সংবাদভাষ্য

বিপিএল আসলে আমাদের ক্রিকেটপ্রেমের মাশুল

প্রথম বিপিএল-এর ঘটনা৷ রাতে অফিস থেকে গেছি এই জেনে যে চার সেমিফাইনালিস্টের একটি হচ্ছে চিটাগাং কিংস৷ পরদিন বিস্ফারিত চোখে দেখলাম, ওদের জায়গায় বরিশাল বার্নার্স! খোঁজ নিয়ে যা শুনলাম তাতে মফস্বলের টুর্নামেন্টের কথা মনে পড়ল৷

Bangladesch Cricket Premier League (Mir Farid)

মফস্বলে যেসব ক্ষেত্রে একটা আয়োজক কমিটি থাকে, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো আইন-টাইন বদলে পছন্দের দলকে সেমিফাইনাল-ফাইনাল খেলিয়ে দেয়৷ তাই বলে সেটা দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে! তা ও সব ক্ষেত্রে কমিটির লোকদের আত্মরক্ষার্থে মাঝে-মধ্যে দৌড়াতেও হয়৷ এখানেও বিষয়টা প্রায় সেরকমই হয়েছিল৷ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ম্যাচ রেফারি, যার অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা ইংরেজি, তিনি ইংরেজির ভুল ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন হেনস্তা হয়েছেন যে প্রায় পালানোর অবস্থা৷ বিষয়টা চূড়ান্ত রকম হাস্যকর৷ কিন্তু ভেবে দেখলাম একেবারেই কি অপ্রত্যাশিত? অল্প ক্রিকেট-বেশি নাচ-গান, সামান্য খেলা বিপুল পরিমাণ ধূলা মিলিয়ে যে একটা মেঘাচ্ছন্ন আকাশ বিপিএলকে ঘিরে ছিল শুরু থেকেই, তাতে তো এমন কিছুই হওয়ার কথা৷

এই জাতীয় মতিগতি দেখে পত্রিকায় অনেক লেখা হয়েছে৷ আশঙ্কার সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী ছিল৷ কেউ শোনেনি৷ এবং আসলে আইপিএল-বিপিএল জাতীয় প্রতিযোগিতায় এগুলো কেউ শুনতে চায় না৷ ক্রিকেটের সঙ্গে মশলা মিশিয়ে এমন একটা উপাদান তৈরি হয় যাতে বাজার আর বাণিজ্যই এক এবং একমাত্র অঙ্ক৷ ক্রিকেটাররা এখানে যত না খেলোয়াড় তার চেয়ে বেশি বিনোদনকারী৷

মাশরাফি ও মুশফিক

মাশরাফি ও মুশফিক

দর্শকরা যত না ক্রিকেটপ্রেমী বলে বিবেচিত, তার চেয়ে বেশি ভোক্তা৷ মানুষ নাচাও, টাকা কামাও এবং ‘টুর্নামেন্ট দারুণ সফল হয়েছে' ঢোল বাজাও – এই মোটামুটি মূলমন্ত্র৷ সেখানে কর্মের চেয়ে অপকর্ম বেশি ঘটবে এই তো স্বাভাবিক৷ তা যেসব ক্ষেত্রে এরকম হয়, অর্থাত্‍ সুবিধার চেয়ে সমস্যা বেশি, সেগুলো বাদ দিয়ে দেয়াই তো উচিত৷

কিন্তু সমস্যা হলো, তারপরও বিপিএলকে আমরা বাদ দিতে পারব না৷ ক্রিকেট বাস্তবতা আমাদের এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে বিপিএল হচ্ছে সেই ‘দুষ্ট গরু' যাকে গোয়াল থেকে বের করে দেয়ার উপায় নেই৷ সব দেখব, জানব, তবু এই ‘প্রয়োজনীয় ক্ষত'-টা নিয়েই চলতে হবে৷

বিপিএল প্রয়োজনীয় এজন্য যে এখন টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একটা অনিবার্য অনুষঙ্গ৷ ধরনের কারণে জনপ্রিয়তা এমন বাড়ছে যে এটা একসময় ক্রিকেটের মূল ফরম্যাটও হয়ে যেতে পারে৷ তা হোক না হোক, যেহেতু একটা বিশ্বকাপ পর্যন্ত হচ্ছে কাজেই টি-টোয়েন্টির জন্য তৈরি হতে হবে৷ আর তৈরির জন্য বিপিএল হচ্ছে আদর্শ মঞ্চ৷ এখানে খেলার মাধ্যমেই সেই পর্যায়ের জন্য সঠিক প্রস্তুতিটা হয়৷ সম্ভাব্য আগামী দিনের খেলোয়াড়দেরও দেখা মেলে এখান থেকে৷ এর বাইরে আরেকটু বিস্তৃত করে চিন্তা করলে সামগ্রিক ক্রিকেটেও লাভ আছে কিছু৷ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের খেলোয়াড়দের সঙ্গে এক দলে খেলে তরুণদের মধ্যে বিশ্বাস বাড়ে৷

বিপিএল ২০১৬-তে বরিশাল বুলস

বিপিএল ২০১৬-তে বরিশাল বুলস

গেইলকে যখন আমাদের একজন তরুণ বোলার আউট করে তখন এই বিশ্বাসটা তার মধ্যে চলে আসে যে ‘আমার পক্ষেও সম্ভব'৷ মাঠ এবং মাঠের বাইরে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকা হয় বলে ওদের প্রস্তুতি, নিজেকে বিন্যস্ত রাখা এসব শিক্ষাও হয় সমান্তরালে৷

সমস্যাদগ্ধ প্রথম বিপিএলের পরই ঢাকায় হয়েছিল এশিয়া কাপ৷ সেটা ওয়ানডে টুর্নামেন্ট হলেও বিপিএলজাত বিশ্বাস সেখানে বাংলাদেশের সাফল্যের একটা নিয়ামক হয়েছিল৷ এরপর থেকে যে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ খুব ধারাবাহিক সেই কৃতিত্বটাও বিপিএলকে কিছুটা দিতে হবে৷ তবে চুপিচুপি সতর্কবাণীটা জানিয়ে রাখা যাক৷ যতটা ঢোল সবাই বাজায় অতটা কীর্তিময় বিপিএল কখনোই নয়৷ যুক্তি আছে, তবে এর মধ্যে ফাঁকও প্রচুর৷ আইপিএল বা বিপিএল জাতীয় টুর্নামেন্টের সার্থকতার নিদর্শন হিসাবে প্রধান যে যুক্তিটা দেখানো হয়, তরুণ খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক তারকাদের সান্নিধ্য পাওয়া৷ আইপিএল-এ তারকামেলা বসে, কিন্তু আমাদের বিপিএল-এর সময় আন্তর্জাতিক দলগুলো খেলার মধ্যে থাকে বলে সাবেক তারকা এবং অন্য দেশের উঠতিরাই ভরসা৷ সাবেক তারকাদের নাম অনেক ভারী শোনায়, কিন্তু সাঙ্গাকারা-মাহেলারা এখন পুরনো দিনের মানুষ৷ এই টুর্নামেন্টগুলো তাঁদের কাছে স্রেফ একটা টুর্নামেন্ট, হয়ত টাকা রোজগারের জায়গা৷ এমন কিছু অর্জনের নেই বলে হালকা চালে খেলাই স্বাভাবিক, সেটা দেখে তরুণদের মনে হওয়া স্বাভাবিক ক্রিকেটটা আসলে এভাবেই খেলা উচিত৷ হালকা চালে৷ আয়েশী ভঙ্গিতে৷ নিবেদন, নিষ্ঠা,এগুলোর খুব দরকার নেই৷ সেটা কিন্তু ওদের বিপথে যাওয়ার পথেই এগিয়ে দেয়৷

মোস্তফা মামুন, উপ-সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

মোস্তফা মামুন, উপ-সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

দ্বিতীয় বিষয় হলো পার্টি কালচার৷ ব্যবসায়ীরা থাকেন মালিকানায়, সিনে অঙ্গনের লোকজন থাকেন শোভা বাড়াতে, দু'টো মিলে পার্টি আর উদ্দাম উত্‍সব৷ অল্প বয়সের ক্রিকেটাররা মাঠের ক্রিকেটের আগে পার্টিটা শিখে ফেলা কি ভালো? আর খেয়াল করলে দেখবেন এই ধরনের ক্রিকেট দিয়ে যাদের আবির্ভাব, তারা সাধারণত খুব স্থায়ী হতে পারে না৷ কারণ ক্রিকেটটাই তারা শেখে অন্যভাবে৷ এটা বরং কাজের হয় তাঁদের জন্য, যাঁরা ইতিমধ্যে ক্রিকেটে এসে খেলাটার চরিত্রটা ধরে ফেলেছে৷ ফলে ভালোটা নিয়ে ভুলটা দূরে রাখার ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারে৷ তরুণ খেলোয়াড়দেরই তাই বুঝতে হবে, বাজারে দুধও পাওয়া যায়, মদও পাওয়া যায়৷ তাদের দুধটাই নিতে হবে৷ নিলে টিকে থাকবে৷ না হয় হারিয়ে যাবে৷ নিজেদের উপরই দায়িত্ব৷ দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্যই পাতানো৷ শুধুমাত্র ম্যাচ পাতানোর ঘটনার কারণে কোনো একটা টুর্নামেন্ট এক বছর বন্ধ ছিল এরকম ঘটনাই পৃথিবীতে বিরল৷ এবং এবারও সেই ম্যাচ পাতানোর গন্ধ৷ অভিযোগ পর্যন্ত পৌঁছেছে ঘটনা৷

বিপিএল বা এই জাতীয় ক্রিকেটের চরিত্রের সঙ্গে ম্যাচ পাতানো ব্যাপারটা এমনভাবে মিশে আছে যে এ থেকে পুরো মুক্তির কোনো পথ নেই৷ এমনকি যেখানে আইসিসি প্রধান পর্যন্ত সন্দেহের আঙুল পৌঁছে যায়, সেখানে বিসিবি এই আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলবে এই আশাও বাড়াবাড়ি৷ কিন্তু এই ক্ষেত্রে তবু একটা পয়েন্ট পাবে বাংলাদেশ বোর্ড৷ বিশেষ করে এই বোর্ড দায়িত্ব নেয়ার পর দ্বিতীয় বিপিএল-এ ম্যাচ পাতানোতে দায়ীদের যেভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছে সেটা খুবই প্রশংসার৷ পরের বিপিএল-এ তাই রোগটা একটু দূরেই ছিল৷ এবার আবার তার দুষ্ট হাতের ছায়া৷ এই সত্যটা মেনে নেই যে, এই ধরণের ক্রিকেটে ম্যাচ পাতানো ব্যাপারটা এমন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে যে এটা পুরো দূর করার একটাই উপায় আর তা হলো, বিপিএল বন্ধ করে দেয়া৷ সেটা যখন আর সম্ভব নয়, তাই ম্যাচ পাতানো হবে এটা মেনে নেয়াই শ্রেয়৷ কিন্তু ঐ যে সহনীয় সীমার মধ্যে রাখা৷ ক্রিকেট বোর্ডের তত্‍পর থাকা৷

অপরাধীকে শাস্তি দিলে অন্তত পরের আসরটা নিরাপদ রাখা যায়; এই শিক্ষা তো আমাদের আছেই৷ ক্যানসারকে যেমন কেমো দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, তেমনি তদন্ত আর শাস্তি দিয়েই শুধু এটাকে সহ্য সীমায় রাখা সম্ভব৷ ম্যাচ পাতানো বিষয়টা মেনে নেয়ার সুযোগ নেই, কিন্তু বিপিএল-এ আরেকটা আপত্তিকর বিষয় যেন সবাই মেনে নিয়েছে৷ এখানে পার্টি, নাচ-গান ইত্যাদি থাকবে৷ ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের জায়গায় বিদেশি কিংবা দেশি গ্ল্যামার গার্লদের রাখা হবে বিনোদন বাড়াতে৷ এখানেই বড় আফসোসটা৷ ক্রিকেট বা খেলাধুলা নিজেই এত বড় একটা বিনোদন যে আকর্ষণের নামে তাতে বাড়তি কিছু যোগ করার চেষ্টা করার মানে আসলে খেলাটাকেই অপমান করা৷

কিন্তু দুঃখের কথা কাকে বলি, খেলার এই অমর্যাদায় যাদের সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদী হওয়ার কথা সেই ক্রিকেটাররাই এই দুষ্ট নাচের সঙ্গে পা মেলান৷ ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে নিজেরাও নেমে যান প্রায় ভাঁড়ের স্তরে৷ নিজেদের খেলার শক্তি আর মর্যাদাটাই ওরা বুঝলেন না! প্রশাসকরা ব্যবসা আর ব্র্যান্ডিংয়ের নামে খেলাটাকে করে ফেলেন৷ সাবেক ক্রিকেটাররা বিনোদনের নামে নিজেদের সস্তা বানান৷ ক্রিকেটাররাই পাতানো খেলা খেলেন৷ তাহলে আর অক্ষম আমরা কী করতে পারি? পারি শুধু দুধ আর মদের তফাত্‍ করে ঠিক জিনিসটা বেছে নিতে৷ কেউ পয়সা বানানোর ধান্দা করবে, কেউ কেউ নষ্টামি ঢোকাবে কিন্তু এর মধ্যেও আমরা ক্রিকেট আর খেলাটাকেই দেখার চেষ্টা করব৷ দর্শক হিসাবে বাড়তি এবং কঠিন দায়িত্ব৷ কিন্তু কী আর করা! খেলাটাকে ভালোবাসি যখন, তখন ভালোবাসার উপদ্রবটা তো মানতেই হবে৷ বিপিএল তাই আসলে আমাদের ক্রিকেটপ্রেমের মাশুল৷

মোস্তফা মামুন, উপ-সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

বন্ধু, মোস্তফা মামুনের এই লেখাটা কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو