বাংলাদেশে নদী সংরক্ষণে জার্মান সহায়তা

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ৷ কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কার্যকলাপের ফলে নদীগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা যাচ্ছে৷ জার্মানির উন্নয়ন সাহায্য কর্মীরা পরিস্থিতির উন্নতির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চাইছেন৷
সমাজ সংস্কৃতি | 02.12.2011

বাংলাদেশের নদীর উপর দিয়ে গেলে একটা সমস্যা চোখে পড়ে৷ চারিদিকে নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে, যেমন ব্রহ্মপুত্র নদের ক্ষেত্রে দেখা যায়৷ বর্ষা এসে গেলে হাজার-হাজার মানুষকে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়৷

জার্মানির উন্নয়ন সাহায্য বিশেষজ্ঞরা তাই নিজেরাই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এসেছেন৷ ঢাকার মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী৷ গরমের সময় চারিদিক শুকনা থাকে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজকাল বর্ষার সময় বৃষ্টি ও ভাঙন বেড়েই চলেছে৷ বছরে প্রায় পাঁচ মাসই বৃষ্টি হয়৷

জলবায়ু পরিবর্তন

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ৷ উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে৷ ফলে উপকূলের মানুষ বাসস্থান হারাচ্ছেন৷ অসময়ের বন্যা, খরা ফসলের ক্ষতি করছে৷ মোটের উপর লবণাক্ত পানি চাষ উপযোগী জমির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে৷

বাড়ছে পানি, বাড়ছে ভোগান্তি

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনুযায়ী, ২১০০ সাল নাগাদ যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন হেক্টর জমি প্লাবিত হতে পারে৷ সম্প্রতি সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের পানি পরিমাপ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে৷

জলবায়ু উদ্বাস্তু

বাংলাদেশের জলবায়ু শরণার্থী বিষয়ক সংগঠন এসিআর-এর মুহাম্মদ আবু মুসা চলতি বছর ডয়চে ভেলেকে জানান, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ৪৫ জনের মধ্যে ১ জন জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে৷ আর বাংলাদেশে সংখ্যাটা হবে প্রতি সাতজনে একজন৷ দেশের ১৭ ভাগ এলাকা বিলীন হয়ে যাবে সমুদ্র গর্ভে৷ ইতোমধ্যে কুতুবদিয়া এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ মূল ভূখণ্ড ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন৷

লবণাক্ত পানি

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় লবণাক্ত পানি সমতল ভূমির আরো ভেতরের দিকে চলে আসছে৷ ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে৷ বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে ইতিমধ্যে এ সমস্যা সনাক্ত করা হয়েছে৷ পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷

মাছের উৎপাদন কমছে

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাছ উৎপাদনের উপর৷ মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে৷ এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে খাল, বিল, প্লাবনভূমিতে সময় মতো পানি না পৌঁছানোয় দেশীয় মাছের প্রজনন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷

ক্ষতির শিকার সুন্দরবন

জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ শীর্ষক ইউনেস্কোর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে৷ ইতোমধ্যে সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের সবচেয়ে গহীনের ক্যাম্প মান্দারবাড়িয়া ক্যাম্প সাগরে হারিয়ে গেছে৷

জার্মানির সহায়তা

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশকে প্রায় ১১ মিলিয়ন ইউরো বা ১১২ কোটি টাকার অর্থ সহায়তা দিতে গত বছর এক চুক্তি স্বাক্ষর করে জার্মানি৷ এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের তিনটি উপকূলীয় জেলায় দুর্যোগ সহনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ ২০১২-২০১৭ মেয়াদে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে৷ এসব প্রকল্পের মধ্যে আছে টেকসই রাস্তা-ঘাট, সেতু ও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ৷

জলবায়ু তহবিল

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অর্থ সহায়তা দিতে বিভিন্ন সম্মেলনে সম্মত হয়েছে আন্তর্জাতিক সমাজ৷ তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসব সহায়তা পুরোপুরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে৷ একইসঙ্গে জলবায়ু তহবিল বণ্টনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ সব মিলিয়ে এক্ষেত্রে আরো সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷

মানুষ এবার সেই সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা শুরু করেছে৷ জিআইজেড-এর ক্নুট ওবারহাগেমান বলেন, ‘‘বন্যার বিপদ সংক্রান্ত অসংখ্য বোর্ড বসানো হয়েছে৷ সত্তরের দশকে প্রথম এই আইডিয়া আসে, তবে এখন তার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে৷ বড় বড় নদীর তীর স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাও শুরু হয়েছে৷ জার্মানিতে সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতেই রাইন নদীতে এ কাজ করা হয়েছিল৷ প্রযুক্তির সাহায্যে এখানে সবে এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে৷''

আরও একটি সমস্যার মোকাবিলার কাজও চলছে৷ নদী ও বাতাসে মারাত্মক দূষণ দেখা যায়৷ বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ইটভাটা রয়েছে৷ পাথরের অভাবের কারণে কয়লা পুড়িয়ে ইটভাটায় নির্মাণের উপকরণ তৈরি করতে হয়৷ কেএফডাব্লিউ ব্যাংকের ভিক্টর ব্যোটশার বলেন, ‘‘ইটভাটা থেকে বিশাল পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়৷ অনেক প্রকল্পের মাধ্যমে সেখানে জ্বালানির চাহিদা কমপক্ষে অর্ধেক কমানোর চেষ্টা চলছে৷''

কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে৷ বাংলাদেশের নদ-নদীর পানির একটা বড় অংশ হিমালয় থেকে আসে৷ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলতে থাকলে নদীর পানি আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে৷

বিজ্ঞান পরিবেশ | 03.07.2010

বাংলাদেশের নদীর উপর দিয়ে গেলে একটা সমস্যা চোখে পড়ে৷ চারিদিকে নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে, যেমন ব্রহ্মপুত্র নদের ক্ষেত্রে দেখা যায়৷ বর্ষা এসে গেলে হাজার-হাজার মানুষকে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়৷