ব্লগ

পাহাড়িদের পৌরাণিক চোখ

খরস্রোতা শঙ্খ নদ দেখতে আমি অনেকবার পাহাড়ে গেছি৷ পাহাড়ের খাজে আঁকাবাঁকা নদ যেন শিরা-উপশিরার মতো এগিয়ে চলে৷ খুব বৃষ্টিতে পাহাড় আরো সবুজ৷ নদের পানি রুপোলি৷ দিগন্তের ওপারে সূর্য উঠলে তার সোনালি আলো ঝিকিমিকি করে সেই পানিতে৷

Bangladesch Jhum Kultur (DW/M. Mamun)

পাহাড়ের মানুষগুলোও তেমনই৷ কেমন একটা মায়াবি ঘোর যেন তাঁদের চোখে-মুখে৷ এই ঘোরের কথা পুরাণ নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাঁরাও লিখেছেন৷ যে পাহাড় তাঁদের ঘিরে থাকে, যে নদী বা ঝর্ণা কুল কুল করে বয়ে চলে পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে, কিংবা পাহাড়ের বনে বনে যেসব পশুপাখি চরে বেড়ায়, সবকিছুকেই পৌরাণিক চোখ দিয়ে দেখেন পাহাড়িরা৷ তাঁদের কাছে এই প্রকৃতি পূজনীয়৷ কারণ, এই প্রকৃতিই খাদ্য দেয়, বাঁচিয়ে রাখে তাঁদের৷

প্রকৃতির টানে আর বৈচিত্র্যময় মানুষগুলোকে দেখতেই বারবার ছুটে যাওয়া দক্ষিণের পাহাড়গুলোতে৷ বৈশাখে সাংগ্রাই উৎসব হয় বান্দরবানে৷ ছেলেমেয়েরা তাঁদের নিজস্ব ধরণের নানান রঙিন পোশাক পড়ে৷ নাচ গান করে৷ আর মেতে ওঠে জলকেলি উৎসবে৷ এটি একটি বিশেষ ধরণের খেলা৷ এখন এটি আনুষ্ঠানিকভাবেই হয়৷ তরুণ-তরুণীরা একে অন্যের গায়ে পানি ছিটায়৷ এটি মূলত মারমাদের উৎসব৷  তাঁদের বিশ্বাস, এই পানি ধুয়ে-মুছে দেবে পুরনো বছরের যত দুঃখ-গ্লানি-বেদনা৷ তবে এই উৎসব এখন সার্বজনীন হয়ে গেছে৷ শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, পুরো বান্দরবানের সবাই যেন এই খেলায় মাতে৷

 

একটি স্বনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে সেবার আমি গিয়েছিলাম এই অনুষ্ঠানগুলো কাভার করতে৷ পেছনে জলকেলি রেখে যেই ক্যামেরায় কথা বলা শুরু করলাম, অমনি একজন এসে গায়ে পানি ছিটিয়ে দিলেন আর বললেন, ‘‘গায়ে পানি না লাগলে ঠিক মানাচ্ছে না যে৷''

এরপর যতবার এই উৎসবে গিয়েছি, ক্যামেরা থাকুক আর না-ই থাকুক, ‘পানিযুদ্ধে' পরাজিত হতে হয়েছে প্রতিবারই৷ এমনকি বৌদ্ধ ভিক্ষু শিশুগুলোও কেউ কারো চেয়ে কম নয়৷ নানান ফন্দিফিকির করে পরিচিত আর অপরিচিত সবাইকেই সেদিন পানি বাণে অতিষ্ঠ করাই ওদের কাজ৷ তাদের কিয়াং বা ধর্মীয় আখড়ায়ও হয় অনুষ্ঠান৷

বিকেলের দিকে বুদ্ধস্নানের জন্য সারি সারি গেরুয়া পড়া ভিক্ষুগণ ছুটে চলেন শঙ্খ নদের পাড়ে৷ এ সময়টায় নদে পানি কম থাকে৷ চর পড়ে যায়৷ কোথাও কোথাও হেঁটেই নদ পার হয়ে যাওয়া যায়৷ সেখানে নদের পানি দিয়ে স্নান করানো হয় স্বর্ণের বুদ্ধমূর্তিকে৷ রাতে হয় সহস্র বাতি প্রজ্জ্বলন৷

রাতে গিয়েছি মারমা পাড়ায়৷ তরুণীরা উঠোনে বসে পিঠা বানাচ্ছে৷ আর ছেলেগুলো আশেপাশে ঘুরোঘুরি করছে৷ স্থানীয় সাংবাদিকরা জানালেন, এই ছেলেদের বেশিরভাগই জেএসএস-এর কর্মী৷

Zobaer Ahmed (Zobaer Ahmed)

যুবায়ের আহমেদ

বাঙালিরা আসার পর থেকে অনেক কিছুই বদলেছে পাহাড়ি সমাজে৷ জমি নিয়ে বিরোধ বেড়েছে৷ রক্তক্ষয় হয়েছে৷ অবিশ্বাস জন্মেছে৷ পাহাড়ি ছেলেগুলোর চোখেও তেমন অবিশ্বাস চোখে পড়ার মতো৷ পরদিন খুব ভোরে পাহাড়ি পথ ধরে গিয়েছি একটি পাড়ায়৷ শুনেছি, সেখানে পাশাপাশি বাঙ্গালি আর পাহাড়িরা থাকছে৷ গিয়ে দেখা গেল, দু'পক্ষই সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেরা নিজেদের জমি ভাগ করে নিয়েছে৷ একটা অঞ্চলে জমি ভাগাভাগি বা প্রশাসনিক কাঠামোয় এত ধরনের নিয়ম, যা আর কোথাও নেই এদেশে৷ এর সমাধান দরকার৷

আর যেটি দরকার, তা হলো পাহাড়িদের পৌরাণিক চোখগুলো বাঁচিয়ে রাখা৷ তাঁদের জীবনপদ্ধতি ও দর্শন প্রকৃতির জন্য, জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখতে খুব দরকার৷ তা না হলে পাহাড় আর পাহাড় থাকবে না৷ প্রকৃতি হয়ে যাবে নকল আধুনিকতার উপনিবেশ৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو