সাক্ষাৎকার

‘বাল্যবিয়ে বাড়াতে নয়, কমাতেই এই আইন করেছি’

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে৷ এই আইন শিশুদের আরো বেশি যৌন হয়রানির ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠন৷ তবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বললেন ভিন্ন কথা৷

Bangladesch Meher Afroz Chumki in Dhaka (DW/S. K. Dey)

নতুন আইনে ধর্ষণের শিকার অপ্রাপ্তবয়স্কের সম্মান রক্ষায় ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে৷ শিশু অধিকার বিষয়ক অ্যাক্টিভিস্টরা মনে করেন, এই বিধান নারীর শরীর বা অধিকার রক্ষায় মোটেই সহায়ক নয়৷

এছাড়া আইনে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট' বিবেচনায় ১৮ বছরের কম বয়সিদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে৷

আলোচিত এই আইনের বিভিন্ন দিক ও উদ্ভূত আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি৷

ডয়চে ভেলে: বাল্যবিবাহ নিরোধ যে আইনটি হয়েছে তার বিশেষত্ব কি?

মেহের আফরোজ চুমকি: আপনারা জানেন বাল্যবিবাহ নিরোধ যে আইনটি ছিল, সেটি দীর্ঘদিনের পুরাতন একটি আইন৷ আইনটি পুরনো হওয়ার কারণে এটি বাস্তবায়নে অনেক ফাঁকফোকর ছিল৷ সেগুলো বন্ধ করে আরো শক্তভাবে ও যুগোপযোগী করে আমরা নতুন আইনটি করেছি৷ নতুন এই আইনে যে ধারাগুলো আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- যারা বিয়ে দেবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে এটি আরো কঠোর হয়েছে৷ তাদের অর্থদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে৷ ন্যূনতম এক লাখ টাকা করা হয়েছে৷ তাদের সাজার মেয়াদ দুই বছর করা হয়েছে৷ পাশাপাশি ইউএনও এবং জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাদের ‘ম্যাজেষ্ট্রেসি পাওয়ার' দেয়া হয়েছে৷ আগে রোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে দেয়া হত, সেই জায়গাটাও বন্ধ হয়ে গেছে৷ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সমস্যা থেকে যাতে পরিত্রাণ পায় সে ব্যাপারেও কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷ কোন বিয়ে যদি আমরা বন্ধ করি সেখানে একটা মুচলেকা রাখা হবে৷ ভবিষ্যতে যাতে সে এই কাজ না করে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে৷

অডিও শুনুন 08:52

‘‘এই আইন বাল্যবিবাহ রোধে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে’’

এই আইনটি বাল্যবিবাহ রোধে কতটুকু ভূমিকা রাখবে?

এই আইন বাল্যবিবাহ রোধে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে৷ পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করবে৷ কাজী, ম্যারেজ রেজিষ্ট্রার, অভিভাবক - এঁরা বাল্যবিয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত৷ এই অভিভাবকদের কঠোর আইনের মধ্যে আনা হচ্ছে, ফলে তাঁরা এখন চিন্তা করবেন৷ ম্যারেজ রেজিষ্ট্রার যদি কোথাও বাল্যবিয়ে রেজিষ্ট্রি করেন তাহলে তাঁর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে৷ 

এই আইনে যে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে, তাতে অনেকের আশঙ্কা, বাল্যবিয়ে বেড়ে যেতে পারে? অনেক অভিভাবক ইচ্ছা করে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে দিতে পারেন? এ ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?

বয়স বাড়িয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ আর সব আইনেই বিশেষ ধারা থাকে, এখানেও আছে৷ এখানেও কিন্তু ‘স্পেশাল কেস'৷ সেটা করাও কিন্তু সহজ না৷ এখানে অভিভাবক, আইন-আদালতের সম্মতি নিয়েই কিন্তু বিয়েটা দিতে হবে৷ সেখানে কিন্তু আমরা দেখব এই বিয়ের ফলে মেয়েটি কোনো উপকার পাচ্ছে কি-না? তাকে জোর, জবরদস্তি করে বিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ এগুলো দেখার নির্ধারিত কমিটি থাকবে৷ আদালতে যেতে হলেও এই কমিটির মাধ্যম দিয়েই যেতে হবে৷ আপনি কি কালই সব সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন? যদি না পারেন তাহলে তো বিষয়গুলো দেখতে হবে৷ এক্ষেত্রে তো সামাজিক অনেক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে৷ ধরেন, অত্যন্ত গরিব একটি পরিবার, তাদের একটি ঘর৷ সেই ঘরে বাবা-মা থাকেন, আবার মেয়েও থাকেন৷ এই বাবা কিন্তু এইভাবে মেয়েকে ১৮ বছর পর্যন্ত রাখতে চাইবেন না৷ তাদের একটা বাড়ি তৈরি করে দেয়া দরকার৷ আমরা কি সেটা পারছি? পারছি না৷ কালকেই পারব সেটাও বলতে পারছি না৷ তার জন্য একটু সময়ের দরকার আছে৷ কোন কোন সময় কিন্তু অনেক জটিলতা আসবে৷ সেই জটিলতাটাও আমাদের বুঝতে হবে৷ একদিকে আইন এবং অন্যদিকে আমরা অনেক ধরনের কর্মসূচি চলমান রেখেছি৷

এই আইনটা করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় দলগুলোর কি কোনো চাপ ছিল?

এই আইন করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোনো দলের প্রভাব ছিল না৷ এরপর ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে যখন আমরা বসব তখন আপনারাই বুঝতে পারবেন যে তারাই আমাদের প্রতি বেশি দূর্বল হচ্ছে৷ মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আমরা তাদের প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি৷

সংসদে এই আইনটি পাস করার আগে বিরোধী দল আরো জনমত যাচাই এবং সংস্কারের কথা বলেছিল৷ তাদের মতামত এখানে গুরুত্ব পায়নি৷ ভবিষ্যতে বিলটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কি-না?

গুরুত্ব পায়নি এই কথা ঠিক নয়৷ স্থায়ী কমিটিতে ১০ জন সদস্য আছেন৷ তার মধ্যে বিরোধী দলের সদস্যও আছেন৷ বিভিন্ন পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আমরা বসেছি৷ তারা হয়ত বয়সের কথা বলেছে, সেটা আমরা চিন্তা-ভাবনা করেই ঠিক করেছি৷ আমরা কিন্তু সবার সঙ্গে আলোচনা করেছি৷ একটা বিষয় আলোচনা করলে সবাই কিন্তু একমত নাও হতে পারেন৷ শতভাগ মানুষ প্রত্যেকটি ধারায় একমত হবে, এমনটা নাও হতে পারে৷ আমরা সামাজিকতাকে নিয়ে চিন্তা করেছি৷ সমাজকে সিকিউরিটি দেয়া, বিশেষ করে আমাদের মেয়েদের সিকিউরিটির কথাটা আমরা বিবেচনা করেছি৷

আমরা তো নারী শিক্ষা বা নারীর অগ্রগতিতে অনেকদূর এগিয়েছি, এই আইনটা কি নারীদের অগ্রগতিতে কোনো বাধার সৃষ্টি করবে?

যাঁরা এটা ভাবছেন, তাঁদের আমি বলব আপনারা একটু ধৈর্য্য ধারণ করুন৷ এটা নিয়ে কথা না বলে মাঠে আমরা কি করছি আপনারা দেখেন৷ আমরা কি বাল্যবিয়েতে উৎসাহ দিচ্ছি, না এটা বন্ধ করার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছি, সেটা আপনারা একটু দেখেন৷ আমরা সবাই মিলেই তো এই আইনটা করেছি৷ নিশ্চয় আমরা বাল্যবিয়ে বাড়ানোর জন্য এই আইনটা করিনি, বাল্যবিয়ে কমানোর জন্যই করেছি৷ এই ধরনের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে আমার মনে হয় ভালো হয়৷

এই আইনটার মতো কি বিশ্বের আর কোনো দেশে আইন আছে?

অনেক দেশে এই আইন আছে৷ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গিয়ে দেখেন, বিশেষ ‘কজ' তাদেরও আছে৷ সেখানে বলা আছে, ১৫ বছর বয়সে একটা মেয়ে বিয়ে করতে পারবে৷ আর ১৮ বছর বয়স হলে সে যদি মনে করে এই বিয়েটা তার ভুল হয়েছে তাহলে সে ডিভোর্স দিতেও পারবে৷ ভারত ছাড়াও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও এমন আইন আছে৷ তাহলে বাংলাদেশে এটা নিয়ে এত অস্থির হওয়ার কী আছে আমি বুঝলাম না৷

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শুধু মেয়েদের বয়স নিয়ে আলোচনা হয়, এক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স নিয়ে আলোচনা হয় না৷ এটা নিয়ে আলোচনা হওয়া কতটা জরুরি?

আলোচনা হয় না কেন? সবগুলো নিয়েই আলোচনা হওয়া জরুরি৷ তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ছেলেরা ২১ বছরের নীচে বিয়েতে খুব একটা উৎসাহিত থাকে না৷ খুবই কমই হয়৷ তারপরও এ বিষয়টা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না৷ আমার মনে হয়, ক'দিন পরে মেয়েদের বয়স যে ১৮ বছর, এটা নিয়ে আলোচনাও কমে যাবে৷ আমার বিশ্বাস, এক বছরের মধ্যেই এই আলোচনা অর্ধেকে নেমে আসবে৷ আমরা একটা উদ্যোগ নিয়েছি, কিছুদিন পর দেখবেন ছেলেরাই বলবে, ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েকে বিয়ে করব না৷ আর মেয়েরা বলবে, আমরাও ১৮ বছরের আগে বিয়ে করব না৷ তখন অর্ধেক সমস্যা এখানেই সমাধান হয়ে যাবে৷

বিশেষ বিধানে সর্বনিম্ন বয়স কত, এটা কিন্তু উল্লেখ নেই?

এটা তো ‘স্পেশাল' বিষয়৷ সে কারণে এখানে বয়সের কোনো বিষয় আসেনি৷ তার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশে ৫/৭ বছরে বা ১০ বছরে বিয়ে দেয়৷ এটা কিন্তু বাংলাদেশে নাই বললেই চলে৷

এটা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

বাংলাদেশে অন্য আইনগুলো যেভাবে প্রয়োগ হয়, এটাও সেভাবে প্রয়োগ হবে৷ আজকেই যদি কেউ একটা বিয়ে দেয় আর বলে এটা ‘স্পেশাল' তাহলে তাকে বলতে হবে এটা কীভাবে স্পেশাল৷ সেই স্পেশালের সমাধান যদি না থাকে, তাহলে বিয়ে হবে৷ আর যদি আমরা সমাধান করতে পারি তাহলে তো হলোই, বিয়ে হবে না৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو