ভুয়া খবর নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে ‘সোশ্যাল বট’ সম্পর্কে জানুন

আসল খবরের চেয়ে ভুয়া খবর যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন খবরটা যে আসল তা এখন বোঝা বেশ দুরুহ হয়ে যাচ্ছে৷ এটা আসলে সোশ্যাল বটের সঙ্গে সম্পৃক্ত৷ কিন্তু তারা কারা এবং কিভাবে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার, কার্যত আমাদের চিন্তাভাবনায় বড় প্রভাব ফলে৷ ফলে বিশ্বের যাবতীয় ঘটনা সম্পর্কে আমাদের যে মতামত সৃষ্টি হয়, তা কার্যত সামাজিক যোগাযোগনির্ভর হয়ে উঠছে৷ রাজনীতিবিদদের গুরুত্ব, জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা বলুন আর আর্থিক মডেল বা নীতিগত আন্দোলন, সবকিছু সম্পর্কেই আমরা জানছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে৷ বিশ্বের ছোটবড় সব গণমাধ্যম তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কন্টেন্ট শেয়ার করেন৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

‘সোশ্যাল বট'দের বসবাসও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ বিএমডাব্লিউ থেকে শুরু করে স্পটিফাই অবধি বিভিন্ন কোম্পানি এখন ‘বট' ব্যবহার করছে, যেগুলোর কাজ হচ্ছে আপনার পছন্দের গানগুলো সেভ করে রাখা থেকে শুরু করে আপনার ইন্সটাগ্রামের ছবি টুইটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট করা, এমনকি সময় মতো আপনার গাড়ির গ্যারেজ খুলে দেয়া৷ সমস্যা হচ্ছে কিছু মানুষ মন্দ উদ্দেশ্যেও ‘বট' তৈরি করছে৷

বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটারে অনেক সময় ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সেগুলোতে হাজার হাজার ভুয়া অনুসারী যোগ করা হয়৷ এটা করা হয়, যাতে অ্যাকাউন্টগুলো দেখে আসল মনে হয়৷ পরবর্তীতে অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের ‘বট' সফটওয়্যার যোগ করে দেয়া হয়, যার কাজ হচ্ছে সুনির্দিষ্ট তথ্য টুইট, রিটুইট বা পোস্ট করা৷ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এটা করা হয়৷ আর এই বিশেষ উদ্দেশ্য অমঙ্গলজনক হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে৷

ভুয়া খবর

আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তথ্য বিকৃতি এক বড় ইস্যু৷ জার্মানির বিচারমন্ত্রী হাইকো মাস সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি মনে করেন, জার্মানির আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে ব্যাপক হারে ভুয়া তথ্য বা ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া হতে পারে৷

তাঁর উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে৷ যদিও মানুষই ভুয়া সংবাদ তৈরি করে, কিন্তু সেটি ফেসবুক, টুইটার বা রেডিটের মতো জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে বড় ভুমিকা পালন করে লাখ লাখ ভুয়া অ্যাকাউন্ট৷ ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বাজফিডের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন ভুয়া সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে পরিমাণ ‘এনগেজমেন্ট' সৃষ্টি করেছিল, তা উনিশটি বড় সংবাদমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদে তৈরি সম্মিলিত এনগজেমেন্টের চেয়ে বেশি৷

বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নিয়ে তৈরি গবেষণা দল ‘পলিটিক্যাল বটস' এক রিপোর্টে জানিয়েছে, টুইটারে অন্তত ৩০ মিলিয়ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট রয়েছে৷ এটি আরো জানিয়েছে, মার্কিন নির্বাচনের আগে ট্রাম্পপন্থি বট, যেগুলোর কাজ ছিল ভুয়া সংবাদ ছড়ানো, প্রো-ক্লিন্টন বটের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি ছিল৷

সমাজ

মহাকাশ থেকে ফেসবুক লাইভ

একটি ফেসবুক লাইভে দেখাচ্ছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র থেকে নভোচারীদের স্পেসওয়াক করার দৃশ্য৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ভাইরাল হয়ে যায়৷ ইউএনআইএলএডি, ভাইরাল ইউএসএ এবং ইন্টারেসটিনেট- এটি পোস্ট করার পর ফেসবুকে বিপুল পরিমাণ লাইক ও শেয়ার হয়৷ কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ফুটেজের কোথাও নাসা বা ফেসবুকের লাইভ স্ট্রিম কথাটির উল্লেখ ছিল না৷ পরে নাসা’র এক মুখপাত্র জানান, ভিডিওটি ২০১৩ সালে রুশ নভোচারীদের ধারণ করা ভিডিও৷

সমাজ

করোনা বিয়ারের প্রতিষ্ঠাতার উইল

২০১৬ সালের অন্যতম ভাইরাল খবর এটি-করোনা বিয়ার-এর প্রতিষ্ঠাতা আন্তোনিও ফার্নান্দেজ মৃত্যুর আগে তাঁর জন্মভূমি স্পেনের একটি গ্রামের ৮০টি পরিবারের মধ্যে ২০ কোটি ইউরো দান করার উইল করে গেছেন৷ ডেইলি মেইল প্রথমে খবরটি প্রকাশ করে স্থানীয় পত্রিকার বরাত দিয়ে৷ পরে আরটি, দ্য ইন্ডেপেন্ডেন্ট, দ্য মিররসহ বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রও তা প্রকাশ করে৷ পরে ফার্নান্দেজের পরিবার প্রতিবাদ জানানোয় তারা খবরটি সরিয়ে ফেলে৷

সমাজ

ধর্ষণের ভুয়া খবর

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বার্লিনে লিজা নামের এক জার্মান কিশোরীকে এক দল অভিবাসীর ধর্ষণ করার খবর ভাইরাল হয়ে যায়৷ বিশেষ করে রুশ মিডিয়ায় খবরটি বিপুল কভারেজ পায়৷ পরে কিশোরীটি জানায়, সে সব কিছু বানিয়ে বলেছে৷

সমাজ

মার্কিন নির্বাচন

মার্কিন নির্বাচনে যে ভুয়া খবরটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল তাতে ছিল ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধের মাত্রার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলের তুলনা৷ এছাড়া নির্বাচনের ফলাফলের এমন একটি মানচিত্র ওয়াশিংটন পোস্ট প্রকাশ করেছিল, যেটির দিকে ভালোভাবে তাকালে বোঝা যায় একেবারে ওপরে ২০১২ সালের উল্লেখ রয়েছে৷

সমাজ

ট্রাম্প এবং সিম্পসন

সিম্পসন কার্টুনে বেশ কিছু ভবিষ্যদ্বাণী থাকে৷ আর এ কারণে ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার পর একটি ট্রল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে বলা হয় সিম্পসনে আগেই বলা হয়েছিল, ট্রাম্প নির্বাচনে জিতবেন৷ কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু হয়নি৷ অথচ টুইটারে বাস্তব আর পুরোনো ভুয়া সিম্পসনের ছবি দেয়ায় নিউজটি ভাইরাল হয়ে যায়৷

সমাজ

শোকার্ত ক্যাঙ্গারু

ডেইলি মেইল এমন একটি ছবি প্রকাশ করে যেখানে দেখানো হয় এক পুরুষ ক্যাঙ্গারু নারী ক্যাঙ্গারুকে দুই হাতে ধরে অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে আছে৷ ইভান সুইৎজারের তোলা ছবিটি এভাবে উপস্থাপনের কারণে ভাইরাল হয়ে যায়৷ তবে ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞরা জানান, নারী ক্যাঙ্গারুর সঙ্গে যৌন মিলনের ইচ্ছে জাগলে পুরুষ ক্যাঙ্গারুর চোখ অশ্রুসজল হয়, তখনই তারা দুই হাত দিয়ে ঝাঁকিয়ে নারী ক্যাঙ্গারুকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে৷

সমাজ

বিখ্যাত গণমাধ্যমের নকল

ভুয়া খবর প্রচারকারীরা জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত ওয়েবসাইটগুলোকে নকল করে ৷ ফলে মানুষ খুব ভালোভাবে লক্ষ্য না করলে বুঝতে পারে না, সেগুলো প্রকৃত ওয়েবসাইট, নাকি ভুয়া৷ যেমন, এবিসি নিউজ ডট কম এর সঙ্গে ডট সিও যুক্ত করে (ABCnews.com.co), ব্লুমবার্গের সঙ্গে ডট এমএ যুক্ত করে, ওয়াশিংটন পোস্ট ডট কম- এর সঙ্গে ডট সিও যুক্ত করে কয়েকটি ভুয়া সংবাদ সাইট তৈরি করা হয়েছে৷ এসব ওয়েবসাইটের কাজই ভুয়া সংবাদ পরিবেশন করা৷

ভুয়া সংবাদের মোকাবিলা

যদিও হোক্সম্যাপের মতো কোম্পানিগুলো গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ভুয়া নিউজের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো, কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারবর্গ এখন সেই লড়াইয়ে নামছে৷

ফেসবুক সম্প্রতি এক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যা প্ল্যাটফর্মটিতে ভুয়া খবর ছড়ানো রোধে সহায়তা করবে৷ এই উদ্যোগের কারণে এখন কোনো ব্যববহারকারীর কোনো সংবাদ ভুয়া মনে হলে তিনি সেটি ফেসবুকে রিপোর্ট করতে পারবেন৷ এরপর ফেসবুক সেই নিউজ সঠিক, না ভুয়া তা জানতে ‘থার্ড পার্টি' বিভিন্ন তথ্য যাচাই কোম্পানির সহায়তা নেবে৷ সংবাদটি ভুয়া হলে ফেসবুকে লিংকটির সঙ্গে ট্যাগ লাগিয়ে দেবে

ভুয়া সংবাদ রোধে জার্মান সরকারও উদ্যোগ নিচ্ছে৷ ‘সেন্টার অফ ডিফেন্স অ্যাগেইনস্ট ডিসইনফরমেশন' নামে একটি টিম গঠন করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীনে৷ আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এক ‘সাইকোলজিক্যাল ভ্যাকসিনের' কথা বলছেন, যা মানুষকে ভুয়া সংবাদ সম্পর্কে সজাগ করতে পারে৷ তবে অন্যান্য ভ্যাকসিনের মতো এমন ভ্যাকসিন তৈরিতেও কয়েক দশক লাগতে পারে৷

স্টেফান বিয়ানকোভস্কি/ এআই

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন মন্তব্যে৷