বাংলাদেশ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিতর্ক ও ইস্যু

পক্ষপাতের উর্ধ্বে উঠে বিচারিক মন নিয়ে বিচারকরা বিচার করবেন – এটা সব সমাজের চিরন্তন নীতি৷ সভ্যতার শুরুর দিকে শাসকই ছিলেন বিচারকদের প্রধান৷ তবে সভ্যতা গণতান্ত্রিক পথে পা বাড়ানো শুরু করলে পৃথক বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে৷

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরী

বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় এসে সম্পূর্ণরূপে পৃথক বিচার ব্যবস্থার ধারণা গড়ে উঠে৷ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তাতেই বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের কথা বলা হয়েছে৷

বাহাত্তরের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে৷

তবে সংবিধানে এই ধরনের বিধান থাকলেও বাংলাদেশের বিচার বিভাগ বহু জায়গায় রাষ্ট্রের অন্য বিভাগের সঙ্গে একাকার হয়েছিল৷

এমনকি নিম্ন আদালতের বিচারকরা নিয়োগও পেতেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে৷ বদলিসহ অন্যান্য কাজ করতো আইন মন্ত্রণালয়৷

এ অবস্থার অবসানে আইনি লড়াই হয় উচ্চ আদালতে৷ দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ মাসদার হোসেন মামলায় এক ঐতিহাসিক রায় দেয়৷ রায়ে বিচার বিভাগকে পৃথক করতে ১২ দফা নির্দেশনা দেয় আদালত৷

তবে এই রায়ের পরও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণে আট বছর পেরিয়ে যায়৷ এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আমল পেরিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক হয়ে যায়৷

নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোচনায় ঘুরে ফিরে এটা আসে৷ বর্তমানে নিয়োগের কাজটি করে থাকে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন৷ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে বদলি-পদোন্নতির কাজটি করে থাকে আইন মন্ত্রণালয়৷ 

এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট একটি বিচার বিভাগীয় সচিবালয় করতে চায়৷ এই লক্ষ্যে পুরাতন সড়ক ভবনে এই ‘সচিবালয়ে'-র জন্য একটি জায়গা উদ্বোধনও হয়েছে৷ তবে এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে৷

এখনো সুপ্রিম কোর্টের ওই সচিবালয় এলাকায় আদালতের প্রশাসনিক বিভাগের কর্মকর্তারা বসেন৷ সু্প্রিম কোর্টের কাজ করেন৷ নিম্ন আদালত চলে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই৷ তবে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেয়া হয়৷

এই পরামর্শের ব্যতিক্রম যে হয় না, সেটা নয়৷ তবে সমালোচকদের বক্তব্য হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের ইচ্ছার বাইরে নিম্ন আদালতে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ থাকাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার হুমকি৷

এক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হচ্ছে, বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের নেই৷ তাছাড়া তারা সুপ্রিম কোর্টের ইচ্ছাতে কেবল সাচিবিক কাজই করেন৷

তবে সম্প্রতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশে সরকার বারবার সময় নিচ্ছে৷ এটা চূড়ান্ত হলে নিম্ন আদালতের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও খর্ব হবে বলে অনেকে মত দেন৷

উচ্চ আদালত

বিচারে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদের উপর সরকারের প্রভাব বিস্তার করা কঠিন৷ আদালত অবমাননার অভিযোগে বিশেষ করে সরকারের দুই মন্ত্রীর দণ্ড হওয়ার পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোচনার বিষয়ে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়৷

তবে অনেকে উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগ-অপসারণকে এই আলোচনায় যুক্ত করে দেখেন৷ এই দুই ক্ষমতা সরকারের কাছে থাকলে কিছু কিছু সংকট তৈরি হতে পারে৷ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিকে বাধাগ্রস্থ করতে বিএনপি সরকার ইচ্ছা করে আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ দেয়নি বলে তখন অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগের৷

পর্যাপ্ত বিচারক না থাকার বাস্তবতাও সে সময় দেখা যায়৷ আবার অনেক বিচারপতি বিব্রতও হয়েছেন ওই সময়৷ যেটাকে ‘অস্বাভাবিক' মনে করেছেন অনেকেই৷

সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনায় যোগ হয়েছে মাত্রা যোগ হয়েছে৷

বিচারকদের অপসারণ পদ্ধতি

বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়৷ এই সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়, এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোনো প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না৷

এরপর বলা হয়, এই অনুচ্ছেদের ২ দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে৷

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে চলে যায়৷ পরে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ওই সংশোধনী বাতিল হয়ে যায়৷ এরপর বিচারকদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়৷

এই পদ্ধতিতে কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক তদন্ত করেন৷ সর্বশেষ শাহবাগ আন্দোলনের কর্মী রাজীব হায়দারের বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষপূর্ণ' লেখা বিতরণের অভিযোগ ওঠার পর এক বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্তে নামে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল৷ তবে তদন্তের পর তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়৷

জিয়ার আমলে করা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী উচ্চ আদালতে বাতিল হলেও এই অংশ অক্ষত থেকে যায়৷

বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের আগের মেয়াদে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়েও এখানে হাত দেয়নি৷

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে ফিরিয়ে আনা হয় ৭২-এর সংবিধানের এ সংক্রান্ত বিধান৷ তিন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত আইন করার ঘোষণা দেন আইনমন্ত্রী৷

এই সংশোধনীর উদ্যোগ নেয়ার পর উচ্চ আদালতের অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এর বিরোধিতা করেন৷ সংশোধনী পাস হওয়ার পরও এই সমালোচনা অব্যাহত থাকে৷

এর মাঝেই সরকার সবচেয়ে বড় সমর্থনটি সম্ভবত আইন কমিশন থেকে পায়৷ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর আইন কমিশন একটি আইনেরও প্রস্তাব করে৷

এই কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক৷ যিনি পঞ্চম সংশোধনী মামলায় বিচারকের দায়িত্বে থাকলেও রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল করেননি৷

২০১৪ সালের নভেম্বরে এই সংশোধনী নিয়ে রুল দেয় হাই কোর্ট৷ শুনানির পর ১৬ সালের ৫ মে ওই সংশোধনী বাতিলের রায় হয়৷ রায়ে এই সংশোধনীকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়৷ 

এই মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে৷ আপিল বিভাগে এই শুনানিতে গত ৯ মে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে৷

বিচারপতি নিয়োগ

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণে সংবিধান সংশোধন, আইন তৈরি ইত্যাদি পর্যন্ত গড়ালেও নিয়োগের কোনো আইন বা বিধান নেই৷ সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতায় রাষ্ট্রপতি তাদেরকে নিয়োগ করে থাকেন৷ এক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেয়ার চল রয়েছে

তবে এক্ষেত্রেও পরামর্শের ব্যতিক্রম হয়েছে বলে নানা সময়ে শোনা যায়৷ বিচারক নিয়োগে দিক নির্দেশনা চেয়ে ২০১০ সালে একটি মামলাও হয়েছিল৷ ওই বছরের ৬ জুন আদালত এ বিষয়ে রুল দেয়৷ সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে গত ১৩ এপ্রিল পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে দেয় হাই কোর্ট৷

সুলাইমান নিলয়

সুলাইমান নিলয়, সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

গত ২২ মে ওই রায় প্রকাশিত হয়েছে৷ হাই কোর্টের বিচারক হিসাবে যোগ্য লোক খুঁজে পেতে বিভিন্ন মাপকাঠির কথা রায়ে বলা হয়েছে৷ তবে যেহেতু পুরো প্রক্রিয়া রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতি সম্পন্ন করে থাকেন, তাই আদেশ জারি করেনি৷ নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও এই রায়ে বলা হয়েছে৷ নীতিমালা তৈরি সংসদের সার্বভৌম এখতিয়ার হওয়ায়-আদালত সেখানেও কোনো নির্দেশনা দেয়নি৷

অবশ্য আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের শেষের দিকে হাই কোর্টে অস্থায়ী বিচারক হিসাবে নিয়োগ পেয়ে পরে বিএনপি আমলে স্থায়ী নিয়োগ বঞ্চিত হয়েছিলেন কিছুসংখ্যক বিচারক৷ তাঁদের মধ্যে ১০ জন এক মামলায় ‘নিয়োগ না দেয়াকে' চ্যালেঞ্জ করেন৷ ওই রায়ে সর্বোচ্চ আদালত এ ধরণের নীতিমালা করতে নির্দেশনা দিয়েছিল৷

সাম্প্রতিক এই রায়ে পূর্বের ওই রায়ের কথাও উদ্বৃত করে আদালত বলে, নীতিমালা প্রণয়নে সংসদের একান্ত এখতিয়ারে নির্দেশনা দিলে সেটা ভবিষ্যতে অসাংবিধানিক বিবেচিত হতে পারে৷
একইসঙ্গে সর্বশেষ এই মামলায় রুলের জবাব দিতে আদালতে না আসায় এবং আদালতকে সহযোগিতা না করায় বিবাদী আইন সচিব, মন্ত্রি পরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের সমালোচনা করেন৷

বিবাদীদের আদালতে না আসাসহ সার্বিকভাবে রায়ের এই পর্যায়ে এসে বলা যায়, বিষয়টির সমাধান এবং ভবিষ্যত গতিপথ সরকারের উপরই নির্ভর করছে৷

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গও সামনে আসে৷ এটা নিয়েও কথা থাকে৷ নিম্ন আদালতের ব্যয় সংস্থানের কাজটি আইন মন্ত্রণালয় করে৷ উচ্চ আদালত সরকার থেকে বরাদ্দ পায়৷ এ বিষয়টিও নিয়মের মধ্যে আসা উচিত – এমন আলোচনা আইন অঙ্গনে শোনা গেছে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو