নির্বাচনের পর চ্যালেঞ্জ ও চিন্তা

সিডিইউ-সিএসইউ নাটকীয়ভাবে ভোট হারিয়েছে, এফডিপি আবার সংসদে, তৃতীয় স্থানে এএফডি৷ জার্মান সংসদীয় নির্বাচন বার্লিন রাজনীতির প্রথাগত হিসাবনিকাশ ভণ্ডুল করে দিয়েছে৷

ভোটে আসল চমক দিয়েছেন এবার অজ্ঞাত ভোটদাতারা; আবার তারা সব প্রাক-নির্বাচন জরিপকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছেন৷ আঙ্গেলা ম্যার্কেলের দল সিডিইউ ও তাদের বাভেরীয় সহযোগী সিডিইউ মিলে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পাবে বলেই বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করে এসেছিলেন: পরিবর্তে ইউনিয়ন দলগুলি ১৯৪৯ সাল যাবৎ তাদের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছে৷ প্রতিক্রিয়া হিসেব চ্যান্সেলর ম্যার্কেলকে বলতে শোনা গেছে, ‘‘আমাদের বাদ দিয়ে কোনো সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না৷'' সেটুকুই সান্ত্বনা৷   

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

এসপিডি এবার বিরোধীপক্ষে থাকবে

সিডিইউ-সিডিইউ দলের বেশ কিছু ভোটার প্রধানত এফডিপি দলকে ভোট দিয়েছেন; প্রচুর সিডিইউ-সিএসইউ ভোটার এএফডি-কেও ভোট দিয়েছেন৷ অপরদিকে রক্ষণশীলরা তরুণ ভোটারদের টানতে পারেনি৷

সিডিইউ-সিএসইউ দলের ভোট কমার একটি বড় কারণ হলো, বাভেরিয়ায় সিএসইউ দলের বিপর্যয়৷ সিএসইউ শুধুমাত্র বাভেরিয়াতেই ভোটে নামে, সিডিইউ যেমন সেখানে ভোটে নামে না৷ দক্ষিণের ঐ প্রদেশটি চিরকালই সিএসইউ-এর রাজত্ব; সেখানে এবার তারা ২০১৩ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ ভোট হারিয়েছে – ওদিকে আগামী বছর বাভেরিয়ায় রাজ্য নির্বাচন৷ ভোটের দিন সন্ধ্যাতেই সিএসইউ নেতা হর্স্ট জেহোফার ঘোষণা করেছেন যে, সিএসইউ এবার স্পষ্ট দক্ষিণপন্থি ধারা অবলম্বন করবে৷

এসপিডি দলের নতুন নির্বাচনি বিপর্যয়ের ফলে আঙ্গেলা ম্যার্কেল তাঁর একটি সম্ভাব্য জোট সহযোগীকে হারালেন৷ ভোটার সমীক্ষা ভিত্তিক প্রাথমিক ফলাফল ঘোষিত হবার পর-পরই এসিপিডি দলের নেতৃস্থানীয় সদস্যরা সিডিইউ-সিএসইউ ও এসপিডি দলের তথাকথিত ‘‘বৃহৎ জোট'' থেকে বিদায় নেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন৷

রাজনীতি

জার্মানিতে বিদেশি পতাকার রং

জার্মানির সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবারো নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে সিডিইউ বা খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রীরা৷ অর্থাৎ চতুর্থবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হতে চলেছেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ কিন্তু সরকার গঠনের ক্ষেত্রে চিরাচরিত কালো-হলুদ নয়, দেখা দিতে পারে জামাইকা, কেনিয়া বা ট্র্যাফিক লাইটের মতো কোয়ালিশন৷

রাজনীতি

কালো-লালের দিন শেষ?

চার বছর আগে, সিডিইউ-সিএসইউ আর সামাজিক গণতন্ত্রী, মানে এসপিডি দল একত্রে জোট সরকার গঠন করেছিল৷ অর্থাৎ বৃহৎ কোয়ালিশনের রং ছিল কালো-লাল৷ কিন্তু ২০১৭ সালের সংসদীয় নির্বাচনের পর এসপিডি দলের চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী মার্টিন শুলৎস বেশ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে এবার আর মহাজোটের সম্ভাবনা নেই৷ বরং বিরোধী দল হিসেবেই সংসদে বসবে এসপিডি৷

রাজনীতি

তৃতীয় বৃহত্তম দল এএফডি

জার্মানির সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা জার্মানির জন্য বিকল্প দল (এএফডি)৷ এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে৷ তুলনামূলকভাবে জার্মানির রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দল হলেও, প্রতিষ্ঠার পাঁচ মাস পরের নির্বাচনেই প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে সাড়া ফেলে দেয় এই দল৷ আর এবার, সেই এএফডি-ই তৃতীয় বৃহত্তম দল৷

রাজনীতি

জামাইকা কোয়ালিশন

নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালেই এএফডি-র সঙ্গে জোট বাঁধতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সিডিইউ-সিএসইউ, এসপিডি, মুক্ত গণতন্ত্রী (এফডিপি), সবুজ দল এবং বামদলের মতো বড় দলগুলি৷ নির্বাচনের পরেও তারা সেই অবস্থানেই রয়েছে৷ তাই এএফডি যদি জোটের বাইরে থেকে যায়, তবে সরকার গঠন করতে সিডিইউ-সিএসইউ দলের হাত ধরতে পারে এফডিপি আর সবুজ দল৷

রাজনীতি

কেনিয়া কোয়ালিশন

ভোটের অঙ্ক অনুযায়ী অবশ্য আরো একটি কোয়ালিশনের সুযোগ আছে৷ আর সেটা হচ্ছে সিডিইউ-সিএসইউ, এসপিডি এবং সবুজ দলের, যদিও প্রথম দুটি দলেরই সম্মিলিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকছে৷ অর্থাৎ কেনিয়ার ফ্ল্যাগের রঙে কালো-লাল-সবুজের৷ অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিলেও গত বছর স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যেও কিন্তু জোট গঠন করেছিল এই দলগুলি৷

রাজনীতি

লাল-লাল-সবুজ

এসপিডি আর বামদলের সঙ্গে সবুজ দলের জোট হলে তা হতে পারতো লাল-লাল-সবুজের জোট৷ তবে সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে এসপিডি দলের ভরাডুবির ফলে সে সম্ভাবনা আর নেই৷

রাজনীতি

ট্র্যাফিক লাইট কোয়ালিশন

যথেষ্ট আসনসংখ্যা না থাকার কারণে লাল-হলুদ-সবুজ বা এসপিডি-এএফডি আর সবুজ দলেরও আর জোট গড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই৷

বাকি রইল ‘জামাইকা' জোট

জামাইকার জাতীয় পতাকার রং হলো কালো, হলুদ ও সবুজ: প্রথাগতভাবে সিডিইউ-সিএসইউ, এফডিপি ও সবুজ দলকে এই তিনটি রং দিয়ে বর্ণনা করা হয়৷ ইতিপূর্বে কেন্দ্রে কখনো এই তিনটি দলের জোট ক্ষমতায় আসেনি৷ ‘জামাইকা' জোটের প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা থাকলেও, সরকার গঠন সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা খুব সহজ হবে না, বিশেষ করে যখন এফডিপি আর সবুজদের মধ্যে চিরকালই বিশেষ বনিবনা নেই৷ তবে গত জুন মাস যাবৎ উত্তরের ছোট্ট শ্লেসভিগ-হলস্টাইন রাজ্যে একটি ‘জামাইকা' জোট শাসন চালাচ্ছে৷ 

প্রায় ছয় দশক পরে আবার জার্মান সংসদে ছ'টি দল আসন নিতে চলেছে৷ বড় দু'টি দল, অর্থাৎ সিডিইউ-সিএসইউ এবং এসপিডি ব্যাপকভাবে ভোট হারিয়েছে, অপরদিকে ছোট চারটি দলই তাদের ভোটের অনুপাত বাড়াতে পেরেছে – যার ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বৈ কমেনি৷ ভোট সবচেয়ে বেড়েছে এএফডি দলের, যারা ১২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট নিয়ে সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী হতে চলেছে৷ মুক্ত গণতন্ত্রী এফডিপি দল চার বছর সংসদে অনুপস্থিত থাকার পর এবার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট নিয়ে ফিরতে চলেছে৷ বামদল ‘ডি লিঙ্কে' নয় শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে, যা তাদের নির্বাচনি লক্ষ্যের চেয়ে বেশি৷ অপরদিকে সবুজরাও ৮ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট নিয়ে অনুরূপভাবে তাদের ভোটের পরিমাণ বাড়াতে সমর্থ হয়েছে৷ তবে তিনটি ছোট দলই এএফডি-র চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছে, যা তাদের পছন্দ হওয়ার কথা নয়৷

‘বৃহৎ জোটে' অরুচি

ইউনিয়ন দলগুলি ও এসপিডি মিলিয়ে মোট ১৩ শতাংশ ভোট হারিয়েছে – এবং ভোটারদের অনুপস্থিতি তার কারণ নয়, কেননা চার বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার পাঁচ শতাংশ বেশি ভোটার ভোট দিতে গেছেন (অথবা পত্র মারফত ভোট দিয়েছেন) – সাকুল্যে ৭৬ শতাংশের বেশি৷

মধ্যমপন্থি বড় দলগুলি আর দৃশ্যত একা জার্মান রাজনীতির কর্ণধারের ভূমিকা নিতে পারবে না৷ বিশেষ করে বড় দলগুলির মধ্যে জোটে বাম ও ডানের ছোট দলগুলি পালে হাওয়া পায়, এএফডি-র সাফল্য যার প্রমাণ৷ ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে সিডিইউ-সিএসইউ আর এসপিডি মিলে মোট ৮১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল; এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশে৷

‘বৃহৎ জোটের' ছোট তরফ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসপিডি, কেননা ম্যার্কেল সরকারে থেকে ম্যার্কেলের বিরোধিতা করা সহজ নয়৷ অপরদিকে ম্যার্কেল সরকারের সমালোচনা করার অর্থ অংশত এসপিডি দলের সমালোচনা করা৷ কাজেই এবার নেতৃস্থানীয় এসপিডি রাজনীতিকরা সাততাড়াতাড়ি ঘোষণা করেছেন যে, এসিপিডি এবার সরকারে না থেকে বিরোধীপক্ষে যেতে চায়৷

অর্থনীতির রমরমা ও বেকারত্ব কমতির দিকে হওয়া সত্ত্বেও ‘কালো-লাল' সরকার যে ভোটারদের মন কাড়তে পারেননি, তার একটা কারণ হলো উদ্বাস্তু নীতি বা অবসরভাতা সংক্রান্ত নীতি নিয়ে সাধারণের অসন্তোষ৷

এএফডি-র চ্যালেঞ্জ

প্রায় সব রাজ্য বিধানসভায় আসন নেওয়ার পর এএফডি এবার জার্মান সংসদেও আসন নিতে চলেছে৷ জার্মানির পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে – অর্থাৎ সাবেক পূর্ব জার্মানির এলাকায় এএফডি সাকুল্যে ২১ শতাংশ ভোট পেয়ে সিডিইউ-এর পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে৷ পূর্বাঞ্চলের পুরুষদের শুধু ধরলে এএফডি আজ পূর্বাঞ্চলে প্রথম স্থানে৷ কেন্দ্রে প্রথমবার নির্বাচনে নেমেই এএফডি তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী৷ অপরদিকে এএফডি-কে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের ৬০ শতাংশ বলেছেন যে, তারা অপরাপর দলগুলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এএফডি-কে ভোট দিয়েছেন – অর্থাৎ বাস্তবিক এএফডি সমর্থকের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম৷ তবুও এএফডি-র একজন মুখ্য প্রার্থী আলেক্সান্ডার গাউলান্ড ঘোষণা করেছেন যে, তারা নতুন ম্যার্কেল সরকারকে ‘‘তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবেন''৷

ফল্কার ভাগেনার/এসি