আলাপ

ধর্মাশ্রয়ী বাংলাদেশের রাজনীতি

বাংলাদেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোটের পার্থক্য সামান্য৷ আ. লীগের চেয়ে বিএনপি ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ভোট কম পায়৷ দল দু’টির এই ভোট মোটামুটিভাবে নির্দিষ্ট৷ আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী, সাংগঠনিক ভিত্তি আছে৷

বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বিক্ষোভ

১.

আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির অনেক দুর্বল৷ আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না, মূলত তারাই বিএনপির ভোটার৷ ফলে সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকলেও বিএনপি ভোট ঠিকই পায়৷

সাংগঠনিক ভিত্তি আছে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর৷ সারা দেশে নয়, কিছু এলাকায়৷ তাদের ভোটের সংখ্যা ৩ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ৷ এককভাবে জামায়াত যদি নির্বাচন করে, দু-তিনটির বেশি আসন পায় না, পাবে না৷ বিএনপির সঙ্গে একত্রিত হয়ে নির্বাচন করলে জামায়াত ১৫ থেকে ২০টি আসন পেয়ে থাকে৷ তাদের রাজনৈতিক শক্তি দৃশ্যমান করার জন্যে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য করাটা খুব জরুরি৷ আবার বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলে ১২০ থেকে ১৩০টি আসন পাওয়া সম্ভব৷ সরকার গঠনের জন্যে প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসন পাওয়া সম্ভব নয়৷

বিএনপি-জামায়াত একে অপরের স্বার্থে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেছে৷ তারা যখন সম্মিলিতভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন সরকার গঠন করতে পারে (যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়)৷ বিএনপির ভেতরে জামায়াত মনোভাবাপন্ন কিছু নেতা আছে৷ তারা আলোচনায়-দর কষাকষির সময়ে কৌশলে জামায়াতকে বেশি সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে৷ বিএনপি যখনই ক্ষমতায় যায়, খুব গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র বা শিক্ষার মতো মন্ত্রণালয় জামায়াত মনোভাবাপন্ন নেতারা পেয়ে থাকে৷

বিএনপি-জামায়াত ঐক্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, বড় দল বিএনপিকে সবসময় চাপে রাখে ছোট দল জামায়াত৷ জামায়াত চেষ্টা করে তার নীতি-আদর্শ বিএনপির ভেতরে বিস্তার ঘটাতে৷ কিছু কিছু পেরেছেও৷ ফলে বিএনপি ক্রমেই জামায়াতের উপর নির্ভরশীল একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে৷ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াত অনেকটা প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারণে৷ বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে এটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়৷ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বুঝতে হলে, এই বিষয়টি বুঝতে হবে৷

২.

বিএনপি-জামায়াত একত্রিত হয়ে নির্বাচন করলে, আওয়ামী লীগের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে (১৫১টি) বিজয়ী হওয়া শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব৷ সে কারণে আওয়ামী লীগের প্রধান টার্গেট বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যে ফাটল ধরানো৷ ফাটল ধরানোর জন্যে যতটা না প্রকাশ্যে তার চেয়ে বেশি গোপনে জামায়াতকে বিএনপির থেকে সরাতে চায়৷ আওয়ামী লীগ প্রথম বড় সুযোগ পেয়ে যায় ১৯৯৬ সালে৷ ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কে অবণতি ঘটে৷ সুযোগটা নেয় আওয়ামী লীগ৷ তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করে না, কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলে৷ আওয়ামী লীগ নেতারা তখন জামায়াত নেতাদের সঙ্গে গোপনে-প্রকাশ্যে মিটিং করে৷ দুই প্লাটফর্মে থেকে আওয়ামী লীগ-জামায়াত একই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে৷ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা মুছে ফেলার জন্যে জামায়াতের প্রয়োজন ছিল, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য৷ বিএনপির সঙ্গে তো ঐক্য ছিলই৷ আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ঐক্য হলো, এখন আর বলা যাবে না জামায়াত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল – এই ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কৌশলগত ঐক্যের ক্ষেত্রে জামায়াতের নীতি৷

এই নীতিতে তারা অনেকটা সফল হয়৷ আন্দোলনে পতন হয় বিএনপি সরকারের৷ সরকার পতনের পরও এককভাবে নির্বাচন করে বিএনপি ১১৬টি আসন পায়৷ এককভাবে নির্বাচন করে জামায়াত আসন পায় মাত্র তিনটি৷ তারপর আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে৷ ভুল বুঝতে পারে জামায়াত৷ তারা আবার এগিয়ে আসে বিএনপির দিকে৷ ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচন করে সরকার গঠন করে৷ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ৷

বিএনপি-আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে ফেলে জামায়াতের মতো একটি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পতিত ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলকে৷ এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিতে ধর্ম বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে৷

৩.

বাংলাদেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর উল্লেখ করার মতো কোনো জনসমর্থন বা ভোট নেই৷ ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে তারা কোনো ‘ফ্যাক্টর' হয়ে উঠতে পারেনি৷ তাদের তুলনায় ভোটের রাজনীতিতে বড় ‘ফ্যাক্টর' ‘স্বৈরাচার' এরশাদের জাতীয় পার্টি৷ এই আঞ্চলিক দলটি ১৫ থেকে ২০টি আসন পেয়ে থাকে৷ ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি ফ্যাক্টর৷ জাতীয় পার্টি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না হলেও, ধর্মকে তারা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে৷ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছে তারা৷ ধর্মাশ্রয়ী জাতীয় পার্টিকে কাছে টেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ৷

জামায়াতকে বিএনপি, জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগ পৃষ্ঠপোষকতা করছে৷ দু'টি রাজনৈতিক দলই এভাবে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করছে৷ প্রচণ্ড গোঁড়া আরও কিছু ধর্মভিত্তিক দল আছে৷ নিজেদের রাজনৈতিক দল না বললেও, তারা আসলে রাজনীতিই করে৷ যেমন হেফাজতে ইসলাম৷ তাদের দেশব্যাপী সংগঠন নেই, ভোট নেই৷ সারা দেশের কওমী মাদ্রাসার কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী আছে তাদের হাতে৷ ফলে তারা চাইলে একদিনে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ঘটাতে পারে৷ বিএনপি মানসিকভাবে অনেকটা হেফাজতে ইসলামের কাছাকাছি বহু আগে থেকে৷ শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশের সময় তা আর একবার প্রমাণ হয়৷ বিএনপি-জামায়াতের যে সরকার বিরোধী আন্দোলন, সেই আন্দোলনে যদি হেফাজতে ইসলাম যোগ দেয়, আওয়ামী লীগ মনে করে বড় বিপদে পড়তে হতে পারে৷

বিএনপি-জামায়াতকে নিপীড়ন-নির্যাতন করে দমন করলে, ধর্মের উপরে আঘাতের অভিযোগ অতটা আসে না, জামায়াত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও৷ হেফাজতে ইসলামের উপরে পুলিশি আক্রমণ হলে ‘ধর্মের উপর আঘাত' – এমন প্রচারণা জোরালোভাবে সামনে চলে আসে৷ সরকার চায় না তার বিরুদ্ধে এমন প্রচারণা চলুক৷ ফলে সরকার কৌশলে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হেফাজতে ইসলামকে হাত করার নীতি নেয়৷ হেফাজতের অপছন্দ ‘নারী নীতি' বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে সরকার৷

গোলাম মোর্তোজা

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে দেয়৷ বক্তৃতায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে ধর্মীয় প্রসঙ্গ আনা হয়৷ যেমন ‘দেশ চলবে মদিনা সনদ অনুযায়ী' – প্রধানমন্ত্রী কথাটা মাঝেমধ্যে বলেন৷ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম রাখা আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক৷ নিজেরা ধর্ম বিরোধী নয়, এটা প্রমাণ করার জন্যেই আওয়ামী লীগ এ সব করেছে, করছে৷ বিএনপি বা জামায়াতের চেয়েও তারা বেশি ধর্মভীরু এটা প্রমাণ করছে আওয়ামী লীগ৷ হেফাজত ব্লগারদের তালিকা করেছে, সেই তালিকা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সরকার প্রায় নির্বিকার৷ ‘জঙ্গিরা করেছে, বিএনপি-জামায়াত করেছে' – ইত্যাদি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে থেকে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে৷

৪.

ভোটের রাজনীতির খেলায় বিএনপি-আওয়ামী লীগ ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে৷ আর এখন ভোটারবিহীন নির্বাচন করে, জনসমর্থন ছাড়া দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার জন্যে আওয়ামী লীগ ধর্মকে ব্যবহার করছে৷ ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করছে৷

বিএনপির সঙ্গে থেকে জামায়াত প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে৷ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জামায়াতে ইসলামীকে দুর্বল করা গেলেও, অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো ক্রমশ বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو