বিকৃত পর্নো নয়, দরকার নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা

প্রযুক্তির কারণেই ‘পর্নোগ্রাফি' আজ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে৷ এজন্য আজকাল আর নামজাদা পর্নোস্টারদের ভিডিও বা চটি বইয়ের সন্ধান করতে হয় না৷ ইন্টারনেট আছে যে! সেখানে তো না চাইলেও ঘুরে-ফিরে আসতে থাকে নানা পর্নো সংবাদ!

ইন্টারনেটে ভালো-মন্দ, সত্য-অসত্য নানা কিছু পাওয়া যায় – তথ্য, আপনার পছন্দের সংগীত, এমনকি সেক্সও৷ যাবে না কেন? কথায় তো আছে – ‘সেক্স সেলস'৷ কিন্তু বাজারে বিক্রি হয় বলেই কি আমাদের সেটা কিনতে হবে? আমাদের কি নিজস্ব রুচি বলতে কিছু নেই? নেই আত্মমর্যাদা, নারীর প্রতি সম্মান?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

এ প্রশ্ন আমার আজকের নয়৷ মনে পড়ে, তখন কলেজে পড়ি৷ আমার প্রথম বসন্ত, প্রথম প্রেমের সময়৷ তখন একদিন না জানিয়েই চলে গিয়েছিলাম সেই বিশেষ বন্ধুর বাড়িতে৷ গিয়ে দেখি, সে একটা ‘ব্লু-ফিল্ম' দেখছে৷ বললাম, ‘‘আমিও দেখবো৷'' কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো, গুলিয়ে উঠলো গা৷ এ কী দেখছি! এ তো নারী-পুরুষের ভালোবাসা নয়, এ তো ক্ষমতার চরম প্রদর্শন৷ সেক্সের নামে মেয়েদের যন্ত্রণা দেওয়া, অকথ্য নির্যাতন, অমর্যাদা...!

আমার পুরুষ বন্ধুটি অবশ্য সে কথা মানতে চায়নি৷ তাকে ভালোবাসার দোহাই দিয়েও আমার মনন-যন্ত্রণার কথা বোঝাতে পারিনি সেদিন৷ আর সে মানবেই বা কেন? সে-ও তো পুরুষ৷ আর এই পুরুষরাই তো পর্নো ছবির প্রধান দর্শক৷ পুরুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্যই তো এসব তৈরি হয়, বিক্রি হয়৷ মেয়েদের দাসীবৃত্তি, পতিতাবৃত্তি, পর্নোবৃত্তি সবই যে পুরুষের ভোগের জন্য৷ আচ্ছা, আপনিই বলুন, আপনার দেখা কোনো পর্নো ছবিতে কি নারীর স্বাভাবিক যৌনাকাঙ্খার মূল্য দেওয়া হয়েছে? হয়নি৷

সমাজ

দেশি চটি বই থেকে বিদেশি ‘প্লেবয়’

একটা সময় পর্যন্ত ঢাকায় তো বটেই, দেশের প্রায় সব মফঃস্বল শহরেও গোপনে বিক্রি হতো ‘চটি বই’৷ আদিরসাত্মক গল্পের সেই বইগুলো লেখা হতো ছদ্মনামে৷ চটি বইয়ের বাইরে ‘জলসা’, ‘নাট্যরাজ-’এর মতো নিরীহ নামের কিছু ‘পিনআপ’ ম্যাগাজিনও ছিল, যেগুলো প্রকাশের উদ্দেশ্যই ছিল নারীদেহ এবং যৌনকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে পাঠক মনে যৌন উদ্দীপনা জাগানো৷ এছাড়া বড় শহরগুলোয় ‘প্লেবয়’ ম্যাগাজিনও পাওয়া যেত৷

সমাজ

ভিসিআরের হাত ধরে ‘ব্লু ফিল্ম’

ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার, অর্থাৎ ভিসিআরের কয়েক বছর পর হয়ত কোনো চিহ্নই থাকবে না৷ গত বছরের জুনেজাপানে তৈরি হলো বিশ্বের সর্বশেষ ভিসিআর৷ মানে বিশ্বের কোথাও আর কখনো ভিসিআর তৈরি হবে না৷ বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফির বিস্তারে এই ভিসিআর একসময় খুব বড় ভূমিকা রেখেছে৷ প্রেক্ষাগৃহে না গিয়ে ঘরে বসে হিন্দি, ইংরেজি ছবি দেখা শুরু হয়েছিল ভিসিআর দিয়ে৷ একটি চক্র তখন নানা জায়গায় গোপনে ‘ব্লু ফিল্ম’-ও দেখাতে শুরু করে৷

সমাজ

সিনেমা হলে ‘কাটপিস’

দেশের কিছু প্রেক্ষাগৃহে হলিউডের মুভি দেখানো হতো৷ এক সময় ঘোষিত মুভির ফাঁকে ফাঁকে দেখানো শুরু হয় ‘ব্লু ফিল্ম’৷ এই প্রবণতা অন্য হলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে৷ বাংলা ছবির ফাঁকে ফাঁকে দেখানো শুরু হয় ‘কাট পিস’, অর্থাৎ পর্নো ছবির অংশ বিশেষ৷

সমাজ

সিডি থেকে ডিভিডি

কম্পিউটারের আগমনের পর থেকে অল্প অল্প করে কমপ্যাক্ট ডিস্ক, অর্থাৎ সিডিতেও ঢুকে পড়ে পর্নো ছবি৷ সেই ছবি পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে৷ সিডির পর এলো ডিজিটাল ভার্সেটাইল ডিস্ক, অর্থাৎ ডিভিডি৷ ভার্সেটাইল ডিস্ক দেশে জ্ঞান এবং সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে নিঃসন্দেহে ‘ভার্সেটাইল’ ভূমিকাই রাখছে, তবে পাশাপাশি যে পর্নোগ্রাফির ধারক, বাহক হিসেবেও এর একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছে তা-ও অস্কীকার করা যাবে না৷

সমাজ

অন্তর্জালে পর্নোজাল

গত কয়েক বছরে দেশে ইন্টারনেট ও তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বিষ্ময়কর হারে বেড়েছে৷ সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ দশমিক ৬৮ কোটি৷ ইন্টারনেটের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে৷ পর্নোসাইটের দৌরাত্ম এত ভয়াবহভাবে যে, সম্প্রতি পর্নোগ্রাফি ও আপত্তিকর কন্টেন্ট প্রকাশ বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) পাঁচশ’রও বেশি পর্নোসাইট বন্ধ করেছে৷

সমাজ

মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফি

দেশের ৬ দশমিক ৬৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯৪ দশমিক ১৮ শতাংশই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে৷ ফলে মোবাইলই হয়ে উঠেছে পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় উৎস৷ হাতে হাতে মোবাইল, তাই পর্নোগ্রাফি ও আপত্তিকর কন্টেন্টও হয়ে উঠেছে সহজলভ্য৷

সমাজ

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক একবার জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ‘‘দেশে প্রতি ১২ সেকেন্ডে অন্তত একটি করে নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে৷’’ নতুন অ্যাকাউন্টগুলোর উল্লেখযোগ্য একটি অংশই ‘ভুয়া’৷ এভাবে কিছু লোক ফেসবুক, টুইটারেও নানা ধরণের অপতৎপরতা চালাচ্ছে৷ এর ফলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও পর্নোগ্রাফির বিস্তার বাড়ছে৷

পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন অবশ্য নতুন নয়৷ সত্তরের দশক থেকেই পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন পশ্চিমের নারীবাদীরা৷ এই যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথরিন ম্যাককিনন৷ তবে তিনি এটা বলেননি যে, পর্নোগ্রাফি অশ্লীল, তাই একে নিষিদ্ধ করো৷ বরং তাঁর কথায়, পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করতে হবে, কারণ,  ‘সেক্স ডিসক্রিমিনেশন' বা লিঙ্গ বৈষম্যই শুধু নয়, এর মাধ্যমে নারীর অধিকারও লঙ্ঘিত হয়৷ কিন্তু সেই আন্দোলনে কাজ হয়নি৷ যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় জায়গায় নারীবিরোধী পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করার লড়াই তাঁকে আজও করে যেতে হচ্ছে৷

বিজ্ঞান পরিবেশ | 22.06.2011

তাঁর মতো নারীবাদীরা বলেন, পর্নো ছবিতে সাধারণত যে যৌনতা দেখানো হয়, তা নিতান্তই পুরুষের দাপট দেখানোর নামান্তর৷ অর্থাৎ পুরুষরা মারবে, মেয়েরা মার খাবে৷ পুরুষরা যথেচ্ছাচার করবে, মেয়েটিকে বেঁধে, চাবকে, চড়িয়ে, উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে যা ইচ্ছে তা-ই করবে, কিন্তু মেয়েটি মেনে নেবে৷ তাদের মান, সম্মান, অধিকার, স্বাধীনতাকে যত খর্ব করা হবে, ততই আনন্দ পেতে হবে তাদের, হাসতে হবে খিলখিল করে৷ অবশ্য এমনটা আমার-আপনার দেখা বহু মেয়েকেই রোজই করে যেতে হয়৷ ‘বর' নামের প্রভুটির কথায় উঠতে-বসতে হয় নিত্যদিন৷ এমনকি স্বামীর ছলনায় ভুলে নিজেরাই অনেকসময় পর্নোস্টার হয়ে ওঠেন তারা, নিজেরই অজান্তে৷

‘পর্নোগ্রাফি' শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘পর্ন' ও ‘গ্রাফোস' থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ – বারাঙ্গণাদের সম্পর্কে লেখালেখি৷ পর্ন শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘বেশ্যা'৷ আরো পরিষ্কারভাবে বললে, সবচেয়ে নীচু জাতের ‘গণিকা' বা যৌনকর্মী৷ সুতরাং পর্নোগ্রাফির মানে কোনোভাবেই ‘যৌনকর্মের বিবরণ' অথবা ‘কামোদ্দীপক বর্ণনা' নয়৷ পর্নোগ্রাফির অর্থ – জঘণ্য, সস্তা, ‘বেশ্যা' রূপে নারীর চিত্রায়ন৷ আমি নারীর এমন চিত্রায়নের বিরোধী৷ বিরোধী নারীকে যৌন সম্ভোগের সামগ্রী হিসেবে, বেশ্যা হিসেবে দেখানোর৷ সে কারণেই আমি পর্নোগ্রাফির বিরোধী৷ অথচ দেখুন, আমাদের সংস্কৃতিতে, মহাকাব্যগুলোতেও কিন্তু এমন অসংখ্য নারী চরিত্র আমরা পেয়েছি৷ কামসূত্রের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, কিন্তু খাজুরাহো অথবা কোনার্কের সূর্য মন্দির? সেখানকার শিল্প-স্থাপত্যে যৌনতা, কাম, সম্ভোগ – এই বিষয়গুলি কি আসেনি?

Guha Debarati Kommentarbild App

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সম্পাদক

আবার ধরুন, মানুষ কে সৃষ্টি করেছে? ঈশ্বর৷ তা ঈশ্বর কে? হ্যাঁ, একজন পুরুষ৷ অর্থাৎ, পুরুষের যৌন আধিপত্যের বাস্তব কাঠামোর মধ্যেই একজন ‘বেশ্যা' টিকে থাকে৷ ঐ কাঠামোয় একজন নারী শুধুমাত্র যৌনবস্তু, তার অন্য কোনো সত্তা নেই৷ তাই পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহৃত নারীর যৌনতারও একইভাবে মূল্যায়ন হয়৷ তাদের আলাদা কোনো জীবন নেই, সুখ-দুঃখের কথা তো ছেড়েই দিলাম৷ শুধু তাই নয়, পর্নোগ্রাফিতে পুরুষ যেভাবে নারীর ওপর বলপ্রয়োগ করে, সেটাও কি বাস্তব নয়? আমি তো বলবো, একেবারে বাস্তব, বস্তুনিষ্ঠ৷ কারণ, আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজেও যে এ রকম বলপ্রয়োগ নারীর বিরুদ্ধে হচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ হচ্ছে না? ঘটছে না ধর্ষণ, দাম্পত্য ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, নির্যাতন অথবা হত্যার ঘটনা?

বিজ্ঞান পরিবেশ | 06.06.2014

অন্যদিকে নারীর যৌন-স্বাধীনতাতেও বিশ্বাসী আমি৷ মানে কেউ যদি স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তি বা পর্নো ছবি করে, তবে তাকে বাধা দেওয়ার আমি কে? কিন্তু যৌন-স্বাধীনতার নামে যৌন-পরাধীনতা বা পতিতাবৃত্তির পক্ষ আমি একজন নারী হয়ে কীভাবে নেব? বিশেষ করে এটা জেনে, এটা বুঝে যে, আমাদের সমাজে, এই বিশ্বে, নিজের ইচ্ছায় ক'টা মেয়ে এমন কাজ বেছে নেবে? তাই পর্নোবিরোধী নারীবাদীদের মতোই আমি যৌনতা বা ‘ইরোটিসিজম'-এর বিরুদ্ধে নই৷ বরং আমি ‘ভায়োলেন্স' বা সহিংসতাকে ‘ইরোটিসাইজ' করার বিরুদ্ধে৷ হিউমিলিয়েশন, অসম্মান, অপমানকে, যন্ত্রণাকে ‘ইরোটিসাইজ' করার বিরুদ্ধে৷

তাই পর্নোগ্রাফি নিয়ে আলোচনা করার আগে, তার ভালো-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরার আগে, প্রয়োজন নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, সম অধিকার আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক৷ কারণ, যতদিন না নারী শিক্ষিত ও স্বনির্ভর হচ্ছে, যতদিন না নারীবিরোধী কুসংস্কারের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি হচ্ছে, যতদিন না সম অধিকার পাচ্ছে নারী, ততদিন নারীর শরীর নিয়ে পুরুষের বিকৃত উৎসব চলতেই থাকবে, থাকবেই৷

দেবারতি গুহকে বা তাঁর লেখা নিয়ে আপনি কিছু বলতে চান? তাহলে লিখুন নীচে, মন্তব্যের ঘরে৷

‘নিষিদ্ধ’ বিষয়

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে যৌনতা সংক্রান্ত মনোবৃত্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে৷ জার্মানিতে ‘ব্রাভো’-র মতো টিনেজার ম্যাগাজিনগুলিতে খোলাখুলি সেক্স সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়৷ এর আগে ফিল্মেও যা ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় ছিল, তাই নিয়েই তৈরি হয় ১৯৬৮ সালের হিট ছবি ‘সুয়র জাখে, শ্যাটসেন’ বা ‘পথে এসো, প্রেয়সী’৷ এখানে ছবির নায়ক-নায়িকা ভ্যার্নার এঙ্কে ও উশি গ্লাস; মাঝের মহিলাটি হলেন পরিচালিকা মাই স্পিল্স৷

মা যা ছিলেন

পঞ্চাশের দশকেও দুনিয়াটা ‘ঠিকঠাক’ ছিল – অন্তত নবীন পশ্চিম জার্মানির নীতি-নৈতিকতা যাদের দায়িত্বে, তাদের চোখে৷ নারীর স্থান ছিল গৃহে, সংসারে, পতিব্রতা স্ত্রী, স্নেহময়ী জননী, নিপুণা গৃহকর্ত্রী হিসেবে৷ কাজে যেতেন শুধু পুরুষরা৷ জনসমক্ষে সেক্স নিয়ে কথা বলা কিংবা রাস্তায় চুমু খাওয়া চলত না৷ ব্যক্তিগত জীবন ও নৈতিকতা ছিল গির্জা বা সরকারের তাঁবে৷

আদম ও হবার কাহিনি

১৯৫১ সালের জার্মান ছবি ‘দি জ্যুন্ডারিন’ বা ‘পাপিনী’ জার্মান ফিল্ম জগতে কেলেংকারির অবতারণা ঘটায়৷ রক্ষণশীল চ্যান্সেলর কনরাড আডেনাউয়ার-এর আমলে এ ধরনের ‘নোংরামি’ সেন্সর করা উচিত, এই ছিল অধিকাংশ মানুষের অভিমত৷ ‘পাপিনী’ ছবির যৌনোদ্দীপনামূলক দৃশ্যগুলো ছিল অতি সংক্ষিপ্ত, তা সত্ত্বেও ছবিটিকে কেন্দ্র করে নৈতিকতা ও প্রকাশ্য যৌনতা নিয়ে বিপুল তর্ক শুরু হয়ে যায়৷

নারীমুক্তি

শেরিং কোম্পানি যখন ১৯৬১ সালে প্রথম গর্ভনিরোধক ‘পিল’ বাজারে ছাড়তে শুরু করে, তখন জার্মানির গির্জায় গির্জায় ‘যুবসমাজের নৈতিক অধোপতন’ সম্পর্কে ভাষণ শোনা গেছে৷ পিল নেওয়ার ফলে মহিলাদের যৌন আসক্তির খবর বেরোয় পত্রপত্রিকায়৷ সব সত্ত্বেও, গর্ভনিরোধের নতুন উপায়গুলি মহিলাদের স্বনির্ধারণে সাহায্য করে৷

ছাত্র বিপ্লব, যৌন বিপ্লব

ষাটের দশকের শেষে জার্মানিতে যে ছাত্র বিপ্লব দেখা দেয়, তার সঙ্গে তথাকথিত ‘কাউন্টার কালচার’ বা বিকল্প সংস্কৃতিরও যোগ ছিল৷ সেই বিকল্প সংস্কৃতি – হিপি আমলের রূপরেখা অনুযায়ী – খোলা এবং স্বাধীন যৌনতায় বিশ্বাস করত, যার একটা প্রমাণ পাওয়া যায় ‘কমিউন ওয়ান’-এর মতো কুখ্যাত কলোনিতে স্ত্রী-পুরুষের একসঙ্গে বাস ও সহবাসে৷ যে কারণে রাইন্যার লাংহান্স এবং উশি ওবারমায়ার-এর মতো চরিত্র আজও অবিস্মৃত৷

যৌনশিক্ষা

৬৮-র ছাত্র বিপ্লব পশ্চিমে পরিবারজীবনের সংজ্ঞাই বদলে দেয়৷ তরুণ বাবা-মায়েরা নিজেদের ‘বাবা’ কি ‘মা’ বলে অভিহিত না করে, নাম ধরেই ডাকতে শুরু করেন৷ ১৯৬৯ সালে স্কুলের জীববিজ্ঞান ক্লাশে একটি যৌনশিক্ষার ‘মানচিত্র’ চালু করা হয়৷ স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অর্থানুকুল্যে সৃষ্ট ‘হেলগা’ নামধারী একটি যৌনশিক্ষার ফিল্ম দেখতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হতো৷

মেইল-অর্ডার যৌনতা

‘বেয়াটে উজে’ বললেই জার্মানির শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ আজও বোঝেন: মেইল-অর্ডার সেক্স-শপ৷ যদিও সে-ধরনের দোকানে বাস্তবিক ঢোকার মতো সাহস আজও সকলের নেই – লোকলজ্জা বলে একটা কথা আছে তো৷ বেয়াটে উজে-র বাণিজ্যিক সাফল্যের সূচনা ১৯৪৮ সালে, যখন তিনি মহিলাদের গর্ভনিরোধের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করার জন্য একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেন৷ তার পরে আসে তাঁর মেইল-অর্ডার সেক্স-শপ৷

পশ্চিমের আগে পুব

সাবেক পূর্ব জার্মানির মানুষরা তাদের পশ্চিমের সতীর্থদের চেয়ে অনেক বেশি যৌন স্বাধীনতা ভোগ করেছেন৷ গোটা পূর্ব জার্মানি জুড়ে ছিল নিউডিস্ট ক্লাব৷ যৌনতার বিচারে পুবের মেয়েরা পশ্চিমের মেয়েদের চেয়ে বেশি ‘স্বাধীন’ ছিলেন, বাচ্চাদের সরকারি ডে-কেয়ারে জমা করে প্যান্ট-শার্ট পরে কাজে যেতেন৷ স্বাধীনতার অপরপীঠে ছিল রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা৷ যেমন এই সাইনটিতে পূর্ব জার্মানির মায়েদের ‘ধন্যবাদ’ জানানো হচ্ছে৷

‘বিকারগ্রস্ত সমাজ’

যে সব চিত্রপরিচালক সর্বপ্রথম সমকামিতা নিয়ে ছবি তৈরি করেন, রোজা ফন প্রাউনহাইম ছিলেন তাঁদের অন্যতম৷ ১৯৭১ সালে তিনি একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন, যার বক্তব্য ছিল: সমকামী নিজে বিকারগ্রস্ত নয়, বিকারগ্রস্ত হল তার সমাজ৷ এভাবেই তিনি জার্মানির ‘গে’ এবং ‘লেসবিয়ান’ সম্প্রদায়ের জন্য সম্মান ও সমানাধিকার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে দেন৷

যুগ-যুগান্তের সংস্কার

জার্মানিতে সমকামিতা ছিল একটি বিতর্কিত বিষয়, রাজনীতিকরাও যা নিয়ে কথা বলতে ভয় পেতেন৷ আইনের যে সূত্র – ১৭৫ নং অনুচ্ছেদ – দু’টি পুরুষের মধ্যে যৌন সম্পর্ককে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষণা করেছিল, সেই অনুচ্ছেদটি ১৯৬৯ সালে কিছুটা নরম করার পর, ১৯৯৪ সালে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়৷ কিন্তু – বিশেষ করে খেলাধুলার জগতে – সমকামীদের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব আজও পুরোপুরি উধাও হয়নি৷

নারী না পুরুষ?

ট্র্যান্সভেস্টাইট আর্টিস্ট, ২০১৪ সালের ইউরোভিশন সং কনটেস্ট বিজয়ী কনচিটা ভুয়র্স্ট ওরফে টম নয়ভির্থ আজ একজন সেলিব্রিটি৷ দাড়ি-সম্বলিত, ইভনিং গাউন পরিহিতা কনচিটা ২০১৫ সালের ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতায় উপস্থাপিকা ছিলেন৷ তা-তে কারো কোনো আপত্তি দেখা যায়নি – আপাতদৃষ্টিতে৷...

ইতিহাস

জার্মানির ‘ড্র্যাগ কুইন’ তথা টিভি হোস্ট লিলো ভান্ডার্স এই প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন৷ ‘নির্লজ্জ? পরিবর্তনের মুখে যৌন নৈতিকতা’ প্রদর্শনীটি চলবে ২০১৬ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি অবধি, বন শহরের ‘হাউড ডেয়ার গেশিস্টে’ বা ইতিহাস ভবনে৷