বিজ্ঞান এদের শিরায় শিরায়, প্রযুক্তি এদের ধমনীতে

‘বিশ্বের খুব কম দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই পরিমাণ অবদান রেখেছে'; জার্মানি সম্পর্কে মন্তব্যটি খোদ ইউরোপীয় কমিশনের৷ কেন, তা বুঝতে গেলে নোবেল প্রাইজ গোনার দরকার নেই, কয়েকটি প্রকল্প দেখলেই চলে৷

যে দেশে মিউনিখ, হাইডেলব্যার্গ বা বার্লিন ছাড়াও অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়েবিজ্ঞান-প্রযুক্তি নিয়ে পঠন-পাঠন ও গবেষণা চলে; যে দেশে হুমবোল্ট কিংবা ডয়চে ফর্শুংসগেমাইনশাফ্টের মতো নিধি গবেষণায় অর্থসংস্থান করে থাকে – সেই সঙ্গে সরকারের অর্থনীতি মন্ত্রণালয়; যে দেশে মাক্স প্লাঙ্ক, ফ্রাউনহোফার, হেল্মহলৎসের মতো বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়ে সর্বাধুনিক গবেষণা চলেছে – সেই আইনস্টাইন, হাইজেনব্যার্গ, শ্রোয়ডিঙ্গার-এর দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মান বোঝানোর জন্য বিশেষ কোনো পন্থা অবলম্বন না করে উপায় নেই৷ তবে দু'টি জিনিস আগে থেকে বলে নেওয়া দরকার৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

‘দ্বিবিধ'

প্রথমত, জার্মানির অর্থনীতি ও জার্মানির সমৃদ্ধি দাঁড়িয়ে রয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ব্যবহারিক শিল্পোৎপাদনের যৌথ ভিত্তির উপরে৷ তাত্ত্বিক গবেষণাতেও জার্মানরা এককালে মার্কিনিদের চেয়ে কম যেতেন না, কিন্তু প্রযুক্তি হলো জার্মানদের নিজেদের খেলার মাঠ, তাদের নিজেদের স্টেডিয়াম, যেখানে তাদের হারানো শক্ত৷

বিজ্ঞান

আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু

সবর্প্রথম উদ্ভিদে প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু৷ বিভিন্ন উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার এক পর্যায়ে তার মনে হলো, বিদ্যুৎ প্রবাহে উদ্ভিদও উত্তেজনা অনুভব করে এবং সাড়া দিতে পারে৷ এর অর্থ, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে৷ ১৯১০ সালের দিকে বিজ্ঞানী বসু তাঁর গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বই আকারে প্রকাশ করেন৷

বিজ্ঞান

ড.কুদরাত-এ-খুদা

গবেষণা জীবনের এক পর্যায়ে, তিনি বনৌষধি, গাছগাছড়ার গুণাগুণ, পাট, লবণ, কাঠকয়লা, মৃত্তিকা ও অনান্য খনিজ পদার্থ নিয়ে কাজ করেন৷ বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি ও তাঁর সহকর্মীদের ১৮টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে ন’টি পাটসংক্রান্ত৷ এর মধ্যে পাট ও পাটকাঠি থেকে রেয়ন, পাটকাঠি থেকে কাগজ এবং রস ও গুড় থেকে মল্ট ভিনেগার আবিষ্কার উল্লেখযোগ্য৷ দেশে বিদেশে তাঁর ১০২টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে৷

বিজ্ঞান

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

১৯২২ সালে পার্টিকেল স্ট্যাটিস্টিক্স নিয়ে সত্যেন বোসের গবেষণাটি, যেটি আইনস্টাইন নিজে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, অনেকের ভাষায় ২০ শতকের সেরা দশ কাজের একটি৷ যদিও তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি, কোয়ান্টাম থিওরির অনেক গবেষণার পথ খুলে দেয় তাঁর গবেষণা৷ কোয়ান্টাম ফিজিক্সের অনন্য আবিষ্কার ‘গডস পার্টিকেলস’ বা ‘ঈশ্বর কণা’-র নামকরণ করা হয়েছে, তাঁর ও আরেক পদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগসের নামে – হিগস-বোসন পার্টিকেল৷

বিজ্ঞান

পি সি রায়

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পায়নে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য৷ ১৮৯৫ সালে তিনি মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার করেন যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে৷ এটি তার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার৷ তিনি তার সমগ্র জীবনে মোট ১২ টি যৌগিক লবণ এবং পাঁচটি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন৷

বিজ্ঞান

মেঘনাদ সাহা

মেঘনাদ সাহা পরমাণু বিজ্ঞান, আয়ন মণ্ডল, পঞ্জিকা সংস্কার, বন্যা প্রতিরোধ ও নদী পরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা করেন৷ তাপীয় আয়নবাদ সংক্রান্ত তত্ত্ব উদ্ভাবন করে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন৷

বিজ্ঞান

আব্দুস সাত্তার খান

নাসা ইউনাইটেড টেকনোলজিস এবং অ্যালস্টমে কাজ করার সময়ে ৪০টিরও বেশি সংকর ধাতু উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানী খান৷ এই সংকর ধাতুগুলো ইঞ্জিনকে আরো হালকা করেছে, যার ফলে উড়োজাহাজের পক্ষে আরো দ্রুত উড্ডয়ন সম্ভব হয়েছে এবং ট্রেনকে আরো গতিশীল করেছে৷ তার উদ্ভাবিত সংকর ধাতুগুলো এফ-১৬ ও এফ-১৭ যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে৷

বিজ্ঞান

ডাক্তার শাহ এম ফারুক

কলেরা রোগের কারণ আবিষ্কার করেছেন ডা. ফারুক৷ কলেরার ঘটক ‘ভিবরিও’ নামে এক ধরনের শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়ার সংস্পর্শে অন্যান্য ব্যাক্টেরিয়া এসে কীভাবে একে আরো কার্যকরী বা শক্তিশালী করে তোলে সেটিই ছিল তাঁর গবেষণা৷ আন্তর্জাতিক কলেরা রোগ গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআরবি-তে তিনি ও তাঁর গবেষণা দল এ আবিষ্কার করেন৷

বিজ্ঞান

ড. মাকসুদুল আলম

পাটের জিনের আবিষ্কারক ড. মাকসুদুল আলম৷ এই বাংলাদেশি জিনতত্ত্ববিদের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডাটাসফটের একদল উদ্যমী গবেষকের যৌথ প্রচেষ্টায় ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সফলভাবে উন্মোচিত হয় পাটের জিন নকশা৷

বিজ্ঞান

ড. জামালউদ্দিন

বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর সৌর বিদ্যুৎ কোষ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে ম্যারিল্যান্ডের কপিন স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং গবেষক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. জামালউদ্দিন ইতিহাস গড়েছেন৷ ড. জামাল উদ্দিন এবং তার গ্রুপ সোলার সেল থেকে শতকরা ৪৩.৪ পুনঃব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে যা বিশ্বে এই উৎপাদনের সর্বোচ্চ মাত্রা৷

বিজ্ঞান

শুভ রায়

বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম কিডনি তৈরি করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী শুভ রায়৷ এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য কীর্তি৷ ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সহযোগী অধ্যাপক শুভ রায় তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে কৃত্রিম কিডনি তৈরির কাজ শুরু করেন৷ চলতি দশকের গোড়ার দিকে দলটি ঘোষণা দেয় যে, তাঁরা কৃত্রিম কিডনি তৈরি করে তা অন্য প্রাণীর দেহে প্রতিস্থাপন করে সফল হয়েছে৷

বিজ্ঞান

হরিপদ কাপালী

হরিপদ কাপালী ছিলেন এক প্রান্তিক কৃষক৷ কিন্তু তাঁর আবিষ্কার হরিধান কৃষিবিজ্ঞানের এক অনন্য সাফল্য৷ প্রকৃতির কাছ থেকেই শিক্ষা৷ প্রকৃতিতেই তাঁর গবেষণা৷ তাঁর নামে নামকরণ করা এই ধানটি অন্য যে কোনো ধানের চেয়ে উচ্চ ফলনশীল৷ এতে সার ও ওষুধও লাগে অনেক কম৷ সব মিলিয়ে সোনার বাংলার সোনালি আবিষ্কার হরিপদ কাপালীর হরিধান৷

শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন তাদের ‘ডুয়াল' বা ‘দ্বিবিধ' শিক্ষাপ্রণালীর মাধ্যমে জার্মানরা শিক্ষার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক, দু'টো দিককে মেলাতে পেরেছেন, ঠিক সেইভাবেই এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় নানা শিল্পসংস্থা, সকলে মিলে নতুন ও আধুনিকতর পণ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টায় সামিল৷ কিন্তু গবেষণার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য যে শেষমেষ কোনো না কোনোভাবে মানুষের ও সমাজের কাজে লাগা, সেটাও যেমন জার্মানরা ভোলেন না; সেইরকম গবেষণা যে অর্থসাপেক্ষ, গবেষণাকে যে শেষমেষ শিল্প-ব্যবসায়ের জন্য পণ্য বা পরিষেবা সৃষ্টি করে তার নিজের খরচ নিজেকেই পুষিয়ে নিতে হবে, জার্মানরা সেটাও ভোলেন না৷

ফ্লেক্সনেট অ্যান্ড কো.

বিষয়টা দৃষ্টান্ত ছাড়া বোঝানো কঠিন, তাই গিয়েছিলাম ইউরোপীয় কমিশনের ওয়েবসাইটে, ইউরোপীয় কমিশনের অর্থানুকুল্যে জার্মানিতে কী ধরনের গবেষণা প্রকল্প চলেছে, তার খোঁজে৷ স্বভাবতই এই সব প্রকল্পে বিভিন্ন জার্মান শিল্পসংস্থা ও গবেষণা সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট৷ এদেশে সেটাই স্বাভাবিক৷ প্রথমেই নেওয়া যাক ‘ফ্লেক্সনেট' প্রকল্পটিকে৷ জার্মানির কেমনিৎস টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি আরো ১৫টি ইউরোপীয় সহযোগীর সঙ্গে ইউরোপের ছোট ও মাঝারি আকারের শিল্পসংস্থাগুলির জন্য ‘‘অরগ্যানিক অ্যান্ড ফ্লেক্সিবল'' পদার্থ ব্যবহার করে এমন সব প্রযুক্তি ও পণ্য উদ্ভাবন করার চেষ্টা করছে, যা সোলার প্যানেল থেকে ব্যাটারি ও লাইটিং বা ডিসপ্লে অবধি নানাভাবে প্রয়োগ করা চলবে৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থানুকুল্যে দ্বিতীয় যে প্রকল্পটি চলছে, তার নাম এসএমই রোবোটিক্স৷ এখানেও উদ্দেশ্য হলো ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য এক নতুন ধরনের ম্যানুফ্যাকচারিং রোবট তৈরি করা, যার জটিল প্রোগ্রামিং-এর প্রয়োজন পড়বে না, বরং ঐ বুদ্ধিমান রোবটটি তার মানুষ সহকর্মীর কাছ থেকে নিজেই শিখে নেবে৷ প্রকল্পটির সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে জার্মানির ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউট ফর ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অটোমেশন৷

এভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরেকটি প্রকল্পে অর্থসংস্থান করছে, যার নাম হল ‘ই-ব্রেনস'৷ জার্মানির ইনফিনিয়ন টেকনোলজিস কোম্পানির নেতৃত্বে একটি আন্তঃ-ইউরোপীয় কনসর্টিয়াম অতি ক্ষুদ্র, নানো পর্যায়ের সেন্সর তৈরি করছে, যা বাড়িতে প্রাত্যহিক জীবনে মিনিয়েচারাইজেশান ও ‘স্মার্ট' বেতার যোগাযোগ দ্রুততর করবে৷

আর ন্যানোতেও যদি না হয়, তাহলে রয়েছে ‘দ্য ডিয়ামান্ট' নামের একটি প্রকল্প৷ জার্মানির উল্ম বিশ্বদ্যালয়ের নেতৃত্বে এই প্রকল্পে সলিড স্টেট মলিকিউলার টেকনোলজি নিয়ে কাজ চলেছে: সহজ করে বলতে গেলে, একটি নানো পর্যায়ের হিরের জালির উপর নিখুঁতভাবে এক একটি করে অণু, অর্থাৎ অ্যাটম বসানোর প্রচেষ্টা চলেছে৷ এক্ষেত্রে ইউরোপীয় কমিশনও তাদের সংশ্লিষ্ট ওয়েবপেজে বলতে বাধ্য হয়েছে যে, এ ধরনের প্রযুক্তির আপাতত কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ না থাকলেও ‘‘নিকট ভবিষ্যতে'' এগুলি নিশ্চয় বাণিজ্যিক উপযোগিতা পাবে৷

আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷