ব্লগ

ডয়চে ভেলের দুই সাংবাদিকের সঙ্গে

চলতি বছরের মে মাসের প্রথম দিকে জার্মানিতে এসেছি৷ তিন মাসের জন্য ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগে৷ গত এক দশকে ঢাকার কোনো নিউজ রুমে এত দীর্ঘ সময় আর কোনোদিনই আমি অনুপস্থিত ছিলাম না৷ ঢাকায় রিপোর্টিং করতাম৷ এখানকার কাজ মূলত ডেস্কে৷

Symbolbild Beschriftung Zettel Deutsch lernen (imago/blickwinkel)

এই দুই সংবাদমাধ্যমের কাজের ধরনে বড় একটা মিলও রয়েছে৷ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগ –উভয়েরই লক্ষ্য মূলত বাংলাদেশি পাঠকরা৷ এরপরও নতুন প্রতিষ্ঠানের কাজে রয়েছে নানামুখী নতুন মাত্রা৷

সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন পর নতুন একটা অফিসে কাজ করায় ভিন্নধর্মী একটা অভিজ্ঞতা তো অবশ্যই হয়েছে৷ আমার কাজ করা এই দুই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত খবর এবং উপস্থাপনায়ও রয়েছে অনেক পার্থক্য৷

ডয়চে ভেলের বন অফিসেই বহু ভাষার বহু দেশের মানুষ কাজ করেন৷ উঠতে বসতে দেখা হয়ে যায় তাঁদের সাথে৷ এ যেন নতুন নতুন সংস্কৃতিকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ৷

জার্মানি এসেছি, সাংবাদিকতা করছি৷ তার মানে এটা নয়, আমার তৈরি করা খবর জার্মানরাও পড়ছে৷ নানামুখী ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই মুহূর্তে কেউ সুযোগ দিলেও হয়ত এখানকার মানুষের জন্য সাংবাদিকতা করার পর্যায়ে আমি নেই৷ অন্তত আমার বিশ্বাসটা এ রকমই৷

Bremen Nina Haase und Sumi Somaskanda Station 5

নিনা হাসে এবং সুমি সমাস্কান্দা

কারণ বিদেশের সাংবাদিকতা মানে মানে কেবল একটি নতুন ভাষায় নয়৷ ভাষার সঙ্গে থাকা জনগোষ্ঠী, তাঁদের জীবন যাত্রা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু – পুরো প্যাকেজ৷ পুরো ব্যপারটাই ভিন্ন৷ এমনকি এখানে মানুষের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ধরনও ভূমিকা রাখে৷

আমার মনে হয়, ভিন্ন দেশ থেকে কেউ এসে কোথাওসাংবাদিকতা করতে এ সব বিষয়ে পড়াশোনা করে আসতে হবে৷ কেউ সেটা করতে চাইলে তা খুবই দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার৷ এরপরও এখানকার একেবারে মূল ধারার সাংবাদিকতা দেখার লোভ ভেতরে ভেতরে ছাড়তে পারিনি৷

তাই ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের নেতৃস্থানীয়দের এই আগ্রহের কথা বলতে কুণ্ঠিতও হইনি৷ যার ধারাবাহিকতায় জার্মান নির্বাচন ঘিরে এখানকার রাজনীতি নিয়ে বেশ কিছু খবর অনুবাদ করি৷

এর মাঝেই একটি খবর ছিল ‘গ্রীষ্ম-যাত্রায়' বের হচ্ছেন ডয়চে ভেলের দুই প্রতিবেদক৷ এরা হচ্ছেন সুমি সমাস্কান্দা এবং নিনা হাসে৷

এরমধ্যে মার্কিন নাগরিক সুমি ২০১১ সাল থেকে ডয়চে ভেলে ইংরেজি বিভাগের উপস্থাপক হিসাবে কাজ করছেন৷ আর নিনা ২০০৫ সাল থেকে ডয়চে ভেলের ইংরেজি এবং জার্মান সংস্করণে প্রতিবেদক, সম্পাদক, অনলাইন লেখক এবং উপস্থাপক হিসাবে কাজ করছেন৷

‘গ্রীষ্ম-যাত্রা' মূলত ডয়চে ভেলের নিয়মিত আয়োজন৷ প্রতি বছরই গ্রীষ্মে এ ধরনের যাত্রায় বের হয় ডয়চে ভেলের একটি টিম৷

আগামী সেপ্টেম্বরে জার্মানির সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগের নির্বাচন৷ এ উপলক্ষ্য এবারের গ্রীষ্ম-যাত্রায় নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়৷ ঠিক করা হয় ছয়টি ইস্যু৷ যেগুলো নিয়ে কথা বলতে ছয়টি শহরকে ধরে মূলত ছয়টি এলাকা ঠিক করা হয়৷

এ সব এলাকায় গিয়ে দুই প্রতিবেদক সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলছেন, নিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ মতামত৷  ডয়চে ভেলের বিভিন্ন মাধ্যমের জন্য খবর সংগ্রহ এবং তৈরি করবেন৷

এখানে বলে রাখা ভালো, ডয়চে ভেলের সদরদপ্তর বনে৷ এখানে সব অনলাইন এবং রেডিও-র কার্যালয়৷ আর টিভির কার্যালয় বার্লিনে৷

সুমি সমাস্কান্দা এবং নিনা হাসে নামে দুই প্রতিবেদক তাঁদের যাত্রা শুরু করেন বার্লিন থেকে৷ যে ছয় শহরকে ঘিরে তাঁরা এই গ্রীষ্ম যাত্রায় আবর্তিত হবেন, তার মধ্যে বনের সবচেয়ে কাছের শহর কোলন৷

জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থরাইন ওয়েস্টফালিয়ার সবচেয়ে বড় শহর কোলন৷ দুই হাজার বছরের পুরাতন এই শহর জার্মান সংস্কৃতিরও অন্যতম কেন্দ্র৷ এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করে৷ এ কারণে এখানকার জন্য গ্রীষ্ম-যাত্রায় বিষয় ঠিক করা হয় ‘ইসলাম'৷

‘ইসলাম কি জার্মানিকে বদলে দিচ্ছে' – এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা হয় কোলন এবং আশেপাশের এলাকায়৷

গত ৫ মে কোলনের অদূরে বন শহরে আসেন সুমি৷ ঐ দিন বিকালে তাঁদের সাথে একটি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেখা করার কথা৷ এই এলাকাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে প্রচুর মুসলিম বাস করে৷

যাই হোক, এত সব কিছু না জেনেই ঠিকানা ধরে ওই এলাকায় যাই৷ এখানে চমৎকার গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকলেও ঠিকানা খুঁজে পেতে সুবিধার জন্য ট্যাক্সিতেই যাই৷ ট্যাক্সিওয়ালা নামিয়ে দেয়ার পর আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না৷ আশেপাশে কয়েকজনকে পেলাম বটে তবে তাঁরা কেউই ইংরেজি একেবারেই বোঝেন না৷ রীতিমত ইশারা ভাষায় কথা বলার মতো দশা৷

পাশেই একটি মসজিদও খুঁজে পেলাম৷ কাভারেজের বিষয় যেহেতু ইসলাম, তাই ঠিকানা চেক করতে সেখানেও একবার উঁকি দিলাম৷ তবে সেখানেও কাউকে খুঁজে পেলাম না৷

ঠিকানা অনুসারে যদিও আমি সঠিক জায়গাতেই আছি৷ তবে বাড়িটি একেবারে জনশূন্য বলে সন্দেহ হয়৷ এদিক ওদিক ঘুরতে থাকি৷

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর ফিরে এসে দেখি দুই নারী বসে আছেন৷ একজনকে ছবিতে দেখা সুমির মতোই মনে হচ্ছে৷ হ্যাঁ, সুমিই৷ অন্যজন হচ্ছেন ম্যাক্সিমিলিয়ানে কোসচিক৷ তিনি ডয়চে ভেলে বন অফিসে কাজ করেন৷ সুমি এই শহরে আসার পর তিনি তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন৷

এবার আমাদের তিনজনের অপেক্ষা শুরু হলো৷ কিছুক্ষণ পর আফ্রিকান কিছু সাংবাদিক আসলেন৷ আসলেন ডয়চে ভেলে অন্য বিভাগের কয়েকজন সহকর্মীও৷

কথা প্রসঙ্গে জানলাম, এখানে মার্শাল আর্টের দুই শিফটের আমরা থাকবো৷ এর জন্য কর্তৃপক্ষ থেকে পূর্বানুমতিও নেয়া হয়েছে৷ এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, জার্মানিতে অনুমতি ব্যতীত বাচ্চাদের ছবি তোলা যায় না৷ এটা কঠোরভাবে মানা হয়৷ অবশ্য এখানকার সমাজে ঘুরে আমার মনে হয়েছে, বাচ্চাদের সব বিষয়েই তাঁরা খুব স্পর্শকাতর৷

যাই হোক, যেহেতু একটা শিফট বাচ্চাদের, তাই অনুমতির বিষয়টা আরো যত্ন করে নেয়া হয়েছে৷ ঘণ্টাখানেক পর ক্লাবের লোকজন আসে৷ খোলে দরজা৷ আমরা ভেতরে যাই৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিভাবকদের সাথে শিশুরাও আসতে শুরু করেন৷

ম্যাক্স ক্যামেরা খুলে ছবি নিতে শুরু করেন৷ তাঁর দেখাদেখি ছবি নিতে থাকি আমিও৷ এভাবে গল্পে-আড্ডা-কাজে কেটে যায় আধা ঘণ্টা৷ এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও বেড়ে অনেক হয়ে যায়৷ মাঝখানে তারা শরীরচর্চা করছে, প্র্যাকটিস করছে৷ একপাশে সারি বেঁধে বসে আছেন অভিভাবকরা৷

হঠাৎ করে এক লোক এসে ছবি তোলার বিষয়ে আপত্তি জানান৷ জার্মান ভাষায় আপত্তি৷ আমি কিছুই বুঝিনি৷ উদ্বেগ দেখি দুই প্রতিবেদকের চোখে মুখে৷ পরে নিনা ও ম্যাক্স আমাকে বুঝিয়ে বলেন৷

এক অভিভাবকের আপত্তির পর তারা জানান, ক্লাব কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে৷ এরপর ওই অভিভাবক বলেন, না, আমার বাচ্চা, আমি আপত্তি করার পর আপনি আর ছবি তুলতে পারেন না৷

সুলাইমান নিলয়

সুলাইমান নিলয়, ডয়চে ভেলে

ক্লাব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তাঁরা জানায়, এভাবে তাঁরা অতীতে অনেককে অনুমতি দিয়েছেন৷ কিন্তু কেউ আপত্তি করেনি৷ কেউ আপত্তি করতে পারে বলে তাঁরা ভাবেনওনি৷

এরপর যেটা দেখলাম, দুই মারকুটে সাংবাদিক তাঁদের সব জিনিসপত্র গুটিয়ে নিলেন৷ এসে বসে পড়লেন বাইরের দুর্বা ঘাসে৷ আমি ভাবছিলাম, জার্মানির সেই আইনের কথা৷ যেখানে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে৷ তবে ব্যক্তির অধিকার তারও উপরে৷

অলস আড্ডার মাঝে আমরা তিন জন বের হলাম৷ খেয়ে আসলাম হালকা নাস্তা৷ এক সময় শেষ হয়ে যায় শিশুদের সেই সেশন৷ আমরা ফিরে আসি ক্লাবে৷

এবারে মার্শাল আর্টের শিক্ষার্থীরা নানা বয়সের৷ ১৫-১৬ থেকে শুরু করে একেবারে পরিণত বয়সের ছেলে মেয়েও আছেন৷ ম্যাক্স ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে নানাভাবে ছবি নিচ্ছিলেন৷ মাঝে মাঝেই মোবাইল ফোনে তুলছিলেন স্থির ছবিও৷ এরপরই কাজ করছিলেন ফোনে৷

কয়েকবারই দুইজন পিটিসিরও কাজ করছিলেন৷ নিনা দাঁড়াচ্ছেন ক্যামেরার সামনে৷ আর ম্যাক্স পেছনে৷ পিটিসি দিচ্ছিলেন দুই ভাষাতেই৷ জার্মান এবং ইংরেজি৷

মাঝে মাঝে সুযোগমতো তাঁরা মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণার্থীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন৷ ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও তাঁরা ধারন করেন৷

আরো ঘণ্টা দেড়েক এভাবেই কাটলো৷ এরপর আমাদের বের হওয়ার সময় হলো৷ বের হতে হতে দেখি টুইটারে আমাকে ট্যাগ করে আমার একটি ছবি দিয়েছে নিনা৷ আরো বেশ কিছু টুইট করেছে তাঁরা৷

আলাপে আলাপে জানা গেলো, খবরে ব্যবহারের ছবির পাশাপাশি তাঁরা ডয়চে ভেলের ফেসবুক, টুইটারের জন্য ছবি এবং ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ নিয়েছেন৷ এর মধ্যে পোস্টও করেছেন অনেকগুলো৷ রসদ নেন ইংরেজি ও জার্মান সংস্করনের অনলাইনে লেখার৷ তাঁরা মূলত টিভির জন্যই কাজ করছেন৷ আমাদের টিভি সাংবাদিকদের গতানুগতিক কাজের বাইরে এতগুলো কাজ সামাল দেয়ায় আমি বেশ চমৎকৃত হয়েছি৷

একটা কথা বলতেই হবে নিনা-ম্যাক্সদের কাজের গতি এবং দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করেছে৷

আমাদের দেশেও অনেক দক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন৷ যাঁরা হয়ত নিনা বা ম্যাক্সের চেয়েও বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন৷ তাঁদের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি৷ টিভি সাংবাদিকদের কথা বলায় তাঁরা ক্ষিপ্ত হতে পারেন৷

বিষয়টাকে অন্যভাবেও দেখা যায়৷ তাঁদেরকে যদি অনলাইন সাংবাদিক ভাবি৷ তাহলে অনলাইনের কাজও আমরা কত কম করি৷ অনলাইনে যদি তাঁদের সম পরিমাণ কাজও আমরা করে থাকি, তাহলেও এর বাইরে দুই দুইটা ভাষার জন্য টিভি রিপোর্টের কাজ করা আমার মতো অযোগ্যের পক্ষে সম্ভব নয়৷ অন্তত এই মুহূর্তে৷

প্রথম দিকে বলেছিলাম, ভিন্ন দেশে ভিন্ন সংস্কৃতিতে কাজের ক্ষেত্রে অনেক কিছুর জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়৷ নিনাও হয়ত নিয়েছে৷ আমার মতো তিনিও জার্মান নন৷ তিনি এসেছেন দূরের দেশ অ্যামেরিকা থেকে৷ মুগ্ধ হওয়ার এটাও একটা কারণ৷ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতে ফিরতে এই দুই সাংবাদিকের সঙ্গে আরো কথা বললাম৷ তাঁদের ছোট ছোট দু'টো সাক্ষাৎকারও নিলাম৷ হয়ত কেবলই নিজের জন্য৷ আগামী দিনে তাঁদের ক্ষিপ্রতা যদি একটু গতিও বাড়ায়, সেই প্রত্যাশায়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو