নারী কী পরবে, সে সিদ্ধান্ত শুধুই নারীর

ছোটবেলা থেকেই কথাটা শুনে আসছি৷ ‘আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা’৷ মানে ‘নিজের পছন্দের খাবার খাও, পোশাক পরো অন্যের পছন্দের৷’ অবাক লাগতো৷ ভাবতাম আমি কী পরবো, কী পরবো না – সেটা অন্য কেউ বলে দেবে কেন?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আমার জন্ম সত্তরের দশকে৷ তখনও হিন্দু পরিবারে পর্দার চল ছিল৷ বৈঠকখানা ছিল, ছিল অন্দরমহল৷ আর সেই অন্দরমহল থেকে বৈঠকখানায় যাওয়ার পথে ছিল একটা ভারি কাপড়ের পর্দা, যেটা ঠেলে বাড়ির মা-বউরা তেমন বাইরের মহলে যেতেন না৷ আর গেলেও মাথায় বড় ঘোমটা টেনে যেতেন৷ অন্দরমহলেও অনেক গুরুজন বা পরপুরুষের সামনে ঘোমটা টেনে ধরতেন তাঁরা৷

বাবা ছিলেন আইনজীবী৷ তাই ছুটির দিনও সারাটা দিন বৈঠকখানা গিজ গিজ করতো মক্কেলে৷ কাজেই সেদিকে সেই ছোট্ট আমারও বিশেষ আসা-যাওয়া হতো না৷ তবে খুব বেশিদিন এ সমস্ত নিয়ম দেখতে হয়নি আমায়৷ মায়ের আধুনিক শিক্ষা আর আমার জেদের কারণে একটা সময় বাবাকেও নতজানু হতে হয়েছিল৷ বদলাতে হয়েছিল নিয়ম৷ স্কুলের গণ্ডি পার হতে না হতেই বাবার চেম্বারটা ছিল, কিন্তু বৈঠকখানা, অন্দরমহল – এসব ‘কনসেপ্ট' গেল মিলিয়ে৷ আমি বড় হতে লাগলাম৷ পাড়ার মেয়েরা সালওয়ার-কামিজ ছেড়ে জিন্স ধরেছে৷ জেদ ধরলাম আমিও পরবো৷ অনেক অশান্তি হলো৷ বাবা বললেন, নারীবাদী বক্তৃতা দিতে হলে যেন মাঠে গিয়ে দিই, বাড়িতে আমার জায়গা হবে না...৷

সমাজ-সংস্কৃতি

আবেগী, স্বাধীনচেতা

গরবিনি, আবেগী এবং স্বাধীনচেতা – বাঙালি নারীর সঙ্গে এই তিনটি বিশেষণই মানানসই৷ আবেগ যেমন তাঁদের দ্রুত স্পর্শ করে, তেমনি স্বাধীনতার প্রশ্নে কিন্তু তাঁরা সত্যিকার অর্থে অনড়৷ নিজের সত্ত্বা নিয়ে অহংকার তাঁদের আছে বটে, তবে তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের মধ্যে রয়েছে অসীম ধৈর্য্য৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শাড়িতে সবচেয়ে সুন্দর

বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শাড়ি৷ সেই শাড়ি বাঙালি নারীর সৌন্দর্য্য ফুটিয়ে তোলে চমৎকারভাবে৷ বিভিন্নভাবে শাড়ি পরতে জানেনও তাঁরা৷ আর ‘উপহার হিসেবে শাড়ি’? – কোন বাঙালি মেয়ে না চায় বলুন?

সমাজ-সংস্কৃতি

উৎসব প্রেমী

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন৷ নববর্ষ, ঈদ কিংবা দুর্গা পূজা – সব উৎসবই যেন বাঙালি নারীর জন্য তৈরি৷ প্রতিটি উৎসবের সঙ্গে মানানসই পোশাক পরতে এবং সেই উৎসবের উপযুক্ত রান্নায় পারদর্শী তাঁরা৷ ডয়চে ভেলের পাঠক সুজন খানের কথায়, ‘‘বঙ্গের নারী লাজুক প্রকৃতির, কিন্তু যে কোনো উপলক্ষ্যেই প্রাণ খোলা হাসি উপচে পড়ে তাঁদের৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

‘নো ডায়েট’

বাঙালি নারী ‘ডায়েট’ করছেন, এমনটা বেশ বিরল৷ তাই খাওয়ার ব্যাপারে তাঁরা বেশ উদার৷ কথায় বলে না, মাছে-ভাতে বাঙালি? অবশ্য মাছ-ভাতের পাশাপাশি ফুসকা কিংবা চটপটি পেলে তো আর কথাই নেই৷ আসলে টক, ঝাল, নোনতা, মিষ্টি, এমনকি তেতোও পছন্দ এই নারীদের৷

সমাজ-সংস্কৃতি

রান্নার শখ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথাই ধরুন৷ দেশ সামলানোর কঠিন দায়িত্ব পালনের মাঝেও রান্না ঘরে যেতে ভোলেন না তিনি৷ গত বছর ছেলের জন্য রান্না করার সময় তোলা তাঁর এই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল৷ বাঙালি মেয়েরা রাঁধতে যে ভীষণ ভালোবাসেন!

সমাজ-সংস্কৃতি

অল্পতেই সন্তুষ্ট

বাঙালি মেয়েদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা কি খুব কঠিন? না৷ সকলেই জানেন যে, কাজটা সহজই৷ একটি লাল গোলাপ পেলে কিংবা প্রিয় রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেলেই তাঁরা সন্তুষ্ট৷ ডয়চে ভেলের পাঠক রন্জু খালেদের মতে, বাঙালি নারীর মধ্যে ‘একইসাথে দৃঢ়তা ও নমনীয়তা এবং প্রজাপতির চপলতা’ রয়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

কাজল কালো চোখ

জীবনানন্দ দাসের ‘বনলতা সেন’ কিংবা রবি ঠাকুরের ‘কৃষ্ণকলি’ – বাঙালি নারীর কাজল কালো চোখের প্রশংসা পাবেন অনেক কবির কবিতাতেই৷ সত্যি বলতে কি, বাঙালি নারীর চোখ পুরুষকে টানে সবচেয়ে বেশি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বাকপটু

বাংলাদেশের কিংবা ভারতের মেয়েরা চুপ করে বসে আছেন – এমন দৃশ্য কল্পনা করাও কঠিন৷ তাঁরা কথা বলতে ভালোবাসেন৷ রান্না থেকে রাজনীতি – সব বিষয়েই একটা মতামত আছে তাঁদের৷ ডয়চে ভেলের পাঠক জিএনএস নয়নের কথায়, ‘‘নারী পুরুষের যে কোনো কষ্ট অতি সহজে ভুলিয়ে দিতে পারে৷ এই গুণই আমাকে মুগ্ধ করে, আবার সাথে অবাকও করে৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

নারীবাদী

বাঙালি মেয়েরা নারীবাদী৷ বিতর্কিত বাঙালি লেখিকা তসলিমা নাসরিন তাঁদের অনেকেরই প্রিয়৷ নাসরিনের ‘আমার মেয়েবেলা’ পড়েনি এমন নারী পাওয়া মুশকিল৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভ্রমণপ্রিয়

বাংলাদেশি কিংবা ভারতীয় বাঙালি নারীর গুণ কি আর অল্পতে জানানো যায়, বলুন? কিছু গুণ না হয় অজানাই থাক৷ তবে একটির কথা বলে শেষ করি, বাঙালি মেয়েরা কিন্তু ঘুরতে খুব ভালোবাসেন৷ তথ্য সহায়তা: ডয়চে ভেলে ফেসবুক পাতা, ইন্ডিয়াওপাইন্স, স্কুপহুপ

এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে৷ কলকাতা-ঢাকা ছেড়ে দিল্লি, তারপর দিল্লির পাট চুকিয়ে জার্মানিতে এসেছি৷ তখন আমার পাঠানো অর্থেই সংসার চলে৷ কখনও পশ্চিমা পোশাক পরি, কখনও আবার দক্ষিণ এশীয়৷ বাবা বৃদ্ধ বয়স আর আমার দাপটের কারণে বিশেষ কিছু বলতে পারেন না৷

এখন তো বাবাও আর নেই৷ যখন যা ইচ্ছে, যা মন চায়, যা আমাকে মানায় বলে মনে হয়, তাই পরি৷ কোনো নিয়ম নেই৷ আমার পরের মামাতো-পিসতুতো বোনেরা আরো আধুনিক, আরো আত্মসচেতন৷ তাদের কোনো নিয়মের মধ্য দিয়ে আমি যেতেই দিইনি৷ আসলে আমি বরাবরই বিশ্বাস করি ব্যক্তি স্বাধীনতায়৷ কেউ ইচ্ছে হলে সমস্ত শরীর ঢেকে রাখবে, কেউ চাইলে রাখ-ঢাক রাখবে না – এটাই আমার মত৷

ভুলে গেলে চলবে না মেয়েদের ওপর ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরেও রয়েছে অজস্র বাধা-নিষেধ৷ ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেও তাদের খালি গা হয়ে মাঠে বসার উপায় নেই৷ অথচ ছেলেরা ঠিকই সেটা করছে, এবং তা-ও আবার আমাদের, মানে মেয়েদের সামনেই৷ কেন? পুরুষের জন্য পর্দা নেই কেন?

ভারত-বাংলাদেশ তো বটেই, ইউরোপেও বাঙালি সমাজের সামনে ‘গা-দেখানো’ পোশাক পরলে, পুরুষরা ভ্রু কুঁচকে তাকায়৷ এমনকি মেয়েরা ফেসবুকে ‘ক্লিভেজ’ দেখানো ছবি দিলেও আপত্তি ওঠে, আধা-নগ্ন হলে তো কথাই নেই৷ ফেসবুক কতৃপক্ষ নিজের হাতে সে ছবি মুছে দেয়৷ তাই বাড়িতে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, বাইরে তো আছে!

নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

সম্প্রতি মুসলিম নারীদের জন্য তৈরি সাঁতারের পোশাক ‘বুর্কিনি’ ফ্রান্সে নিষিদ্ধ করা হয়৷ সে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত অবশ্য এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘মানবাধিকারের লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে৷ তারপরও চলছে বিতর্ক, প্রতিবাদ৷ সেই প্রতিবাদের অংশ হিসেবেই অ্যান্টভ্যার্পে ‘বুর্কিনি বিচ পার্টি’-র আয়োজন করেছিলেন মুসলিম নারীরা৷

পোশাক পরা ‘ব্যক্তিগত’ বিষয়

প্রকৃত সমুদ্র সৈকতে না হলেও, আয়োজকরা অভিনব এ পার্টির নাম দিয়েছিলেন ‘বুর্কিনি বিচ পার্টি’৷ প্রতীকী প্রতিবাদের এই আয়োজনে সবাই যে শুধু বুর্কিনি পরে এসেছেন, তা কিন্তু নয়৷ পোশাক নির্বাচনে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না৷ তাই কেউ পরেছিলেন বিকিনি, কেউ শুধু চোখ খোলা নিকাব, আবার কেউ কেউ পরে এসেছিলেন এই মুহূর্তে বিতর্কের তুঙ্গে থাকা বুর্কিনি৷ সব মিলিয়ে খুব বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আয়োজনটি৷

বৈপরিত্যেও বৈচিত্র্য

পার্টিতে আসা এই নারীদের পোশাক দেখুন৷ খুব সংক্ষিপ্ত পোশাক বিকিনি যেমন আছে, তেমনই প্রায় পুরো শরীর ঢাকা বোরকাও আছে৷ এমন বৈপরিত্যে যে কোনো অসুবিধে নেই, বরং নারী এবং পুরুষের যে সব জায়গায় নিজের পছন্দের পোশাক পরার অধিকার থাকা উচিত – সে কথা সবাইকে জানাতেই আয়োজন করা হয়েছিল ‘বুর্কিনি বিচ পার্টি’৷

এক মুসলিম নারীর কথা

বিচ পার্টিতে নীল বুর্কিনি পরে আসা এই নারী ফ্রান্সে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বললেন, ‘‘নিষেধাজ্ঞাটা খুবই অদ্ভুত৷ আমি তো আমার যা ইচ্ছে তা-ই পরতে চাই৷ নারী এবং পুরুষের সব জায়গায় নিজের ইচ্ছে মতো পোশাক পরার স্বাধীনতা থাকা দরকার৷’’

‘আমরা তাঁবু পরি না’

অ্যান্টভ্যার্পে এই পার্টি আয়োজনের একটা কারণ আছে৷ অ্যান্টভ্যার্পের মেয়র কয়েকদিন আগেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘মুসলিম নারীরা তাঁবু পরে৷’’ বোরকা বা নিকাবকে তাঁবুর সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়৷ বুর্কিনি পার্টিতে এসে অনেকেই মেয়রের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘‘আমরা তাঁবু পরি না৷’’

অভাবনীয় সাড়া

আয়োজকরা পার্টিতে শ’ তিনেক মানুষ আসতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন৷ তবে শেষ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ যোগ দিয়েছিল বুর্কিনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদের এই আয়োজনে৷

ডানপন্থিদের প্রতিবাদ

‘বুর্কিনি বিচ পার্টি’-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিল মুসলিমবিরোধী উগ্র ডানপন্থিরা৷ তবে সেই প্রতিবাদে বেশি মানুষ যোগ দেয়নি৷

আরো প্রতিবাদ

বিশ্বের নানা শহরে চলছে বুর্কিনির ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ৷ লন্ডন এবং বার্লিনে ফরাসি দূতাবাসের সামনেও নারীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন৷

বিশ্ব | 05.09.2016

যেমন ধরুন, মনিপুরে থাংজাম মনোরমা নামের একটি মেয়েকে অমানবিকভাবে ধর্ষণ ও নির্যাতন করে সেনাবাহিনী৷ পরে তাঁকে হত্যাও করা হয়৷ ২০০৪ সালে শত শত নারী ঘটনাটির প্রতিবাদ জানায় রাস্তায় নগ্ন হয়ে৷ আমার এক বান্ধবী তাঁর ফেসবুক পাতায় প্রোফাইল ছবি হিসেবে ধর্ষণ-বিরোধী আন্দোলনের সেই ছবি দিয়েছিল বার বার৷ কিন্তু প্রতিবারই ফেসবুক কতৃপক্ষ তা ‘ডিলিট' করে দিচ্ছিল৷

কিন্তু নগ্ন-বক্ষ হয়ে প্রতিবাদ তো ইতিহাসে কোনো নতুন ঘটনা নয়৷ ক্যানাডায় হয়েছে, হয়েছে ভারতেও৷ তাহলে? নগ্নতা আর যৌনতা যে এক জিনিস নয়, এটা আমি প্রথমবার ইউরোপে এসেই জেনেছিলাম৷ এ নিয়ে লেখেলেখি, নানা তত্ত্বকথাও আছে৷ কিন্তু পরে বুঝেছি, নারীর ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে, তাঁর স্বাধীনতাকে মাথা পেতে নিতে, তাঁকে বুঝতে তত্ত্বের প্রয়োজন হয় না, বিশেষ করে একটি স্বাধীন দেশে৷ এখন কোনো ঔপনিবেশ নেই যে, বাড়িতে বাবা-ভাই-বরের অনুশাসন আর বাইরে ব্রিটিশ রাজের ‘দাসত্ব' রয়েছে৷ এখন তো তাহলে কোনো ‘ডাবল কলোনিয়ালাইজেশন' থাকার কথা নয়৷ তবে?

তারপরও কেন জমিদার, তালুকদার, পাড়া-প্রতিবেশী অথবা বাড়িতে পুরুষের কথামতো উঠতে-বসতে হবে মেয়েদের? পুরুষের যখন ইচ্ছে নারীকে হিজাব পরাবে৷ কখনও নিরাপত্তার গান গেয়ে, কখনও বা ইসলামের দোহাই দিয়ে৷ না, কোনো নারী যদি তাঁর নিজের ইচ্ছেতে ‘হিজাব’ করে, তাহলে তাঁকে আমি বাধা দেবো না৷ তবে প্রশ্ন হয়ত করবো, তুমি কি জেনে-শুনে এই ‘অবিচারের চিহ্ন’ ধারণ করেছো? অন্যদিকে রোদে-পোড়া গরমে বুর্কিনি পরা বেশ আরামেরই৷ তাই ইচ্ছে হলে শুধু মুসলিম মেয়েরা কেন, বুর্কিনি তো আমিও পরতে পারে৷ তাই না?

Guha Debarati Kommentarbild App

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সম্পাদক

এবার একটা অন্য উদাহরণে আসি৷ গত বছর বাংলাদেশের আদালত রায় দেয় যে, কাউকে ধর্মীয় কাজে বাধ্য করা যাবে না৷ অর্থাৎ কাউকে বোরকা পরতে বা রোজা রাখতে, এমনকি নামাজ পড়তেও বাধ্য করা যাবে না৷ এ রায় বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রশংসার যোগ্য৷ তাছাড়া গত কয়েক বছরে হিজাবের ব্যপারে সুনির্দিষ্ট মতামত দিয়েছেন বিচারকরা৷ সেসব রায়ে বলা হয়েছে, কাউকেই তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে হিজাব পরতে বাধ্য করা যাবে না৷ যদি সেটা করা হয়, তাহলে যে জোর করছে তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে রায় দিয়েছেন তাঁরা৷

কিন্তু আইনের সঙ্গে বাস্তবতার কি কোনো মিল খুঁজে পান আপনি? আমি তো পাই না৷ কারণ, মিল থাকলে জিন্স-টপ পরা ঐশীর শরীরটা কেন একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয় পুলিশ? কেন পরে তাঁর মাথা ঢেকে দেয়া হয়? কেন পরিয়ে দেয়া হয় হিজাব? যাতে ওড়নাহীন ঐশীকে আর খারাপ মেয়ে না ভাবে ‘সমাজ'? এটা কি পুরুষতন্ত্রের আস্ফালন নয়? হস্তক্ষেপ নয় একটি মেয়ের ব্যক্তিস্বাধীনতায়? এ কি মধ্যযুগীয় চিন্তার প্রকাশ নয়?

ইউরোপে হিজাব, নিকাব, বুর্কিনি নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে৷ নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, এমন সবকিছুরই বিপক্ষে আমি৷ কিন্তু যে সমস্ত পুরুষ নারী স্বাধীনতার নামে হিজাব-নিকাব-বুর্কিনির সমালোচনা করছেন, তাঁরাই কিন্তু বাড়ি ফিরে বউয়ের হাতের রান্না চান, বাচ্চা সামলাবে বউ – এমন দোস্তুরই চান তাঁরা৷ তাহলে?

আমি বুঝি না, কর্মক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা না হলে কেউ বুর্কিনি পরে সাঁতার কাটুক অথবা বিকিনি পরে – এতে অন্যের, বিশেষ করে পুরুষের সমস্যা কোথায়? কই আমরা তো বলছি না যে, সমুদ্রতটে বা মাঠে কোনো পুরুষকে খালি গায়ে দেখলে আমাদের অসুবিধায় হয়?

কেমন লাগলো দেবারতি গুহর লেখা? তাঁকে আপনি কি কিছু বলতে চান? লিখুন নীচে, মন্তব্যের ঘরে৷

হিজাব

দেশ এবং সংস্কৃতিভেদে অনেক মুসলমান নারী হিজাব পরিধান করেন৷ মূলত মাথা, চুল এবং গলা এবং ঘাড়ের খোলা অংশ ঢাকা হয় এই পোশাক দিয়ে৷ বিভিন্ন ডিজাইনের এবং রঙের হিজাব পাওয়া যায় যেগুলো পরলে চেহারা পুরোটাই দেখা যায়৷

নিকাব

নিকাব পরলে নারীর পুরো শরীর ঢেকে যায়, শুধু চোখ দু’টো খোলা থাকে৷ সাধারণত পুরোপুরি রক্ষণশীল মুসলমান নারীরা নিকাব পরেন৷ নিকাব মূলত কালো রঙের হলেও অন্যান্য রঙের নিকাবও ইদানীং দেখা যায়৷

দোপাট্টা

দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় দোপাট্টা বা ওড়না৷ নিকাব বা বোরকার মতো না হলেও এই পোশাকেও নারীর শরীর অনেকটা ঢাকা থাকে৷ তবে চুলের কিছুটা, চেহারা এবং গলা দেখা যায়৷ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যান্য ধর্মের মেয়েরাও দোপাট্টা পরেন৷

আল-আমিরা

মূলত দুই টুকরো কাপড় দিয়ে আল-আমিরা তৈরি করা হয়৷ একটি টুকরো দিয়ে চুল পুরোপুরি ঢেকে দেয়া হয় আর অন্য টুকরোটা হিজাবের মতো জড়িয়ে দেয়া হয়৷ কম বয়সি মুসলিম নারীদের মধ্যে এই আল-আমিরা বেশ জনপ্রিয়৷

শায়লা

শায়লা হচ্ছে লম্বা, চারকোনা এক ধরনের স্কার্ফ, যা গল্ফ অঞ্চলের মুসলিম নারীদের মধ্যে জনপ্রিয়৷ এটি সাধারণত কালো রঙের হয় এবং কাঁধের কাছে পিন দিয়ে আটকাতে হয় এটিকে৷ তবে হিজাবের মতো সবকিছু ঢেকে রাখে না শায়লা৷

এশার্প

অনেকটা হিজাবের মতো হলেই এসার্প তৈরি হয় সিল্ক দিয়ে এবং বেশ উজ্জ্বল রঙের হয়৷ মূলত তুরস্কের মুসলিম নারীরা এটা পরিধান করেন৷ এটি বিভিন্ন রং এবং ডিজাইনে পাওয়া যায়৷

কেরুডুং আর টুডুং

ইন্দোনেশিয়ার আধুনিক মেয়েরা আজকাল যে হিজাব ব্যবহার করছে, তার নাম কেরুডুং৷ আর প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়ায় নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় টুডুং৷ এই দু’টি অনেকটা চাদরের মতো হলেও, একটি অংশে সুন্দর প্যার্টার্ন থাকে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকে বিভিন্ন রঙের শেডও৷ হিজাবের মতো টুডুং বা কেরুডুং-ও চুল, গলা এবং কাঁধ পুরোপুরি ঢেকে ফেলে৷

চাদর

ইরানের মেয়েদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় চাদর৷ বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সাধারণত সে দেশের নারীরা চাদর পরে নেন৷

বোরকা

মুসলিম নারীরা সারা চেহারা এবং সারা শরীর পুরোপুরি ঢেকে ফেলে বোরকা পরিধান করেন৷ ক্ষেত্রবিশেষে বোরকার চোখের অংশে জাল দেয়া থাকে, যাতে তারা দেখতে পারেন৷ কালো ছাড়াও বিভিন্ন রংঙের বোরকা হয়৷

জিলবুবস

সারা শরীর ঢেকে রেখেও নারীর স্তন এবং পশ্চাতদেশের আকার ফুটিয়ে তোলা যায় এই পোশাকে৷ এ জন্যই একে জিলবুবস বলা হয়৷ ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পোশাকের ব্যবহার দেখা যায়৷ তবে এই পোশাক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে৷ দ্রষ্টব্য: মুসলিম নারীদের পোশাক সংক্রান্ত বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ছবিঘরটি তৈরি করা হয়েছে৷

আমার জন্ম সত্তরের দশকে৷ তখনও হিন্দু পরিবারে পর্দার চল ছিল৷ বৈঠকখানা ছিল, ছিল অন্দরমহল৷ আর সেই অন্দরমহল থেকে বৈঠকখানায় যাওয়ার পথে ছিল একটা ভারি কাপড়ের পর্দা, যেটা ঠেলে বাড়ির মা-বউরা তেমন বাইরের মহলে যেতেন না৷ আর গেলেও মাথায় বড় ঘোমটা টেনে যেতেন৷ অন্দরমহলেও অনেক গুরুজন বা পরপুরুষের সামনে ঘোমটা টেনে ধরতেন তাঁরা৷