ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে পুলিশ

পুলিশের স্বভাবটাই হলো এমন৷ আর এই উপমহাদেশের পুলিশের মধ্যে সেই বদ লক্ষণটি তুলনায় হয়ত একটু বেশিই প্রকট৷ একেকজন পুলিশকর্মী একাই একেকটি প্রশাসন হয়ে বসে থাকেন৷ আর একা যখন, স্বৈরাচার ছাড়া আর উপায় কী!‌

ভারতের যেখানেই পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী বা সেনাকে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের নামে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে রাখা হয়েছে, সেখানেই সেই অতিরিক্ত ক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে৷ সে কাশ্মীর হোক বা উত্তর-পূর্ব ভারত, সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী সুরক্ষা দেওয়ার বদলে সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও বেশি অনিরাপদ করে তোলে প্রায়শই৷ আর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা নেই, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা নেই, সেখানেই পুলিশ সর্বতোভাবে তৎপর স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত করেও আইনের অপশাসন কায়েম করতো৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

একটি ছোট ঘটনা৷ বারাসতের ফল ব্যবসায়ী ইউনুস আলি মন্ডল তাঁর দাদার হাত দিয়ে ঝাড়খন্ডের ১২ জন ফল ব্যবসায়ীর কাছে ৪৫ লক্ষ টাকা পাঠাচ্ছিলেন৷ যে গাড়িতে সেই টাকা ঝাড়গ্রাম যাচ্ছিল, সেটি গভীর রাতে খড়গপুর থানা এলাকায় একটি গাড়িকে ধাক্কা মারে৷ নিছকই পথ দুর্ঘটনা৷ পুলিশ নিয়ম অনুযায়ী, দু'টি গাড়িকেই আটক করে এবং সেই সঙ্গে ঐ ৪৫ লক্ষ টাকা ভর্তি দু'টি ব্যাগও বাজেয়াপ্ত করে৷

যবে থেকে শুরু

হাতে টানা রিকশার উদ্ভাবন ১৬ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, জাপানে৷ ১৯ শতকে যানটি গোটা এশিয়ায় বহুল ব্যবহৃত এক গণ-বাহন হয়ে দাঁড়ায়৷ ১৮৮০ সালে ভারতে প্রথম রিকশা চালু হয় হিমাচল প্রদেশের সিমলায়৷ সেখান থেকে হাতে টানা রিকশা চলে আসে কলকাতায়৷ ১৯১৪ সাল নাগাদ কলকাতায় ভাড়াটে রিকশার চলন হয়৷ এরপর এত বছর পরেও কলকাতার কোনো কোনো অঞ্চলে টিকে আছে এই হাতে টানা রিকশা৷

প্রধান সড়ক থেকে গলিতে

কলকাতার প্রধান সড়কপথগুলোতে এখন অবশ্য আর রিকশা চলাচলের অনুমতি দেয় না পুলিশ৷ তার প্রথম কারণ রিকশার মতো ধীরগতির যানের কারণে রাস্তায় যানজট তৈরি হয়৷ তবে অন্য আর একটি কারণ হলো, আজকের দিনে রিকশার সওয়ারি হওয়া নিরাপদও নয়৷ ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই রিকশারা আশ্রয় নিয়েছে পুরনো কলকাতার গলি-ঘুঁজিতে, যেখানে ব্যস্ত ট্রাফিকের তাড়াহুড়ো নেই৷ রিকশায় চড়ে দুলকি চালে সফর করাও উত্তর কলকাতার অনেক বাসিন্দারই এখনও পছন্দসই৷

এখনো ব্যবহারের কারণ

আধুনিক কোনো যন্ত্রচালিত যানের সঙ্গে গতি বা স্বাচ্ছন্দ্যে পাল্লা দিতে পারে না আদ্যিকালের রিকশা৷ তা-ও এটি কী করে কলকাতায় থেকে গেল, তার কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে৷ এখনও অনেক বয়স্ক মানুষ রিকশা চড়তে পছন্দ করেন কারণ, এই যানটি তাঁদের জন্য যাকে বলে একেবারে হ্যাসল-ফ্রি৷ ঠিক একই কারণে অনেক বাড়ির বাচ্চারাও স্কুলে যাওয়ার সময় রিকশায় চড়ে যায়৷ তবে কলকাতা শহরে রিকশার সবথেকে বড় উপযোগিতা বোঝা যায় বর্ষায়৷

রিকশার ওয়ার্কশপ

যেহেতু শহরের রাস্তায় এখনও রিকশা চলে, মেরামতির জন্য রিকশার নিজস্ব হাসপাতালও নেই নেই করে এখনও দু-একটি টিকে আছে৷ এগুলো বিশেষভাবে হাতে টানা রিকশার মেরামতির জন্যই৷ অন্য কোনও কাজ এখানে হয় না৷ তবে আজকাল অসুবিধে হয়, কারণ রোজগার প্রতিদিনই কমছে৷ কাজ জানা লোকেরও অভাব৷ যদিও বা লোক পাওয়া গেল, তাদের দেওয়ার মতো যথেষ্ট কাজ পাওয়া যায় না৷ দোকানের মালিক শুয়ে বসেই দিন গুজরান করেন৷

কাঠ দিয়ে তৈরি চাকা

রিকশা তৈরি বা মেরামতিতে কিন্তু এখনও সেই পুরনো পদ্ধতিই বহাল৷ রিকশার চাকা যেমন এখনও কাঠ দিয়েই তৈরি হয়৷ মাঝখানের অংশটা যথারীতি লোহার, কিন্তু বাকি চাকার জন্য কারিগরদেরই জোগাড় করে আনতে হয় উঁচু মানের কাঠ যা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা শহরের খানা-খন্দে ভরা এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে রিকশাকে গড়গড়িয়ে নিয়ে যাবে৷ সওয়ারিকে নিয়ে রিকশা যাতে ভেঙে না পড়ে, তার জন্য ভালো কাঠ বা লোহা যেমন দরকার, তেমনই দরকার ওস্তাদ কারিগর৷

খড় দিয়ে তৈরি বসার গদি

সওয়ারিদের যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্যও রিকশাওয়ালারা সমান যত্নবান৷ যাত্রীদের বসার গদিটি যাতে ঠিকঠাক থাকে, এর জন্য নিয়মিত তার পরিচর্যা হয়৷ কাপড় আর রঙিন প্লাস্টিকের তৈরি এই গদির খোলে কী থাকে জানেন তো? না, তুলো বা ফোম নয়, নির্ভেজাল খড়৷ প্রকৃতি-বান্ধব উপাদান ব্যবহার করার এমন নমুনা কি আর কোনো শহুরে যানের ক্ষেত্রে দেখেছেন? রিকশা দূষণ ছড়ায় না, এটাও একটা খেয়াল রাখার মতো বিষয়৷

অমানবিক

তবু হাতে টানা রিকশা উঠে যাচ্ছে কলকাতা থেকে৷ কারণ, একজন মানুষ আর একজন মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, এটা অনেকের কাছেই খুব অমানবিক মনে হয়৷ সাইকেল রিকশাতে যদিও একই ঘটনা ঘটে, কিন্তু সেক্ষেত্রে চালক প্যাডেলের মাধ্যমে কিছুটা যান্ত্রিক সুবিধা পান৷ যদিও এই রিকশা নিয়ে রোমান্টিকতার কোনো শেষ নেই৷ পরিচালক বিমল রায়ের ‘দো বিঘা জমিন’ ছবির গোটা ক্লাইম্যাক্স সিনটিই গড়ে উঠেছে দুটি হাতে টানা রিকশার রেষারেষির মধ্য দিয়ে৷

সময় কি বিদায় নেয়ার?

তাই দিনের শেষে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় যখন ছায়া দীর্ঘতর হয়, আর রাস্তার একধারে স্থবির হয়ে অপেক্ষায় থাকে সওয়ারি না পাওয়া একটি রিকশা, ব্যস্ত শহর তার পাশ দিয়ে ছুটে যেতে যেতে তার কর্কশ কলরবে যেন বারবার মনে পড়িয়ে যায়, এবার সময় হয়েছে বিদায় নেওয়ার৷ আধুনিক সময়ের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না রিকশা৷ সে কারণেই রাজপথ থেকে সরে গিয়ে তাকে মুখ লুকোতে হয়েছে গলিতে৷ খুব শিগগিরই বোধহয় সেই আড়ালটুকুও যাবে৷

যদিও আইন অনুযায়ী, এই টাকার সঙ্গে ঐ পথ দুর্ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই৷ পুলিশ নিয়মমাফিক দুই গাড়ির মালিক এবং চালকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারে, তার বেশি কিছু নয়৷

কিন্তু ফল ব্যবসায়ী ইউনুস মন্ডল সেই টাকা উদ্ধার করতে পারেন না৷ যতবার তিনি পুলিশের কাছে তদ্বির করতে যান, ততবার তাঁকে এ থানা থেকে ঐ থানা, পুলিশের এক আধিকারিক থেকে অন্য আধিকারিকের কাছে ঠেলে পাঠানো হয়৷ সব জায়গায় যান ইউনুস মন্ডল, জানান, ব্যবসা চালু রাখতে গেলে ঐ টাকাটা ফেরত পাওয়া তাঁর দরকার, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না৷ শেষে, সুবিচারের আশায় খড়গপুর যে জেলায়, সেই পশ্চিম মেদিনীপুরের খোদ পুলিস সুপার ভারতী ঘোষের দ্বারস্থ হন ইউনুস মন্ডল৷ কিন্তু তাতেও তাঁর সমস্যার সুরাহা তো হয়ই না, বরং তাঁর অভিযোগ, তাঁকে বলা হয়, সেই ৪৫ লক্ষ টাকার উৎস জানতে বিস্তারিত তদন্ত করবে পুলিশ এবং তাতে বিস্তর সময় লাগবে৷ ইউনুস মন্ডল এই প্রশাসনিক বক্তব্যের সারবত্তা মানতে নারাজ থাকায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়, বেশি বাড়াবাড়ি করলে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে গরু পাচার এবং নিষিদ্ধ মাদকের চোরা কারবারের কেস দিয়ে দেওয়া হবে তাঁকে৷ অভিযোগ, স্বয়ং পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষই নাকি তাঁকে এই অন্যায় হুমকি দেন!‌

কিন্তু ইউনুস মন্ডল হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না৷ তিনি প্রথমে উচ্চতর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিব এবং রাজ্য পুলিসের ডিরেক্টর জেনারেলের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন৷ তাতেও কিছু না হওয়ায় সরাসরি কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছেন ইউনুস মন্ডল৷ বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন এবং রাজ্য সরকারের কাছে এ ব্যাপারে কৈফিয়ৎ তলব করেছে কলকাতা হাইকোর্ট৷ অন্যদিকে মেদিনীপুর জেলা পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ঐ ফল ব্যবসায়ী মূলত চোরা কারবারি এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ নাকি আগে থেকেই আছে৷

রোজকার খাবার

শৌখিন সুখাদ্য নয়, দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা মেটায় এইসব দোকান৷ রুটি, মাখন, দুধ, সবই পাওয়া যায় এখানে দিনভর৷

বাঘের দুধ

কথায় বলে, নিউ মার্কেটে খুঁজলে বাঘের দুধও পাওয়া যায়৷ আদতে তা হয়ত পাওয়া যায় না, কিন্তু দুধ থেকে তৈরি বিদেশি চিজ পাওয়া যায় হরেক রকম৷

কেক-পেস্ট্রি

নিউ মার্কেটের বিশেষ খ্যাতি তার কেক-পেস্ট্রি-প্যাটির সম্ভারের জন্য, যা চলে আসছে সেই সাহেবি আমল থেকে৷ যে কারণে, আজও ক্রিসমাসের কেক মানেই নিউ মার্কেট৷

ঐতিহাসিক নাহুমস্

এখনও চলছে ১১৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘নাহুম এন্ড সন্স’, যা কলকাতাবাসীর কাছে নাহুমস্ নামে পরিচিত৷ কলকাতার এক ইহুদি পরিবার পরিচালিত বেকারি এটি৷ সারা পৃথিবীতে এদের খাবারের ভারি নামডাক৷

রাম বল, টার্ট

কলকাতার নিজস্ব কিছু পেস্ট্রি, যেমন রাম বল বা লেমন টার্ট বিখ্যাত হয়েছে এই নিউ মার্কেট থেকেই, যা পরে অনুসরণ করেছে অন্যরা৷

কাজু-কিশমিশ

শুধু কাবুলিওয়ালারা নয়, কলকাতা শহরকে কাজু, কিশমিশ, খোবানির মতো শুকনো খাবার চিরকাল সরবরাহ করে গেছে নিউ মার্কেটের এইসব খাবারের দোকান৷

মুখরোচক

নানা ধরনের চানাচুর, সুখাদ্য না হলেও সুস্বাদু তো বটেই৷ এরও ভাঁড়ার আছে নিউ মার্কেটে৷

হাতে বানানো রুটি

নানা ধরনের সুখাদ্য ও সুস্বাদু খাবারের পাশে, নিউ মার্কেটে আপনি পাবেন সাধারণ হাতে বানানো রুটিও৷ দুপুরে এই রুটি খেতে আজও ভিড় জমে নিউ মার্কেটে৷

বিদেশি বাহার

আর আছে নানা স্বাদের বিদেশি চকোলেট, যা অনেক বড় দোকানেও পাওয়া যায় না৷ এ সবেরও খনি মহানগরীর এই নিউ মার্কেট৷

পুলিশের এই দাবি যদি সত্যি হয়, তা হলে বলতেই হয়, একজন দাগী চোরা কারবারির পক্ষে এভাবে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রশাসন এবং বিচারবিভাগের দ্বারস্থ হওয়া রীতিমত অভিনব এবং সম্ভবত বেনজির৷ যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে ইউনুস মন্ডল আদতেই অসৎ এবং অবৈধ কাজে জড়িত, তা হলে তাঁর পক্ষে এমন সৎসাহস দেখানো নেহাত সোজা কথা নয়৷ নিজের টাকা ফেরত পেতে তিনি সবসময়ই আইনের মধ্যে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এটাও লক্ষ্যণীয়৷

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার আদালতের হাতে৷ রাজ্য সরকার কী অবস্থান নেয়, সেটাও দেখার৷ বিশেষ করে নোট বাতিল পরবর্তী টাকার আকালে একজন ফল ব্যবসায়ীর ৪৫ লক্ষ টাকা আটকে রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত এবং ন্যায়সঙ্গত, সেটা কতটা সাধারণ মানুষের স্বার্থে, সেটাও দেখার৷ অবশ্য ইউনুস মন্ডলকে যদি একজন খেটে খাওয়া ব্যবসায়ী হিসেবে রাজ্য সরকার মেনে নেয়, তবেই এ প্রসঙ্গ ওঠে৷ প্রসঙ্গত, পশ্চিম মেদিনীপুরের সুপার ভারতী ঘোষ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী৷ বিশেষত মাওবাদী অধ্যুষিত বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে জঙ্গি শাসনে ভারতী ঘোষের কৃতিত্ব মমতা সরকারের কাছে স্বীকৃত এবং পুরস্কৃত৷ তা সত্ত্বেও রাজ্যবাসী, বিশেষত এই রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষ, যাঁরা জঙ্গি অথবা চোরাকারবারি নন, যাঁরা পরিশ্রমের উপার্জনে বাঁচেন, সৎ, নিয়মনিষ্ঠ, আইনানুগ জীবন কাটান, তাঁরা কিন্তু গভীর উদ্বেগ এবং আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকবেন এই মামলার দিকে৷

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে নীচে মন্তব্যের ঘরে লিখুন৷