ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা: রথ দেখা, বই বেচা

বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে, তারাই জানেন, বই মাত্রেই কিছু সাহিত্য নয়, এমনকি বই মাত্রেই কিছু মলাটের বই পর্যন্ত নয়, ডিজিটালও হতে পারে৷ তবে বই মাত্রেই কিন্তু আন্তর্জাতিক পুস্তক ব্যবসায়ের অঙ্গ৷

ফ্রাংকফুর্ট বাণিজ্য মেলার চত্বরে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি বসে ‘ফ্রাংকফুর্টার বুখমেসে'৷ সাহিত্যের বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যের সঙ্গে এই মেলায় আরো চোখ কাড়ে জার্মান দক্ষতা: সংগঠনে, সাজসজ্জায়, আয়োজনে – নাম করব না এমন সব দেশের কবি-সাহিত্যিকদের দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়ে ছাড়ে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আগেই বলে রাখি, বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা বলতে প্রকাশকদের সংখ্যার বিচারে; দর্শকদের সংখ্যার বিচারে ইটালির তুরিন শহরের বইমেলাই বিশ্বসেরা৷ তবে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার পরিসংখ্যান শুনলে বেশ খানিকক্ষণ হাঁ করে থাকতে হয়: ১০০টির বেশি দেশ থেকে আসা ৭,০০০ প্রকাশক ও পুস্তক সংস্থা তাদের পুস্তকাবলী প্রদর্শন করেন, যা দেখতে আসেন ২,৮৬,০০০-এর বেশি দর্শক৷ আন্তর্জাতিক বই ব্যবসার কাছে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো স্থান বা তারিখ নেই৷

সানন্দে পড়ুন

শুধু জ্ঞান আহরণের জন্য নয়, স্রেফ আনন্দ উপভোগের জন্যও বই পড়া যায়৷ অনেক পাঠকের কাছে বই পড়ার আনন্দ সত্যিই অতুলনীয়৷ ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার এক স্টলে বড় করে লেখা ছিল, ‘রিডিং ফর প্লেজার’, যার একটাই অর্থ, ‘পড়ুন আনন্দের জন্য৷’

পড়া সত্যিই আনন্দের

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলায় চাইলেই কিন্তু যে কোনো বই কেনা যায় না৷ কেনার জন্য কিছু বই বেশ কিছু স্টলে আলাদা করা ছিল৷ কোনো কোনো স্টলে বিনা মূল্যেও কিছু বই দেয়া হয়েছে৷ এক বইপ্রেমীর আর তর সইছিল না৷ কোথায় বসছেন, চারিদিকে কত কোলাহল – এ সব না ভেবেই বসে পড়লেন পছন্দের বই নিয়ে৷

শিশুও জানে....

মায়ের হাত ধরে এসেছে শিশুটি৷ এইটুকু শিশু হলে কী হবে, তার বই পড়ার ঝোঁকও অসাধারণ৷ সামনে কত লোকের আনাগোনা, এর মাঝেই মা-কে পাশে রেখে দিব্যি বই পড়ায় মন দিয়েছে সে৷

লেখকের সঙ্গে....

ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় লেখক, প্রকাশক আর পাঠকদের কদরই আলাদা৷ নানা আয়োজন ছিল তাঁদের নিয়ে৷ কোথাও আলোচনা সভা, কোথাও লেখকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন পাঠককুল, কোথাও বা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে লেখক, পাঠক কিংবা প্রকাশক৷ এখানে এক লেখিকার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে একটি টেলিভিশন চ্যানেল৷

বিশ্রাম

খাওয়া-দাওয়া আর বিশ্রামের খুব ভালো ব্যবস্থা থাকে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায়৷ কিন্তু কারো কারো তো নিজের পছন্দের পরিবেশও চাই৷ এই তরুণ-তরুণীরা বোধহয় এ কারণেই বিশাল মেলা প্রাঙ্গনের সাজানো-গোছানো আয়োজন থেকে একটু দূরে গিয়ে বসে পড়লেন সিঁড়িতে৷

প্রাচীন বই

একটি স্টল শুধু পুরোনো বইয়ে ঠাসা৷ ১৩শ বছর আগের বইও ছিল সেখানে৷

ক্লান্তি দূর....

এক দিনে পুরো মেলা প্রাঙ্গন ঘুরতে গেলে শরীর-মন একসময় ক্লান্ত হবেই৷ সেই ক্লান্তি দূর করতেও ছিল দারুণ ব্যবস্থ৷ মেলায় এসেছিলেন এক ঝাঁক পোলিশ ফিজিওথেরাপিস্ট৷ ক্লান্ত শরীরটা একটা চেয়ারে ছেড়ে দিন৷ বাকি দায়িত্ব ফিজিওথেরাপিস্টের৷ মাত্র দশ মিনিটের মাজাজে শরীরটাকে আবার চাঙা করে দেবেন তিনি৷ খরচ মাত্র দশ ইউরো!

বই মানেই ট্র্যাডিশন, ঐতিহ্য, প্রথা, পরম্পরা৷ ফ্রাংকফুর্টে প্রথম বইমেলা বসেছিল ১৪৫৪ সালে – ইওহানেস গুটেনব্যার্গ যার স্বল্প আগে কাছের মাইঞ্জ শহরে পুস্তক মুদ্রণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন৷ অষ্টাদশ শতাব্দীতে লাইপসিগ বইমেলা ফ্রাংকফুর্ট বইমেলাকে পিছনে ফেলে দিলেও বেশি দিন সেই মর্যাদা ধরে রাখতে পারেনি৷ সপ্তদশ শতাব্দী অবধি যে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইমেলা ছিল, একবিংশ শতাব্দীর সূচনাতেও দেখা যাচ্ছে সেই ফ্রাংকফুর্ট বইমেলাই আজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইমেলা৷

কিন্তু কেন? তার নানা কারণ আছে, তবে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বোধহয় এই যে, বই সংক্রান্ত স্বত্ব ও অনুমতি বা লাইসেন্সের আন্তর্জাতিক বেচাকেনার সেরা জায়গা হলো এই ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা৷ পাঁচদিনের মেলার প্রথম পাঁচদিনই রাখা যাকে বলে কিনা ইন্ডাস্ট্রির ইনসাইডারদের হাতে – অর্থাৎ যারা বই বেচে খান; শেষ দু'দিন – শনিবার ও রবিবার – আপামর জনতাও বইমেলার পরিবেশ উপভোগ করার সুযোগ পান৷ তবে আসল কথা হলো: বিজনেস ফার্স্ট! প্রকাশনার খোঁজখবর নিন, নেটওয়ার্কিং করুন৷ প্রকাশক, এজেন্ট, বইবিক্রেতা, পুস্তকাগারের পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা পত্রিকার সমালোচক, পুস্তক অলঙ্করণ শিল্পী, অনুবাদক, সফ্টওয়্যার ও মাল্টিমিডিয়া বিশেষজ্ঞ বা ফিল্ম প্রযোজক, সকলেরই দেখা মিলবে এই ফ্রাংকফুর্টে৷ শ'খানেক দেশ থেকেআগত  দশ হাজারের বেশি সাংবাদিক-সংবাদদাতাদেরও দেখা পাওয়া যাবে৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

২০১৭ সালে যেমন মেলা চলবে ১১ই থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত: বইমেলার ওয়েবসাইটে এখনই সব খুঁটিনাটি পাওয়া যাবে৷ এ বছর গেস্ট অফ হনার হবে ফ্রান্স, মেলার ফোকাস হবে ফরাসি সাহিত্য৷ এভাবেই এই বইমেলা ইউরোপের সাংস্কৃতিক বর্যপঞ্জীতে তার সুনির্দিষ্ট স্থান করে নিয়েছে৷ যারাই এই মেলার সংস্পর্শে এসেছেন – লেখক বা সাংবাদিক বা নিছক দর্শক হিসেবে – তারাই তাদের নিজস্ব কিছু স্মৃতি সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন ও সযত্নে মনের মণিকোটায় রেখে দিয়েছেন: আমার জীবনে যেটা সুদূর ১৯৮৬ সালের ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা, ভারত যেবার প্রথমবারের মতো অতিথি দেশ হয়৷

ডয়চে ভেলের থেকে সাংবাদিক হিসেবে গিয়েছিলাম ফ্রাংকফুর্টে৷ আজও ভুলিনি একদিকে মহাশ্বেতা দেবী বা সমরেশ বসু, অন্যদিকে নির্মল বর্মা বা আগ্নেয়র মতো হিন্দি লেখকদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা৷ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ‘দ্য গাইড'-এর লেখক প্রবীণ আর কে নারায়ণের আক্ষেপ: ‘আমার ভাই আমাকে না দেখলে, আজ আমি বেঁচে থাকতে পারতুম না৷' অথবা পাকিস্তানের স্বনামধন্যা লেখিকা কুরাতুলাইন হাইদার যখন তাঁর প্রখ্যাত ‘আগ কা দরিয়া' বইটির বেআইনি পাকিস্তানি ও ভারতীয় সংস্করণ দু'টির কপি তুলে ধরে প্রশ্ন করেন, উপমহাদেশে কপিরাইট বলে কি কিছু নেই?

সুসংবদ্ধ, সুসংগঠিত ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার আঙ্গিকে প্রশ্নটা যেন গুম গুম করে উঠেছিল...

বিশ্ব | 13.10.2014

বন্ধু, কেমন লাগলো অরুণ শঙ্কর চৌধুরীর লেখা? জানান মন্তব্যের ঘরে৷