পরিবেশ শরণার্থীদের শেষ ঠিকানা রাজধানী ঢাকা

ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে স্থানচ্যুত মানুষের ভিড় বেড়ে চলেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়৷ সাথে রয়েছে অপরিকল্পতি এবং দ্রুত নগরায়ণ প্রক্রিয়া৷ ফলে পরিবেশের অবক্ষয়সহ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে রাজধানী - মন্তব্য বিশ্লেষকদের৷

২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল৷ প্রাণ হারায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ৷ পরিবেশ শরণার্থীতে পরিণত হয় শাহানার মতো হাজারো অসহায় নারী-পুরুষ৷ নিরুপায় হয়ে শাহানা ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী বস্তিতে আশ্রয় নেয়৷ ২৫ বছর বয়সি শাহানা বার্তা সংস্থা এএফপি'কে জানান, ‘‘দুই বছর আগে ঘর-বাড়ি সব হারিয়ে ঢাকায় আশ্রয় নিই৷ এখানে আসার পর আমার স্বামী জেলে হিসেবে কাজ করে সামান্য উপার্জন করে৷ কোন রকমে দিন চলে যায়৷ আমাদের মেয়ে দু'টোকে গ্রামে ফেরত পাঠাতে চাই৷ কিন্তু সেখানে কোন ঠিকানা নেই, ঘর-বাড়ি নেই৷ কোথায় পাঠাবো?'' হতাশা শাহানার চোখে-মুখে৷ এর মধ্যেই এ বছরের মে মাসে আবারও ঘূর্ণিঝড়ে মারা যায় তিন শতাধিক৷ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে সাড়ে তিন লাখ মানুষ৷ যাদের অধিকাংশই আশ্রয় নেয় ঢাকার অলিতে-গলিতে৷

Arbeitslose in Dhaka

বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০২০ সাল নাগাদ ঢাকার বাসিন্দা হবে দুই কোটিরও বেশি (ফাইল ফটো)

ঢাকার বর্তমান চেহারা

১৯৭৪ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল এক লাখ ৭৭ হাজার৷ কিন্তু বর্তমানে সেখানে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ২০ লাখে৷ ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি৷ শুধু তাই নয় এর জনসংখ্যা আরো ফুলে ফেঁপে উঠছে প্রতিনিয়ত৷ বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০২০ সাল নাগাদ ঢাকার বাসিন্দা হবে দুই কোটিরও বেশি৷ ২০০৬ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার ৩০ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রত্যেক চার জনে একজন বস্তিতে বাস করে৷ সেসময় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল এক কোটি ৬০ লাখ৷ এদিকে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে বাস করে মাত্র ৩০ লাখ মানুষ৷

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

ঢাকায় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ব্রিট হাগস্ট্রোম বলেন, ‘‘নতুন শহর গড়ে তোলা অতীব জরুরি৷ কেননা সবকিছু ঢাকায় রাখা যায় না৷ ঢাকা শহর ইতিমধ্যেই বিশাল আকার নিয়ে ফেলেছে৷'' আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা - আইএমও'র বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা বলেন, ‘‘নদী ভাঙন, সাইক্লোন এবং বন্যার কারণে দেশে এখন বিপুল সংখ্যক স্থানচ্যুত মানুষ৷ সাথে সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার আরো বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷ এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে যা কখনো শেষ হওয়ার নয়, বলেন ফাতিমা৷

জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তার অভিমত

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্ত-সরকার পরিষদ - আইপিসিসি'র সাবেক কর্মকর্তা আতিক রহমান বলেন, ‘‘আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতো৷ কিন্তু বর্তমানে ২-৩ বছর পরপরই বড় দুর্যোগ হানা দিচ্ছে৷'' আইপিসিসি'র আশংকা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বে৷ আতিক রহমানের মন্তব্য, ‘‘এসব বাস্তুহারা মানুষের অধিকাংশই চরম দরিদ্র হয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নিবে৷'' যেকারণেই তিনি বরাবরই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানচ্যুত মানুষদের জন্য ধনী দেশগুলোর দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই

সম্পাদনা: আবদুস সাত্তার

সংশ্লিষ্ট বিষয়