার মানে হলো, টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে, বাজেট বা বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন অনেকটাই সহজ হয়ে যেত৷ জিএফআই অবশ্য টাকা পাচার বলতে ইলিসিট ফাইন্যান্সিয়াল ফ্লো বা অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে উত্‍সরিত অর্থের প্রবাহকে বোঝায়৷ তার মানে সংস্থাটি টাকা পাচারের বিষয়টিকে সীমিত পরিসরে বিবেচনা করছে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতির কারণে৷ অন্যভাবে বললে, জিএফআই-এর হিসেব অনেকটাই রক্ষণশীল৷ পাচারকৃত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ আরো অনেক বেশি হতে পারে৷

সুতরাং বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ বা কত টাকা পাচার হচ্ছে, তার খুব নির্ভরযোগ্য তথ্য-পরিসংখ্যান মেলে না৷ যেটুকু মেলে, তা মোটামুটি একটা ধারণা দেয়৷ লন্ডনভিত্তিক ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক ২০১৩ সালে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ সেটা থেকে প্রথম জানা যায় যে, বাংলাদেশ থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে (১৯৭৬-২০১০) বাংলাদেশ থেকে ২৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন বা দুই হাজার ৪৭০ কোটি ডলার টাকা পাচার হয়েছে৷ সম্ভবত সেটা ছিল টাকা পাচার নিয়ে বড় ধরনের কোনো তথ্য প্রকাশ৷ এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা পাচার বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে, যার সবই মূলত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য৷ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধা গ্রহণকারীর সংখ্যা বা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে (যা সুইস ব্যাংক নামে বেশি পরিচিত) বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ টাকা পাচারের বিষয়টি সমর্থন করে৷

স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন চলে আসে, যেগুলো এরকম: টাকা পাচার হচ্ছে কেন? এর ফলে দেশের কতটা ক্ষতি হচ্ছে? টাকা পাচার রোধ করা যাচ্ছে না কেন? এসব প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর নেই, কেননা, টাকা পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির একটা বড় ধরণের সংযোগ আছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শন ও শাসন ব্যবস্থার একটা সম্পর্ক আছে৷

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে৷ এই সময়কালে অর্থনীতির গতিতে খুব বড় ধরনের কোনো ছেদ পড়েনি৷ কিছুটা উত্থান-পতনেরর মধ্য দিয়ে মোট দেশজ উত্‍পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশে থিতু রয়েছে৷ অর্থাত্‍ অর্থনীতির আয়তন ক্রমেই বড় হচ্ছে৷ এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্য-আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে৷ আবার ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকেও বেরিয়ে আসতে যাচ্ছে৷

অর্থাত্‍ একটি গতিময় ও উদ্যমী অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে বাংলাদেশ৷ একই সঙ্গে এটাও ঠিক যে প্রবৃদ্ধির যে বণ্টন, তা বেশ অসম৷ অর্থাত্‍ দেশের বিপুল সংখ্যাক জনগোষ্ঠী এখনো নানারকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে অধিক পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ায়৷ বৈষম্য পরিমাপকারী গিনি-সহগের কোনো হালনাগাদ উপাত্ত না থাকলেও সাদাচোখেই সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার বিষয়টি বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়৷ যেমন, বিপুল সংখ্যাক মানুষের জন্য ভালো গণপরিবহন নেই, অথচ কিছু মানুষ বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন৷

আবার যে মুক্তবাজারের দর্শনে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে পুঁজির সঞ্চয়ন ও সুরক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে৷ শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উন্নয়নের নির্দেশক হয়ে উঠছে বিভিন্ন ধরণের ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণ, যেখানে ব্যয় যৌক্তিক সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে দফায় দফায়৷ এর মধ্য দিয়ে রেন্ট সিকিং বা অনুপার্জিত মুনাফাখোরীর পথকে প্রশস্ত করা হচ্ছে৷ অনুপার্জিত মুনাফাখোরী তখনই জোরদার হয়, যখন সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেয়৷ সমান্তরালে ক্রনি ক্যাপিটালিষ্ট বা স্বজনতোষী পুঁজিপতিদের উত্থান ঘটে অর্থনীতি বড় হতে থাকলে৷ সুশাসনের অভাব অনুপার্জিত মুনাফাখোর ও স্বজনতোষী পুঁজিপতিদের জন্য যতটা কাম্য, সর্বসাধারণের জন্য ততটাই বিপজ্জনক৷ কেননা, এতে করে সিংহভাগ সাধারণ মানুষ নিজের জীবন, উপার্জন ও সম্পদ নিয়ে বিচলিত বোধ করে৷ কিন্তু তার এ দেশের বাইরে চিন্তা করার ক্ষমতা বা সামর্থ নেই৷ ফলে দেশের ভেতরে অন্যায়-অনিয়মের সঙ্গে আপোশ করেই চলতে হয়৷ অন্যদিকে অর্থ-সম্পদ মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হতে থাকায় সুশাসনের অভাবে অনেকেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ দেশে রাখা নিরাপদ মনে করে না৷ তারা তখন নানা উপায়ে ও কৌশলে অর্থ অন্যত্র স্থানান্তর করে৷

আবার এক দেশের অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার নানা ধরণের ব্যবস্থা বৈশ্বিকভাবেই রয়েছে৷ এ রকম একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো স্থায়ীভাবে অন্য দেশের অধিবাসী হওয়া ও কালক্রমে সে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ৷ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে কোনো কোনো দেশের বিশেষত কথিত ট্যাক্স হেভেনগুলোয় স্বল্প সময়ের মধ্যে নাগরিকত্ব, তথা পাসপোর্ট পাওয়া যায়৷ এসব দেশে কখনোই জানতে চাওয়া হয় না যে,টাকা কীভাবে বা কোথা থেকে আনা হলো৷ প্রয়োজনীয় টাকা এনে বাড়ি-জমি, কৃষিকাজ বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করলেই হলো৷ তবে বাংলাদেশ থেকে যেহেতু বৈধপথে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্যত্র স্থানান্তরের কোনো আইনি সুযোগ নেই, সেহেতু নানা কৌশলে তা করা হয়৷ এর মধ্যে একটি হলো কথিত ‘অ্যাসেট সোয়াপ'৷ যেমন ক্যানাডার স্থায়ী বাসিন্দা কোনো বাংলাদেশি দেশে বাড়ি কিনতে চান৷ আর বাংলাদেশ থেকে একজন ক্যানাডায় জমিতে বিনিয়োগ করে স্থায়ী বাসিন্দা হতে চান৷ এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়জন প্রথম জনের পক্ষে দেশে বাড়ি কেনার টাকা পরিশোধ করবেন আর প্রথমজন করবেন ক্যানাডায় দ্বিতীয় জনের পক্ষে৷ এতে দেশ থেকে টাকা বা সম্পদ ঠিকই স্থানান্তরিত হলো৷

বস্তুত অর্থনীতির উত্তরণ পর্বে অর্থ পাচার খুব অস্বাভাবিক বিষয় নয়৷ পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থের কিছুটা আবার ফিরেও আসে মূলত বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে৷ বাংলাদেশে ইদানীং সে রকম আভাসও মিলেছে৷ তাই বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার আগামীতে আরো বাড়লেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই৷

কিন্তু এভাবে টাকা পাচার বাড়লে ক্ষতি একাধিক৷ প্রথমত, অর্থ পাচার প্রয়োজনীয় সম্পদকে দেশ থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করে দেয় যা কিনা দেশে বিনিয়োগ হতে পারত৷ দ্বিতীয়ত, এই প্রবণতা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে৷ তৃতীয়ত, এটি সমাজের বৈষম্যকে প্রকটভাবে তুলে ধরে৷ আর এসব কিছুই টেকসই ও সুসম উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে৷ সে কারণেই পাচার পুরোপুরি রোধ না করা গেলেও কমিয়ে আনা জরুরি৷ আর সুশাসনের মাধ্যমে তা করা সম্ভব৷

আসজাদুল কিবরিয়া, ঢাকাভিত্তিক দ্য ফিনান্সিয়্যাল এক্সপ্রেস পত্রিকার পরিকল্পনা সম্পাদক

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو