ব্লগ

'পিকনিক' দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট আর কতদূর?

শততম টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ৷ ৯৯ টেস্টে ৮টি মাত্র জয়, যার পাঁচটি জিম্বাবোয়ে আর দুটি খেলোয়াড় ধর্মঘটে দুর্বল হয়ে পড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে৷ কেন টেস্টে এগোতে পারছে না বাংলাদেশ? উত্তর খুঁজেছেন রাজীব হাসান৷

২০০৯ সাল, বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ

যে কোনো উপলক্ষ্য মানুষকে স্মৃতিকাতর করে তোলে৷ স্মৃতির অদৃশ্য গোঁফে তা দিতে দিতে আমরা পাতা ওল্টাই সময়ের অ্যালবামের৷ বাংলাদেশের শততম টেস্টের প্রান্তে এসে কেন জানি খুব করে মনে পড়ছে সেই সময়টা৷ ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর৷ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম৷ টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টস করতে নামলেন দুই বাঙালি অধিনায়ক! এক দিকে সৌরভ গাঙ্গুলি, ভারতের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে যেটি তাঁর প্রথম ম্যাচ, অন্য দিকে নাঈমুর রহমান; তাঁর তো বটেই, বাংলাদেশেরই সেটি প্রথম টেস্ট৷ 

মনে পড়ছে, অনেক আলোচনার জন্ম দিয়ে অভিষেক টেস্টের দলে ঢুকে পড়া হাবিবুল বাশারের সেই ঝলমলে ৭১ রানের ইনিংসটি৷ বেশি মনে পড়ছে আমিনুল ইসলামের ১৪৫৷ ৫৩৫ মিনিট উইকেটে ছিলেন আমিনুল, এখনো যেটি সময়ের হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘতম ইনিংস৷

প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট হয়ে গেল মাত্র ৯১ রানে৷ প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯০ রানে ভারতে ৫ উইকেট ফেলে দিয়ে যে টেস্টে বাংলাদেশ অসম্ভব জয়ের এক কল্পনায় মেতে উঠেছিল, নিদেন ড্র-ও সম্ভব হবে বলে ভাবা হয়েছিল এক সময়; সেই ম্যাচটাই চার দিনে হেরে গেল!

এই সেদিন নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়েলিংটন টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রানে ইনিংস ঘোষণা করেও বাংলাদেশ ম্যাচ হেরেছিল৷ সেই ম্যাচেও বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের অনেক ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়৷ সত্যি বলতে কি, এমন ছায়া ফিরে আসে বারবার৷ শ্রীলঙ্কা সফরে গলের প্রথম টেস্টে পঞ্চম দিনেও ভর করেছিল সেই ভূত৷

কেন এমনটা হয় বারবার? কেন টেস্টে একটা বড় সময় দারুণ খেলেও এক সেশনেই সব প্রচষ্টো ধুলিসাতৎ করে দেয় বাংলাদেশ? এর উত্তর সেই অভিষেক টেস্টেই খুঁজে নেওয়া যায়৷ আমিনুলের পর আর কেউ ৫০০ মিনিট ব্যাটিং করার সাহস বা যোগ্যতা দেখাতে পারেননি৷ বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে ৪০০-র বেশি বল খেলা ইনিংসও মাত্র একটি, মোহাম্মদ আশরাফুলের৷ ৩০০-র বেশি বল খেলার ইনিংসও আছে মাত্র ছয়টি৷ অথচ টেস্ট ক্রিকেটে কখনো কখনো রান তোলার চেয়ে বল খেলতে পারাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সেই স্কিল বা দক্ষতা গড়ে ওঠেনি এখনো৷

অভিষেক টেস্টের জন্য একটা ‘থিম সং' বানিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)৷ যতদূর মনে পড়ে সেই গানটির শিরোনাম ছিল, ‘চার মারো রে, ছক্কা মারো রে৷' যেন চার-ছক্কা মারাই ক্রিকেটের একমাত্র নিয়ম৷ বাংলাদেশের দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেট সেই ঘোর থেকে এখনো বেরোতে পারেনি৷

কেন পারেনি এর সহজ উত্তর আমাদের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট৷ যে ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটটা কখনো কখনো থার্ড ক্লাস মানের হয়৷ বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকেরা যেটিকে লেখেন 'পিকনিক ক্রিকেট'৷ সত্যি বলতে কি, বাংলাদেশের সাংবাদিকেরাও ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটকে যেন পিকনিক হিসেবে নেন৷ খুব কম পত্রিকার সাংবাদিক হাজির থাকে মাঠে৷ পত্রিকার খুব সামান্য জায়গা বরাদ্দ পায়৷ বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকেরাও মাঠে গিয়ে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ দেখেন এমন অপবাদ কেউ দিতে পারবে না৷ এই ম্যাচগুলোর কোনোটাই সম্প্রচার করা হয় না টিভিতে৷

সি.এল.আর. জেমস বহু আগে লিখে গেছেন, ‘‘যে শুধু ক্রিকেট জানে, সে ক্রিকেটের কী-ই বা জানে৷'' ক্রিকেট শুধু একটা খেলা নয়; একটা সংস্কৃতি৷ বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের সূত্র ধরে সেই সংস্কৃতিটা তৈরি হতে পারত৷ কিন্তু সবাই এটিকে ধরে নিয়েছেন এক দিনের বনভোজন হিসেবে৷ ক্রিকেটাররা, অংশত দেশের মিডিয়া ও সমর্থকেরা; এবং অবশ্যই বিসিবি৷

বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটটা ঠিকমতো বোঝার আগেই নেমে পড়েছিল এই উত্তাল সাগরে৷ ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয় ছিল দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য৷ অথচ এর তিন বছরের মাথায় টেস্ট অভিষেক৷ অথচ তখনো ওয়ানডেতে বাংলাদেশের জয়ই ছিল সাকল্যে তিনটি৷ '৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় জয় (বাকি দুটি জয় কেনিয়া ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে) আর এ দেশের মানুষের ক্রিকেটউন্মাদনা ছিল টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার আসল চাবিকাঠি৷ তাতে অনুঘটক ছিল ক্রিকেট কূটনীতি৷

বাংলাদেশ টেস্ট খেলার মাত্র এক বছর আগে বড় পরিসরের ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়োজন করেছে, যেটা তখনো ফার্স্ট ক্লাস স্বীকৃতিই পায়নি৷ কিন্তু গত ১৭ বছরে বাংলাদেশ তার ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটকে নিয়ে এখনো সিরিয়াস নয়৷ অথচ অপ্রস্তুত যাত্রাটা গুছিয়ে নিতে ১৭ বছর যথষ্টে দীর্ঘ সময় ছিল৷

আর এ কারণে যে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট হতে পারত বাংলাদেশের ক্রিকেটের মূল মেরুদণ্ড, নতুন ক্রিকেটার তুলে আনার কারখানা; কার্যত সেটি ফলশূন্য৷ বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় দলের বেশির ভাগ তারকা আসলে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ফসল৷ সাকিব-মুশফিকরা ছিলেন বিকেএসপির ছাত্র৷ হালের সৌম্য-মোস্তাফিজ-মিরাজরা বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের আবিষ্কার৷

এ ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখা প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেটটিও ঢাকাকেন্দ্রিক ওয়ানডে টুর্নামেন্ট৷ যেটি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বেশির ভাগের আয়-রোজগারের বড় উৎস৷ ২০১২ সালে বিসিবি জাতীয় দলের বাইরে থাকা ১০০-র মতো ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারকে অবশ্য বেতনের আওতায় এনেছিল৷ কিন্তু তাদের মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ১৮০ ডলার!

রাজীব হাসান

রাজীব হাসান, সংবাদকর্মী

ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটটাকে শুরু থেকে জাতীয় লিগের আবহ দেওয়ার একটা চেষ্টা অবশ্য ছিল৷ দ্রুতই এই টুর্নামেন্ট অঞ্চলভিত্তিক দল দিয়ে তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে৷ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিভাগগুলো ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল নাম নিয়ে জাতীয় লিগে খেলে৷ এই জাতীয় লিগের পাশাপাশি খুব সম্প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) নামের আরেকটি লিগ চালু করেছে বিসিবি৷ সেখানে চারটি দল খেলে৷

উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের এই দলগুলো বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির নামে থাকল কার্যত, তা নিয়ন্ত্রণ করে বিসিবি৷ জাতীয় লিগের বিভাগীয় দলগুলোও তা-ই৷ বিভাগ বা অঞ্চল পর্যায়ে কোনো ক্রিকেট অভিভাবক গড়ে ওঠেনি৷ যেমন, রাজশাহীর দলটা কী হবে, কীভাবে চলবে তা চালানোর কোনো কর্তৃত্ব রাজশাহীর নেই৷ ফলে এই দলগুলোর অঞ্চলভিত্তিক সমর্থনও গড়ে ওঠেনি৷ ফলে এই ক্রিকেটে কোনো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই৷ শিরোপা জয়ের মধ্যেও নেই তীব্র উত্সাহ বা উল্লাস৷

বাংলাদেশের ক্রিকেট ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল, আরও বেশি করে ঢাকামুখী হয়েছে৷ প্রিমিয়ার লিগ আছে৷ পাশাপাশি আছে বিপিএল নামের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট, যেটি ধীরে ধীরে হাওয়াও ফোলানো বেলুনের একটা বড় সাদা হাতি হিসেবেই প্রমাণিত হচ্ছে৷

ঢাকার বাইরে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে না পারার কুফল কী হতে পারে এর বড় প্রমাণ চট্টগ্রাম৷ এক সময় চট্টগ্রামই ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিভার উত্স৷ নান্নু-আকরাম খানদের সেই চট্টগ্রামে প্রতিভার স্রোতটি এখন ক্ষীণধারা৷ 

‘কানা মামাই ভালো' আপ্তবাক্যও সান্ত্বনা হয় না, যখন দেখবেন, ঘরোয়া এই ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে খুব অসাধারণ খেলেও জাতীয় দলে জায়গা হয় না কারও৷ খুব সম্প্রতি তুষার ইমরান ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি রানের (১২৪৯) রেকর্ড ভেঙেছেন৷ জাতীয় লিগে টানা তিন ম্যাচে সেঞ্চুরি, বিসিএল-এ দুটি ডাবল সেঞ্চুরি৷ তবু তুষারের জায়গা হয় না টেস্ট দলে৷ কারণ, তুষারদের বলেই দেওয়া হয়, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলা এ আর এমন কী! এখানে বোলারদের মান ভালো নয়; উইকেটের মানও৷

বিসিবির কর্তাব্যক্তিরাই যে মেনে নিয়েছেন, বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট আসলে পিকনিক ক্রিকেট!  

ওয়ানডে ক্রিকেটে দলের সাফল্যে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে ব্যস্ত বিসিবি৷ হয়ত আমরাও৷ কেন আমাদের আজও টেস্ট খেলার মানসিকতাই গড়ে উঠল না; এর উত্তর খোঁজা হবে কখন!

রাজীব হাসান, সংবাদকর্মী, প্রথম আলো

বন্ধু, রাজীবের এই ভাবনা আপনার কেমন লেগেছে? জানান আমাদের, লিখুন মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو