ঢাকায় বৃষ্টি, প্রশান্তির চেয়ে ভোগান্তি

ঢাকা শহরে বর্ষাকালটা মানুষের জন্য যতটা না আশীর্বাদ, তার চেয়ে বেশি অভিশাপ৷ এক দু’ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট, তৈরি হয় যানজট, ঘটে দুর্ঘটনা৷ ঢাকাবাসীর কি এই অভিশাপ থেকে মুক্তি নেই?

২০০৪ বা ২০০৫ সালের ঘটনা৷ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমি৷ থাকি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে৷ হলে থাকার কারণে যেটা হয়, পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরে থাকায় ছোট ছোট আনন্দের ঘটনাই হলের মেয়েদের জীবনে খুশির বন্যা বইয়ে দেয়৷ তীব্র গরমের পর বর্ষায় এক পশলা বৃষ্টি ছিল এমন একটি বিষয়৷ টানা বৃষ্টিতে হলের সামনে কিছুটা পানি জমে যায়৷ ছুটির দিন হওয়ায় মেয়েরা সেই পানিতে গিয়ে আনন্দে সবাই মিলে লাফালাফি করে, কেউ কেউ ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে৷ কিন্তু সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সেই আনন্দটা অনেকটাই মলিন হয়ে যায়৷ কেননা, হলের গেটের পাশে বড় বড় দুটি ড্রেনে আবর্জনা জমে বৃষ্টির পানি আটকে যায়৷ ফলে হলের সামনে বাড়তে থাকে পানি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

মধ্যরাতে হঠাৎ চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়৷ আমি দোতলায় থাকতাম৷ বারান্দায় বেরিয়ে দেখি একতলায় পানি উঠেছে৷ মেয়েরা তাদের জিনিসপত্র সরাতে ব্যস্ত৷ কয়েক ঘণ্টা পর হলের বিদ্যুৎ চলে গেল৷ বন্ধ হয়ে গেল পানি সরবরাহ৷ ভোর হতেই হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ৷ সবাই ঢাকা শহরে পরিচিতদের বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি৷ অনেকেই তাদের অভিভাবককে ডেকে পাঠায়, যাতে তাঁরা এসে নিয়ে যান৷ আমার কয়েকজন বান্ধবী সিদ্ধান্ত নেন ৫/৬ জন করে এক একটি আত্মীয় বা পরিচিত পরিবারের বাসায় থাকবেন৷ কারণ, ঢাকা শহরে সবারই তো পরিচিত মানুষ নেই৷ আমি উত্তরায় ভাইয়ার বাসায় যাব ঠিক করলাম৷

ডিজিটাল বিশ্ব

অপরিকল্পিত নগরায়ন

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মহানগরীতে এখন প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস করছেন৷ এই শহরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে৷ ফলে শহরের বেশিরভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা

ঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই এখনো ময়লা ফেলা হয় খোলা জায়গায়৷ এসব ময়লা আবর্জনা, বিশেষ করে কঠিন বর্জ্যের একটা অংশ সরাসরি ড্রেনে গিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়৷ ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় রাস্তাঘাটে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

বর্ষায় খোড়াখুড়ি

ঢাকা শহরের সড়কগুলোতে খোড়াখুড়ির মহোৎসব শুরু হয় বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে থেকে৷ পুরো বর্ষা মৌসুম ধরেই চলে এসব খোড়াখুড়ি৷ সামান্য বৃষ্টিতেই তাই জলাব্ধতার সৃষ্টি হয় শহরে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

নদী ভরাট

ঢাকা শহরের চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতালক্ষ্যা প্রভৃতি নদীগুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা৷ আর তাই বিশাল জনসংখ্যার এ শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

খাল দখল

ঢাকা নগরীর ৬৫টি খাল এক সময়ে এ মহানগরীর পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা রাখত৷ কিন্তু রাজধানীর এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়াও কঠিন৷ বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে৷ অনেকগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে৷ যে দু’য়েকটি টিকে আছে সেগুলোও দখলে জর্জরিত৷

ডিজিটাল বিশ্ব

জলাশয় ভরাট

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে আবাসান ব্যবস্থা গড়ে তোলায় বড় এই শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়েছে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

বুড়িগঙ্গা দূষণ আর দখল

ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী দখল আর দূষণে জর্জরিত৷ দখলে এ নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্থ হয়েছে আর দূষণে নদীর তলদেশে নানান বর্জ্য্ জমে এর গভীরতা কমিয়েছে৷ ফলে পানির প্রবাহ বাড়লেই তা উপচে পড়ে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট

রাজধানীর জলাবদ্ধতা রোধে ঢাকা ওয়াসা বিভিন্ন সময়ে যেসব বক্স কালভার্ট নির্মাণ করেছে, তার বেশিরভাগই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত৷ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তৈরি এসব বক্স কালভার্ট প্রয়োজনের তুলনায় সরু হওয়ায় বৃষ্টির পানি অপসারণে তেমন কাজে আসে না৷ অনেক ক্ষেত্রে এসব কালভার্টে অপচনশীল কঠিন বর্জ্য আটকে গিয়ে পানি নির্গমন পথও বন্ধ হয়ে যায়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

সমন্বয়হীন সংস্কার কাজ

ঢাকা শহরে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে কোনো সমন্বয় না থাকায় সারা বছরই সড়ক খোড়াখুড়ি চলতেই থাকে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়াসা স্যুয়ারেজ নির্মাণের জন্য একটি সড়ক খোড়া হলো, সে কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খোড়াখুড়ি শুরু করল গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগ৷ ফলে সারা বছর সড়কগুলোতে এ ধরনের কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

পলিথিনের অবাধ ব্যবহার

ঢাকা শহরে চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার৷ পলিথিন ব্যবহার না করার আইন থাকলেও তার সামান্যটুকুও মানা হয় না৷ ফলে দুই কোটি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার অধিকাংশজুড়েই থাকে পলিথিন৷ এসব পলিথিন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

ড্রেনের ময়লা ড্রেনে

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন থেকে ময়লা তুলে সেগুলো দিনের পর দিন ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়৷ ফলে বৃষ্টি হলেই সে ময়লার পুনরায় ঠিকানা হয় ড্রেন৷ সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা৷

ডিজিটাল বিশ্ব

নতুন আতঙ্ক ফ্লাইওভার নির্মাণ

ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ফ্লাই ওভার নির্মাণ কাজের দীর্ঘসূত্রিতা৷ ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের ফলে এ এলাকার রাস্তাঘাটের দিনের পর দিন যে ক্ষতি হয়েছে, তার কখনোই সংস্কার না করায় সামান্য বৃষ্টি হলেই বিশাল এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা৷

 হলের ভেতর থেকে বাইরের অবস্থা টের পাওয়া যাচ্ছিল না৷ একতলার পানি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি, হলের সামনেটা নদীতে পরিণত হয়েছে৷ সেটা পার হতে হলে কোনো বাহন ছাড়া উপায় নেই৷ আর আমাকে যেতে হবে সেই উত্তরা৷ অনেকেই নীলক্ষেত থেকে ভ্যান বা রিক্সা ডেকে এনেছিলেন৷ আমার এক বন্ধুকে ফোন করার পর সে-ও একটা ভ্যান নিয়ে হাজির হলো৷ ভ্যানে ওঠার পরও রক্ষা নেই৷ এত পানি যে পা ভিজে যায়৷ রাস্তায় নেই কোনো বাস, নেই কোনো গাড়ি৷ কয়েকটা সিএনজিতে পানি ঢুকে বিভিন্ন জায়গায় থমকে আছে৷ এ যেন এক বিচিত্র জনপদ৷ গতকালও সকালে যেখানে নিউমার্কেটের সামনে ছিল বহু মানুষ, আজ সেই এলাকা পানিতে থই থই৷ নিউমার্কেটের ভেতর থেকে রিকশায় করে অনেক দোকানিকে তাঁদের জিনিসপত্র নিয়ে যেতে দেখলাম৷ চেহারার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখেই টের পাওয়া যায় কী পরিমাণ লোকসান গুণতে হবে তাঁদের৷

সিএনজি চালকদেরও একই অবস্থা৷ কারণ, তারা দিন আনেন দিন খান৷ দিনে একটা নির্দিষ্ট টাকা না উঠলে মালিককে ভাড়া দেবেন কিভাবে? অসহায় এ মানুষগুলোর কষ্টের কাছে আমাদের কষ্ট তো কিছুই না৷ নিউমার্কেটের সামনে রাখা ময়লা আবর্জনার স্তূপ বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে৷ বের হচ্ছে তীব্র গন্ধ৷ বলাকা সিনেমার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম উত্তরা যাওয়ার কোনো বাস বা সিএনজি পাওয়া যায় কিনা৷ কিন্তু কিসের কী! ভ্যানওয়ালা তখনও আমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে, জানালেন, উনি নিজেই পৌঁছে দেবেন ফার্মগেট পর্যন্ত৷ সেখানে পানি থাকবে না বলে ওনার ধারণা৷ কিছুই করার নেই৷ পৌঁছাতে হবে উত্তরায়৷ তাই বন্ধুকে নিয়ে উঠে পড়লাম ভ্যানে৷

DW Bengali Redaktion

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

রাস্তায় যেতে যেতে দেখতে পেলাম মানুষের দুর্ভোগের আরও চিত্র৷ নিউমার্কেটের কাঁচা বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে৷ সেখানকার বিক্রেতারা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন৷ অন্যদিকে, হকার্স মার্কেটেরও একই অবস্থা৷ কাপড় নিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন দোকানিরা৷ কী উদভ্রান্ত অবস্থা সবার৷ হঠাৎ চোখের সামনেই একটা রিকশা উল্টে গর্তে পড়ে গেল, রিকশায় এক নারী ও একটি ছোট ছেলে ছিল, তারা পড়ে গেল পানিতে৷ রিকশাওয়ালাই টেনে তুললেন তাদের৷ কিন্তু ততক্ষণে তারা পানি আর নোংরায় মাখামাখি৷ 

এলিফ্যান্ট রোড দিয়ে যেতে গিয়ে দেখি অবস্থা আরও খারাপ৷ কিছুদিন আগেই রাস্তাটা খোঁড়া হয়েছে৷ তাই বিভিন্ন জায়গায় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে৷ যাঁরা রিকশা চালাচ্ছেন, তাঁরা জানেন না ঠিক কোথায় গর্ত রয়েছে৷ তাই ঘটেছে বেশ কয়েকটি  দুর্ঘটনা৷ পুরো বছরজুড়েই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ, গ্যাসের লাইন বসাতে খোঁড়াখুঁড়ি চলতে ই থাকে৷

জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে যাঁরা শুকনো অলিগলিতে ঢুকেছেন, আটকে গেছেন যানজটে৷ ফলে অবস্থা বেগতিক৷ রওনা হয়েছিলাম বেলা ১১ টায়৷ কিন্তু ফার্মগেট পৌঁছাতে লেগে গেল তিন ঘণ্টা৷ অবশেষে সেখান থেকে বাস নিয়ে পৌঁছে গেলাম উত্তরায়৷

অন্বেষণ | 20.12.2013

এটা কেবল একটা দিনের চিত্র৷ তা-ও প্রায় ১২/১৩ বছর আগের কথা৷ বর্তমানের ঢাকায় মানুষ আরও বেড়েছে৷ তাই যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলার হারও বেড়েছে৷ বিশেষ করে ড্রেনে৷ ফলে ড্রেন বন্ধ হয়ে অতিরিক্ত পানি নদী নালাতে গিয়ে পড়ছে না৷ ফলে একটু বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার৷ অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং মানব আচরণই এই সমস্যার অন্যতম কারণ৷ তাই নগরপিতাকে নিতে হবে পরিকল্পিত পদক্ষেপ আর জনগণকে হতে হবে সচেতন৷ এছাড়া এই অভিশাপ থেকে মুক্তির নেই কোনো উপায়৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷