ভারত

ভারতে সাম্প্রদায়িকতা যায়নি, আছে...

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, মানসিকভাবে অসাম্প্রদায়িক৷ অন্তত তেমনটাই ধারণা ছিল৷ কিন্তু গত ১০ বছরে এই ধারণাটা একটু একটু করে ভেঙে পড়েছে৷

default

বাবরি মসজিদ ভাঙার বছরে, ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ঐতিহ্য নিয়ে এক আলোচনাসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছিলেন কলকাতার এক বুদ্ধিজীবী৷ তিনি বলেন যে, হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা, আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে মুসলিম-বিদ্বেষ বরাবরই ছিল, আছে এবং থাকবে৷ প্রথমত, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এবং বহু হিন্দু পরিবারের উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে আসার যে যন্ত্রণা, তা এত সহজে যাওয়ার নয়৷ তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত এই যন্ত্রণার তীব্রতা একটু একটু করে কমবে৷ যে প্রজন্ম স্বচক্ষে দেশভাগ এবং শরণার্থী সংকট দেখেছে, তাদের যে রাগ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সেই একই অনুভূতি হয়ত ততটা সক্রিয় থাকবে না৷ এক্ষেত্রে শিক্ষার প্রসার অবশ্যই একটা বড় ভূমিকা নেবে৷

কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে, তেমনটা হয়নি৷ উলটে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল যখন পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের ঘাঁটি গড়তে মরীয়া, তখন সামান্য খোঁচাতেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে মুসলিম-বিদ্বেষ৷ এবং না, শিক্ষা এক্ষেত্রে কোনো হেরফের ঘটায়নি৷ অতি উচ্চ শিক্ষিত, সফল পেশাদাররাও এখন প্রকাশ্যে বলছেন, ‘‘‌ওদের‌ বড্ড বাড় বেড়েছে৷ শিক্ষা না দিলে চলছে না!‌''‌ কী রকম শিক্ষা?‌ গুজরাটে যেমন দেওয়া হয়েছিল!‌

কখনো কখনো শিক্ষিত মানুষেরাও বলছেন এমন কথা!‌ বিজেপি এমন আক্রমণাত্মক মানসিকতার প্রসারই চাইছে৷ যে কারণে এই বঙ্গভূমে রামায়ণ নিয়মিত পাঠে থাকলেও, পাঠান্তরে শ্রীরামচন্দ্র পুজো পাননি কখনও, অথচ আজ রামনবমী পালিত হচ্ছে৷ সে-ও অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মিছিল করে৷ দুর্গা পুজোর শেষে বিজয়া দশমী বাংলায় চিরকালই আত্মীয়-বন্ধুর পুনর্মিলনের উৎসব৷ সেদিন মুসলিম প্রতিবেশীর ঘরেও বিজয়ার নিমকি, নারকেল নাড়ু যায়, ঠিক যেভাবে ওদের ঘর থেকে আসে ঈদের সেমাই৷ কিন্তু এ বছর নাকি বিজয়া দশমী ‘‌শস্ত্র দিবস'‌ হিসেবে পালিত হবে বাংলার কিছু জায়গায়৷ যুদ্ধজয়ের উৎসব হিসেবে৷

অডিও শুনুন 01:27

শিক্ষিত মুসলিমদের এখনও দূরবিন দিয়ে খুঁজতে হয়

সমস্যা হচ্ছে, বিজেপির এই হিন্দুত্ববাদী কৌশলের পালটা হিসেবে আরও বিভ্রান্ত এক রাজনীতির চর্চা হচ্ছে৷ রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল এবং এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র বড় এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস ধর্মীয় সংস্কৃতি দিয়েই বিজেপির পুজোপাঠের সংস্কৃতির বিরোধিতা করতে চাইছে, যা কার্যত অসম্ভব এবং ভুল৷ কারণ, ভারতীয় ধর্ম নিরপেক্ষতার যে আদর্শের অন্তত বাঙালি মানসিকতায় এক ধরনের আত্মীকরণ হয়েছিল, তার থেকে বাঙালিকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই রাজনৈতিক কৌশল৷ সেখানেও ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে হিতে বিপরীত হচ্ছে৷ এই বছরেই যেমন, বিজয়া দশমীর পরের দিন মুসলমানদের মহরম পালিত হবে বলে সেই দিন দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি৷ এই সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে, যার পুরো সুযোগ নিচ্ছে বিজেপি৷

অথচ মুখ্যমন্ত্রী একবারও ভাবেননি, মহরমের মিছিল হয় দুপুরে, চলে বড় জোর বিকেল পর্যন্ত, আর প্রতিমা বিসর্জন শুরুই হয় সন্ধের পর থেকে৷ এর আগেও বহুবার বিজয়া দশমী এবং মহরমের তারিখ গায়ে গায়ে পড়েছে, কিন্তু কোনো অসুবিধে হয়নি৷ এবারেও মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর রাজ্যের একাধিক মুসলিম গোষ্ঠী জানিয়েছে, তারা এমন কোনো আবেদন সরকারের কাছে করেনি৷ সোজা কথায়, এটা সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, যার সঙ্গে বাঙালি মুসলিমদের কোনো যোগ নেই৷

অডিও শুনুন 05:20

‘হিন্দুদের মুসলিম-বিদ্বেষ বরাবরই ছিল, এখনও আছে’

পরিস্থিতিটাকে বাঙালি মুসলমিরা কীভাবে দেখছেন?‌ বিশেষত শিক্ষিত, উদারপন্থি মুসলিমরা?‌ অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক শামিম আহমেদের গলায় হতাশার সুর স্পষ্ট৷ তিনি পরিষ্কারই বলছেন, শিক্ষিত মুসলিমদের এখনও দূরবিন দিয়ে খুঁজতে হয়৷ আর যাঁরা আছেন, তাঁরাও খুব বিভ্রান্ত এবং অসহায়৷ এই পরিস্থিতির মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে, তাঁরা বুঝতে পারছেন না৷ বরং অনেক সময়ই ভুল প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেলছেন কোনো ঘটনায়, যার জন্য আফসোস হচ্ছে৷

আরেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী আবদুর রউফ আরও একটু স্পষ্ট করেছেন সংকটটা৷ তিনি বলছেন, যারা এইধর্মনিরপেক্ষতার স্খলন আটকাতে পারত, সাম্প্রদায়িকতার বিপদের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার চালিয়ে মানুষকে সচেতন করতে পারত, সেই বামপন্থিরা আজ শক্তিহীন৷ জাতীয়তাবাদ এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী কংগ্রেসও অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে৷ তাছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস ধর্মীয় সংস্কৃতি দিয়েই বিজেপির ধর্মীয় আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে চাইছে, যা শুধু ভুল নয়, বিপজ্জনকও বটে৷ আবদুর রউফের সাফ কথা, বাঙালি মুসলমানদের ভুল বোঝানো হচ্ছে৷ পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা এখন মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ, যা সরকার গড়ার পক্ষে জরুরি বলে মমতা ব্যানার্জির হয়ত মনে হচ্ছে৷ কিন্তু শতকরার হিসেবে যে ভোটের অঙ্ক আর কষা হয় না, সেটা উত্তর প্রদেশে বিজেপি কিন্তু গত বিধানসভা ভোটে প্রমাণ করে দিয়েছে৷ ভারতের সবচেয়ে জনবহুল ঐ রাজ্যেরও জনসংখ্যার ২০ শতাংশ কিন্তু মুসলিম৷ তা সত্ত্বেও সরকার গড়ার ক্ষেত্রে তাদের ধর্তব্যের মধ্যেই রাখা হয়নি৷ প্রখর হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথ সেখানে দাপটে সরকার গড়েছেন এবং একের পর এক মুসলিম-বিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন৷ কাজেই ভোটের হিসেবে আজ যে গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে পাচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটা স্রেফ অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে পারে৷ এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসও গুরুত্ব হারাতে পারে৷ কারণটা আবদুর রউফ তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বলেছেন যে, হিন্দুদের মুসলিম-বিদ্বেষ বরাবরই ছিল, এখনও আছে৷ বিজেপি তার সুযোগ নিচ্ছে মাত্র৷

আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

Albanian Shqip

Amharic አማርኛ

Arabic العربية

Bengali বাংলা

Bosnian B/H/S

Bulgarian Български

Chinese (Simplified) 简

Chinese (Traditional) 繁

Croatian Hrvatski

Dari دری

English English

French Français

German Deutsch

Greek Ελληνικά

Hausa Hausa

Hindi हिन्दी

Indonesian Bahasa Indonesia

Kiswahili Kiswahili

Macedonian Македонски

Pashto پښتو

Persian فارسی

Polish Polski

Portuguese Português para África

Portuguese Português do Brasil

Romanian Română

Russian Русский

Serbian Српски/Srpski

Spanish Español

Turkish Türkçe

Ukrainian Українська

Urdu اردو