দিল্লিতেই বিদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি

প্রাণ বাঁচাতে মানুষ নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় নানা কারণে৷ এভাবেই আফগান, সোমালি, তিব্বতি, বার্মিজ, সিরিয়ান শরণার্থীরা দলে দলে চলে আসছেন ভারতে, যদিও এখানে আইনি মর্যাদা নেই তাঁদের৷ বেঁচে থাকার জন্য এঁদের প্রথম পছন্দ দিল্লি৷

গৃহযুদ্ধ, জাতি দাঙ্গা, সরকারি নির্যাতন ইত্যাদি নানা কারণে প্রাণ হাতে নিয়ে নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এঁরা৷ চলে আসেন ভারতে, শরণার্থী হিসেবে৷ কেউ এ দেশে আছেন কয়েক বছর ধরে, কেউ বছর দশেক আবার কেউ কেউ ১৫ বছর বা তারও বেশি৷ দিল্লিই তাঁদের কাছে প্রথম পছন্দের শহর৷ যদিও সরকারি আইনি সংজ্ঞায় এঁদের এ দেশে থাকার অধিকার নেই, তবুও যেটুকু পাচ্ছেন তা জাতিসংঘের রিফিউজি কনভেনশন বা ইউএনএইচসিআর-এর দৌলতে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আইনি সংজ্ঞায় পড়েন না বলে সব শরণার্থীকে একই বন্ধনিতে রাখা হয় না ভারতে৷ এটা নির্ভর করে প্রশাসনিক বড় কর্তাদের সিদ্ধান্তের ওপর৷ তবে ইউএনএইচসিআর-এর কার্ড যাঁদের আছে, তাঁদের ভারতে থাকার একটা পরোক্ষ বৈধতা আছে৷ অধিকার আছে রুটিরুজি বা জীবিকার৷ তাই অনেকেই ছোটখাটো কাজ করেন, মজদুরি করেন, ছোট ছোট দোকান বা রেস্তোরাঁ চালান৷ আর শহরের অলিগলিতে বিক্রি করেন সেদেশের বিশেষ বিশেষ খাবার৷ সেদিক থেকে আফগান ও তিব্বতি খাবারের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি ভারতে৷

কোনো এক উপায়ের সন্ধানে

শিশু, পরিবারসহ শত শত শরণার্থী ইডোমিনি শরণার্থী শিবির থেকে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেন সোমবার সকালে৷ উদ্দেশ্য গ্রিস-ম্যাসিডোনিয়া সীমান্তের কোন অরক্ষিত অংশ থেকে ম্যাসিডোনিয়ায় প্রবেশ করা৷

সাহসিকতার পরিচয়

ম্যাসিডোনিয়ায় প্রবেশের আশায় এক উত্তাল নদী এভাবে পাড়ি দিয়েছেন শরণার্থীরা৷ কাঁটাতারের বেড়া নেই সীমান্তের এমন অংশ খুঁজে পেতে তাদের প্রানান্ত চেষ্টা৷

ভয়, আতঙ্ক

উত্তাল নদী পাড় হতে গিয়ে ভয় পাওয়া এক অল্প বয়সি শরণার্থীকে সাহায্যে এগিয়ে আসেন অন্য শরণার্থীরা৷

পুলিশের বাধা

দলভেদে শরণার্থী শিবির ছাড়া শরণার্থীদের এভাবেই ম্যাসিডোনিয়ায় ঢুকতে বাধা দিয়েছে গ্রিসের পুলিশ৷

স্থানীয়দের সহায়তা

গ্রিক সীমান্তের গ্রাম চামিলোর, যেটি কিনা সীমান্ত থেকে মাত্র এক দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দূরে, বাসিন্দারা এভাবেই পানি দিয়ে সহায়তা করেছেন লম্বা পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা শরণার্থীদের৷

চরম দুর্দশা

ক্লান্ত এবং দুর্বল শরণার্থীরা নদী পাড় হতে গিয়ে চরম দুর্দশায় পতিত হন৷

সতর্ক বার্তা

শরণার্থীদের মিছিল দেখার পর সম্ভবত পুলিশকে ফোন করেন ডানের এই স্থানীয় বাসিন্দা৷

সেনাবাহিনীর হুমকি

ম্যাসিডোনিয়া সীমান্তে শরণার্থীদের প্রথমাংশ প্রবেশের কিছু পরেই সেখানে হাজির হন সেদেশের সেনাবাহিনী৷

মার খাওয়া এবং পোড়া

এক আফগান শরণার্থী দাবি করেছেন, ম্যাসিডোনিয়ার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের পর পিটিয়েছে এবং গাল পুড়ে দিয়েছে৷

আফগান শরণার্থীদের একটা বড় ঘাঁটি রয়েছে দক্ষিণ দিল্লির লাজপতনগর এলাকায়৷ সেখানে গড়ে উঠেছে আফগানি দোকানপাট, ডিসপেন্সারি, ওষুধের দোকান, রেস্তোরাঁ, মুদিখানার দোকান, আরো কত কী! পাড়াটা তাই ‘মিনি কাবুল' বলে পরিচিত৷ আর পাড়ার বড় রাস্তার মোড় ‘আফগান চক' বা চৌমাথা বলে চিহ্নিত৷ পাড়ার দশজন লোকের সঙ্গে দেখা হলে, তাঁদের পাঁচজনই আফগান৷ বুঝতে পারলেও, ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলতে পারেন তাঁরা৷ এঁদের মধ্যে বৈধ পথে এসেছে বেশ কয়েকজন৷ তারপর তাঁদের হাত ধরে অনুপ্রবেশ হয়েছে দলে দলে আগান৷ কেউ চিকিত্সার জন্য, কেউ রুজি-রোজগারের ধান্দায়, কেউ বা নিরাপদে থাকার জন্য৷

ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক চিরকালই বন্ধুত্বের৷ সেটা ভূ-রাজনৈতিক কারণেই হোক বা অর্থনৈতিক কারণেই হোক৷ তবে একটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো৷ ছেলে-বুড়ো সকলের মুখে কুলুপ আঁটা৷ বাইরের লোকের সঙ্গে বড় একটা কথা বলেন না তাঁরা৷ আর মিডিয়া শুনলে তো কথাই নেই৷ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে সরে পড়েন তাঁরা৷ অনেক চেষ্টার পর একটা আফগান রেস্তোরাঁর তরুণ ম্যানেজার আবদুল ওয়ালি নিজেদের সম্পর্কে ডয়চে ভেলেকে শুধু এটুকুই বললেন যে, তাঁরা বছর চারেক আগে এই রেস্তোরাঁ খুলেছেন৷ বিক্রিবাটা ভালোই৷ আফগানিস্তানের খাবার-দাবার দিল্লির লোকেদের ভারি পছন্দ৷ কোনো সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে, মাথা নেড়ে উত্তর দেন, ‘না হয়নি৷' 

Indien - Afghanen in Delhi

ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক চিরকালই বন্ধুত্বের

জানা যায়, শুধু দিল্লিতেই আছে প্রায় হাজার পঞ্চাশেক শরণার্থী৷ এর বাইরে আছে আরও হাজার দশেক অ্যাসাইলাম বা আশ্রয়প্রার্থী৷ শরণার্থীদের কাছে তাঁদের ভিটে-মাটি ছেড়ে আসার কথা জানতে চাইলে বেশিরভাগই মাথা নীচু করে থাকেন৷ স্পষ্ট করে বলতে জিব আটকে যায়৷ মহিলারা আরও নীরব৷ মাঝে মাঝে ছল ছল চোখে যা বলার বুঝিয়ে দেন তাঁরা৷ বয়স্ক নারী-পুরুষরা কখনও কখনও স্বপ্নমেদুর হয়ে পড়েন৷ হয়ত ভাবতে থাকেন, একদিন দেশে ফিরতে পারবেন৷ আবার অন্য একটা অংশ তা মনে করে না৷ এক বয়স্ক আফগান গৃহকর্তা বলেন, ‘‘এই তো বেশ আছি৷ দিল্লির মাটিতে মানিয়ে সংসার পেতে বসেছি৷ তেমন বৈরিতা আর নেই৷ রাজধানির জীবন ও সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চাই৷ ছেলে-মেয়েরা এখানে পড়াশুনা করতে পারছে, ইংরেজি শিখছে৷ আমরা হিন্দি শিখে নিয়েছি কাজ চালাবার মতো৷ সুযোগ পেয়েছি গ্রাসাচ্ছাদনের৷''

Indien - Afghanen in Delhi

প্রতি শরণার্থী পরিবার পিছু দেওয়া হয় মাসে পাঁচ হাজার টাকা

তবে সব শরণার্থীদের অভিজ্ঞতা কিন্তু এক নয়৷ সোমালিয়ার শরণার্থীরা দিল্লিতে নাকি প্রান্তিক৷ অনেক সময় তাঁদেরকে নাইজেরিয়ান বলে ভুল করে মানুষ৷ সম্প্রতি মাদক ও যৌন পেশায় জডিত থাকার অভিযোগে দক্ষিণ দিল্লির এক এলাকার লোকেরা হামলা চালায় তাঁদের ওপর৷ তাই ভয়ে ঐ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয় তাঁরা৷ এর পেছনে স্থানীয় কিছু রাজনীতিকদের উসকানি ছিল বলে পুলিশের দাবি৷ এছাড়া এঁদের মধ্যে যা ‘সিঙ্গল' নারী শরণার্থী, তাঁদের জীবনটা বেশি কষ্টকর হয়৷ আশেপাশের পুরুষদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় তাঁদের৷ ‘‘নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে প্রাণান্তকর লড়াই এখানেও কিছু কম নয়'', বলেন সোমালিয়ার ২৭ বছর বয়সি সাদিয়া শেখ৷ বলেন, ‘‘দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভাবছি দেশে ফিরে যাবো৷''

কী চলছে সোমালিয়ায়? সোমালিয়ার সামরিক সরকারকে উচ্ছেদের পর থেকে সেখানে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ, সেই ১৯৯১ সাল থেকে৷ এখনও প্রকৃত সরকার বলে সেদেশে কিছু নেই৷ বরং সোমালিয়া এখন দুর্ভিক্ষের মুখে৷ আফগান ও সিরিয়ার পর সোমালিয়া থেকে সবথেকে বেশি শরণার্থীর আগমন৷

বিশ্ব | 22.08.2012

এপ্রিলে শুরু

হোটেলটির নাম সিটি প্লাজা৷ এথেন্সের কেন্দ্রে অবস্থিত সাত তলা এই ভবনে এপ্রিলের শেষ দিকে তিনশ’র বেশি শরণার্থী ওঠেন৷ তাঁরা এসেছেন আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক ও সিরিয়া থেকে৷

হোটেলটি বন্ধ ছিল

গ্রিসের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকদিন ধরেই খারাপ৷ সে কারণে কয়েক বছর ধরে হোটেলটি বন্ধ ছিল৷ মালিক এটি বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন৷ তবে এখন হোটেলের অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের রুমের চাবি দেয়া হচ্ছে৷

হোটেলে উঠছেন তাঁরা

সিরীয় এক পরিবারকে হোটেলের রুমে উঠতে দেখা যাচ্ছে৷ শরণার্থীরা আগে এমন সব শিবিরে ছিলেন যেখানে থাকার জায়গাটি ভালো ছিল না৷ এছাড়া ছিল পর্যাপ্ত খাবারের অভাব৷ স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ভালো ছিল না৷

নিজেদেরই পরিষ্কার করতে হচ্ছে

হোটেলে ওঠা শরণার্থীরা নিজেরাই নিজেদের রুম ও হোটেল পরিষ্কার করছেন৷ ছোট্ট এই দুই সিরীয় শিশু – সিদ্রা (৭) ও সেজার (১০)-কে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে বিভিন্ন রুমে যেতে দেখা যাচ্ছে৷

এক আফগান পরিবার

আলি জাফরি ও তাঁর পরিবার আফগানিস্তান থেকে এসেছে৷ কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও অনুবাদক জাফরি তাঁর স্ত্রী ওয়াজিহা ও দুই সন্তানসহ আগে ছিলেন পরিত্যক্ত এথেন্স বিমানবন্দরে স্থাপন করা এক শরণার্থী শিবিরে৷ জাফরি জানান, তাঁরা জার্মানি যেতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু আফগানিস্তান থেকে গ্রিস পর্যন্ত আসার পরই সীমানা বন্ধ হয়ে যায়৷

একসঙ্গে খাবার রান্না

সিরীয় শরণার্থীরা ইটালীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মিলে রান্না তৈরি করছেন৷ দাতাদের কাছ থেকে পাওয়া খাবার দিয়ে হোটেলটিতে তিনবেলা স্বাস্থ্যকর খাবার রান্না করা হচ্ছে৷

এবার একসঙ্গে খাওয়ার পালা

হোটেলের ডাইনিং রুমে বসে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের মধ্যে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে৷

শিশুদের খেলার ব্যবস্থা

স্বেচ্ছাসেবকরা শিশুদের সঙ্গে খেলছেন৷ হোটেলে ওঠা শরণার্থীদের একটি বড় অংশ শিশু৷ গ্রিসে আটকে পড়া প্রায় ৫০ হাজার শরণার্থীর মধ্যেও শিশুর সংখ্যা অনেক৷

অবশেষে বিছানা

তিন বছরের ফিদান দাউদ আর তার ভাই সাত বছরের রশিদ৷ অবশেষে তারা নিজেদের রুমে নিজেদের বিছানায় খেলা করতে পারছে৷ তাদের নিজেদের টয়লেট ও গোসলখানাও আছে৷ অথচ এর আগে তারা এমন এক শরণার্থী শিবিরে ছিল যেখানে ১০০ জনের জন্য ছিল মাত্র একটি টয়লেট৷ মা-বাবার সঙ্গে এই দুই শিশু সিরিয়া থেকে এসেছে৷

অবশ্য দিল্লিতে সবথেকে বেশি শরণার্থী আফগানিস্তানের৷ প্রথমে সোভিয়েত আগ্রাসন, তারপর গৃহযুদ্ধ৷ তালেবান শাসন এবং তালেবান ও আফগান বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ৷ বেশির ভাগ আফগান শরণার্থী দেশে ফিরে যেতে চান না সেখানকার প্রতিকূল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে৷ তরুণ আফগান মনোভাব, ‘এই তো দিব্যি আছি৷ লেখাপড়া, কাজ সব চলছে৷ দেশে ফিরে কী হবে?' মিয়ানমারেও ২০১১ সাল পর্যন্ত ছিল একই নিরাপত্তা পরিস্থিতি৷ সামরিক শাসন, গৃহযুদ্ধ, জাতি দাঙ্গা৷ হিংসা, হানাহানি ও সামরিক বাহিনীর হাতে অত্যাচারে জর্জরিত চেন জাতি গোষ্ঠী৷ বেসামরিক শাসনকালেও হাজার হাজার রোহিঙ্গা এবং চেন জাতিগোষ্ঠী দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল, যাঁদের কারুর কারুর বাড়ি আজ এই দিল্লি শহর৷ আর তিব্বতি শরণার্থীদের সংখ্যা তো দিল্লিতেই ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে৷

কীভাবে সাহায্য করা হয় শরণার্থীদের? এঁদের সাহায্য করে জাতিসংঘের শরণার্থী হাই-কমিশনারের মাধ্যমে উদ্বাস্তু সহায়তা কেন্দ্র৷ প্রতি শরণার্থী পরিবার পিছু দেওয়া হয় মাসে পাঁচ হাজার টাকা৷ এছাড়া অন্যান্য সহায়তার মধ্যে আছে – শারীরিক ও মানসিক চিকিত্সা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, স্থানীয় ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি৷ তবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই মানসিক বিষাদে আক্রান্ত, বিশেষ করে যাঁরা পরিবারহীন, মানে একা৷ মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতারা তাঁদের বোঝান, পৃথিবীটা বড় জটিল৷ তবে দেশের বাইরেও দেশ আছে, ঘরের বাইরেও আছে ঘর৷ সেই ঘর শুধু খুঁজে নিতে হবে৷

বন্ধুরা, আপনি কি কোনো শরণার্থী পরিবারকে চেনেন? জানান আপনার অভিজ্ঞতা, লিখুন নীচের ঘরে৷