বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মোকাবিলা কঠিন নয়: আইপিসিসি

বার্লিনে সপ্তাহব্যাপী অধিবেশনের পর আইপিসিসি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা, পরিণাম ও এর মোকাবিলা সম্পর্কে অনেক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছে৷ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই পরামর্শ-প্রস্তাব কার্যকর করার কতটা সদিচ্ছা রাখেন, সেটা এবার লক্ষ্যণীয়৷
বিজ্ঞান পরিবেশ | 07.04.2014

ব্যক্তিবিশেষ জেনেশুনে ভুল করলে তাকে ‘জ্ঞানপাপী' বলা হয়৷ কিন্তু গোটা মানবজাতি যদি বছরের পর বছর ধরে সতর্কবাণী উপেক্ষা করে নিজেদের ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চললে কী হয়, তার কোনো সংজ্ঞা এখনো তৈরি হয়নি৷ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল আইপিসিসি আবার জানিয়ে দিলো যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটে চলেছে এবং তার পরিণাম হবে মারাত্মক৷ অথচ এর মোকাবিলার কাজ মোটেই কঠিন নয়, ব্যয়ভারও তেমন বেশি নয়৷ অত্যন্ত দ্রুত সেই কাজ শুরু না করলে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে৷

আইপিসিসি-র হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড সহ অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাসের মাত্রা বছরে গড়ে ২.২ শতাংশ বেড়ে গেছে৷ বিশেষ করে জ্বালানি ক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহারই এর একটা বড় কারণ৷ কোনো কিছু না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এখনকার তুলনায় ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে৷

বাকি বিশ্ব থেকে দ্বিগুণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা বিশ্বে তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে, আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে সেই মাত্রাটা প্রায় দ্বিগুণ৷ এভাবে বরফ গলার কারণে আর্কটিকে যাওয়ার পথ সহজ ও সংক্ষিপ্ত হচ্ছে৷ ফলে সেখানে থাকা সম্পদ আহরণের কাজে সুবিধা হবে৷ তাই খুশি এ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী৷

খুশি আর্কটিকের দেশগুলোও

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পাঁচটি আর্কটিক দেশ – ক্যানাডা, ডেনমার্ক, নরওয়ে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র – বিভিন্নভাবে সেখানে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে৷ উল্লেখ্য, আর্কটিকের কতটুকু অংশ কার নিয়ন্ত্রণে সেটা নিয়ে এখনো দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ রয়েছে৷

প্রায় এক চতুর্থাংশ

ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা, বিশ্বে এখনো যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস আছে তার প্রায় এক চতুর্থাংশ রয়েছে আর্কটিকের বরফের নীচে৷

সামরিক উপস্থিতি

সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকার কারণে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্থিক লাভের বিষয়টি সামনে আসায় ডেনমার্ক, ক্যানাডা, রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে৷ ছবিতে মার্কিন একটি সাবমেরিনকে বরফের নীচ থেকে বের হতে দেখা যাচ্ছে৷

গ্রিনপিসের বিরোধিতা

আর্কটিকে তেলের ড্রিলিং এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রিনপিসের৷ কারণ ড্রিলিং করতে গিয়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে উত্তর মেরুর পরিবেশের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে সংগঠনটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ কেননা দুর্গম ঐ পরিবেশে উদ্ধার তৎপরতা চালানোও বেশ কঠিন হবে৷

উত্তর মেরুতে বিমানযাত্রা

ছবিতে বিমান থেকে বরফ সরাতে দেখা যাচ্ছে৷ আর্কটিক সার্কেলে ওড়াওড়ি করা বিমানের জন্য এটা একটা নিয়মিত ব্যাপার৷ তবে গবেষণায় দেখা গেছে, আর্কটিকের উপর বিমান চলাচলের কারণে সেখানকার পরিবেশে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে৷ এই কালো কার্বনের পার্টিকেল সূর্যের আলো শোষণ করে বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে৷

চীনের আগমন

আর্কটিকের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া সেখান থেকে লাভবান হতে চায় চীনও৷ তাইতো ‘স্নো ড্রাগন’ নামের এই জাহাজটি ২০১২ সালে আর্কটিকের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে ইউরোপে পৌঁছেছে৷ এ বছর মে মাসে চীনকে আর্কটিক কাউন্সিলের অবজারভার স্ট্যাটাস দেয়া হয়৷

ভারতের গবেষণা

২০০৮ সালে আর্কটিকের নরওয়ের অংশে এই গবেষণা কেন্দ্রটি চালু করে ভারত৷ এর বাইরে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও আর্কটিক নিয়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে৷

আইপিসিসি-র প্রধান রাজেন্দ্র পচৌরি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মোকাবিলা করতে যত দেরি হবে, তার ব্যয়ভারও ততই বেড়ে যাবে৷ তাছাড়া এই ব্যয়ের ফলে মানুষের শিল্প-বাণিজ্য সংক্রান্ত কার্যকলাপে কোনো ব্যাঘাতও ঘটবে না৷ অর্থাৎ এমন পদক্ষেপ এখনো মানুষের ক্ষমতার সীমার মধ্যেই রয়েছে বলে মনে করেন তিনি৷

কোন ধরনের পদক্ষেপের ফলে কতটা কাজ হবে, তারও রূপরেখা তুলে ধরেছে আইপিসিসি৷ জীবাশ্ম-ভিত্তিক জ্বালানি ছেড়ে বিকল্প জ্বালানি অথবা কম নির্গমন হয় – এমন জ্বালানির পথে অগ্রসর হলে জ্বালানির ব্যবহার বছরে ০.০৬ শতাংশ কমে যাবে৷ এর ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাও পাওয়া যাবে৷ এখনই পুরোপুরি পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের সম্ভাবনা যে অবাস্তব, আইপিসিসি সে বিষয়ে সচেতন৷ তাই আণবিক শক্তির মতো ‘লো কার্বন' জ্বালানির ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে রিপোর্টে৷ এমনকি আধুনিক প্লান্ট ব্যবহার করে জীবাশ্ম-ভিত্তিক জ্বালানির নির্গমনের একাংশ বশে আনার কাজেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে৷

আর্থিক অঙ্কের বিচারে ভবিষ্যতে জীবাশ্ম-ভিত্তিক জ্বালানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বছরে ৩,০০০ কোটি ডলার করে কমে যাবে বলে আশা করছে আইপিসিসি৷ অন্যদিকে ‘লো কার্বন' জ্বালানির ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক দাঁড়াবে ১৪,৭০০ কোটি ডলার৷ পরিবহন, বাড়িঘর, শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদিত জ্বালানি সাশ্রয়ের মাত্রা দাঁড়াবে ৩৩,৬০০ কোটি ডলার৷

অন্বেষণ | 04.04.2014

এই সব বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অর্থের অঙ্কের বাস্তব মূল্যায়ন কী হয়, সেটাই এখন প্রশ্ন৷ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে শুরু থেকেই শিল্পোন্নত বিশ্ব ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে দর কষাকষি চলে আসছে৷ আইপিসিসি-র সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলির কার্বন নির্গমনের মাত্রাও বেড়ে চলেছে৷ পৃথিবীর দেশগুলি কী ভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে, আইপিসিসি সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, শুধু দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মনে করিয়ে দিয়েছে৷

এসবি/ডিজি (এপি, রয়টার্স)

ব্যক্তিবিশেষ জেনেশুনে ভুল করলে তাকে ‘জ্ঞানপাপী' বলা হয়৷ কিন্তু গোটা মানবজাতি যদি বছরের পর বছর ধরে সতর্কবাণী উপেক্ষা করে নিজেদের ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চললে কী হয়, তার কোনো সংজ্ঞা এখনো তৈরি হয়নি৷ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল আইপিসিসি আবার জানিয়ে দিলো যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটে চলেছে এবং তার পরিণাম হবে মারাত্মক৷ অথচ এর মোকাবিলার কাজ মোটেই কঠিন নয়, ব্যয়ভারও তেমন বেশি নয়৷ অত্যন্ত দ্রুত সেই কাজ শুরু না করলে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে৷