ভারত

ধর্মীয় গোড়ামি দিয়ে সংগীতকে বেঁধে রাখার চেষ্টায় বিতর্ক

সংগীতের কোনো ধর্ম নেই, সীমান্ত নেই৷ অথচ ধর্মীয় মৌলবাদীরা সেটা বুঝতে চান না৷ দুই মুসলিম তরুণীর সংগীত প্রতিভার কণ্ঠরোধ করতে তাঁরা জারি করেছেন ফতোয়া৷ প্রকাশ্যে গান গাওয়া নাকি শরিয়তবিরোধী৷ তাই এটা বন্ধ করতে হবে৷

প্রতীকী ছবি

লালন ফকিরের কথা টেনে বলা যায়, জাত দিয়ে কি বিচার হয় সংগীতের? হয় না৷ লালনের গানে যে ঈশ্বর-আল্লাহ একাকার হয়ে গেছে, সে কথা কে না জানে? তাঁর গানের আবেদন অবিনশ্বর৷ কিন্তু বহুত্ববাদী আধুনিক ভারতে সেই সহিষ্ণুতা নিম্নগামী৷

ভারতের দক্ষিণী রাজ্য কর্নাটক৷ সেখানেই বাস করেন ২২ বছরের মুসলিম তরুণী সুহানা সাঈদ৷ এক টিভি চ্যানেলের রিয়্যালিটি সংগীত শো অনুষ্ঠানে হিন্দু দেবতা বালাজির ওপর ভক্তিসংগীত গেয়ে শোনান তিনি৷ প্রতিযোগিতার বিচারকমণ্ডলি তাঁর গায়কির উচ্চ প্রশংসা করে বলেন, হিন্দু ভক্তিগীতি গেয়ে সুহানা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে৷ কিন্তু গত ৪ঠা মার্চ ঐ এপিসোডটি টেলিকাস্ট হবার পর এক শ্রেণির মুসলিম মৌলবাদীরা সুহানার ওপর খড়্গহস্ত৷ ম্যাঙ্গালোর মুসলিম গ্রুপ ফেসবুকে তাঁকে হুমকিও দেয় এই বলে যে, সুহানা এভাবে টিভিতে সকলের সামনে গান গেয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করেছেন৷ অন্য সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়ে যদি সে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন, তাহলে ভুল করেছেন সুহানা৷

এখানেই শেষ নয়৷ সুহানার মা-বাবাকেও ফেসবুকে হুমকি দিতে ছাড়েনি তারা৷ বলা হয়েছে, এভাবে গান গাইতে উৎসাহ দিয়ে মেয়েকে নরকের পথে ঠেলে দিয়েছেন তাঁরা৷ এমনকি, সুহানার হিজাব খুলে নেবার কথাও বলা হয়েছে৷ কারণ সুহানা হিজাব পরেই গানে অংশ নিয়েছিলেন৷ তাই হিজাব পরার অধিকার নাকি হারিয়েছেন তিনি৷ ভারতের মৌলবাদীরা সুহানার সংগীত প্রতিভা উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, যেসব মুসলিম বাচ্চারা ছয় মাসের মধ্যে কোরান পড়া রপ্ত করে তাঁদের কৃতিত্ব হাজার গুণ বেশি৷ সুহানা মুসলিম আর ইসলাম একেশ্বরবাদী৷ অথচ সুহানা বহু ঈশ্বরের ভজনা করেছেন৷ সেটা হতে পারে না৷ বলা বাহুল্য, এ ধরনের হুমকির পর সুহানা এখন ঘরবন্দি৷ কিন্তু গান তো আর ছাড়া যায় না...৷ সংগীত যে তাঁর জীবন৷

প্রসঙ্গত, ম্যাঙ্গালোর ঐ মুসলিম গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার৷

পাশাপাশি পূর্ব-ভারতের আসাম রাজ্যেও ঘটেছে একই ধরনের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ঘটনা৷ ১৬ বছরের কিশোরী নাহিদ আফ্রিনকে নিয়ে সেখানে বিতর্ক শুরু হয়েছে৷ বিষয়টা মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত গড়িয়েছে৷ নাহিদ টেলিভিশন রিয়্যালিটি শো-এর রানার্স-আপ৷ কিছু গোঁড়া মৌলবি হ্যান্ডবিলে ফতোয়া দিয়েছে, মুসলিম মেয়েদের এভাবে টিভিতে বা প্রকাশ্য মঞ্চে গান গাওয়া বন্ধ করতে হবে৷ ইসলাম ধর্মে এটা পাপ৷ সেই থেকে নাহিদ সমানে চোখের জল ফেলছে৷ বলছে গানই তাঁর ধ্যানজ্ঞান৷ তাই গান সে ছাড়তে পারবে না, তা তারজন্য যে মূল্যই দিতে হোক না কেন৷ এ অবস্থায় তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সরকার ও নাগরিক সমাজ৷ আসামের মন্ত্রী এ বিধায়করা নাহিদের বাড়িতে গিয়ে তাকে অভয়ও দিয়ে এসেছেন৷ মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল ফোনে আশ্বায় দিয়ে বলেছেন, সরকার তার পাশে আছে৷ আর তারপরেই আসামের মুসলিম পার্সোনাল ল-বোর্ড থেকে বলা হয়েছে নাহিদকে ফতোয়া দেয়া হয়নি, স্রেফ হ্যান্ডবিলে আবেদন করা হয়েছে৷

এমন অসহিষ্ণুতার উদাহরণ ভারতে ভুরি ভুরি৷ শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনকে দেবি সরস্বতীর আপত্তিকর ছবি আঁকার কথিত অপরাধে দেশছাড়া হতে হয়েছিল একদিন৷ হালে বলিউড চিত্রনির্মাতা সঞ্জয় লীলা বানসালিকে চিতোরের রাণী পদ্মাবতীর কাহিনি অবলম্বনে ছবি করতে বাধা দেয়া হয়৷ সেটে ভাঙচুর চালায় মৌলবাদী হিন্দু সংগঠনের কিছু সদস্য৷ অভিযোগ, দ্বাদশ শতাব্দিতে রাজরাণী পদ্মাবতীকে নাকি দেবী হিসেবে নয়, অতি সাধারণ মানবী হিসেবে ছবিতে দেখাতে চেয়েছেন চিত্রপরিচালক৷

এদিকে অন্য সব সম্প্রদায়ে মানুষ সুহানার সমর্থনে এগিয়ে এসে বলেছে, মুসলিম অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যখন সিনেমায় হিন্দু দেব-দেবীর চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন তো তাঁরা চুপ থাকে৷ হৈ চৈ করে না৷ বিখ্যাত পরভিন সুলতানা, মহম্মদ রফির মতো বহু মুসলিম সংগীত শিল্পীদের হিন্দু ভক্তিগীতি ও ভজনের বহু রেকর্ড আছে৷ খ্রিষ্টান সংগীত শিল্পী জেসুদাস সবরিমালা মন্দিরে ভগবান আয়েপ্পার বন্দনা গান গেয়েছেন৷ হিন্দু জগজিত সিং ও কিশোর কুমার বহু মুসলিম ভক্তিগীতি গেয়েছেন৷ হিন্দু-মুসলিম সবাই বড়দিনে খ্রিষ্টান ভক্তিগীতি ‘ক্যারল' গেয়ে থাকেন৷ পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারগুরু ছিলেন পণ্ডিত আলাউদ্দিন খান৷ খাজা মইনুদ্দীন চিস্তি মিশ্র সংস্কৃতির সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ভক্তিগীতি এবং সুফি আধ্যাত্মবাদ৷ আরও নজির আছে৷ পাকিস্তানের সুফি রক ব্যান্ড জুনুন-এর প্রতিষ্ঠাতা পাকিস্তানের সলমন আহমেদ বলেন, সংগীত বিশ্বকে জোড়ে, ভাগ করে না৷ তারপরও এই ধরনের মৌলবাদী অসহিষ্ণুতা ক্রমশই বিপদ বাড়াচ্ছে৷ এইসব তালিবানের হাত থেকে সুহানা বা নাহিদের মতো গায়িকাদের পাশে দাঁড়াবার সময় এসেছে৷ কাজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা সুহানার নিন্দা করছেন, তাঁদের বোঝা উচিত যে ইসলাম এক মহান ধর্ম৷ বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছে সুহানা৷ এতে দোষের কী আছে? সংগীতের যে কোনো ধর্মীয় বেড়া থাকতে পারে না৷

তবে সবথেকে নজর কেড়েছে ওড়িষার কেন্দ্রপাড়ায় ছ'বছরের এক মুসলিম বালিকা ফিরদৌস৷ গত সপ্তাহে এক মন্দির প্রাঙ্গনে স্তোত্রপাঠ প্রতিযোগিতায় ৪৬ জন প্রতিযোগীর মধ্যে প্রথম হয়েছে সে৷ পেয়েছে ১০০ নম্বরের মধ্যে সাড়ে ৯৭৷ প্রথম শ্রেণির এই খুদে পড়ুয়া ফিরদৌস গডগড় করে মুখস্থ বলে গেল হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ভগবত গীতার শ্লোক৷ সকলেই বিস্ময়ে হতবাক৷ কারণ ফিরদৌসের এখনও ভালো করে অক্ষরজ্ঞান হয়নি৷ স্কুলের প্রার্থনায় শুনে শুনে সে শুধু মুখস্থ করেছে৷ গীতার শ্লোক আবৃত্তি করার সময় সারাক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জুগিয়ে গেছেন ফিরদৌসের মা আরিফা বিবি৷ পরিবেশের সংবেদনশীলতা বুঝে অবশ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছিল প্রশাসন৷

বন্ধু, আপনার কী মত? সংগীতকে কি কোনো ধর্মীয় বেড়া দিয়ে বেঁধে রাখা সম্ভব? লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

  • তারিখ 19.03.2017
  • লেখক অনিল চট্টোপাধ্যায় (নতুন দিল্লি)
  • কি-ওয়ার্ডস ভারত

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو