আলাপ

প্রবাসীদের গুরুত্ব শুধুই ‘বক্তৃতায়’

বাংলাদেশের যত মানুষ বিদেশে থাকেন, পৃথিবীর অনেক (আয়তনে) বড় দেশের মোট জনসংখ্যাও তত নয়৷ ঠিক কত মানুষ বিদেশে থাকেন? সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের কাছে৷ নানা গোঁজামিল দিয়ে বলা হয় ৯৪ লাখ বা ১ কোটির কম বেশি৷

কাতারে এক বাংলাদেশি শ্রমিক

প্রশ্নটি যদি এমন হয় মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, জাপান বা অ্যামেরিকায় কত বাংলাদেশি আছেন? সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা সরকারের কোনো সংস্থা সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারবে না৷ ৫ লাখের মতো, ২০ লাখের মতো, ১০ হাজারের মতো, ৩, ৪ লাখ হবে হয়তো... ইত্যাদি উত্তর পাওয়া যাবে৷ সঠিক সংখ্যা না জানার কারণ কী? এসব মানুষ বিদেশে গেছেন মূলত ব্যক্তি উদ্যোগে (সরকারের প্রায় কোনো ভূমিকা ছাড়া)৷ সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের বিষয়ে মোটেই সচেতন নয়৷ তারা প্রবাসীদের সংখ্যা জানা তো দূরের কথা, প্রবাসীদের গুরুত্বই দিতে চান না৷ প্রবাসীদের গুরুত্ব না দেয়ার চিত্র আবার সব দেশে এক রকম নয়৷ উত্তর অ্যামেরিকা-ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসীরা তুলনামূলকভাবে দূতাবাসে গুরুত্ব পেয়ে থাকেন৷ আসলে এসব দেশের প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন জাতীয় কাজ ছাড়া, অন্য তেমন কোনো কাজ থাকে না৷ দূতাবাসের নানা রকমের সহায়তার প্রয়োজন হয় মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়ার মতো দেশে থাকা প্রবাসীদের৷ এ সব দেশেই প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হয়ে থাকেন দূতাবাস কর্তৃক৷

বাংলাদেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তারা প্রবাসীদের কথা, প্রবাসী আয়ের কথা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলেন বক্তৃতায়৷ বাস্তবে প্রবাসীদের কথা আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো সরকার আন্তরিকতা দিয়ে ভাবেননি৷

প্রবাসীদের এসব প্রসঙ্গ নিয়েই এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা৷

১. ২০-২৫ বছর আগে যারা উত্তর অ্যামেরিকা-ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া-জাপানে গেছেন, তাঁদের একটা অংশ খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত৷ তাঁরা দেশে বিনিয়োগ করতে চান৷ সরকারও তাঁদের বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে৷ অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান প্রবাসী তিন চারজন প্রবাসী ঢাকায় হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন৷ অস্ট্রেলিয়া-জাপান থেকে অর্থ এনেছেন, বিনিয়োগ বোর্ড থেকে অনুমতি নিয়েছেন, বনানীতে ৬ তলা ভবন ভাড়া নিয়েছেন, ফ্রান্সের একটি চেইন হোটেলের সঙ্গে চুক্তি করেছেন৷ এই মুহূর্তে তাঁরা ঢাকায় বসে আছেন৷ হোটেল উদ্বোধনের অনুমতি পাচ্ছেন না৷ ‘আবাসিক এলাকায় হোটেল করা যাবে না'- বক্তব্য শুনছেন প্রশাসন থেকে৷ আবাসিক এলাকায় হোটেল যদি নাই করা যায়, আগে অনুমতি দিয়েছেন কেন? প্রশ্নের উত্তর নেই৷ দুঃশ্চিন্তা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থায় ঘুরছেন৷

২. বছর তিনেক আগের কথা৷ একজন বাংলাদেশি-জাপানি, জাপান এবং কোরিয়ার ১২টি কোম্পানির সিইও ও পরিচালকদের বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন৷ এর মধ্যে কোরিয়ান জায়ান্ট দাইউর সিইও, জাপানের সনি, ন্যাশনাল প্যানাসনিকসহ বড় বড় কোম্পানির সিইও, পরিচালকরা ছিলেন৷ জাপানের ডায়েটের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্যও ছিলেন সেই দলে৷ বাংলাদেশ সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁরা দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন৷ এক উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করায়, আরেক উপদেষ্টা মন খারাপ করেছিলেন৷ দুই উপদেষ্টার মাঝখানে পড়ে জাপানি-বাংলাদেশির স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায়নি৷ তাদের নিয়ে আমরা চ্যানেল আই ভবনেও একটি মিটিং করেছিলাম৷ কিন্তু সরকারি সহায়তা না পাওয়ায়, তাঁরা ফিরে গেছেন বাংলাদেশ থেকে৷ তাঁদের অনেকে বিনিয়োগ করেছেন মিয়ানমারে৷ জাপানি-বাংলাদেশির সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা হয়, দেখা হয় – মন খারাপ করে দুঃখের কথা বলেন৷

৩. সবার ক্ষেত্রেই যে এমন হয়েছে, তা নয়৷ অনেক প্রবাসী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছেন৷ তাঁদের অধিকাংশ বিনিয়োগই প্লট-ফ্ল্যাট কেন্দ্রিক৷ ব্যবসা-শিল্পে বিনিয়োগ করেননি বললেই চলে৷ যাঁরা ব্যবসা বা শিল্পে বিনিয়োগ করতে চেয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশের অভিজ্ঞতা উপরে যে দুটি ঘটনা বললাম, প্রায় হুবহু তেমন৷ বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রবাসী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন৷ এর মধ্যেও সাধারণ প্রবাসীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি৷

৪. গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৫৩২ কোটি ডলার৷ বাংলাদেশের প্রবাসী আয় মূলত ৫ দেশ নির্ভর৷ সৌদি আরব, ইউএই, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া ও কুয়েত৷ মোট প্রবাসী আয়ের ৭২ শতাংশ এসেছে এই পাঁচ দেশ থেকে৷ শ্রমিক নির্ভর দেশের বাইরে অ্যামেরিকা থেকে এসেছে ২৮২ কোটি ডলার৷ ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান-কোরিয়া থেকে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ খুব বেশি নয়৷ মজার বিষয় হলো, সবচেয়ে বেশি অর্থ সেসব দেশ থেকে আসে, সেই সব দেশের প্রবাসীরা দূতাবাস বা সরকারি সেবা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত৷

৫. সৌদি আরব প্রবাসী একজন ‘সাপ্তাহিক' অফিসে এসেছিলেন মাসখানেক আগে৷ তিনি একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সুপারভাইজার৷ তাঁর স্ত্রী নার্স৷ দু'জনে ভালো আয় করেন৷ তাঁদের দুই সন্তান৷ একজনের বয়স ৯, আরেক জনের ৬৷ তাঁদের আবাস ও কর্মক্ষেত্রের আশপাশে কোনো বাংলাদেশের স্কুল নেই৷ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আছে, তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল৷ তাঁদের পক্ষে দুই সন্তানকে সেখানে পড়ানো সম্ভব নয়৷ এমন স্কুলে পড়াতে পারেন, যেখানে পড়ানো হয় শুধু আরবি৷ দেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না৷ কামরাঙ্গীর চরে ৫ কাঠা জায়গা কিনেছিলেন৷ এক প্রভাবশালী দখল করে নিয়েছেন৷ থানা-পুলিশের থেকে কোনো সহায়তা পাননি৷ উল্টো লাখ দুয়েক টাকা খরচ করতে হয়েছে৷ কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না৷ আমিও তাকে কোনো পরামর্শ দিতে পারিনি৷ সৌদি আরবে বাংলাদেশের স্কুল আছে রিয়াদে৷ কাজের কারণে রিয়াদে চলে যাওয়া সম্ভব নয়৷

৬. সপ্তাহ দু'য়েক আগে কুয়ালালামপুরে কথা হলো অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে৷ তিন বছরের চুক্তিতে ৫ লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া গেছেন৷ তিন বছরে যে টাকা খরচ করে গেছেন, সেই টাকাও তুলতে পারেননি৷ দেশে ফিরে যাননি৷ অবৈধ হয়ে গেছেন৷ এখন পাসপোর্ট নবায়নসহ দূতাবাস থেকে কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না৷ দূতাবাসের সামনে এসে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন৷ ভেতরে ঢোকারও সুযোগ পান না৷ ইউএই, সৌদি আরবের সাধারণ শ্রমিকের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়৷ ঢাকা এয়ারপোর্টের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে৷ তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা-যাওয়া প্রবাসীদের দুর্ভোগ খুব বেশি কমেনি৷ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে৷ দূতাবাস কর্তাদের মানসিকতার কোনো উন্নতি হয়নি৷ প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও, বাস্তবে কোনো কাজই হয়নি৷ ভোটাধিকার প্রবাসীদের দেয়া হয়নি৷ মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট পাওয়া নিয়েও মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা বিপদে আছেন৷ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশগুলোর প্রবাসীদের স্ত্রী-সন্তানরা দেশে থাকেন৷ সন্তানের পড়াশোনার ক্ষেত্রে দেশেও বাড়তি কোনো সুযোগ সুবিধা পান না৷ প্রবাসে কিছু দেশে বাংলাদেশি স্কুল আছে৷ অধিকাংশ জায়গাতেই তা গড়ে উঠেছে প্রবাসীদের উদ্যোগে৷ দেশের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা নেয়া ছাড়া দূতাবাস বা সরকারের তেমন কোনো ভূমিকা নেই৷ দেশে অর্থ পাঠানোর ভিত্তিতে সিআইপি মর্যাদা দেয়া হয় প্রবাসীদের কয়েকজনকে৷ সিআইপি মর্যাদা না পেলেও তাঁদের কোনো সমস্যা হতো না৷ সমস্যা যাঁদের হয়, সেই সাধারণ প্রবাসীদের সুযোগ সুবিধার কথা কারো ভাবনায় থাকে না৷ সরকারের প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দে প্রবাসীদের কোটা থাকে৷ সেখানেও বঞ্চিত হন সবচেয়ে বেশি অর্থ পাঠানো মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রবাসীরা৷

গোলাম মোর্তোজা

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

৭. সরকার বা দূতাবাস প্রবাসীদের বিষয়ে কেমন মানসিকতা পোষণ করেন, সেই ঘটনার একটি চিত্র তুলে ধরে লেখা শেষ করছি৷ টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে৷ সম্প্রতি টোকিও সফরকালে প্রধানমন্ত্রী দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করেছেন৷ সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিদের অল্প কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি৷ বাংলাদেশ-কম্যুনিটির গুরুত্বপূর্ণ, জাপানিজদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন প্রবাসী ব্যক্তিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি৷ বিষয়টি টোকিও প্রবাসী একজন সাংবাদিক লিখেছেন ‘সাপ্তাহিক'-এ৷ টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে৷ সেই প্রতিবাদের ভাষা এমন, ‘... অত্যন্ত দুর্বল ও ভুল বাংলায় লেখা এবং মনগড়া ও অসমর্থিত তথ্যে ভরা প্রতিবেদন৷' অথচ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কোনো তথ্যই বলেননি যে, এটা ঠিক নয়৷ পুরো প্রতিবেদনে ‘ভুল বাংলা' ‘অত্যন্ত দুর্বল লেখা' – ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে এক ধরনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ এই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য প্রকাশ...দূতাবাস কর্তা এবং সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রবাসীদের বিষয়ে সত্যিকারের মানসিকতা৷ অর্থের জন্যে সরকার প্রবাসীদের কথা বক্তৃতায় বলেন, সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা চিন্তাই করেন না, সম্মান-শ্রদ্ধা তো করেনই না৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو